নিসর্গ

কাশ্মীরের গল্পকথা (তৃতীয় পর্ব)- দিল্লী থেকে শ্রীনগরের গল্প

নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বঃ কাশ্মীরের গল্পকথা (দ্বিতীয় পর্ব) – এক অপূর্ব এয়ারপোর্টের গল্প]

মেজবাহ, জীবনে প্রথম দেশের বাইরে বেড়াতে যাচ্ছে বন্ধুদের সাথে। সেটাও আবার পৃথিবীর ভূস্বর্গ কাশ্মীরে। বাংলাদেশের নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি করা হলেও, দেশের বাইরে এই প্রথম। স্বভাবতই চারদিকের নতুন নতুন নানা আকর্ষণে সে চমকিত। বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করার পর থেকে শুধু চেয়ে আছে তো চেয়েই আছে। চোখের পলকটি পর্যন্ত ফেলতে চায়না, পাছে কিছু মিস হয়ে যায়, রয়ে যায় অদেখা! এমনকি নাওয়া-খাওয়াটুকুও ঠিকঠাক মত করছেনা।

অথচ খেতে সে খুব পছন্দ করে। বন্ধুদের সাথে বাইরে বের হলে, সবার আগে, সবচেয়ে ভালো আর সবচেয়ে বেশী খেতে চায় সে। এমনকি নিজের পছন্দের খাবার খেতে বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করতেও দ্বিধা করেনা কখনো। আর ঘুমের ক্ষেত্রে তো আরও জোর জবরদস্তি করে সে নিজের জন্য সবচেয়ে ভালো আর আরামদায়ক জায়গাটা বেছে নিতে।

কিন্তু প্রথমবার ভারতে বেড়াতে এসে সেই মেজবাহ এরই একেবারেই অন্য রূপ দেখছে সবাই! ঠিকমত খায়না, ঘুমায়না, কারো সাথে কোন দ্বন্দে জড়ায়না; একেবারে চুপচাপ, নীরব আর এক দৃষ্টিতে কোথায় যেন চেয়ে থাকে। কি যেন দেখে যায় নিবিষ্ট মনে! সবাই অনেক অনেক জিজ্ঞাসা করেছে, কি হল ওর? কোন সমস্যা কিনা? এনজয় করছে কিনা? সব কথার উত্তর দিল দুই-একটি মাত্র শব্দে। যে, হ্যাঁ সব কিছুই ঠিক আছে, এনজয় করছে, খেতে তেমন ইচ্ছে করছেনা, ক্ষুধা লাগছেনা বলে। আর ঘুমোচ্ছেনা, তেমন ক্লান্তি বা ঘুম আসছেনা বলে!

বন্ধুরা সবাই মেজবাহ এর উল্টো এই আচরনে কিছুটা বিব্রত বা শঙ্কিত, কি হল ওর হঠাৎ করে? কিভাবে একটা মানুষ দুই দিনের মধ্যে এতোটা বদলে যেতে পারে? ভেবে পায়না ওর বন্ধুরা। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে নিজেদের মত ভ্রমণ উপভোগ করতে লাগলো। আর মেজবাহকে ওর মতই থাকতে দিল।

কলকাতা থেকে দিল্লীতে ওরা এলো রাজসিক রাজধানী এক্সপ্রেসে চড়ে, অসাধারণ একটা ভ্রমণ ছিল সেটি। আর তার চেয়েও রোমাঞ্চকর ভ্রমণ ওদের সবার জন্য অপেক্ষা করছিল দিল্লীতে। কারন দিল্লী থেকে ওরা সবাই জীবনে প্রথমবারের মত বিমানে চড়ে শ্রীনগর যাবে। সবাই দারুণ উত্তেজিত, মেজবাহও। দিল্লী থেকে ওদের বিমান ছাড়বে সেই সকাল ৬ টায়। এর মাঝে একটা প্রায় পুরো দিন আর রাত রয়েছে ওদের দিল্লী ঘুরে দেখার জন্য।

বন্ধুরা টাকা বাঁচাতে দিল্লীতে কোন হোটেল নিল না। একটা ট্যাক্সি ভাড়া করলো সারাদিন থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। সারাদিন ঘুরে ঘুরে দিল্লী চষে বেরিয়ে, পুরনো দিল্লীতে রাতের খাবার খাবে দিল্লী-৬ এ। নানা রকম মুঘল খাবার, কাবাব, পরাটা, বিরিয়ানি, মিষ্টান্ন- যার যেটা ভালো লাগে, সে সেটা খেতে পারে ইচ্ছে মত। কারন হোটেল খরচ বাঁচিয়েছে ওরা প্রায় ৫০০ রূপী জনপ্রতি। তো সেই টাকার সাথে নিজেদের মীলের টাকা যোগ করলে যে টাকা হয়, তাতে দিল্লীর এইসব মুঘল দোকানে কিছুতেই সেই টাকা খেয়ে শেষ করতে পারবেনা এক একজন।

দিল্লী-৬ থেকে যে যার মত পেটপুরে আর মন ভরে খেয়ে রাত তিনটার দিকে ওরা গিয়ে পৌঁছালো, ঝকঝকে দিল্লী এয়ারপোর্টের ঝলমলে চত্বরের বাইরে। ট্যাক্সি থেকে নেমে সবাই একটি করে কোমল পানীয় নিয়ে নিল যে যার পছন্দমত। কারন সামনের তিন ঘণ্টা বসে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। সারাদিন ঘুরে ঘুরে ভীষণ ক্লান্ত সবাই। বাইরের গরম থেকে রেহাই পেতে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো দিল্লী এয়ারপোর্টের হিমহিম এসি’র পরশ পেতে।

একটু এদিক-ওদিক ঘুরে ৩০ মিনিট পরেই ওদের বোর্ডিং পাস পেয়ে গেল। সবাই মিলে চলে গেল ওদের জন্য নির্ধারিত লাউঞ্জের কাছে, ঠিক যেখান থেকে ওদের বিমান ছাড়বে। হেঁটে যেতে যেতে ওরা দেখলো পুরো এয়ারপোর্টের প্রতিটি লাউঞ্জে বসার চেয়ারের পাশাপাশি বেশ মনোরম আর আরামদায়ক শোয়ার ব্যাবস্থাও করে রেখেছে এখানে। দুই-একটি ফাঁকা পেয়েও কেউ বসলো বা শুয়ে পড়লোনা কোথাও ভয়ে! পাছে এরজন্য আবার অতিরিক্ত বিল দিতে গিয়ে হোটেলে খরচের চেয়ে বেশী বেরিয়ে যায় পকেট থেকে!

প্রায় ৩০ মিনিট হেঁটে বিশাল এয়ারপোর্টের এক কর্নারে ওদের লাউঞ্জ খুঁজে পেল। সাথে পেল বসার চেয়ার। সবাই বসে পরলো আরাম করে। কিন্তু মেজবাহ এখানে মনে মনে সেই শোবার চেয়ার খুঁজছে। ওর ভীষণ ঘুম পেয়েছে, দুইরাত টানা প্রায় নির্ঘুম কেটেছে পথে পথে। টাকা লাগলেও ওর একটু শরীরটা এলিয়ে দিতে হবে কিছু সময়ের জন্য হলেও। তাই একটু এদিক ওদিক ঘুরে একটু পাশেই, পাশাপাশি তিনটি ঘুমানোর চেয়ার দেখতে পেল, যার একটি এখনো ফাঁকা আছে, আর বাকি দুটিতে কেউ চাদরমুরি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। খুব দ্রুত কিন্তু বেশ সাবধানে ফাঁকা চেয়ারটাতে গিয়ে বসলো মেজবাহ।

শুয়ে পরবে নাকি বসে থাকবে এই নিয়ে একটু উসখুস করছিল মনে মনে। যত যাই হোক, প্রথমবার বিদেশে এসেছে, প্রথম বিমানবন্দরে এসে কিছুটা ভয় আর শঙ্কা থাকাটাই স্বাভাবিক। তবুও শুয়ে পরবে বলে মন ঠিক করে ব্যাগটা পিঠ থেকে নামিয়ে পাশে রাখতেই চোখ পড়লো ওর ডান পাশের চেয়ারে। কেউ একজন দারুণ একটা হলুদ শাল মুরি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। হ্যান্ড ব্যাগ মাথায় দিয়ে। ছেলে না মেয়ে প্রথমে এটা বোঝা গেলনা।

মেজবাহ একটু গুছিয়ে নিয়ে শুয়ে পরবে, ঠিক এমন সময় পাশের শুয়ে থাকা জন একটু নরে উঠলো। মাথাটা আর একটু ঢাকতে গিয়েই তার পা দুটি বেরিয়ে গেল। আর সেখানে চুম্বকের মত আটকে গেল মেজবাহর চোখ দুটি! দুটি পুতুল-পুতুল পা, একেবারে তুলতুলে, ধবধবে সাদা পায়ের ঝকঝকে নকে টকটকে লাল নেইল পলিশ, যাতে বিমানবন্দরের রঙিন আর উজ্জ্বল আলো পরে চিকচিক করে উঠছে! চাইলেও মেজবাহ চোখ ফেরাতে বা নামাতে পারছেনা সেই পা দু’খানি থেকে! আর তেমন ইচ্ছেও যে ওর করছেনা।

কারো পা যে এতো এতো সুন্দর, আকর্ষণীয় আর মোহাচ্ছন্ন হতে পারে দেখা তো দূরের কথা, শোনেওনি কারো কাছে বা কোনদিন কোন রকম কল্পনাতেও আসেনি। ইস দু’খানি পা নয়, যেন দুটি পদ্ম ফুল! সাদা আর লালের শেড দেয়া পদ্ম ফুল যেন ফুটে রয়েছে এই এয়ারপোর্টের শেষ লাউঞ্জে! যার খবর আর কেউ জানেনা, জানবেনা। শুধু মেজবাহ জানে।

সেই মায়াবী আর মোহাচ্ছন্ন পা দুটির দিকে তাকিয়ে ছিল অপলক। কিছুক্ষণ পরে জেগে বা ঘুমিয়ে ঠিক জানেনা, কিন্তু পা দু’টি টুপ করে হলুদ শালে ঢেকে গেল।

মেজবাহও যেন নিজেকে ফিরে পেল। এবার সে শুয়ে পরবে এমন সময় পাশের সেই শুয়ে থাকা মানবী মেজবাহকে উর্দুতে জিজ্ঞাসা করল…
-কি দেখছিলে অমন করে?

নিঃসঙ্কোচে মেজবাহ জানালো- আপনার পা (হিন্দিতে)।
– পায়ে দেখার কি আছে? মানবীর জিজ্ঞাসা।
– জানিনা তবে এমন সুন্দর পা কোনদিন দেখিনি! আর দেখার পরে, না দেখার লোভ সামলাতে পারিনি, এতো এতো আর এতোই সুন্দর আপনার পা দুটি!
– আপনিই বোধয় প্রথম কেউ যে কারো পা দেখেই এতো এতো মুগ্ধ হলেন, ইম্প্রেসিভ!
– কি করবো? সুন্দর যা কিছু তাকে তো অসুন্দর বলার কোন কারন নেই, আর দেখে আনন্দ পাবার সুযোগ কেন হারাবো? যদি তাতে কোন অপরাধ বা ক্ষতি না থাকে?

মানবী আর কোন কথা না বলে উঠে পাশের বাথরুমে গেল, ভদ্রতা করে ওর কাছে সম্মতি নিয়েই! কারো সাথে কথা বা গল্প করতে করতে হঠাৎ অন্য কোথাও যেতে বা মনোযোগ দিতে চাইলে তার অনুমোদন নেয়াটা এক ধরনের ভদ্রতা। হোক সে পরিচিত বা অপরিচিত। সেই মেয়েটি সেটাই করলো, স্বাভাবিকভাবে।

মেয়েটি উঠে যেতেই, ঘোষণা এলো… শ্রীনগরগামী যাত্রীদের তাদের বিমানে উঠে যাবার। মেজবাহকে ওর বন্ধুরা ডাকছে, মেজবাহ আসছি-আসছি বলে কয়েকবার ওদের থামালো। যেতে হবে কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছেনা একটুও, মেয়েটি কতটা ভদ্রতা করে বাথরুমে যেতেও ওর অনুমতি নিল, আর ও না বলেই চলে যাবে? এতটা অভদ্র ও হতে চায়না কিছুতেই। বন্ধুরা দারুণ বিরক্ত হয়ে দুই-একজন বিমানের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল, দুই একজন এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

ওদেরকে সামনে এগোতে বলল, মেজবাহ বাথরুম থেকে আসবে বলে। এখনো ৩০ মিনিট সময় বাকি আছে প্লেন ছাড়ার। যদিও মেজবাহর মনেও একটা ছটফটানি কাজ করছে প্লেনে ছেড়ে যদি চলে যায়? এর আগে কখনো প্লেনে ওঠেনি, তাই কোন রকম অভিজ্ঞতাও তো কারো নেই যে দেরি হলে কাকে কি বলবে বা বলতে হবে? একটু ছটফট করতে করতেই মেয়েটি চলে এলো অবর্ণনীয় এক রুপে ভরপুর চোখে-মুখে পানির ছিটে দিয়ে।

পা যদি হয় পদ্ম ফুল, তবে মুখ তো তার গোলাপী গোলাপ! ঠোঁট দুটো তো গোলাপের পাপড়িতে ভোরের প্রথম শিশির ঝরে পরে থাকা, চোখ নাকি গভীর কোন স্বচ্ছ জলাশয় বুঝতে পারা মুশকিল, মৃদু হাসিতে টোল পরা গাল দেখে মরে যেতে ইচ্ছে করা স্বাদ জাগে! ছোট দুই পাহাড়ের ভ্যালীর মত খাঁজকাটা থুঁতনিতে আমরণ হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে যে কারো! এতটাই রেশমি কোমল চুল যে বারবার হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়েও রাখতে পারছেনা, অবাধ্য ঢেউয়ের মত দোল খেতে খেতে চলে আসছে কপালের উপরে।

নাহ মেজবাহ আর দেখতে পারছেনা, আর তাকিয়ে থাকতে পারছেনা ওই অসম্ভব সুন্দর আর আকর্ষণীয় মানবীর দিকে। তাতে করে হয় ওর প্লেন মিস করবে নয়তো অজানা কোন সুখে মরেই যাবে! এমনও কি কেউ হয়? হতে পারে? কোনদিন ভাবেনি, কল্পনাতেও আসেনি।

নিজের কাছ থেকে নিজেকে বাঁচাতেই চোখ নামালো মেজবাহ। কিন্তু চোখ দুটি অবাধ্য, অসভ্যর মত বার বার উপরের দিকে এই ভোরের প্রথম আলোতে ওই অপার্থিব রূপ দেখে সারা জীবনের তৃষ্ণা মেটাতে ব্যাকুল। এই জীবনে আর কিছু না দেখলেও চলবে, আজ সকালে যা দেখলো তাতে!

– বাকরুদ্ধ মেজবাহকে মানবী জিজ্ঞাসা করলো কোথায় যাবেন আর কোন ফ্লাইট? (উর্দুতে)
– মেজবাহ জড় পদার্থর মত জবাব দিল, শ্রীনগর, এয়ার এশিয়া, সকাল ৬ টা। আপনি? (হিন্দিতে)
– শ্রীনগর, এয়ার এশিয়া, সেইম ফ্লাইট! সি ইউ।

শুনে মেজবাহ যেন বধির হয়ে গেল, মেঘে ভেসে ভেসেই যেন বিমানের দিকে চলে গেল!

যেতে যেতে মেজবাহ নাম জানতে চাইলে, যে হাসিটি দিল সেই মানবী- তা যেন কোন বরফ পাহাড়ের চুড়ায়, সূর্যের প্রথম আলো পড়ে এক অপার্থিব মুহূর্তের চেয়ে সুন্দর, দুর্লভ আর ভাষায় অবর্ণনীয়, যার কোন মূল্যই কেউ কোনদিন দিতে পারবেনা! অসম্ভব!

আর সেই মিষ্টি, হৃদয় তোলপাড় করা, ঝড়তোলা, পৃথিবী হাতের মুঠোয় চলে আসা হাসির অনুভুতির সাথে তার নামটি উচ্চারণ করে গেল……

মেহরীন!

[পরবর্তী পর্বঃ কাশ্মীরের গল্পকথা (চতুর্থ পর্ব)– ডাল লেকের একদিন]

[মাসে-দু’মাসে অন্তত একবার ইট-কাঠে বন্দী শহর থেকে বের হয়ে তাজা হাওয়ার ঘ্রাণ নাকে না নিলে কি আপনার দমবন্ধ হয়ে আসে? নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশে কিংবা বিদেশে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্র? আপনার ভ্রমণের গল্প শেয়ার করুন আমাদের সাথে, পাঠিয়ে দিন neonaloymag@gmail.com এই ঠিকানায়!]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top