গল্প-সল্প

মনের কশেরুকা (প্রথম পর্ব)

নিয়ন আলোয়

০১.
মিষ্টার অয়ন। খুব সদালাপি ও মিষ্টভাষী। শুধু মিষ্টভাষীই নন, ছোট বড় সবাইকেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মোড়কে মুড়িয়ে রেখেছেন তার বন্ধুসুলভ ব্যবহার দিয়ে। বন্ধুমহলে একজন সজ্জন ব্যাক্তি হিসেবেও পরিচিত।

ঢাকার অভিজাত এলাকায় বিশাল ফ্ল্যাট। দু-দুটো গাড়ী। চলনে বলনে চাকচিক্যের ও আভিজাত্যের অভাব নেই ব্যাবসায়ী অয়ন সাহেবের। আর এই ব্যাবসার মূল অস্ত্র তার স্বভাবজাত সুন্দর ব্যাবহার। অতি চালাক মানুষ না হলে তার কথায় যে কোন মানুষ হিপনোটাইজ অর্থাৎ সম্মোহিত হয়ে যায়। একজন ভালো ব্যাবসায়ীকে ভালো ব্যাবহারের মাধ্যমে নিজের আয়ত্বে রাখাই বিজনেস প্রসেসের একটি মাধ্যম। উনিও তাই করতেন। দোষের কিছু না যদি উদ্দেশ্য সৎ হয়।

কিন্তু সমস্যাটা বাঁধলো অন্য জায়গায়। ব্যাবসা করতে যে শুধু ভালো ব্যাবহারই যথেষ্ট নয়, ভালো প্রডাক্ট ও সার্ভিস ডেলীভারীটাও বেশী জরুরী, সেটা অয়ন সাহেব বুঝতে পারেননি। তাই তার ব্যাবসায় ধ্বস নামতে বেশীদিন সময় লাগেনি।

অয়ন সাহেবের ব্যাবসায় ধ্বস নামার আরেকটা বড় কারণ, তার কাস্টমারদের সাথে ব্যাবসা করতে গিয়ে একটা সময় নিজের পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব, ছোট ভাই বড় ভাই সবাইকেই তার ব্যাবসায়ীক এলিমেন্ট মনে করতে শুরু করলেন। অর্থাৎ তার অন্য ক্লায়েন্ট বা ক্রেতাদের ভুলিয়ে ভালিয়ে যে বিজনেসটা এতদিন চালিয়ে আসছিলেন সেটা তার কাছের মানুষদের সাথেও শুরু করলেন।

যে সব বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন, ভালোবাসতেন তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে তিনি যখন ব্যাবসায়ীক নষ্ট লাভের আশায় দৌঁড়ানো শুরু করলেন, মূলত বিপত্তির শুরুটা এখানেই।

ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা শুধুমাত্রই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধেই খাটে। সর্বোপরি ইহা মনের গহীনে পুঁজি হিসেবে লালন পালন করে সম্পর্কটাকে বড় করতে হয়। এগুলোকে পুঁজি করে কোন নষ্ট অর্থ লাভের চিন্তা ভাবনাটাও যে মহাপাপ তা অয়ন সাহেবের কখনো মনে হয়নি বা বুঝেও বুঝতে চান নি।

অয়ন সাহেব একটা ব্যাবসা বেশীদিন কন্টিনিউ করেন না বা করতে পারেন না। কেন পারেন না? কারন তিনি তার কোন ব্যাবসাকেই কোন প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে পারেননি। একটা প্রতিষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক আকারে নিয়ে আসতে হলে সেটাকে নিজের সন্তানের মত যত্ন করে লালন করতে হয় এবং এই লালন পালনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ডাল পালা গজিয়ে একটা স্ব-আকার ধারন করে। যেটাকে বলে ব্র্যান্ডিং। একটা ব্যাবসা যখন একটা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায় বা আকার ধারন করে বা স্ব-ব্র্যান্ডিং’এ পৌঁছে যায়, তখন সেই প্রতিষ্ঠান অটোমেটিক্যালী রান করে। গলা টিপে না মারা পর্যন্ত সেটা চলতেই থাকে তার নিজস্ব সুনামে।

কিন্তু অয়ন সাহেব চলেছেন উল্টো পথে। তাই আজ এক ব্যাবসা তো বছর তিন চারেক পরে আরেক ব্যাবসা। উনি শুধু ব্যাবসাই করেছেন কিন্তু কোন ব্যাবসায়ীক প্রতিষ্ঠান করতে পারেননি।

বছরের পর বছর তিনি এভাবেই চলতে থাকলেন। নতুন করে নতুন উদ্যমে নতুন কারো সাথে। নতুন কোন সম্মোহনী গল্প শুনিয়ে। এরপর… এরপর আর কি? সম্মোহিত ক্লায়েন্টদের মোহভঙ্গের পর এ ব্যাবসাও শেষ। আবার নতুন কোন ব্যাবসায়ীক প্লট, নতুন কোন গল্প, নতুন কিছু কুশি-লব। চলছে….. যার কোন শেষ নেই।

এতে মিষ্টার অয়ন সাহেবের দেহের মেরুদন্ডের তিরিশটি কশেরুকা সোজা থাকলেও মনের মেরুদন্ডের একটি কশেরুকাও যে একদিন অবশিস্ট থাকবে না, সেটা বোধ করি টের পাচ্ছেন না বা টের পেয়েও হাসিমুখে অভিনয় করে যাচ্ছেন অবিরত।

০২.
৮/৯ বছর আগের কথা। হঠাৎ অয়ন সাহেবের ফোন। ফোনের এ প্রান্তে শোভন। শোভন সম্পর্কে তার জুনিয়র এক ভাই।

: হ্যালো শোভন, কেমন আছো। তোমারে ভাই কতদিন দেখি না। তোমারে তো আমি নিজের ছোটভাই মনে করি। একদিন আসো… তোমারে খুব দেখতে ইচ্ছে করে।
– আসবো ভাই। দেখি নেক্সট উইকে। আপনার আর কি খবর?
: এই তো, আমি একটা নতুন ব্যাবসা শুরু করছি।
– তাই নাকি? কিসের ব্যাবসা?
: তোমারে সব বলবো। এখন তোমার একটু হেল্প লাগবে ছোটভাই।
– কি হেল্প, বলেন।
: আমার এমারজেন্সী ৫০,০০০ টাকা লাগবে। ব্যাবসার কাজে। জাস্ট দুদিনের জন্য।
– কি যে বলেন অয়ন ভাই, আপনার এত বড় ব্যাবসা। মাত্র ৫০,০০০ টাকায় আটকে গেলেন?
: আর বইলো না, পরশু আমি নগদে ১৫ লক্ষ টাকা হাতে পাব। এখন একটু আটকে গেছি। তোমারে পরশুই টাকাটা ব্যাক করবো। চিন্তা কইরো না।
– আচ্ছা, আচ্ছা। ঠিক আছে, অয়ন ভাই, আপনার অফিস থেকে কাউকে পাঠিয়ে দেন, আমি চেক লিখে দিচ্ছি। ২ টার আগে পাঠাইয়েন, ব্যাংক থেকে ক্যাশ তুলে নিতে পারবে।

শোভন, অয়ন সাহেবকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে বড় ভাইয়ের মত। সেই ১৫/১৬ বছরের পরিচিত। অয়ন ভাইকে কোনদিন কাউকে মনে কষ্ট দিয়ে কথা বলতে দেখেনি। একটা অন্ধ বিশ্বাস আছে অয়ন ভাইয়ের প্রতি। তাই তার অফিসের টানাটানির মধ্যেও ৫০,০০০ টাকা দিয়ে দিল। পরশুই তো দিয়ে দিবে। সমস্যা কি? এই টাকায় যদি প্রিয় অয়ন ভাইয়ের কিছু উপকার হয়, হোক না। ক্ষতি তো নেই।

এরপর? এরপর শোভন কি দুদিনে তার টাকা ফেরত পেয়েছিল? সে আরেক গল্প…… দু’দিন যায়, দু’সপ্তাহ যায়। শোভন অয়ন সাহেবকে ফোন দেয়, প্রথম প্রথম ফোনে দিব দিব বললেও শেষে ফোন ধরা বন্ধ করে দিল।

তারপর? টাকাটা পেয়েছিল? হ্যাঁ, পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু কিভাবে? কতদিন পর?

(চলবে)

Most Popular

To Top