ইতিহাস

“হস্তপদ থাকা স্বত্তেও পুত্তলিকা অচেতন পদার্থ”

neon aloy নারী জাগরণ নিয়ন আলোয়

অদ্ভূত শিরোনামটি অগ্রাহ্য করে ভেতরের লেখা পড়ে দেখার ধৈর্য যারা রাখছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা। আগে ভাগেই সৎ হয়ে পাঠকদের কাছে লেখাটির ত্রুটিগুলো স্বীকার করে নেয়া নিতান্ত কর্তব্য মনে হচ্ছে। ত্রুটি “গুলো” আসলে একাধিক ত্রুটির অস্তিত্ব জ্ঞাপন করছে না। ত্রুটি এখানে একটি। আর তা হল এই লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে আমাদের উপমহাদেশে কয়েক শতাব্দী জুড়ে আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, গ্রন্থ-প্রবন্ধের কোন অভাব নেই। তবুও যেহেতু ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক আদি এই বিষয় নিয়ে লেখার অথবা চিন্তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে, তার মানে শতাব্দীব্যাপি আলোচিত বিষয়টি নিয়ে কেবল আলোচনাই হয়তো সম্ভব। তবে আলোচনার সুবাদে একজনের অন্তর একটু আলোকিত হলেই লেখা স্বার্থক। নতুবা সহজ ভাষায় বলতে গেলে লেখাটি “উলো বনে মুক্তা ছড়ানো” ছাড়া আর কিছু হবে না।

লেখার ভাববস্তুর সাথে উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে আসা প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী পরিচিত। পরিচয় থাকলেও বিষয়বস্তু অন্তরে ধারণকারীর সংখ্যা হতাশাজনক। প্রশ্ন আসবে এটা কিভাবে বলা সম্ভব কার অন্তরে কি আছে। সত্যতা যাচাইয়ের লিটমাস পরীক্ষা এখনই হয়ে যাক তবে? শিরোনামটির উৎস যে পাঠকদের জানা আছে, তাদের নিয়েই জাতি কিছুটা আশা রাখতে পারে। বাকিদের নিয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। শিরোনামের বাক্যটির উৎস জানার উপর প্রাথমিক লিটমাস পরীক্ষার ফলাফল নির্ভর করছে।

বিজ্ঞান প্রমাণিত একটি সত্য আগে বলে রাখা দরকার। মানুষের অস্তিত্বের পুরোটাই নির্ভর করে ৪৪+২টি(২৩ জোড়া) ক্রোমোসোমের উপর। ৪৪টি ক্রোমোসোম প্রত্যেক মানুষে একই কাজ করে থাকে। আলাদা ভাবে লেখা ক্রোমোসোম গুলো হচ্ছে মানুষের লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোসোম। এই ২টি ক্রোমোসোমই নারী আর পুরুষের পার্থক্য তৈরী করে। কোষ পর্যায়ে চিন্তা করলে নারী-পুরুষের পার্থক্য কতটা নগণ্য সেটা তুলে ধরার জন্যই জীববিজ্ঞান কপচাতে হচ্ছে। লেখাটির অনুপ্রেরণা এই পার্থক্যের নগণ্যতাই।

কথা না বাড়িয়ে তবে মূল বক্তব্যে আসি। পৃথিবীজুড়ে পিতৃতান্ত্রিক অর্থনীতি, পুরুষপ্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা, পুরুষপ্রণীত ধর্মজ্ঞান, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি সাধারণ প্রভাব ফেলেছে। নারীকে পুরুষের উপর নির্ভরশীল করে রেখেছে এই প্রথা, শিক্ষা আর বিশ্বাসগুলো। এই প্রথার দমকেই স্বামী দৈহিক কাম মোচন আর ৩ বেলার খাবার ছাড়া আর কোন কিছুই আশা করতে পারেন না স্ত্রীর কাছে, ভাই তার আপন বোনের সাথে মুক্তচিন্তার আলোচনায় যেতে নিরুৎসাহিত হন, একজন বাবা ইচ্ছা না থাকা স্বত্তেও কন্যার ভাগ্য ছেড়ে দেন অন্য পুরুষের হাতে এবং সর্বোপরি একজন মা ব্যর্থ হন বলিষ্ঠভাবে নিজের সন্তানের অধিকার আদায়ের লড়াই করতে।

নারীর প্রতি বৈষম্যের যে চিত্র ১০০ বছর আগে ছিল, তার কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশে নারীশিক্ষার হার বেড়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু এই শিক্ষিত নারীসমাজ সম্পূর্ণ মুক্তি পেয়েছে কি বৈষম্য থেকে? তার উত্তর পাঠকরাই ভালো বুঝবেন। শিক্ষিত নারীর প্রতি সমাজ আর প্রতিষ্ঠানের বৈষম্যগুলো এখন সূক্ষ। প্রকৌশলভিত্তিক চাকুরীগুলো এখনো নারীসমাজের ধরা ছোঁয়ার বাইরেই আছে। এমন অনেক গ্র্যাজুয়েট নারী আছেন, যারা প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক- প্রকৌশলে স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ে লেখাপড়া শেষ করার পর চাকরির বিজ্ঞাপনে দেখছেন- “পুরুষ প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে”। শিক্ষাগত যোগ্যতা এখানে বিষয় নয়। নারী হয়ে জন্ম নেয়াটাই তাদের অযোগ্যতা।

অনেক বাবা আছেন যিনি মেয়েকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মেয়েকে যখন রাত-দিন নির্বিশেষে চাকুরীর জন্য অন-কল ডিউটিতে থাকতে হয়, তখন নিরাপত্তা আর সমাজের দোহাই দিয়ে বলেছেন “মা চাকুরীটা ছেড়ে দে। রাতবিরাতে ভদ্রঘরের মেয়ে বাইরে থাকে না।” অনেক স্বামী আছেন কর্মজীবী স্ত্রীর উপার্জনে বিলাসীতাও করেন, আবার সেই স্ত্রীকে নিয়ে লোকে কথা বলে দেখে হট কথায় চাকুরী ছেড়ে দিতে বলেন, কথায় কাজ না হলে কোলে সন্তান ধরিয়ে দেয়ার সুযোগ তো আছেই। নিজে এমন অনেক চাক্ষুষ প্রমাণ দেখেছি। মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, স্নাতকে একজন পুরুষের তুলনায় কয়েক গুণ ভালো ফলাফল পাওয়া নারী নিজের থেকে কম শিক্ষিত স্বামীর সংসারে কেবল রান্নাঘরেই স্থান করে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই শিক্ষিত নারীর উন্মুক্ত মস্তিষ্কটুকু যে রান্না ঘরের মধ্য আটকে গেল তা কি কেবল নারীর ক্ষতি, নাকি আমাদের পুরো জাতির? শিক্ষিত হয়ে মুক্ত চিন্তার নারীর জন্য এই দেশ কি রকম তা আর না বলি। নির্যাতক, পাষন্ড, চরিত্রহীন স্বামীর কাছ থেকে যখন একজন শিক্ষিত নারী মুক্ত হতে চান তখন দোষ সে নারী এবং তার শিক্ষারই হয়। নিজ কন্যার উপর নির্যাতনের কথা জানার পরও একজন বাবা চুপ থাকেন সমাজের দোহাই দিয়ে। মায়ের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করার পর কন্যার শুনতে হয়, “আমরাও এসব মেনেই সংসার করেছি”। কি এক সমাজ আমাদের যেখানে নারী মুক্ত হয়েছে কেবল শরীরে, এবং সে শরীরের নিরাপত্তার থেকেও বাবা-মা’র কাছে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা আর সম্মান মূখ্য।

উপরের কথাগুলো বিশ্বের সকল প্রেক্ষাপটে কম বেশি সত্য। যে জাতি এই প্রথার শেকল ভেঙে ভিন্নমত পোষণ করেছে, তাদের উন্নতি একরকম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। উল্লেখ্য, এই ভিন্নমত পোষণের বিপ্লবে নারী জাগরণের পথে পুরুষ নারীর সঙ্গী হয়েছে মাত্র। দূর্গম পথটুকু নারীর নিজ শক্তি আর উদ্যম দিয়েই অতিক্রম করতে হয়েছে। উন্নত বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোতে নারী জাগরণের সূচনা আর তাতে নারী সমাজের কি পরিমাণ প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ছিল তা নিয়েই এই লেখা।

৪টি দেশের ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন আঙ্গিকে নারী জাগরণের পটভূমিঃ

১) আইসল্যান্ডঃ গেল বছর আইসল্যান্ড ৭ম বারের মত বিশ্বের সবচেয়ে লিঙ্গনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। নারী-পুরুষের মধ্যে শিক্ষার হারের পার্থক্য শূন্যের ঘরে নিয়ে আসার সফলতাই আইসল্যান্ডকে নিরপেক্ষতার এই শিখরে নিয়ে এসেছে। ২০০৯ সালে অর্জিত এই প্রশংসনীয় মাইলফলকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ১৮৫০ সালে।

আইসল্যান্ড প্রথম রাষ্ট্র, যেখানে নারী-পুরুষের সমান উত্তরাধিকার যোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৫০ সালে নারী এবং পুরুষ উভয়ে পৈতৃক সম্পদের সমান ভাগ পাবে বলে আইন পাশ হয়। তবে এখানেই শেষ নয়। সত্যিকার বিপ্লবের সূত্রপাত আইসল্যান্ডে তারও ১২৫ বছর পরে, ১৯৭৫ সালে। তখন পর্যন্ত আইসল্যান্ডে সমান সময় কাজের বিনিময় নারীদের বেতন পুরুষের ভগ্নাংশ ছিল। ২৪ অক্টোবর দুপুর ২:০৮ ঘটিকায় আইসল্যান্ডের কর্মজীবী নারীসমাজ স্বেচ্ছায় কর্মস্থান ত্যাগ করেন। নারীদের পূর্ণ ১০ ঘন্টা কাজের যে বেতন দেয়া হত, তা পুরুষদের ৬-৮ ঘন্টার আয়ের সমান বলেই তখন কর্ম বিরতি নেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেদিন শুধু কর্মজীবী নারীদের আন্দোলন ছিল ব্যাপারটা মোটেও এমন না। এই আন্দোলনে সাধারণ গৃহিনীরাও অংশগ্রহন করেন। কর্মবিরতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘরের বাইরে ও ভেতরে নারীর ভূমিকা পুরুষ সমাজকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেওয়া। নারীজাতির উপর নির্ভরশীলতার প্রমান দিয়েই ২৫,০০০ নারী সকল কাজ বন্ধ করে রাজধানী রেইকয়াভিকের রাস্তায় সমাবেশ করেন। এই আন্দোলনের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে আইসল্যান্ডের সরকার নারীদের সমান বেতনপ্রাপ্তির আইন পাশ করে। দেশের ৯০% নারী এই আন্দোলনে অংশ নেন বলেই এত অল্প সময়ে দাবি আদায় হয় এবং আইসল্যান্ড তার বর্তমান অবস্থার পথে চলতে শুরু করে।

২) ইংল্যান্ডঃ ২১ জুন ১৯০৮ সালে লন্ডনের হাইড পার্কে কর্মজীবী নারীদের ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলনের চূড়ান্ত ধাপের সূচনা হয়। ব্রিটেনের Womens Social and Political Union(WSPU) এর উদ্যোগে হাইড পার্কের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সম্মেলন আয়োজন করে। সমগ্র ব্রিটেন থেকে সমর্থকদের জোগাড় করতে ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হেনরি অ্যাস্কুইথ WSPU-কে নারী সমর্থন ভোটে কেমন প্রভাব ফেলতে পারে তা প্রমাণ করতে বলেন। এর উত্তরে হাইড পার্কে লক্ষাধিক নারী সম্মেলনে যোগ দেন।

এক পর্যায়ে অনেক নারী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের গ্রীলে নিজেদের চেইন দিয়ে আবদ্ধ করেন। হেনরি অ্যাস্কুইথ বিপুল এই জনসমাবেশ দেখেও ভোটাধিকার পাশের বিল উত্থাপনে অসম্মতি জানালে আন্দোলন চরমরূপ ধারণ করে। সরকারি বাসভবনের জানালা-দরজায় পাটকেল নিক্ষেপ করা হয় এবং আগুন দেয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ গ্রেপ্তার শুরু করে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘোষণার পর আন্দোলন স্তিমিত হয়। WSPU-এর কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ১৯১৮ সালে ত্রিশোর্ধ বিত্তশালী নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। ১৯২১ সালে অবশেষে প্রাপ্তবয়স্ক সকল নারী ভোটাধিকার লাভ করেন। বিশ্বময় নারী ভোটাধিকারের আন্দোলনে হাইড পার্কের উইমেন্স সানডে (Womens Sunday) অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করেছে।

বেতন সমতার আন্দোলন যুক্তরাজ্যে শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। ফোর্ড মোটর কোম্পানীর সেলাই ও কাঠামো নির্মাণের ডাগেনহ্যাম প্ল্যান্টের সকল নারী শ্রমিক তাদের কাজ বন্ধ করেন। তখন নারী আর পুরুষের আলাদা বেতন স্কেল ছিল যাতে ১৫% কম বেতন দেয়া হত মেয়েদের। কৌশলগত দিক থেকেও নারীদের কাজ পুরুষের তুলনায় নগণ্য মনে করা হত।

আন্দোলন শুরুর অল্প কিছু দিনের মধ্যে ফোর্ড তাদের ফ্যাক্টরি সচল রাখতে ব্যর্থ হয় এবং ৩ সপ্তাহের মাথায় নারীদের নতুন বেতন স্কেল প্রণয়ন করা হয়। উক্ত স্কেলে নারী-পুরুষের বেতন পার্থক্য ১৫% থেকে কমিয়ে ৮% আনা হয়। কিন্তু শিল্পকৌশলের মর্যাদা তখনও আদায় হয়নি। লাগাতার ৬ সপ্তাহ আন্দোলনের পর কৌশলগত মর্যাদা আদায়ে সক্ষম হন ফোর্ড কোম্পানীর নারী শ্রমিকদল।

শ্রমিক শ্রেনীর আন্দোলনে ঊদ্ভূত হয়ে উইমেন্স ট্রেড ইউনিয়ন ১৯৬৯ সালে বেতন সমতার দাবিতে সম্মেলন করেন যেখানে আনুমানিক ১০০০ নারী উপস্থিত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে সমবেতন আইন পাশ করা হয় যা ১৯৭৫ সালে কার্যকর হয়। নব্যপ্রনীত আইনের পরিপ্রক্ষিতে কর্মক্ষেত্রে নারীদের পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়। কর্ম ক্ষেত্রে সম অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ডাগেনহ্যাম প্ল্যান্টের সকল নারী শ্রমিকের ভূমিকা পৃথিবীজুড়ে সর্বজন স্বীকৃত।

৩) যুক্তরাষ্ট্রঃ ১৯৬৮ ও ১৯৭০ সালে দু’টি বিপ্লবী আন্দোলন হয় যুক্তরাষ্ট্রে। প্রথমটিতে ৪০০ নারী মিস আমেরিকা প্রতিযোগীতার বিরুদ্ধে কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তাদের ভাষ্য মতে এই প্রতিযোগীতা কেবল নারীদেহ বিপণন করার উপায় মাত্র। প্রতিযোগীতায় নারী দেহের যে মানদন্ড তৈরী করা হয়েছে তা কেবল অসম্ভব যে তা নয়, বরং সাধারণ নারীদের জন্য অপমানজনক। রুপসজ্জার পুরুষ কাঙ্খিত মানদন্ডের বিরোধিতায় ডাস্টবিনে রূপসজ্জার সামগ্রী, হাই হিল আর অন্তর্বাস ফেলে তাতে আগুন দেন বলে গুজব শুনতে পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়টিতে পুরুষচালিত “Ladies Home Journal” ম্যাগাজিনের অফিসে অবস্থান নেন ১০০ নারী। ম্যগাজিনটি নারী অবমাননার খোরাক যোগাচ্ছে বলে তারা দাবি করেন। টানা ১১ ঘন্টা তারা অবস্থান করেন ম্যাগাজিনের অফিসে। তাদের আন্দোলনের মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল ম্যাগাজিনটির সম্পাদনা বিভাগে যেন নারীদের প্রাধান্য দেয়া হয়। তৎকালীন সম্পাদক পদত্যাগ না করলেও আন্দোলনকারীদের শান্ত করতে সক্ষম হন। ৩ বছর পর ম্যাগাজিনটির প্রথম নারী প্রধান সম্পাদক হিসেবে লেনর হার্সী আসন গ্রহন করেন।

৪) দক্ষিণ আফ্রিকাঃ ১৯৫৬ সালের ৯ আগস্ট। রাজধানী প্রেটোরিয়ায় সকল বর্ণের ২০,০০০ নারী প্রাশাসনিক ভবনের সামনে সমবেত হন। তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভবনে প্রবেশ করেন এবং সেখানে ৩০ মিনিট অবস্থান করেন। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি পিটিশন জমা দেয়া হয়।

প্রেটোরিয়ায় নারী সমাবেশের মূল কারন ছিল ঔপনিবেশিক শাসনে চলাচল পাসের প্রবর্তন। এই প্রথামতে আফ্রিকান নারীদের নিজ বাসভূমি বাদে অন্যথায় যাতায়াত করতে একটি পাসপোর্ট সমতূল্য কাগজ বহন করতে বলা হয়। আফ্রিকান নারীদের শ্রমভিত্তিক কাজ ও অবাধ চলাফেরায় বাধা পড়ার সম্ভাবনায় এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এই আন্দোলনে শ্বেতাঙ্গ নারীদেরও স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহন পরিলক্ষিত হয়। এর প্রধান কারন ছিল নারীদের একাত্বতা। সকলেই মনে করতেন আফ্রিকান নারীদের এই অবমাননা আসলে গোটা নারীজাতির জন্যই অপমানজনক।

১৯৯৪ সালে প্রথা বাতিলের পর থেকে ৯ আগস্ট দক্ষিণ আফ্রিকায় নারী জাগরণের জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

উপরে বর্ণিত প্রত্যেকটি ঘটনা নিয়ে আগ্রহপ্রসূত চিন্তা ও যাচাই-বাছাই করার অনুরোধ থাকবে প্রত্যেক পাঠকের কাছে। প্রত্যেকটি আন্দোলনে মেয়েরা স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ গ্রহণ করেন। তাদের কোন পুরুষ হাত ধরে রাস্তা নামিয়ে আনেনি। নিজের অধিকার আদায়ের তাড়ণায় নিজে থেকে রাস্তা অবরোধ করেছে নারী। তাদের আন্দোলনগুলোর প্রেক্ষিতেই আজ পশ্চিমের অগ্রগতি। নারী জাগরণের সাথে জাতির অগ্রগতির সম্পর্ক বোঝানোর জন্য একটি চিত্রই যথেষ্ট।

সংসার হল দু’চাকার বাহন। পুরুষ আর নারী আলাদা দু’টো চাকা। যদি বাহনের সামনে এগুতে হয় তবে চাকা দুটো সমান হওয়া দরকার। এক চাকা ছোট হলে বাহন নিজের অবস্থানে গোল-গোল ঘুরতে থাকবে, সামনে আর এগুতে পারবে না। আমাদের দেশ যে অবস্থায় আছে সেটা এই গোল গোল ঘুরতে থাকারই বাস্তব রূপ। আর এর একটি মাত্র কারণ, আজ পর্যন্ত আমাদের কোন নারী রাস্তায় নামার সাহস করেনি। যদি নেমেও থাকে, নিজ সম্প্রদায়ের কাছেই হেয় হয়ে আবার ঘরে ফিরে গেছে। একজন যখন কষ্ট করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে তখন ১০ জন তাকে বাধা দিয়েছে পুরুষ শাসনের গোলামী করে। বলাই বাহুল্য উক্ত ১০ জন স্বামীর পরিশ্রমের টাকায় আমোদ-ফূর্তি করে সন্তান প্রতিপালন করেই খুশি। নিজেদের পুরুষের ভোগ্যবস্তু বই অন্য কিছু হিসেবে দেখার ক্ষমতা তাদের আছে বলে ধারণা করা যায় না। ক্ষুদ্র মস্তিক যতটুকু চিন্তা করতে পারে তা অনুসারে, পুরুষভক্ত এই নারীকূল তাদেরই দলে যারা নিজ কন্যাকেও নিজের মত ভোগ্যবস্তু (ভিন্ন মতে দাসী) বানিয়ে রাখাটাই মাতৃত্বের চূড়ান্ত সফলতা মনে করেন। মস্তিষ্ক হাত-পা থাকা পুতুলদেরই শিরোনামটি উৎসর্গিত।

শিরোনামটির উৎস বাংলার নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রবন্ধ “অর্ধাঙ্গী” এর একটি বাক্য।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top