ইতিহাস

যেভাবে খেলার সাথে রাজনীতি মিশিয়েছিলো পাকিস্তান!

neon aloy আবদুল লতিফ নিয়ন আলোয়

স্বাধীনতার পূর্বে যে কয়েকজন ক্রিকেটার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন তাদের ভেতর প্রায় সবার ব্যাপারেই কম বেশি আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু তাদের ভেতর টেস্ট ক্রিকেট খেলার সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছিলেন রকিবুল হাসান, তবে আরো একজন ক্রিকেটার সেই সময় পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলতে পারেন বলে গুঞ্জন উঠেছিলো। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো ফর্মে থেকেও বঞ্চিত হন তিনি। তিনি আবদুল লতিফ

সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান দলে স্থানীয় বাঙালি খেলোয়াড় ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। বেশিরভাগই পশ্চিম পাকিস্তানী। স্থানীয় খেলোয়াড়দের ভেতর দূর্দান্ত একজন অলরাউন্ডার ছিলেন আবদুল লতিফ। মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান, লেগ স্পিনার এবং স্লিপ ফিল্ডার হিসেবে দ্রুতই নজর কাড়েন লতিফ।

লতিফের অভিষেক ১৯৫৬-৫৭ মৌসুমে, ইস্ট পাকিস্তান সবুজ দলের হয়ে। প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে শুরুটা ভালো ছিলোনা। প্রথম পাঁচ ম্যাচে মাত্র ৬৬ রান এবং ২ উইকেট।

পাকিস্তানের প্রথম শ্রেনীর টুর্নামেন্ট কায়েদ-এ-আজম ট্রফিতে ইস্ট পাকিস্তানের রেকর্ড খুব খারাপ তখন, ১৯৫৫ সাল থেকে অংশ নিয়ে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত কোন জয়ের দেখা পায়নি। ১৯৬১-৬২ মৌসুমে প্রথমবারের মতো বাঙালি অধিনায়ক পায় দলটি, আবদুল লতিফ হন অধিনায়ক। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী দল পশ্চিম পাকিস্তানের হায়াদ্রাবাদ। অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ইস্ট পাকিস্তানকে প্রথম জয় এনেদেন লতিফ। নিজে হন ম্যাচ সেরা। ব্যাট হাতে দুই ইনিংসে করেন ১০৯ এবং ৪৯ রান, লেগস্পিনে তুলে নেন ৬ উইকেট (৪৯/৩ এবং ১১২/৩)।

দূর্দান্ত এই ম্যাচের পর লতিফ সম্মিলিত একাদশ (দুই পাকিস্তান মিলিয়ে) দলের হয়ে এমসিসি দলের বিপক্ষে মাঠে নামেন ভাওয়ালপুরে। ১৯৬২ সালে একটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া একাদশের বিপক্ষে মাঠে নামে ইস্ট পাকিস্তান গভর্নর একাদশ, নামে ইস্ট পাকিস্তান হলেও ওই ম্যাচে একমাত্র স্থানীয় বাঙালি খেলোয়াড় ছিলেন আবদুল লতিফ।

১৯৬৩ সালে লতিফ পাকিস্তান একাদশে সুযোগ পান সফররত কমনওয়েলথ একাদশের বিপক্ষে। এই দলেও তিনি একমাত্র বাঙালি ক্রিকেটার ছিলেন এবং দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৮১ রান করেন। ১৯৬৪ সালের আইয়ুব ট্রফিতে ঢাকার অধিনায়ক হিসেবে রাজশাহীর বিপক্ষে মাঠে নামেন। লতিফের ১৫৫* রানে ভর করে জয় পায় ঢাকা। রাজশাহীর অর্ধেক খোলায়াড় পশ্চিম পাকিস্তানের ছিলো।

১৯৬৬-৬৭ সালে শ্রীলংকা পাকিস্তান সফরে আসলে লতিফ প্রেসিডেন্ট একাদশের হয়ে একটি তিন দিনের ম্যাচে শ্রীলংকার (তৎকালীন সিলন) বিপক্ষে সুযোগ পান। শেষ দিনে পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট একাদশ পরাজয়ের আশংকায় পড়লে লতিফের ৪২ রানে ভর করে পরাজয় এড়ায়। পরে পাকিস্তানের হয়ে আনঅফিসিয়াল ওয়ানডেতে সুযোগ পান এবং ২১ রান করেন, বোলিং পাননি। পাকিস্তান দলে ইস্ট পাকিস্তানের একমাত্র বাঙালি ক্রিকেটার ছিলেন লতিফ। প্রেসিডেন্ট একাদশের হয়ে এমসিসির সাথে ওই বছরই আবার মাঠে নামেন লতিফ এবং প্রেসিডেন্ট একাদশ প্রথম ইনিংসে ১৫৭ রান সংগ্রহ করে যার ভেতর লতিফ একাই অপরাজিত ৭৪ রান করেন। এই ইনিংসে লতিফ কিছু অসাধারন এবং অবিশ্বাস্য শট খেলেন (সূত্র: Wisden 1968, p 895)। এই ম্যাচেই খেলেন পেসার নিয়াজ আহমেদ এবং একটি মাত্র উইকেট লাভ করেন।

নিয়ন আলোয়

পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট দল (১৯৬৯)

১৯৬৬-৬৭ সালে দূর্দান্ত পারফর্মেন্স করায় জাতীয় দলের সুযোগ আসতে পারে এমন কথা উঠলেও তার জায়গায় পাকিস্তান দলে সুযোগ পান নিয়াজ আহমেদ।

১৯৬৮ সালের পর রাজনৈতিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে আবদুল লতিফ কেবলমাত্র ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেছেন, পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করে এমন কোন দলে সুযোগ পাননি। যদিও এই সময়েই তার সেরা সময়টা আসে। ইস্ট পাকিস্তান সবুজ দলের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানে জয়ী ম্যাচে বল হাতে প্রথম ইনিংসে ১৯ রানে ৭ উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৪০ রানে ৫ উইকেট নেন। এর কয়েকদিন পরেই পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে দলের বিপক্ষে আবারো ১৯ রানে ৭ এবং ১৯ রানে ৫ উইকেট নেন, ব্যাট হাতে একমাত্র ইনিংসে ৫০ রান করেন। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী দল ছিলো কারন সেই সময় রেলওয়েতে খেলোয়াড় কোটায় অসংখ্য পশ্চিম পাকিস্তানি ক্রিকেটার খেলতেন যাদের পোস্টিং পূর্ব পাকিস্তানে ছিলো।

ওই দুই ম্যাচে লতিফ ৯৭ রানের বিনিময়ে ২৪ উইকেট লাভ করেন যার ১৮ টি ছিলো ক্লিন বোল্ড। অর্থাৎ ব্যাটসম্যানরা লতিফের লেগ স্পিন বুঝতেই পারেননি!

১৯৬৯ সালে হায়াদ্রাবাদের সাথে আবার জয়লাভ করে পূর্ব পাকিস্তান, লতিফ ব্যাট হাতে ১৪৩ এবং ৪২ রান করেন, বল হাতে নেন দুই উইকেট।

১৯৬৯ সালের পর থেকেই দেশের অবস্থা দ্রুত বদলাতে থাকে। ভারসাম্য রাখার জন্যে পাকিস্তান সরকার জাতীয় দলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্লেয়ার রাখবে এরকমই একটা কথা ছড়িয়ে পড়ে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের সবাই ধারনা করেছিলেন অল রাউন্ডার হিসেবে লতিফই দলে সুযোগ পাবেন। কারন লতিফ ছিলেন বাঙালি।

কিন্তু সবাইকে অবাক করে পাকিস্তানের টেস্ট দলে আবারো সুযোগ পান নিয়াজ আহমেদ, একজন পেসার। নিয়াজ আহমেদ, ইতিহাস বলবে একমাত্র ইস্ট পাকিস্তানি ক্রিকেটার যিনি ক্রিকেট খেলেছেন। কিন্তু তিনি বাঙালি নন, বিহারী ছিলেন। তার জন্ম ভারতের বেনারসে, দেশভাগের পর তারা পূর্ব পাকিস্তানে আসলেও ১৯৭২ সালে আবার পাকিস্তানে ফিরে যান। এমনকি তিনি আহামরি পারফর্ম না করেও বিভাগীয় কোটায় প্রথমে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট আর পরে রেলওয়েতে খেলা এবং চাকরির সুযোগ পান। লতিফের প্রথম শ্রেনীর অভিষেক ১৯৫৬ সালে আর নিয়াজের ১৯৬৬ সালে। প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে মাত্র পাঁচ ম্যাচ খেলেই সুযোগ পান পাকিস্তান জাতীয় দলে। ওই পাঁচ ম্যাচে নিয়েছিলেন সাত উইকেট মাত্র! যেখানে ১৯৬৭ সাল জুড়েই লতিফ ভালো ফর্মে ছিলেন সেখানে লতিফকে বাদ দিয়ে নিয়াজকে ইংল্যান্ড সফরের জন্য নেয়া হয়। সেখানেই তার টেস্ট অভিষেক হয়। মূলত ‘৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের পরে পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে ঠান্ডা করার জন্য নিয়াজকে দলে নেয়। ১৯৬৭-১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় পাকিস্তান যত ম্যাচ খেলেছে তাতে নিয়াজ ছিলেন। ১৯৬৯ সালে কমনওয়েলথ একাদশের সাথে আন অফিশিয়াল দ্বিতীয় টেস্টে পাকিস্তানের সেরা পেসার আসিফ মাসুদের জায়গায় ঢাকায় নিয়াজকে খেলানো হয় এবং পরের টেস্টেই (করাচী) আবার বাদ পড়েন। পাকিস্তানের বর্তমান বোর্ড প্রধান শাহরিয়ার খান এক লেখায় বলেছেন “ওই সময় ঢাকায় একজন ক্লাব-লেভেলের বোলার ছিলো নিয়াজ আহমেদ নামে, যে একাধিক বছর ধরে পাকিস্তানের দ্বাদশ প্লেয়ার ছিলো, এটার কারন ছিলো পাকিস্তান বোঝাতে চাইছিলো পূর্ব পাকিস্তান খুব কাছাকাছি আছে জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করার, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পাকিস্তান সরকার বা পিসিবি কেউই ঢাকায় ক্রিকেটের জন্য কিছু করেনি”। রাজনৈতিক ইস্যুতে ব্যবহার হওয়া নিয়াজ ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় এবং শেষ টেস্ট খেলেন ঢাকায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ১৯৭২ সালে নিয়াজ পাকিস্তান ফিরে যান, এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের হয়ে আর সুযোগ পাননি। ১৯৬৯-৭০ এই একবছরে ১৪ ম্যাচে মাত্র ১১ উইকেট পান নিয়াজ।

আবদুল লতিফ, ঘরোয়া ক্রিকেটের নিয়মিত পরফর্মার হয়েও অবিচারের শিকার হয়ে ১৯৭০-৭১ মৌসুমে ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের মিলিটারি একাডেমিতে ছিলেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং লেঃ কর্নেল হিসেবে অবসরে যান।

সেনাবাহিনী ছাড়ার পর কিছুদিন বক্সিং খেলেছেন এবং পরে আন্তর্জাতিক বক্সিং রেফারি হন।

আবদুল লতিফ ২০০৩ সালে বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া এবং পাকিস্তান সফরে এবং ২০০৫ সালে ইংল্যান্ড এবং শ্রীলংকা সফরে ম্যানেজার হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে ম্যানেজার হিসেবে পাকিস্তান সফরে যেয়ে অমার্জনীয় এক অপরাধ করেন তিনি, একটি পাকিস্তানি চ্যানেলের সাংবাদিক ইংরেজীতে দূর্বল হওয়ায় তাকে ঊর্দুতে সাক্ষাৎকার দিয়ে দেশে বিদেশে এমনকি ক্রিকেটারদের কাছেও সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে মিডিয়াতে এই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

২০০৭ সালে গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হন।

২০০৮ সালে বিসিবির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

আবদুল লতিফের প্রথম শ্রেনীর ক্যারিয়ারঃ

ম্যাচঃ ৩৬
রানঃ ১৫৯৬
ব্যাটিং গড়ঃ ২৯.৬৭
সেঞ্চুরী/ফিফটিঃ ৩/৬
সেরাঃ ১৫৫*
ব্যাটিং পজিশনঃ মিডিল অর্ডার (৬/৭ নাম্বার)
উইকেটঃ ৪৫
বোলিং গড়ঃ ২২.৮৪
ইনিংসে ৫ উইকেটঃ ৪ বার
ম্যাচে ১০ উইকেটঃ ২ বার
সেরা বোলিং ফিগারঃ ১৯/৭
ক্যাচঃ ২৬ (স্লিপ ফিল্ডার মূলত)

নিয়াজ আহমেদের প্রথম শ্রেনীর ক্যারিয়ারঃ
ম্যাচঃ ৩৯
রানঃ ৪৬৬
ব্যাটিং গড়ঃ ১৪.৫৬
সেঞ্চুরী/ফিফটিঃ ০/৩
সর্বোচ্চঃ ৭১* (ক্যারিয়ারের শেষ মৌসুমে)
উইকেটঃ ৬২
বোলিং গড়ঃ ৩৮.৪৫
ইনিংসে পাঁচ উইকেটঃ ১ বার
ম্যাচে দশ উইকেটঃ নাই
বেস্ট বোলিং ফিগারঃ ৮৬/৫ (ক্যারিয়ারে এই একবারই ৩ উইকেটের বেশি পেয়েছেন, ইংলিশ কন্ডিশনে কেন্টের সাথে প্রস্তুতি ম্যাচে)
ক্যাচঃ ৩১

** প্রথম শ্রেনীর কিছু ম্যাচ পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে খেলেছেন।

এছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় সুযোগ পাওয়া দুই টেস্টে রান করেছেন ১৭ (সর্বোচ্চ ১৬*), উইকেট নিয়েছেন ৩ টি, বেস্ট ফিগার ৭২/২, বোলিং গড় ৩১.৩৩।

আপনাদের সামনে পরিষ্কার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরলাম। এরপরেও আপনারা পাকিস্তনকে সমর্থন করার, কিংবা “আমরা পাকিস্তান আমলেই ভাল ছিলাম” ধরণের কথা বলবেন কিনা সেটা আপনার বিবেচনা!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top