শিল্প ও সংস্কৃতি

মারা যাচ্ছে মানুষগুলো, সাথে মরে যাচ্ছে আমাদের শৈশব আর কৈশোর!

neon aloy চেস্টার বেনিংটন নিয়ন আলোয়

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি, আমরা যখন ৭-৮ বছরের শিশু তখনকার কথা বলি। সে সময়টায় ইংরেজি গান মানেই বাংলাদেশের মানুষ বুঝতো মাইকেল জ্যাকসনের গান, আর ইংরেজি সিনেমা মানেই “বাচ্চারা এসব দেখলে নষ্ট হয়ে যাবে!” তো সে সময়টায় ছিল না ক্যাবল টিভি’র প্রাচুর্য, ছিল না ইন্টারনেট-ফেসবুক-ইউটিউবের জয়জয়কার। কিন্তু মাইকেল জ্যাকসন এমনই এক শিল্পী ছিলেন, যার কথা-সুর-গান পৌঁছে গিয়েছিল পৃথিবীর আনাচে-কানাচে প্রতিটি মানুষের কানে! তখনকার সমাজে মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন নষ্ট আর বখাটে ছেলেপুলের প্রতিভু। এলাকার কোন কিশোর কিংবা যুবকের চুল লম্বা কিংবা কাপড় একটু বেশি-ই পাশ্চাত্য ধারার হতে দেখলে মুরুব্বীদের টিপ্পনি শুনতে হতো- “কি মিয়া, মাইকেল জ্যাকসন হবার লাগছো? এইসব ছাইড়া পড়াশোনায় মন লাগাও।”

সে সময়ই কোন একদিন বিটিভি’তে দেখেছিলাম মাইকেল জ্যাকসনের The earth song গানটার মিউজিক ভিডিও, বয়স তখন আট কি নয় হবে। দেখলাম, আর ভাবলাম- আমাদের পৃথিবীটার অবস্থা তাহলে এতটাই খারাপ?! মানবসৃষ্ট দুর্যোগে তাহলে পুরো পৃথিবীটা এর সবগুলো প্রজাতিসহ এভাবে ধংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?? এর আগে পর্যন্ত আমার পরিবেশ সচেতনতার জ্ঞানের দৌড় ছিল ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট কার্টুন পর্যন্ত। কিন্তু ওটা তো শুধুই কার্টুন, তাই সেটাকে সিরিয়াসলি নেবার মত কিছু মনে করি নাই।

আর্টিকেলের কভারে একজনের ছবি ঝুলিয়ে ভিতরে মাইকেল জ্যাকসনের গুণগান কেন গাচ্ছি তা ভেবে অনেকে বিরক্ত হতে পারেন। সেই কথায় আসছি। মাইকেল জ্যাকসনের আর্থ সং-এর পর আরেকটা গানের মিউজিক ভিডিও দেখে সেই ছোটবেলার অনুভূতিটা নতুনভাবে অনুভব করেছিলাম- লিনকিন পার্কের What I’ve done। চমৎকার কম্পোজিশন গানের, একজিকিউশন বরাবরের মতই টপক্লাস। আর গানটা ট্রান্সফর্মারস মুভিতে ব্যবহার করা হলেও অরিজিনাল ভিডিওটা বেশ চমৎকার, দেখে নিতে পারেন।

লিনকিন পার্কের সাথে পরিচয় সেই হাইস্কুলের শেষের দিকে হলেও এই ভিডিওটা দেখে মনে হয়েছিল- নাহ, লোকগুলা এতদিন ভাল মিউজিশিয়ান ছিল, এখন ভাল আর্টিস্ট হচ্ছে। মিউজিশিয়ান আর আর্টিস্টের মাঝে পার্থক্য কেন করছি? কারণ একজন “শুধু-মিউজিশিয়ান” এর দায়িত্ব গানবাজনা করে মানুষের মনোরঞ্জন করা। আর একজন আর্টিস্ট বা শিল্পীর দায় আরো অনেক বড়। তাঁকে শুধু দর্শক-শ্রোতা মনোরঞ্জন করলেই চলে না, এর আগে সমাজ-রাষ্ট্র-মানুষ-ব্যাধি সবকিছু বুঝতে হয়, বুঝে হারিয়ে যেতে হয়। আর্টিস্ট কখনো কখনো সেই গোলকধাঁধাঁর সমাধান থেকে হয়তো বেরোতে পারেন, কখনো বা পারেন না। কিন্তু যেটা করেন, সেটা হলো তিনি তার শিল্পের মাধ্যমে দর্শকশ্রোতাদের কাছে সেই ধাঁধাঁ কিংবা তার সমাধানটা ছড়িয়ে দেন, তাদের চিন্তা করতে শেখান, নতুন করে ভাবতে শেখান। সে কারণেই লালন-হাসন রাজারা এখনো তাঁদের শ্রোতাদের মাঝে বেঁচে আছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, কিন্তু তাঁদের সমসাময়িকেরা হারিয়ে গিয়েছেন।

যাই হোক, লিনকিন পার্কের সাথে যখন পরিচয়, সেই সময়কার ইংরেজি গানগুলো কেন জানি খুব একটা পছন্দ ছিল না। ক্লাস নাইনে পড়ি তখন সম্ভবত। এক বন্ধুর গাড়িতে মাঝে মাঝে কোচিং-এ যাবার সুযোগ হতো। তো সেই গাড়িতেই একটা মিক্সটেপে ৬-৭টা ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ আর আউটল্যান্ডিশের গানের সাথে লিম্পবিজকিটের ১টা আর লিনকিন পার্কের ২টা গান ছিল। প্রথম ১-২দিনের পর থেকেই আমার অপেক্ষা থাকতো কখন পুরো টেপ ঘুরে আবার লিনকিন পার্কের গান দুইটা আসবে!

পরে লিনকিন পার্কের সবগুলো গান খুঁজে পেয়েছিলাম কলেজে উঠার পর, নীলক্ষেতে পাইরেটেড এমপিথ্রি’র সিডিতে। এরপরের গল্পটা আর দশজন লিনকিন পার্ক ভক্তের মতই। একসময় দেখলাম লাইভ ইন টেক্সাসের ভিডিও। সে কি এনার্জি প্রত্যেকটা ব্যান্ড মেম্বারের মধ্যে! চেস্টারের পাওয়ারফুল ভয়েজের স্ক্রিম, মাইক শিনোডা’র র‍্যাপ আর পাবলিক ইন্টারআকশন, জো হানের টার্নটেবলের সাথে সাথে অগণিত দর্শকের উদ্দাম কিন্তু সিনক্রোনাইজড নাচানাচি আর লাফানো! দুইটা কনসার্টের ভিডিও দেখে এখন পর্যন্ত আফসোস হয়েছে, তবুও অসংখ্যবার দেখেছি। একটা টেক্সাসে লিনকিন পার্ক, আরেকটা মস্কো’তে মেটালিকা-প্যানটেরা।

লেখা বারবার বেয়াড়াভাবে বেলাইনে চলে যাচ্ছে। ফিরে আসি লিনকিন পার্কে। লিনকিন পার্কের অন্তত ৮০%-এর শ্রোতারই ব্যান্ডটার সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছে তাদের In the end গানটা দিয়ে। তবে প্রায় প্রত্যেকেই কোন না কোন সময় লুপে পড়ে গিয়েছেন Numb শুনে। এমন মানুষও দেখেছি যে কিনা টানা ২-৩ মাস এই একতা গান ছাড়া আর কিছু শোনেনি। সাথে Faint, Crawling, One step closer, From the inside, New Divide, With you, Easier to run তো আছেই! কেন তাদের গানগুলো এত জনপ্রিয় হলো? কেন তারা জনপ্রিয় হলো? তাদের সমসাময়িক এবং কাছাকাছি ঘরানার লিম্পবিজকিট কেন তাদের মত এরকম জনপ্রিয় হতে পারলো না? এর কারণ সম্ভবত তাদের লিরিক্স। প্রত্যেকটা গানের কথা-ই এমন ছিলো যে কিশোর কিংবা তরুণ বয়সের যে কারো মনে হবে গানটা শুধুমাত্র তার কথা ভেবেই লেখা হয়েছে। কৈশোর কিংবা তারুণ্যের শত-শত নির্ঘুম রাত শুধুমাত্র হেডফোনে লিনকিন পার্ককে সঙ্গী করে কাটিয়ে দিয়েছে- এরকম মানুষের সংখ্যা কয় কোটি হবে সারা পৃথিবীজুড়ে?

সেই লিনকিন পার্ককে আর পাওয়া যাবে না। ব্যান্ডটার ফ্রন্টম্যান এবং ভোকাল চেস্টার বেনিংটন আত্মহত্যা করেছেন। যে দিনে আত্মহত্যা করেছেন, সে তারিখটাও অদ্ভুত! ২০ জুলাই, তার কাছের বন্ধু সাউন্ডগার্ডেন ও অডিওস্লেভের ভোকালিস্ট ক্রিস কর্নেলের জন্মদিনে। এই ক্রিস কর্নেল সাহেব নিজেও মাসকয়েক আগে আত্মহত্যা করেছেন! প্রয়াত বন্ধুর জন্মদিনে তাকে এর থেকে ভাল আর কি উপহার দেওয়া যেতে পারে?! আর এই লেখাটা যখন লিখছি, ততক্ষণে ২১ জুলাই শুরু হয়ে গিয়েছে। ২১ জুলাই আবার প্রয়াত অভিনেতা রবিন উইলিয়ামসের জন্মদিন। ছোটবেলায় দেখা Jumanji কিংবা বড় হয়ে দেখা Dead poets society, Good will hunting, Night at the museum-এ অভিনয় করা সদা হাসিখুশি এই মানুষটিও একদিন ধুম করে আত্মহত্যা করে বসলেন! কি যে মজা পাচ্ছেন তারা এই কাজটা করে, আমার জানা নাই।

দুই-তিনটা কারণ থাকতে পারে। যাদের কথা এখানে বলেছি, তাঁরা সবাই কিন্তু জীবনের কোন না কোন সময়ে মাদকাসক্তিতে ভুগেছেন। কেউ শুধু মদ, আবার কেউ উচ্চমাত্রার কোকেন কিংবা হেরোইন সেবনে। এবং এগুলো থেকে ফিরেও এসেছেন। এই মাদকাসক্তি একটা বড় কারণ হতে পারে। যদিও মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু হয়েছিলো ওষুধের ওভারডোজে। দ্বিতীয় কারণটা ব্যক্তিগত ধারণাপ্রসূত, ভুল হবার সম্ভাবনবাই বেশি। এই মানুষগুলো কিন্তু তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছেন। যা করতে ভালবাসতেন-সেটাই পেশা হিসেবে নিয়েছেন, দু’হাত ভরে টাকা কামিয়েছেন, কোটি মানুষের ভালবাসা পেয়েছেন, সুখী পরিবার পেয়েছেন। এতকিছু পেয়ে যাওয়াটাই কি তবে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের জীবনে? সম্ভাব্য সব খেলা জিতে ফেলেছেন, এখন আর জয় করার মত আর কোন খেলা খুঁজে পাচ্ছিলেন না জীবনে? প্রচন্ড রঙিন জীবন পার করে এই রংচঙে জীবনটাই একঘেয়ে লাগতে শুরু করেছিলো? নাকি একসময় যে শিল্প দিয়ে তারা অসংখ্য মানুষকে আশার পথ দেখাচ্ছিলেন, খাদের কিনারা থেকে উঠে আসার সাহস দিচ্ছিলেন- সে আশার বেলুনগুলো নিজেদের মনেই চুপসে গিয়েছিলো? আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলেন যে তারা নিজেদের তৈরি ইল্যুশনে নিজেরাই ঘুরপাক খাচ্ছেন?

কারণ হতে পারে অনেক কিছু। এতকিছু বুঝি না। শুধু এটুকু বুঝি যে গত কয়মাসে Blackhole sun গানটা হাজারখানেকবার শুনেও ক্রিস কর্নেলের ভুত মাথা থেকে নামেনি, এর আগেই চেস্টার বেনিংটন চেপে বসলো। এই ভুতগুলো বড় যন্ত্রণার। ছোটবেলায় যে ভুতের ভয় পেতাম, সেগুলো দোয়া-দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিলেই চলে যাবে এই ভরসা ছিলো। কিন্তু এখনকার ভুতগুলোকে ধরে রাখতে চাই। কারণ এই ভুতগুলো চলে গেলে যে আমার শৈশব-কৈশোরটাও ভুত হয়ে যাবে!!

Most Popular

To Top