ক্ষমতা

গেম অফ থ্রোন্সঃ পর্দার বিনোদন থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে!

neon aloy গেম অফ থ্রোন্স বাংলাদেশ ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ন আলোয়

আগামীকাল যদি আওয়ামী লীগের কোন কেন্দ্রীয় নেতা সংসদে প্রস্তাব করেন যে এখন থেকে লাল রঙের মোজা পরা আইনত দন্ডনীয়, তাহলে সেটাই আইন হয়ে যাবে। কেননা সংবিধান অনুযায়ী কোন সাংসদ তাদের দলীয় মতের বিরুদ্ধে ভোট দিলেই চাকরিচ্যুত হবেন। অর্থাৎ বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা যা-ই মর্জি করবেন, তা-ই আইন। বিরোধের কোন সুযোগ নেই, বিতর্কের কোন অর্থ নেই।

এই ভয়াবহ মোজাতন্ত্রের মূলভিত্তি হলো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যেটা গত দুই দশকে আওয়ামী লীগ আর বিএনপির যৌথ প্রযোজনায় সংসদকে রীতিমত পুতুলনাচের মঞ্চে পরিণত করেছে। পঞ্চাশের দশক ঘনঘন দলবদলের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে দল বদলে সরকার ভেঙ্গে দেয়া প্রতিরোধ করবার উদ্দেশ্যে একটা অনুচ্ছেদ রাখা হয় যেটাতে একই সাথে দলমতের বিরুদ্ধে ভোট দেয়া নিষিদ্ধ করে একটি ধারা রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনী সেই ৭০ ধারাকে বর্ধিত করে সাংসদদেরকে ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকা (এবস্টেনশন) অথবা দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদে অনুপস্থিত থাকা থেকেও অবরুদ্ধ করে দেয়। এ সংশোধনী একই সাথে বহুদলীয় গণতন্ত্র বাতিল করে একদলীয় শাসন কায়েম করে অর্থাৎ এই সংশোধনীতে যে বর্ধনটুকু এসেছে, তা যে অগণতান্ত্রিক-সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

মজার ব্যাপার হলো সেই সংশোধনীকে ‘বাকশালী’, ‘স্বৈরাচারী’ ইত্যাদি বলে বলে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি ১৯৯১ সালে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা লাভ করে এই অনুচ্ছেদটিকে কর্তন না করে উল্টো দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বর্ধিত করে আর একই দলের মাঝে ভিন্ন মতবাদের গ্রুপ বা ককাস তৈরি করাও নিষিদ্ধ করে দেয়। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়ায় এমন যে, বিরোধী দলের প্রত্যেকে বিরুদ্ধে ভোট দিলেও সরকার দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উত্থাপিত যেকোনো বিল পাশ হতে বাধ্য কেননা সরকারী কোন সাংসদ নেতাদের মতের বিরুদ্ধে তো ভোট দিতে পারবেনই না, এমনকি ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকতেও পারবেন না। একই কারণে বিরোধী নেতারা যত ভালো প্রস্তাবই উত্থাপন করুক না কেন সেটা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

অর্থাৎ দ্বাদশ সংশোধনীর পরে সংসদ পুরোপুরি একটি অর্থহীন পুতুলনাচ হয়ে পড়ে। সংসদে বিরোধী দল হয়ে যায় পুরোপুরি ক্ষমতাহীন আর সরকারী দলের নেতারা হয়ে পড়েন সর্বেসর্বা। সাংবিধানিকভাবেই রাজনীতি হয়ে পড়ে দলীয় মতপার্থক্যবিনাশী এবং একনায়কত্বমুখী। নিজের তাগিদে রাজনীতি করা নেতাদের সরিয়ে রাজনীতিতে চলে আসে জ্বী হুজুর মার্কা চাটুকারেরা। টিউশনির পয়সায় চাঁদা দিয়ে রাজনীতি করা ছেলেপেলেদের সরিয়ে জোর করে ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদা তুলে আনা ছেলেপেলে ছাত্র রাজনীতি ছেয়ে ফেলে। এরপর একসময় মিডলম্যানকে অতিক্রম করে চাঁদা দেয়া ব্যবসায়ীরাই সরাসরি রাজনীতিতে ঢুকে গিয়ে ‘জ্বী হুজুর’ নেতা হয়ে বসে। সংসদ ভরে যায় অপরাধী আর সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীতে।

অথচ ৭০ ধারা আসবার আগে রাজনীতিতে একটা দলের মাঝেও তীব্র মতবিরোধ ছিলো-নেতৃত্বে বৈচিত্র্য ছিল-সংস্কার আর পরিবর্তন ছিল। এই সংস্কারের কারণেই মুসলিম লীগ ভেঙ্গে আওয়ামী মুসলিম লীগ আর আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ সৃষ্টি হতে পেরেছিল। নতুন প্রতিভার জায়গা ছিল বলেই টুঙ্গিপাড়ার এক কিশোর নেতা শেখ মুজিব হতে পেরেছিলেন আর শেখ মুজিবের অবর্তমানেও আওয়ামী লীগের বৈচিত্র্যময় নেতৃত্ব একটি অস্থায়ী সরকার গড়ে তুলতে পেরেছিল। অথচ এখন আমরা শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ার পরবর্তী নেতৃত্ব ভাবতে গেলে তারেক রহমান আর সজীব ওয়াজেদের বাইরে ভাবতে পারিনা। ৭০ অনুচ্ছেদের চাপিয়ে দেয়া দলীয় মতপার্থক্যের উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যত আমাদের দুই দলীয় নেত্রীকে দুইজন অন্তঃপরিবর্তনশীল মহারাণী বানিয়ে তুলেছে যাদের মুখের কথাই হয়ে উঠেছে দেশের আইন।

অবশ্য ২০০৮ পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার এই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটায়। পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে ৭০ ধারা ফিরে যায় তার পূর্বতন রূপে অর্থাৎ দলীয় ককাস দিয়ে বিল পাশ হওয়া আটকে দেয়ার একটা উপায় তৈরি হয়। কিন্তু দশকব্যাপি একমুখীতা আর অভিজাততান্ত্রিকতার ইতিহাসের নিচে ভোটদানে বিরত সংসদ কার্যকর করার কাগুজে উপায় চাপা পড়ে যায়। অতঃপর ২০১৪ পরবর্তী আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক অর্থ ছাপিয়ে একেবারে আক্ষরিক অর্থেই সংসদের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে পড়লে লাল মোজা নিষিদ্ধের মতন দমনমূলক আর অবাস্তব আইন প্রণয়ন করা আওয়ামী লীগের নেতাদের জন্যে একেবারে সহজ হয়ে পড়ে। সরকারের ক্ষমতার লাগাম ধরে রাখার রাখার প্রধান এবং একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় বিচার বিভাগ।

সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো যে বিচার বিভাগ এই দায়িত্বটি বেশ ভালোভাবেই পালন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আদালত ঋণ মওকুফে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতার সাংবিধানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে, বাল্যবিবাহের বিশেষ আইন কেন অসাংবিধানিক নয় সেটা জানতে চেয়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রণয়নকারী ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছে। রাজনৈতিক সুবিধার খাতিরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ উচ্ছ্বসিত হলেও বিচার বিভাগের অপরাপর কর্মকান্ড তাদেরকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। তাই বিচারপতিদের বশে আনতে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে ৭০ অনুচ্ছেদের ওপর ভর করে ‘সুপারসনিক’ গতিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাশ করিয়ে ফেলে। এই ষোড়শ সংশোধনী বলছে যে বিচার বিভাগের সদস্যদের তদারকের দায়িত্ব সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল অর্থাৎ প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য সিনিয়র জজদের হাত থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে সংসদের হাতে। যাতে করে বিচারপতিদের কোন রায়ে গোস্বা হলেই সংসদ তাদের অপসারণের প্রস্তাব তুলতে পারেন এবং ৭০ অনুচ্ছেদের বলে সুপারসনিক গতিতে তাদের চাকরিচ্যুত করতে পারেন।

নির্বাহী বিভাগ এবং আইন প্রণয়নকারী বিভাগের মাঝে সুপষ্ট বিভাজন না থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আমলাতন্ত্রে এবং নির্বাহী বিভাগের অন্যান্য ক্ষেত্রে সংসদের নাক গলানোর ফলাফল আমরা দেখেছি। মন্ত্রী ধরে প্রমোশন আর পার্টির পাণ্ডাকে জেলে ভরার কারণে খাগড়াছড়িতে ট্রান্সফার হবার গল্প এক হুমায়ূন আহমেদই শতবার লিখেছেন। জবাবদিহীতার কোন কার্যকর পদ্ধতি না থাকায় দুই বিভাগ মিলেমিশে বিরাট এক দানব হয়ে উঠেছে। এই দানবের লাগাম কোনমতে টেনে ধরে রেখেছে বিচার বিভাগ আর ক্ষিপ্ত দানব মহাপরাক্রমে সেই ক্ষমতাটুকু কেড়ে নেবার চেষ্টা করছে। তবে বিচার বিভাগ দমে থাকবার নয়। সুপারসনিক ষোড়শ সংশোধনীকে সংবিধান প্রণেতা ডক্টর কামাল হোসেন আর ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের মতন ৯ জন এমিকাস কিউরির সুপারিশ অনুসারে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত। এতে সরকার খুব ক্ষেপে উঠেছে আর সংসদে গিয়ে আদালত এবং আদালতের বন্ধুদের বদনাম করে বেড়াচ্ছে। একজন তো প্রশ্নও করেছেন যে কামাল হোসেন কিসের ডাক্তারঃ মুরগি, ছাগল না ভেড়ার? তিনি এতোটুকুও বুঝতে পারছেন না যে কামাল হোসেন কোন হাসপাতালের ডাক্তার নন, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে ডক্টরেট পাশ করা একজন বিশেষজ্ঞ। যদি আইনে ডক্টরেট আর হাসপাতালের ডাক্তারের তফাতটুকু না বোঝেন, তাহলে বিচারপতিদের বিচার তিনি কেমন করে করবেন?

রাজনীতিতে এই ভ্যাপসা অস্বস্তির কালে আমরা রাষ্ট্রের জবাবদিহীতার একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। এমন সময়ে বিচার বিভাগের ঘাড়ের উপর সরকারি নেতাদের নিঃশ্বাস হবে আইনের শাসনের উপরে সর্বোচ্চ আঘাত। ৭০ অনুচ্ছেদকে পরিমার্জন করে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার নিষেধাজ্ঞা বাতিল করার আগপর্যন্ত এবং একদলীয় এককেন্দ্রিক সংসদ বদলে বহুদলীয় সংসদে ফিরে যাবার আগ পর্যন্ত সংসদ বিচার বিভাগের ওপর খবরদারি করার এখতিয়ার চাওয়াটা অযৌক্তিক এবং বিপদজনক।

লেখকের সম্পূর্ণ বক্তব্য দেখুন নিচের ভিডিওটিতেঃ

মূল বক্তব্যঃ অনুপম দেবাশীষ রায়,
অনুলিখনেঃ Prangon Chowdhury।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top