ইতিহাস

যে পাইলট বিমান ল্যান্ড করাতে জানতেন না!

নিয়ন আলোয়

১৬ই জুন, ১৯৪৩

মার্কিন সেনাবাহিনীর একটা বি-১৭ ফ্লাইং ফোর্ট্রেস বোম্বার সলোমন দ্বীপপুঞ্জের বোগেনভিল দ্বীপের আকাশের দিকে ছুটে চলছে। ৪ ইঞ্জিনের এই বোম্বারটির নাম দেওয়া হয়েছিল Old 666। একদম একা আর ফাইটার এস্কোর্টের রেঞ্জের বাইরে উড়তে থাকা এই বোম্বারের পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন জে জিমার। তার মিশন ছিল বোগেনভিল আর বুকা দ্বীপের ডিটেইলড ফটো তুলে আনা, যেন চলতি বছরের শেষে ওই দ্বীপপুঞ্জে মিত্রবাহিনী যে অপারেশনের পরিকল্পনা করছে, সেটার জন্য যেন সেই দ্বীপপুঞ্জের একটা নিখুঁত ম্যাপ তাদের হাতে থাকে। ৯ জন মানুষ এই সুইসাইডাল মিশনের জন্য স্বেচ্ছায় ক্রু হতে চেয়েছিলেন। Old 666 কে দেখার সাথে সাথে দ্বীপের জাপানিরা তাঁদের বাধা দেওয়ার জন্য একটি নয়, দুটি নয়… ১৭টি ফাইটার পাঠায়! সেই মুহূর্তে পাইলট জে জিমারের মনের ভিতর কী চলছিল? এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ইস্তফা দিয়ে পালানো উচিত ছিল আমার, চুলায় যাক ছবি তুলাতুলি, কিন্তু সেনাবাহিনীর শিডিউল ঠিক হয়ে গিয়েছিল। নভেম্বরের ১ তারিখে তারা রেইড দেবে, তাই ছবি তোলার গুরুত্বটা আমাকে নাড়া দিল”। জিমার জানতেন পুরো মিশন চালাতে গেলে ফাইটারগুলো তাকে ধরে ফেলবে। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তিনি মিশন কন্টিনিউ করবেন। জাপানি ফাইটারগুলা যতই কাছে আসছে, Old 666 এর কেবিনে টেনশন ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। মিশন শেষ হতে ৩০-৪০ সেকেন্ড বাকি থাকতেই জাপানি ফাইটারগুলা ধরে ফেলল জিমারকে। বিমানের মেশিন গান রেঞ্জের বাইরে থেকে জাপানি ফাইটারগুলা শকুনের মত চক্কর দিচ্ছে। শীঘ্রই এমন একটা ডগফাইট হতে চলেছে যেখানে একজন বোম্বার পাইলট ১৭টি জাপানি ফাইটার পাইলটের মুখোমুখি হবেন।

নিয়ন আলোয়

ক্যাপ্টেন জে জিমার

Old 666 এর কাহিনীর শুরু হয় মাস পাঁচেক আগে। পোর্ট মোর্সবি নিউগিনিতে। যেটা মার্কিন সেনাবাহিনীর ৪৩তম বোমারু গ্রপের বেইস। জে জিমার লোকটা ছিলেন এমন যাকে বলে “মানুষ ভাল, কিন্তু টাল” টাইপের। ট্যালেন্টেড ছিলেন, এমআইটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ে সেনাবাহিনীর এয়ার কর্পে যোগ দেন। বি-২৬ এর কো-পাইলট হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন। সবই ঠিক ছিল, শুধু গাছে উঠে আর নামতে পারতেন না, মানে বি-২৬ কে ল্যান্ডিং করাতে পারতেন না! তার সহপাঠী ও জুনিয়রেরা সময়মত প্রোমোটেড হলেও তিনি আটকে থাকেন। কাহিনী আরও গুরুতর হয় যখন এক মিশনে তিনি কো-পাইলটের দায়িত্ব পালনের সময় ঘু্মিয়ে পড়েন, চারিদিকে এন্টি-এয়ারক্রাফটের গোলার বিস্ফোরনেও তার ঘুম ভাঙেনি! শেষমেশ পাইলট প্লেনটাকে একা হ্যান্ডেল করতে না পেরে কিল ঘুষি দিয়ে তাকে জাগিয়ে তুলেন। ফলাফল তাকে নিউগিনিতে বি-১৭ এর স্কোয়াড্রনে ট্রান্সফার করা হয়।

একে একে সব পাইলটকে বোম্বার দেওয়া হলেও তাকে ও তার ক্রু’কে ওয়েটিং’এ রাখা হয়। তার ক্রু’রাও ছিল তার মতই অপদার্থ। বিভিন্ন কারণে তাদেরও বাদ দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ এক মিলিটারি ফটোগ্রাফারের সাথে জিমারের দেখা হয়। ফটোগ্রাফার জিমারকে বলেন, “একটা বোম্বারের খবর জানি, কেউ আর উড়াতে চায় না। কারণ যতবারই সেটা কোনো মিশনে গেছে, কখনও আস্ত ফিরে আসতে পারেনি। শত্রু যেন সব রাগ ওই বিমানের উপরেই ঝাড়ে”। লেজের নম্বর ৪১-২৬৬৬ ওয়ালা এই বি-১৭-ই ভার্সনের বোম্বারটাকে “কুফা” বলে ধারণা করা হত। তাই একে বিমান ঘাটির এক কোনায় ফেলে রাখা হয়েছিল যাতে অন্যান্য বি-১৭ এর ক্রু’রা এই বিমান থেকে যে কোনো প্রয়োজনীয় পার্টস খুলে নিয়ে তাদের বিমানে লাগাতে পারে।

নিয়ন আলোয়

মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি বি-১৭ বোম্বার

জিমার আর তার ক্রু এই পরিত্যাজ্য বিমানটিকেই তাদের মত করে সাজিয়ে নেয়। বুলেটের গর্তগুলাকে সারিয়ে পুরো বিমানটিকে মেশিনগান দিয়ে সাজানো হয়। যেখানে মেশিনগান দরকার নাই সেখানেও মেশিনগান বসানো হয়েছিল। সাধারণত, একটা স্ট্যান্ডার্ড বি-১৭-ই ভার্সনের বোম্বারের স্পীড ৩১৭ মাইল প্রতি ঘন্টায়, রেঞ্জ ২০০০ কিলোমিটার, ৩৬২৯ কেজির মত বোমা বহন করতে পারে আর থাকে ১৩টা মেশিনগান। জিমার নষ্ট মেশিনগানগুলাকে টুইন ৫০ ক্যালিবার দিয়ে প্রতিস্থাপন করেন। বিমানের বোম্বেডিয়ার, যিনি বিমানের নাকে বসে বোমা ফেলার দায়িত্বে থাকেন, তার জন্যে একটা মেশিনগান অলরেডি থাকে। জিমার সেখানে আরও একটা ৫০ ক্যালিবারের মেশিনগান বসান। আর উপরে সীটে থেকে বোম্বারটিকে ফাইটারের মত ব্যবহারের জন্যে উইন্ড শিল্ডের সামনে একটা ফিক্সড ৫০ ক্যালিবারও লাগিয়ে নেন। এভাবে মেশিনগানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯টিতে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্যাসিফিক থিয়েটারে সবচাইতে ভারী অস্ত্র সজ্জিত বিমানে পরিণত হয় এই Old 666।

১৯৪৩ সালের ১ নভেম্বরের অপারেশনের জন্যে বোগেনভিল আর বুকা দ্বীপপুঞ্জের একটা ম্যাপ দরকার, এজন্যে একটা ফটো ম্যাপিং মিশনে ভলেন্টিয়ার করার আহ্বান করা হয় জিমারকে। কোনো প্রকার ফাইটার এস্কোর্ট দেওয়া হবে না। শত্রুর এলাকায় একদম একা গিয়ে ছবি তুলে নিয়ে আসতে হবে। জিমার আর তার ক্রু’রা রাজি হন এই সুইসাইড মিশনে। এরপর যা হতে চলেছে তা ডগফাইটের ইতিহাসে একবারই হয়েছিল।

নিয়ন আলোয়

Old 666 এর ক্রু’রা (পেছনের সারির ডান দিক থেকে প্রথম জন সারনাস্কি এবং তৃতীয় জন জিমার)

জাপানি পাইলটরা জানত বি-১৭ এর নাক হচ্ছে এর উইক পয়েন্ট, নাকে এর ডিফেন্স কম। হঠাৎ দু’টা ফাইটার চক্কর কাটা বাদ দিয়ে নাক বরাবর ছুটে আসে, কিন্তু জিমার নাকে আরও এক্সট্রা দুটা মেশিনগান বসিয়েছিলেন। উভয় পক্ষে ভয়ংকর গুলি বিনিময় হয়। জিমার একটা জাপানি ফাইটারকে ড্যামেজ করেন আর বম্বেডিয়ার সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট জোসেফ সারনস্কি তার ৫০ ক্যালিবার দিয়ে আরেকটাকে ঘায়েল করেন। কিন্তু এটা জাস্ট ওয়ার্ম আপ ছিল। এরপর যা শুরু হল তা আক্ষরিক অর্থেই বর্ণনাতীত।

৩ নম্বর ফাইটারটাও একই দিক দিয়ে এগিয়ে আসে সাথে আরেকটা ফাইটার সেই সময়ে বামদিকে একটু কোণে থেকে গুলি করতে করতে এগিয়ে আসে, ককপিটে থাকা জিমার আর বম্বেডিয়ার সারনস্কি ৩ নম্বর ফাইটারটাকে ধ্বংস করতে পারলেও ৪ নম্বরটারগুলির আঘাতে ককপিটে থাকা জিমার তার হাত, কব্জি আর পায়ে মারাত্মক আঘাত পান। বোম্বেডিয়ারের সামনে থাকা প্লেক্সি গ্লাস আর ধাতু ভেঙে সারনাস্কির তলপেট ছিঁড়ে ঢুকে যায়। সারনাস্কি পড়ে যান মেশিনগানপোস্ট থেকে, তিনি জানতেন যে তিনি মারা যাচ্ছিলেন। তারপরেও রক্তমাখা শরীর নিয়ে শামুকের মত হামাগুড়ি দিয়ে তিনি তার মেশিনগান পোস্টে যান। জাপানি ফাইটারগুলার আরেকটা ওয়েভ তেড়ে আসে তাদের দিক। এইবার সামনাসামনি ছুটে আসতে থাকে জাপানের দুই ইঞ্জিনচালিত কেআই-৪৬ ডায়না। জোসেফ সারনাস্কির রক্তে ভেজা হাতে সামনের মেশিনগানটি শেষ বারের মত গর্জে উঠল। ৫০ ক্যালের আঘাতে ডায়নাটি মাঝ আকাশেই ধ্বংস হয়ে গেল। ছিন্নভিন্ন সারনাস্কিও ঢলে পড়লেন মেশিনগানের উপর।

নিয়ন আলোয়

যুদ্ধরত বি-১৭

বিমানের অন্যান্য ক্রু’ও আশপাশে থেকে আক্রমন করতে আসা ফাইটারগুলাতে গুলি করতে ব্যস্ত। ককপিটে জিমারের কব্জি থেকে রক্ত চুইয়ে পুরো কন্ট্রোল ভিজে গেছে ততক্ষণে। তিনি জ্ঞান না হারানোর জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে দেখা গেল, Old 666 এর রাডার কন্ট্রোল, হাইড্রলিক, সামনের মেশিনগানগুলো অকেজো হয়ে গেছে। সবচাইতে খারাপ খবর- প্লেনের অক্সিজেন সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে। ২৫,০০০ ফিটের এই উচ্চতায় বাতাস শ্বাস নেবার জন্যে মোটেও উপযোগী না। জিমার মরিয়া হয়ে বিমানের নাক নিচের দিকে করে দিলেন। ৪০ সেকেন্ডে ৩ মাইল ডাইভ দেবার পর ৮০০০ফিট উচ্চতায় বিমানকে লেভেল করেন জিমার , ক্রু’রা এখন কোনোপ্রকার ইকুইপমেন্ট ছাড়াই শ্বাস নিতে পারবে। বাকি ১৪টা ফাইটার খুব সহজেই আহত বোম্বারটির সাথে তাল মিলিয়ে পেছনে পেছনে এল। আবার শুরু হল তাদের মুখোমুখি আক্রমণ। জিমার জানেন এভাবে বেশিক্ষণ টিকতে পারবেন না। তিনি একটা ডিফেন্সিভ ম্যানুভার নিলেন। যখনই কোনো ফাইটার সামনাসামনি আসবে তিনি বিমানের মুখঘুরিয়ে নিবেন অন্য দিকে। আবার ওইদিক থেকে সামনা সামনি হামলা হলে এদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিবেন এভাবে জিগজ্যাগ করে সর্পিল বেগে তিনি কাছের ফ্রেন্ডলি বেইসের দিকে আগাবেন। সাধারণত ডগফাইট (মাঝ আকাশে বিমানের সাথে বিমানের যুদ্ধ) হয় ১ মিনিটের মত। কিন্তু জিমার আর তার Old 666 টানা ৪৫ মিনিট ধরে জাপানিজ ফাইটারগুলোর সাথে ডগফাইট করে। জিমারের হাত-পা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে, তারপরেও অলৌকীকভাবে তিনি শক্তি সঞ্চার করে এই বিশাল বি-১৭ কে ক্রমাগত ম্যানুভার করাতে করাতে এগিয়ে যান। একসময় জাপানীজ ফাইটারগুলার তেল শেষ হয়ে যায়, বাধ্য হয়ে তারা ফিরে যায়। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত Old 666 কোনোমতে ডোবাগোরা নিউগিনিতে একটি মিত্র বেসের দিকে এগিয়ে যায়। অবতরণের পর মেডিক আর গ্রাউন্ড ক্রু’রা বিমানের দিকে ছুটে আসে। মৃত জোসেফ সারনাস্কিকে বের করে আনা হয়। পাইলট জে জিমারকেও মৃত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অলৌকিকভাবে জিমার বেঁচে যান। তিনি এতই দূর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে কোনো ধরণের শারিরীক মুভমেন্ট করতে পারছিলেন না, তাই তাকে মৃত ভাবা হয়েছিল। টানা ৭২ ঘণ্টা অপারেশনের পর জিমারের শরীর থেকে বুলেটের অংশ, Old 666-এর রাডার প্যাডেল ও কেবলের খন্ডিত অংশ সহ মোট ১৫০টি খন্ডিত ধাতুর টুকরো বের করা হয়। ১৮৭ বুলেট আর ৫টি কামানের গোলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল Old 666। ৬ জন আহত হয়েছিলেন। জিমার কীভাবে সে অবস্থায় বিমানটিকে ল্যান্ডিং করিয়েছিলেন তা আজও অজানা।

নিয়ন আলোয়

Old 666 এর তোলা “The Most Honored Photo”

এই মহা বীরত্বের জন্যে জিমারকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ এবং সবচাইতে সম্মানিত পদক, ‘মেডেল অফ অনার’-এ ভূষিত করা হয়। মারাত্মক আহত হয়েও মেশিনগান পোস্টে ফিরে যাবার জন্যে জোসেফ সারনাস্কিকেও মরণোত্তর ‘মেডেল অফ অনার’ পদক পান। বাকি ক্রু’দের ‘ডিশটিংগুইস সার্ভিস ক্রস’-এ পুরষ্কৃত করা হয়। ‘মেডেল অফ অনার’-এর পরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মানীয় পদক এটি।

এতক্ষণ যেটি পড়লেন তা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান এয়ার ক্রু’দের দ্বারা পরিচালিত সবচাইতে সাহসী মিশন। যার রেকর্ড এখনো আমেরিকাসহ কোনো দেশ, কোনো মিশনেই ভাঙতে পারেনি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top