ইতিহাস

ডিপিএলঃ পেশাদার ক্রিকেটে বাংলাদেশের হাতেখড়ি যেখানে

নিয়ন আলোয়

নব্বইয়ের শুরুতেই ক্রিকেটে ঘরোয়া পর্যায়ে বিরাট পরিবর্তন আসে। তৎকালীন বাংলাদেশে ক্রিকেটের প্রসারে এবং জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ঢাকা প্রিমিয়ার লীগের। আর সেখানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আবাহনী। ‘৯২ বিশ্বকাপের পরেই আবাহনীর তৎকালীন প্রধান অর্থদাতা এ.এইচ.এম মুস্তফা কামাল (সাবেক আইসিসি এবং বিসিবি সভাপতি) প্রচুর অর্থ খরচ করে বিদেশি খেলোয়াড় আনা শুরু করেন। আবাহনী ১৯৮৮ সালে ভারতের বিশ্বকাপ বিজয়ী অধিনায়ক কপিল দেবকে দলে ভেড়ালেও জাতীয় দলের খেলা থাকায় এক ম্যাচেও খেলার সুযোগ হয়নি তার। ‘৯২ সালে আবাহনী দলে আনে ইংল্যান্ডের নেইল ফেয়ারব্রাদার এবং রিচার্ড ইলিংওয়োর্থকে (বর্তমানে আইসিসি এলিট প্যানেলের আম্পায়ার)। ফেয়ারব্রাদার মহামেডানের বিপক্ষে গ্যালারী ভরা দর্শকের সামনে ৮৬ বলে ৯০ রানের ম্যাচ জেতানো এক ইনিংস খেলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন ঢাকার দর্শকের কাছে। “It was a very big crowd, winner-takes-all game, lots of pressure, and afterwards we were not able to get out of the changing room at the stadium because of the crowd waiting to see us”, ম্যাচের কথা এভাবেই মনে করেন এখনো ফেয়ারব্রাদার। ১৯৯৫ সালে আবাহনী দলে ভেড়ায় পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরামকে, তখন দলের দ্বায়িত্ব নিয়েছেন নাজমুল হাসান পাপন। এরপর টানা তিন মৌসুম ডিপিএলের বিভিন্ন দলে খেলেন শ্রীলংকার অর্জুনা রানাতুঙ্গা। ঢাকার ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত গল্প হচ্ছে কোন এক ম্যাচে দল পুরা টাকা না দেয়ায় (অর্ধেক দিয়েছিলো) রানাতুঙ্গা এক পায়ে প্যাড পরে বসেছিলেন ড্রেসিং রুমে, ব্যাটিং করতে নামবেন না। কথিত আছে ড্রেসিং রুমের ভেতরই পুরা টাকা দেয়ার পরেই কেবল মাঠে নামেন রানাতুঙ্গা এবং ম্যাচ জিতিয়েই ড্রেসিং রুমে ফিরেন! নব্বইের দশকে খেলা কয়েকজন প্লেয়ার ছিলেন রামান লাম্বা, আথুলা সামারাসেকারা, অশোক মালহোথ্রা, অরুন লাল, জহুর এলাহী, জনক গামাজে, গ্রায়েম ল্যাবরয়, রবি রত্নায়েকে, কেনিয়ার স্টিভ টিকোলো, মরিস ওদুম্বে, থমাস ওডোয়ো। মহামেডানের হয়ে রানের ফোয়ারা ছোটাতেন স্টিভ টিকোলো। এই প্লেয়ারদের খেলার বাইরের “অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব” ছিলো স্থানীয় প্লেয়ারদের গাইড করা। ম্যাচের আগে পরে নেটে তাদের নিয়মিতই “কোচের” ভূমিকায় দেখা যেত।

নিয়ন আলোয়

১৯৮৮ সালে কপিল দেব আবাহনীর সাথে চুক্তি করছেন

বিদেশি প্লেয়ারদের পাশাপাশি নব্বইের দশকে দেশি ক্রিকেটারদের “প্রফেশনাল” হয়ে ওঠার শুরুটা ডিপিএল দিয়েই। স্থানীয়দের ভেতর সবচেয়ে জনপ্রিয়, ড্যাশিং লুকিং ছিলেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। ‘৮০ সালের শেষ দিকে দেড় লাখার টাকায় তিনি আবাহনী থেকে মহামেডানে নাম লেখান যেটা ওই সময়ের বিচারে বহুল আলোচিত ঘটনা। নান্নুর নিজের ভাষায়,

“After I had been the highest scorer, Mohammedan offered me Tk 150,000 when I was getting Tk 70,000 from Abahani the previous season. The pay was double, which, at the time, was a big deal, Back then, the goal was to become the highest scorer every season. Plus, there was the payment, which made me a true professional. It was always about getting a better contract next season.”

নান্নু ১৯৯১ থেকে ১৯৯৭ প্রতি ডিপিএলে সেরা পাঁচে ছিলেন। নান্নুর পাশাপাশি বড় প্লেয়ারদের ভেতর ছিলেন আকরাম খান এবং আমিনুল ইসলাম বুলবুল। বোলারদের ভেতর এনামুল হক মনি, সাইফুল ইসলাম ছিলেন প্রথম পছন্দ ক্লাবগুলার।

যেহেতু তখনো দেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়মিত হতোনা তাই ডিপিএল বা ক্লাব পর্যায়ের ক্রিকেটই ছিলো ক্রিকেটারদের প্রথম আগ্রহ। পেশাদার ক্রিকেট বলতে একমাত্র ডিপিএল! শাহরিয়ার নাফিস এক সাক্ষাৎকারে বলেন তার ক্যারিয়ারের প্রথম লক্ষ্য ছিলো ঢাকায় ক্লাব ক্রিকেট খেলা। তার মতো অনেকের জন্যই বিষয়টা প্রযোজ্য। ১৯৯৭ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতার পরেই কেবল বাংলাদেশের তরুনরা জাতীয় দলে ক্যারিয়ার গড়ার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেন।

কালের বিবর্তনে ডিপিএল আর আগের অবস্থানে নেই। ক্লাব গুলার হাতে প্রচুর টাকা আছে, টাকা খরচও করে তারা তবুও সেই জনপ্রিয়তা আর নেই। লাস্ট বিপিএলেও ৪৩ জন বিদেশি খেলেছে কিন্তু দর্শক টানার মতো বড় প্লেয়ার কয়জন ছিলো? একসময় ক্লাব গুলা নিজেরাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্লেয়ারদের তুলে আনতো, এখন সেই কার্যক্রম বন্ধ প্রায়। বিসিবির বয়সভিত্তিক দলের মুখগুলাকেই দলে ভেড়ায় তারা। গ্রীষ্মকালের প্রচন্ড গরমে খেলা হয়, প্লেয়াররা নিয়মিত ক্র্যাম্প করেন, শীতপ্রধান দেশের প্লেয়াররা পারতপক্ষে এদিকে আসেনই না। এশিয়ার দেশগুলা থেকেও বড় কোন নাম আসেনা। বিশ্বের সব দেশের মূল লীগগুলা দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়েছে আর আমাদের ডিপিএল দর্শক ক্ষরায় ভুগতে ভুগতে অবস্থা এমনই যে কবে শুরু হয় আর কবে শেষ হয় সেটা পাঁড় ক্রিকেটপ্রেমী ছাড়া কয়জন খোঁজ রাখে! এর সাথে আছে ক্লাবগুলার কর্তাদের বিসিবির বিভিন্ন পদ বা পরিচালক হবার পেছনে অতিরিক্ত মনযোগ দেয়া। আম্পায়ারদের উপর চাপ সৃষ্টি করা, টাকা পয়সা সময় মতো না দেয়া ইত্যাদি অসংখ্য অভিযোগ। অভিযোগ আছে প্লেয়ারদের বিরুদ্ধেও, অনেক প্লেয়ার নাকি ক্লাবের খেলায় যথেষ্ঠ আন্তরিক না। পেশাদারিত্ব বাড়ায় ক্লাবের প্রতি আন্তরিকতা কমেছে। অতীতে একই ক্লাবে দশ বছর কাটিয়ে দেয়ার নমুনা থাকলেও এখন সেটা হয়না, আর্থিক বড় প্রস্তাব পেলেই দল বদল হয়ে যাচ্ছে।

তবে ডিপিএলকে এখানে জনপ্রিয় করে তোলা সম্ভব। দরকার প্রচারনা। ক্লাবগুলার সোশাল মিডিয়াতে সরব থাকতে হবে। যেমনটা কাউন্টি ক্লাবগুলা করে। মেধা খুঁজে আনতে হবে নিজেদের। জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে কার্যক্রম। ধনী ক্লাবগুলা নিজেরাই করতে পারে ক্রিকেট একাডেমি। লাগবে ভালো স্পন্সর। আর যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার সেটা হচ্ছে একটা খেলার চ্যানেল, যেখানে ডিপিএল দেখানো হবে। ডিপিএলের সূচী এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সাথে সংঘর্ষ যত কম হয়ে পারে।

তবে আশার কথা হচ্ছে ডিপিএল এখনো আমাদের ক্রিকেটার দিচ্ছে নতুন নতুন। জাতীয় দলে আসার রাস্তা বলতে এখনো ডিপিএল। ডিপিএলে ভালো করলেই খুলে যায় বিপিএল এবং জাতীয় দলের রাস্তা। প্রায় অর্ধশত বছরের পুরানো এই প্রিমিয়ার লীগ আবারো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে সেটাই প্রত্যাশা করি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top