ইতিহাস

একজন তাজউদ্দীন আহমদ…

neon aloy তাজউদ্দীন আহমদ নিয়ন আলোয়

ব্রিটিশ সরকারের তিন রাজবন্দী রাজেন্দ্র নারায়ণ চ্যাটার্জী, বীরেশ্বর ব্যানার্জি আর মণীন্দ্র শ্রীমণিকে তখন সরকার কলকাতা থেকে কাপাসিয়া থানায় পাঠিয়ে দিয়েছিল। আর এই তিন রাজবন্দী তখন দিনের বেলায় ঘুরে বেড়াতো এলাকাটায়। দরদরিয়া গ্রামের ছোটো ছোটো বাচ্চাদের পড়াতো। হঠাত তাঁরা খুঁজে পান একটি ছেলেকে, যে ছেলেটা এমন সব প্রশ্ন করে যে তাঁরা অবাক হয়ে যান। তারপর চলে সেই ছেলেকে দেশ, সমাজ নিয়ে জ্ঞানপ্রদান। সেই ছেলেটাও আগ্রহভরে তাঁর জ্ঞানের ঝুলিতে নতুন নতুন তথ্য যোগ করে। এরপর দেশভাগ হয়। ছেলেটাও বড় হতে থাকে। ছেলেটার সাথে সাথে তার মনের প্রশ্নগুলোও আরো বড় হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি নব্যগঠিত পাকিস্তানে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হয়, যার নাম ছাত্রলীগ। এই ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিল সেই ছেলেটি। ছেলেটির নাম তাজউদ্দীন আহমদ। স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম কারিগর, বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক তাজউদ্দীন আহমেদ, যাকে নিয়ে লিখতে গেলে লিখাটা অনন্তকাল পর্যন্ত চলতে থাকবে মনে হয়।

“সব রাষ্ট্রবিপ্লবেই আসল নায়কের পেছনে একজন নেপথ্য নায়ক থাকেন। আমার বলতে দ্বিধা নেই বাংলাদেশের বিপ্লবে এই নেপথ্য নায়কের সম্মানিত আসন পাওয়ার অধিকার ও দাবি অবশ্যই তাজউদ্দীনের। শেখ মুজিব এই বিপ্লবের নেতা আর এই বিপ্লবের মুখপাত্র ও নেপথ্য নায়ক তাজউদ্দীন। লেনিন বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, পেছন থেকে লাল ফৌজ গড়েছেন ট্রটস্কি। কামাল নবীন তুরস্ক গড়েছেন, তার শক্তি ও সাহসের উৎস তৈরি করেছেন আনোয়ার পাশা। কেনিয়ার নেতা কেনিয়াত্তার নামের পাশাপাশি অনিবার্যভাবে আরো একটি নাম আসে টম মবায়া। পরবর্তীকালের ইতিহাসে অবশ্য ট্রটস্কি, আনোয়ার পাশা, মবায়া নির্বাসিত ও পরিত্যক্ত নেতা। তাজউদ্দীনের জন্য ইতিহাস ভবিষ্যতে কী ভূমিকা রেখেছে জানি না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের দশ মাসে তাজউদ্দীন প্রমাণ করেছেন যে, কেবল নেপথ্য নায়কের ভূমিকা তার নয়, নেতার অনুপস্থিতিতে বিপ্লবের সারথী সাজবার যোগ্যতা তার রয়েছে।”

-কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী দৈনিক বাংলা (০৬/০২/১৯৭২)

ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে আওয়ামী মুসলিম লীগের যাত্রা- সবকিছুতেই বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন এই তাজউদ্দীন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিকের কথা। ২৫ শে মার্চ রাতে শহরে যে আর্মি নামবে এই সংবাদ সবাই আন্দাজ করতে পারছিল আওয়ামী নেতাকর্মীরা। খন্দকার মোশতাক এয়ারপোর্ট থেকে ইয়াহিয়া খানের পালিয়ে যাওয়ার খবরটি নিশ্চিত করার পরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর জাতীয় চারনেতার দুশ্চিন্তার শুরু হয়। প্ল্যান ছিল গ্রেফতারের আশংকা থাকলেই সবাই এক গোপন স্থানে আত্মগোপন করবেন। কিন্তু বরাবর আবেগী মানুষ বঙ্গবন্ধু বলেন যে বাংলার মানুষকে বিপদে ফেলে তিনি আত্মগোপন করবেন না। প্ল্যানের পরিবর্তন হয়। বঙ্গবন্ধু বাদে তাঁর আদেশে বাকি সবাই আত্মগোপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু তাজউদ্দীন বাসায় গিয়েই অভিমান করে বসলেন। স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে বললেন মুজিব ভাই না পালালে আমিও পালাব না, দেখি কি হয়। এই মানুষটা ছিলেন এককথায় বঙ্গবন্ধুর জন্য নিবেদিতপ্রাণ। আর বঙ্গবন্ধুও তাঁকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন। একদিন জোহরা তাজউদ্দীনকে তিনি বলেন, “তাজউদ্দীনকে দেইখা রাইখো। ও কিন্তু দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।” তাজউদ্দীন কতটা গুরুত্বপূর্ন ছিলেন সেটা আমরা পরের কয়েকটা লাইন থেকে বুঝব। ১৯৪৯ সালের কোনো এক এপ্রিলের ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তাদের দাবী দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছিলেন বঙ্গবন্ধু আর দলীয় বেশকিছু নেতাকর্মী। তো একটা সময় পুলিশ আসে ম্যাজিস্ট্রেটসহ। বঙ্গবন্ধু আন্দোলন আরো তীব্রতর করার জন্য তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন আরো আটজন কর্মীসহ তিনি গ্রেপ্তার হবেন। কিন্তু তাহলে বাইরের দিকটা কে সামলাবে? তিনি তাজউদ্দীনকে বললেন, “তোমার কোনোভাবেই গ্রেপ্তার হওয়া যাবে না”। কিন্তু ততক্ষণে পুলিশ চলে আসে।তাজউদ্দীন কি করবেন ভাবতে ভাবতে হঠাত জনতার সাথে মিশে গেলেন, তারপর হঠাৎ কাগজ কলম নিয়ে বলেন, “সরেন, সরেন সবাই। কে কে গ্রেপ্তার হচ্ছে নামগুলা জানান। আমি সাংবাদিক”। এটা বলেই তিনি গ্রেপ্তার এড়ান ঐ সময়ে। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধির খানিকটা নমুনাও এই ঘটনা থেকেই পাওয়া যায়।

তো এই লিখার প্রতিপাদ্য কি সেটা একটু ক্লিয়ার করি প্রথমে। এই লিখাতে আমি ব্যাসিকালি ব্যক্তি তাজউদ্দীন আর তাঁর বিভিন্ন সময়ের ভূমিকাগুলো উল্লেখ করব। তাজউদ্দীনকে শুধু পড়লে হবে না। অনুধাবনও করতে হবে। তাজউদ্দীন আহমেদের মানবিক গুণগুলোর কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। সেদিকটায় আর গেলাম না। তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে এই পর্যায়ে।

প্রথমত, আগেই উল্লেখ করেছি যে তাজউদ্দীন আহমদ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠার অন্যতম এক কারিগর। এই ছাত্রলীগ কিভাবে তাদের দাবীগুলো পরবর্তীতে উত্থাপন করেছিল, আর বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভূমিকা রেখেছিল তা আমরা সকলেই জানি। একই পয়েন্টে আমি আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম ও তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকাকেও রাখব। এই আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগে পরিণত হলো। এর আগের ফ্ল্যাশব্যাকে যাই একটু। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদককে পরাজিত করে পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনটা আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হতে থাকে এই সময়ে। আমরা যেই ঐতিহাসিক ছয়দফার কথা জানি, সেই ছয়দফার খসড়া তৈরিতেও তাঁর অবদান কম না। ১৯৬৬ সালেই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আর তখন থেকেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসা শুরু হয়। তাঁর মানে বোঝা যায় কিংবা খানিকটা আন্দাজ করা যায় আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তৈরীতে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করতেন।

দ্বিতীয়ত, তাঁর বুদ্ধি আর ইয়াহিয়াকে ব্যাকফুটে রাখার বিষয়টি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। ইয়াহিয়া খানের সাথে মুজিবের বৈঠক চলছিল ’৭১-এ। এরপরে ভুট্টো-ইয়াহিয়া বৈঠক বসে। তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো হুট করে ইয়াহিয়া খানকে বলেন যে , “আলোচনা বৈঠকে মুজিবকে আমি ভয় পাই না। ইমোশনাল এপ্রোচে মুজিবকে কাবু করা যায়, কিন্তু তার পেছনে ফাইল বগলে চুপচাপ যে নটোরিয়াস লোকটি বসে থাকে তাঁকে কাবু করা শক্ত। দিস তাজউদ্দীন, আই টেল ইউ, উইল বি ইউর মেইন প্রবলেম।” ভুট্টোর এই মন্তব্য থেকে আমরা মোটামুটি বুঝতে পারি পাকিস্তানের গলার কাঁটা হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ সবসময় আটকে ছিলেন। পরবর্তী পয়েন্টগুলোতে তার ধারাবাহিকতা আমি আলোচনা করব।

তৃতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারতের সাহায্য কামনাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই সাহায্যের জন্য তাজউদ্দীন আহমদ ২৭শে মার্চ ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলামকে নিয়ে ছদ্মবেশে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ৪ এপ্রিল দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাঁর বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে প্রশ্ন করেন, “হাও ইজ মুজিব? ইজ হী অলরাইট?” এই প্রশ্নের উত্তরটি আমি হুবহু তুলে দিলাম,

“বঙ্গবন্ধু আমাদের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। ২৫ মার্চের পর নেতার সঙ্গে আমাদের দেখা হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যে কোনো মূল্যে এ স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। আমাদের অস্ত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রয়োজন হবে বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের খাদ্য ও আশ্রয়ের। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে জোটনিরপেক্ষ, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি শত্রুতা নয়। বাংলার মানুষের সংগ্রাম মানবতার পক্ষে ও হিংস্র ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। মাতৃভূমির স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রতিবেশী ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা চাই। সব গণতন্ত্রকামী মানুষ ও সরকারের সহায়তা আমরা চাই।”

এই উত্তরটা একটু গভীরভাবে মনের চোখে বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে আসলে কতটা দূরদর্শী, কতটা রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ভারতের সাথে সাহায্য সংক্রান্ত কঠিন মনোভাবের এই আলোচনা তাজউদ্দীন আহমদ ছাড়া কেউ করতে পারতেন বলে আমার মনে হয় না।

আলোচনাটা হয়তো দীর্ঘকাল চালিয়ে নেয়া যাবে এ নিয়ে। তাই ওদিকটা থেকে একটু সরে আসি। তাজউদ্দীন আহমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতি একটু আলোকপাত করি। জ্বি, বলছিলাম প্রবাসী সরকার গঠন করার কথা। খন্দকার মোশতাকরা যখন পাকিস্তানের সাথে সমঝোতার কথা চিন্তা করছিলেন, তখন স্রোতের বিপরীতে গিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ চিন্তা করেছিলেন প্রবাসী সরকার গঠনের কথা। এই সরকার গঠনের জন্য তিনি বেশ চাপের মুখে ছিলেন। খন্দকার মোশতাকসহ বিভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতা আর শেখ মণিসহ বিভিন্ন যুবনেতাদের চাপের সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। এত চাপের মুখেও তিনি সরেননি। কারণ তিনি জানতেন যে এই দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁকে মূখ্য ভূমিকা পালন করতেই হবে। তাজউদ্দীন আহমদের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণটি ১১ই এপ্রিল রেডিওতে প্রকাশ করা হয়। সত্যিকার অর্থে যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন আর সে অনুযায়ী কিরকম স্টেপ নেয়া উচিৎ তার একটা নিদর্শন আমরা পাব এই ভাষণে।এই ভাষণের একটা চুম্বক অংশ তুলে দিচ্ছি হুবহু,

“বিদেশী বন্ধুরাষ্ট্রসমূহের কাছে যে অস্ত্র সাহায্য আমরা চাইছি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে- একটি স্বাধীন দেশের মানুষ আর একটি স্বাধীন দেশের মানুষের কাছে। এই সাহায্য আমরা চাই শর্তহীনভাবে এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি তাঁদের শুভেচ্ছা ও সহানুভূতির প্রতীক হিসেবে- হানাদারদের রুখে দাঁড়াবার এবং আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে, যে অধিকার মানবজাতির শাশ্বত অধিকার। বহু বছরের সংগ্রাম, ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের পত্তন করেছি। স্বাধীনতার জন্যে যে মূল্য আমরা দিয়েছি, তা কোন বিদেশী রাষ্ট্রের উপরাষ্ট্র হবার জন্যে নয়। পৃথিবীর বুকে স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি শান্তিকামী দেশ হিসেবে রাষ্ট্রপরিবারগোষ্ঠীতে উপযুক্ত স্থান আমাদের প্রাপ্য। এ অধিকার বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্মগত অধিকার।”

স্বাধীনতা এবং সেজন্য কিভাবে বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সাহায্য প্রয়োজন এবং দৃঢ়হস্তে কিভাবে আন্তর্জাতিক সাহায্যটি নিশ্চিত করা যায় তা সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ন সজাগ ছিলেন। এই ভাষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ হিসেবে আমি মনে করি কারণ আন্তর্জাতিক মহলকে যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানিয়ে দেয়ার জন্য এই ভাষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

১১ই এপ্রিলের এই ভাষণের পরে ১৭ই এপ্রিলের অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৭ই এপ্রিলের শপথের পর তাজউদ্দীন নিজেকে আর কোনো পরিবারের মনে করেননি, তিনি নিজেকে বাংলার মনে করেছেন। যুদ্ধের নয়টা মাস এই প্রবাসী সরকারে তিনি কি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, ইতিহাস তার সাক্ষী। এই অস্থায়ী সরকারের জন্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় লাভের প্রক্রিয়াটি ত্বরাণ্বিত হয়েছিল এ সম্পর্কে কেউ দ্বিমত আশা করি পোষণ করবে না এই মুহুর্তে। কিন্তু তখন তাজউদ্দীনকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ভারতের দালাল হিসেবে আখ্যাও পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভারতপন্থী ছিলেন না, ছিলেন শতভাগ বাংলাদেশপন্থী। তা ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাঁর আলাপের নিম্নোক্ত বক্তব্য থেকে বোঝা যায়,

“এটা আমাদের যুদ্ধ। আমরা চাই ভারত এতে জড়াবে না। আমরা চাই না ভারত তার সৈন্য দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে আমাদের স্বাধীন করে দিক। এই স্বাধীনতার লড়াই আমাদের নিজেদের এবং আমরা এটা নিজেরাই করতে চাই।”

অস্থায়ী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আর কিসিঞ্জার সরকারের গোপন আলোচনা শুরু হলে, আমেরিকা এক সময়ে বলে যে তোমরা মুজিবকে চাও নাকি স্বাধীনতা চাও? তাজউদ্দীন জবাব দেন, “আমি স্বাধীনতাও চাই, মুজিবকেও চাই”। পরে এই কিসিঞ্জার যখন বাংলাদেশে আসেন তার চারদিন আগে তাজউদ্দীন পদত্যাগ করেন। খন্দকার মোশতাকের ষড়যন্ত্রে তাজউদ্দীন-বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় আর এই দূরত্ব পরবর্তীতে দুইজন তো বটেই, পাশাপাশি পুরো জাতির জন্য একটা কালো অধ্যায় বয়ে আনে। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বলিষ্ঠ চরিত্রের একজন মানুষ। নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন একরোখা, নীতির প্রশ্নে আপোষ তিনি করেন নি। কখনোই না, কারো সাথেই না। সারাদিন মুজিব ভাই-মুজিব ভাই করা লোকটি মুজিব ভাইয়ের সংস্পর্শ থেকে সরে গিয়ে কি দুঃখ পেয়েছিলেন সেটা আমি আপনি হয়ত কেউ কল্পনা করতে পারব না।

লিখাটা শেষ করছি জাতির প্রতি, দেশের প্রতি তাঁর স্বরূপ নিয়ে কিছু কথা বলে। দেশের তরে তিনি পরিবারকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দীর্ঘদিনের জন্য। যুদ্ধ শুরুর পর স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে একটি চিরকুট পাঠান,

“লিলি, আমি চলে গেলাম। যাবার সময় কিছুই বলে আসতে পারিনি। মাফ করে দিও। আবার কবে দেখা হবে জানি না…… মুক্তির পর। তুমি ছেলেমেয়ে নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাথে মিশে যেও।
— দোলনচাঁপা।”

এই চিরকুটটা কেবল একজন দেশপ্রেমিকই তাঁর পরিবারকে লিখতে পারেন।।

ভালো থাকবেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, ভালো থাকবেন।।

তথ্যসূত্রঃ
সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ,
নেতা ও পিতা,
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (তৃতীয় খন্ড)।

আরো পড়ুনঃ মুছে যাক আমার নাম, বেঁচে থাক বাংলাদেশ

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top