ইতিহাস

আইরিশ রূপকথাঃ ৭০ বছরের নিষেধাজ্ঞা থেকে টেস্ট স্ট্যাটাস (দ্বিতীয় পর্ব)

নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বঃ আইরিশ রূপকথাঃ ৭০ বছরের নিষেধাজ্ঞা থেকে টেস্ট স্ট্যাটাস (প্রথম পর্ব)]

প্রায় ৭০ বছরের নিষেধাজ্ঞা আর সামাজিকভাবে ক্রিকেটকে বিদেশি খেলা আর ক্রিকেটারদের এংলোফাইল বা ইংরেজপন্থী হিসেবে বাঁকা চোখে দেখার কারনে আয়ারল্যান্ডের তরুণেরা ক্রিকেট খেলতেন অনেকটা গোপনে। আয়ারল্যান্ডের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান এড জয়েস এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন ছোটবেলায় তিনি তার ক্রিকেট কিটস লুকিয়ে রাখতেন, অনুশীলন শেষে ট্রেনে করে বাড়ি ফেরার সময় ক্রিকেট ব্যাগ লুকিয়ে রাখতেন যাতে কেউ না দেখে। বাড়ির কাছাকাছি কোথাও অনুশীলন করতেন না। জন মুনি বলেছেন তিনি ক্রিকেট খেলেন সেকথা শুরুর দিকে কাউকে জানাতেন না। “The English thing was a big stigma” , যোগ করেন মুনি। এর থেকে বের হবার সবচেয়ে ভালো উপায় ছিলো ইংল্যান্ডকে হারানো। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়েছে অনেক পরে।

২০০০ সালের পর থেকে আয়ারল্যান্ডের সমাজ ব্যবস্থায় আস্তে আস্তে ক্রিকেট জায়গা করে নেয়। আইরিশ ক্রিকেট বোর্ডের একদম শুরুর দিকের বিনিয়োগ হচ্ছে ওয়েন মরগান, বয়েড রেঙ্কিন, উইলিয়াম পোর্টারফিল্ডরা। এদের পেছনে ১৩ বছর থেকে বিনিয়োগ শুরু করে বোর্ড। এই ব্যাচের কয়েকজন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে অংশ নেয় ২০০৪ সালে।

২০০৪ সালে বৈবাহিক সূত্রে আইরিশ পাসপোর্ট লাভ করেন অস্ট্রেলিয়ার ট্রেন্ট জন্সটন। যিনি অস্ট্রেলিয়ায় নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে খেলতেন। অভিষেক ম্যাচে তিনি ব্রেট লির সাথে বোলিং ওপেন করেন ‘৯৯ সালে। ছিলেন স্টিভ ওয়াহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আয়ারল্যান্ডের পরিবর্তনের শুরু এই জন্সটনের হাত ধরেই, তাকে অধিনায়ক করার পর।

২০০৫ সালে আইসিসি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে কেনিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জেতে আয়ারল্যান্ড। এটাই আইরিশ ক্রিকেটের প্রথম বড় সাফল্য। ২০০৫ সালের আইসিসি ট্রফির ফাইনালিস্ট হবার সুবাদে লাভ করে ওয়ানডে স্ট্যাটাস এবং ২০০৭ বিশ্বকাপের টিকেট।

২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে অভিষেক হয় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। স্টরমন্টের সেই ম্যাচে সাড়ে সাত হাজার দর্শক ছিলো। একসময় যেখানে ক্রিকেট নিষিদ্ধ ছিলো। নিজেদের প্রথম ম্যাচে আয়ারল্যান্ড ভালো লড়াই করে, ইংল্যান্ডের ৩০১ রানের জবাবে আয়ারল্যান্ড ২৬৩ রান করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে। নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচেই ওয়েন মরগানের ৯৯ রানে ভর করে স্কটল্যান্ডকে হারায় আয়ারল্যান্ড।

আয়ারল্যান্ড চমকে দেয় ২০০৭ বিশ্বকাপে। নিজেদের প্রথম ম্যাচেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ টাই করে। বিশ্বকাপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচেই হারিয়ে দেয় পাকিস্তানকে। বয়েড রেঙ্কিনের বোলিং তোপে (৩২/৩) পাকিস্তান গুটিয়ে যায় ১৩২ রানে জবাবে নেইল ও’ব্রেইন এর ৭২ রানে ভর করে তিন উইকেটে হারায় সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে। সুপার এইটে চলে যায় আয়ারল্যান্ড। সুপার এইটে বাংলাদেশের বিপক্ষে পায় ৭৪ রানের বড় জয়।

বিশ্বকাপের পর থেকেই আয়ারল্যান্ড টেস্ট স্ট্যাটাসের জন্য পরিকল্পনা শুরু করে। প্রথম পদক্ষেপ ছিলো আয়ারল্যান্ডে ক্রিকেট জনপ্রিয় করে তোলা। সেজন্য ভারত-সাউথ আফ্রিকার তিন ম্যাচের সিরিজ আয়োজন করা হয় বেলফাস্টে। সিরিজের আগে দুই দলই আয়ারল্যান্ডের সাথে একটা করে ম্যাচ খেলে। এই সিরিজের পরেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেদারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড আর আয়ারল্যান্ড চার জাতি সিরিজ খেলে (এটাই সম্ভবত সর্বশেষ চার জাতি সিরিজ এখন পর্যন্ত!)। টুর্নামেন্টে আয়ারল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুই দলই দুটি করে জয় পায়, ফাইনাল আবহাওয়াজনিত কারনে বাতিল হয়।

২০০৮ সালে বাংলাদেশ সফরে আসে আয়ারল্যান্ড। সিরিজের তিন ম্যাচেই হারে আইরিশরা। পরের বছরই আয়ারল্যান্ড ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে যখন ওয়েন মরগ্যান ইংল্যান্ডে খেলার জন্য আয়ারল্যান্ড ছাড়েন। আইরিশরা এটা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। কারন মরগ্যান ছিলো আয়ারল্যান্ডের প্রথম পেশাদার ক্রিকেটারদের একজন যার পেছনে বোর্ড ১৩ বছর থেকে অর্থ ঢেলেছিলো, পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে স্টাইলিশ এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়। “আইরিশম্যান ইংল্যান্ডের হয়ে ক্রিকেট খেলবে এটা সাধারন মানুষকে বোঝানো অনেক কঠিন”, বলেছিলেন আয়ারল্যান্ডের অনূর্ধ্ব ১৯ দলে মরগ্যানের কোচ ও’ব্রুক। “আমি আর কখনোই এমন কাউকে পরিচর্যা করতে চাইনা যে তার সেরাটা ইংল্যান্ডকে দিবে”।

মরগান মাত্র ২৩ ম্যাচ খেলেই ৭৪৪ রান করে এখনো সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় সেরা দশে আয়ারল্যান্ডের হয়ে। মরগান ছাড়াই ২০০৯ সালের টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপে মাঠে নামে এবং প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশকে হারিয়ে পরের রাউন্ডে চলে যায়।

আয়ারল্যান্ড ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মুহুর্ত আসে ২০১১ বিশ্বকাপে, যেদিন তারা ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে। এংলোফাইল, ওয়েস্ট ব্রিট বা ব্রিটিশপন্থী পরিচয় থেকে বের হয়ে আসার জন্য আইরিশ প্লেয়ারদের এইজয়টা দরকার ছিলো। “I don’t care if we never win another f***in’ match in our lives as long as we beat these bastards”, জন মুনি এই কথাটাই বলেছিলেন ড্রেসিং রুমে যখন কেভিন ও’ব্রেইন বিশ্বকাপের দ্রুততম সেঞ্চুরী করেন। ইংল্যান্ডের ৩২৭ রানের জবাবে ও’ব্রেইনের ১১৩ (৬৩) রানের জবাবে তিন উইকেটের রেকর্ড ভাঙা জয় তুলে নেয় আয়ারল্যান্ড।

আয়ারল্যান্ডের জন্য এই জয়টাই দরকার ছিলো। একসময় যেই সমাজে ক্রিকেট ছিলো গোপনীয় বিষয়, লুকিয়ে রাখার বিষয়, সেই আয়ারল্যান্ডের সব পত্রিকার শিরোনাম পরের দিন ক্রিকেট দখল করে নেয়। সকল টিভি চ্যানেলে ক্রিকেট! একশো বছরের বেশি সময় ধরে চলা সামাজিক অবজ্ঞা কাটিয়ে ক্রিকেট এক রাতের ব্যবধানে আয়ারল্যান্ডের আলোচনার বিষয়!

বলাহয়, জিম্বাবুয়ে একটি মাত্র ম্যাচ জিতে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছিলো (১৯৮৩ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সাথে), বাংলাদেশ একটি মাত্র ম্যাচ জিতে (১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সাথে) একইভাবে ইংল্যান্ডের সাথে জেতার পর আয়ারল্যান্ড চেয়েছিলো টেস্ট স্ট্যাটাস। কিন্তু সেটা হয়নি। অনেকে বলেন ইংল্যান্ডের অনীহা ছিলো। কারন আয়ারল্যান্ডের থেকে টেস্ট খেলার আশায় প্রতিবছর অনেক ক্রিকেটার কাউন্টি ক্রিকেটে স্থায়ী হন। আবার আয়ারল্যান্ড টেস্ট স্ট্যাটাস পেলে ইংল্যান্ড থেকেও অনেকে আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমাতে পারে সেই চিন্তায়, বিশেষকরে যারা টেস্ট দলের কাছাকাছি থেকেও সুযোগ পায়না প্রতিযোগীতার কারনে। আবার এটাও ঠিক আগে কোন নির্ধারিত নিয়ম ছিলোনা, এখন আছে। আয়ারল্যান্ড তাই নির্ধারিত শর্ত পূরন করা শুরু করে।

শর্ত অনুযায়ী আয়ারল্যান্ড চারটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট গ্রাউন্ড বানিয়েছে। ২০১৩ সালে চালু করে চারদিনের ম্যাচ। বর্তমানে পঞ্চাশটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্রিকেট শেখানো হয়। করা হয়েছে আয়ারল্যান্ড উলফস (এ দল), বয়স ভিত্তিক দল এবং নারী দল।

এই সময়ে আয়ারল্যান্ডের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিলো কাউন্টি ক্রিকেটে প্লেয়ারদের স্থায়ী হওয়া বন্ধ করা। ভালো এবং মেধাবী প্লেয়াররা পাড়ি জমাচ্ছিলো ইংল্যান্ডে। আয়ারল্যান্ড ঘোষনা করেছিলো ২০২০ সালের ভেতর টেস্ট স্ট্যাটাস পেতে চায় তারা, ঘোষনা এসেছিলো ২০১২ সালে। আট বছরে টেস্ট স্ট্যাটাস পায় নাকি পায়না এই দোদুল্যমান অবস্থায় না থেকে তরুন অনেকেই বয়স থাকতে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। আর একই সাথে ট্রেন্ট জন্সটন, জন মুনি, আন্দ্রে বোথাদের অবসর আয়ারল্যান্ডকে প্রাথমিকভাবে সংকটে ফেলে দেয়। এর সাথে যোগ হয় বয়েড রেঙ্কিনের ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত। তবে এইসব কিছুর ভেতর আশার আলো হয়েছিলো এড জয়েসের আয়ারল্যান্ডের হয়ে ফিরে আসা। এড জয়েস সেই সময় বড় তারকা, প্রতিষ্ঠিত নাম, দেশের টানে তার ফিরে আসার উদ্দেশ্য ছিলো তাকে দেখে যদি তরুণরা আয়ারল্যান্ডে ক্লাব ক্রিকেট খেলতে উৎসাহ পায়!

২০১৩ সালে আয়ারল্যান্ড মালাহাইডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডে ম্যাচ খেলে প্রায় দশ হাজার দর্শকের সামনে। ওই ম্যাচে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ছিলো ওয়েন মরগান, প্রথমবারের মতো নিজ দেশের বিপক্ষে অধিনায়কত্ব করেন মরগান। আয়ারল্যান্ড প্রথমে ব্যাট করে উইলিয়াম পোর্টারফিল্ডের সেঞ্চুরীতে (১১২) সাত উইকেট হারিয়ে ২৬৯ রান করে। ইংল্যান্ডের হয়ে বয়েড রেঙ্কিন সর্বোচ্চ উইকেট নেন (৪৬/৪), জবাবে ইংল্যান্ড ৪৮/৪ হয়ে যাবার পর ওয়েন মরগান ১২৪* এবং রবি বোপারা ১০১* রান করে ম্যাচ জেতান ইংল্যান্ডকে। এই ম্যাচ নিয়ে বলা হয় শুধু ইংল্যান্ড নয় এখানে আইরিশ ক্রিকেট জিতেছে। ম্যাচের সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা বোলার দুইজনই যে আইরিশ! এই ম্যাচের দিন মালাহাইডে একটা পোস্টার লাগানো হয়, যাতে লেখা ছিলো, “We don’t want our best players playing for England, Irish cricket deserves better.”

২০১৩ সালে দুই ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে আয়ারল্যান্ড যায় পাকিস্তান দল। প্রথম ম্যাচ টাই হয়, পাকিস্তান ২৬৬/৫, আয়ারল্যান্ড ২৭৫/৫ (টার্গেট ৪৭ ওভারে ২৭৬ ছিলো ডি/এল মেথডে)। দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানকে প্রায় হারিয়েই দিয়েছিলো আইরিশরা! আয়ারল্যান্ড এড জয়েসের সেঞ্চুরীতে (১১৬) সংগ্রহ করে ২২৯/৯ রান, জবাবে পাকিস্তান ১৩৩/৭ রানে পরিনত হয় একসময়! শেষ পর্যন্ত কামরান আকমলের ৮১* এবং ওয়াহাব রিয়াজের ৪৭ রানে দুই উইকেটে জিতে মান বাঁচায় পাকিস্তান।

ইংল্যান্ডে সফরে আসা দলগুলা নিয়মিত আয়ারল্যান্ড সফর শুরু করে। যেমন শ্রীলংকা ২০১৪ সাল এবং ২০১৬ সাল, পাকিস্তান ২০১৩ এবং ২০১৬ সালে। আয়ারল্যান্ড ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে আবার সাড়া ফেলে দেয়, যদিও তখন আর সেটি অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। প্রথম ম্যাচে হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে (ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩০৪/৭, আয়ারল্যান্ড ৩০৭/৬), দ্বিতীয় ম্যাচে হারায় আরব আমিরাতকে। এরপর হারায় জিম্বাবুয়েকে (আয়ারল্যান্ড ৩৩১/৮, জিম্বাবুয়ে ৩২৬)। ইংল্যান্ডের চেয়ে এক ম্যাচ বেশি জেতায় তাদের মিডিয়া নাম দেয় “ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন”। বিশ্বকাপ শেষে আইসিসি টুইটারে আয়ারল্যান্ডের বিশ্বকাপকে “memorable and inspiring” বলে টুইট করলে উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড আইসিসিকে ট্যাগ করে লেখেন “So memorable and inspiring that you have decided to cut the next WC to 10 teams. What is your vision for the game of cricket?”

২০১৫ বিশ্বকাপের পরেই আয়ারল্যান্ড সিদ্ধান্ত নেয় তারা নিয়মিত টেস্ট দল গুলার সাথে খেলবে। আয়ারল্যান্ড ২০১১-১৫ পর্যন্ত টেস্ট প্লেয়িং দেশগুলার সাথে মাত্র নয়টি ম্যাচ খেলে। আইরিশরা তাই উদ্যোগ নেয় আইসিসি নয় তারা নিজেরাই বড় দলগুলার সাথে খেলার উদ্যোগ নেয়। টার্গেট করে দেড় বছরের ভেতর জিম্বাবুয়ে ছাড়া বাকি সব দলের সাথে খেলার। ভারত ছাড়া সবার সাথেই আয়ারল্যান্ড খেলেছে, বাকি ছিলো নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মে মাসে ট্রাই নেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ডের সাথে খেলেছে, সেপ্টেম্বর মাসে খেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে। এই সময়ের ভেতর আফগানিস্তানের সাথে আয়ারল্যান্ড তাদের ইতিহাসের প্রথম পাঁচ ম্যাচের সিরিজ খেলে জুলাই ২০১৬ সালে (২-২ সিরিজ ড্র)। সাউথ আফ্রিকা গিয়ে একটা করে ম্যাচ খেলে সাউথ আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে সেপ্টেম্বর মাসে।

২০১৬ সালের শেষ দিকে আয়ারল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেট প্রথম শ্রেনীর মর্যাদা লাভ করে (টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার প্রথম শর্ত)। তখনই বোঝা যাচ্ছিলো আয়ারল্যান্ড টেস্ট স্ট্যাটাসের কাছাকাছি। মার্চ মাসে আর্থিক মডেল প্রস্তাবনায় আয়ারল্যান্ডের জন্য ৫৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ এবং প্রস্তাবিত ৯-৩ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের ঘোষনা করার পর নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো আয়ারল্যান্ড এবং আফগানিস্তান টেস্ট স্ট্যাটাস পাবে। অবশেষে, এলো সেই ঐতিহাসিক মুহুর্ত, ২২ জুন ২০১৭, আয়ারল্যান্ড সর্বসম্মতিক্রমে টেস্ট স্ট্যাটাস লাভ করে। যে দেশে ক্রিকেট খেলাটাই নিষিদ্ধ ছিলো তারাই এখন ক্রিকেটের অভিজাত পরিবারের সদস্য। আয়ারল্যান্ড টেস্ট স্ট্যাটাসের পাশাপাশি ১৩ দলের ওয়ানডে লীগের সদস্য হওয়ার ফলে এখন থেকে নিয়মিত বড় দলের সাথে ওয়ানডে খেলতে পারবে, বেড়েছে আইসিসির থেকে প্রাপ্ত অর্থ এবং পেয়েছে ভোট দেয়ার ক্ষমতা। ব্রডকাস্টিং এবং স্পন্সরশীপ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে করতে পারবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। বাড়বে ক্রিকেটারদের বেতন, কমবে কাউন্টি নির্ভরতা। উঠে আসবে তরুন খেলোয়াড়।

আয়ারল্যান্ড গত মে মাসে প্রথমবার ইংল্যান্ড সফর করে। প্রথম ম্যাচের দিন একসাথে টস করতে নামেন একসময় একদলে খেলা দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, মরগান এবং পোর্টারফিল্ড। দুই দলের স্কোয়াড মিলিয়ে ১৪ জন আইরিশ প্লেয়ার ছিলো দুই অধিনায়কসহ, বিপরীতে ১৩ জন ছিলো জন্মগতভাবে ইংলিশ! যদিও আয়ারল্যান্ড বর্তমান সময়ে কিছুটা পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তবে আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল।

অনূর্ধ্ব ১৯ দল থেকে নতুন একটা ব্যাচ উঠে এসেছে, যারা এইবার হয়তো আর ইংল্যান্ডে পাড়ি জমাবেনা, আয়ারল্যান্ডের হয়েই সাদা পোশাকে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখবে। ফিরে এসেছে বয়েড রেঙ্কিনের মতো অভিজ্ঞ প্লেয়ার। পল স্টার্লিং, জস লিটিল, লরকান টাকারদের মত প্রতিভাবান কিছু প্লেয়ার আছে দলে। “People now have a pathway in Ireland. Anyone with vision, passion and drive will remain here”, বলেছেন আয়ারল্যান্ড ক্রিকেটের চিফ এক্সিকিউটিভ।

আয়ারল্যান্ডের এখন প্রধান কাজ আয়ারল্যান্ডে ক্রিকেটকে প্রথম সারির খেলায় পরিনত করা। আর এজন্য তারা রোল মডেল হিসেবে নিয়েছে নিউজিল্যান্ডকে। আয়তন, জনসংখ্যা, কন্ডিশনের দিক থেকে তারা নিউজিল্যান্ডের মতোই। নিউজিল্যান্ডেও ক্রিকেট প্রধান খেলা না কিন্তু তারা ক্রিকেটে উন্নতি করেছে। এরই ভেতর তারা মে মাসের ট্রাই নেশন সিরিজে নিউজল্যান্ডের মতোই সবুজ উইকেট বানিয়েছিলো।

আয়ারল্যান্ডের এই উত্থান অনেকটা আইরিশ রূপকথার মতোই। আয়ারল্যান্ডকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে স্কটল্যান্ড, তারাও আগামী পাঁচ বছরের ভেতর টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির টার্গেট নিয়েছে। একটা সময় ইংল্যান্ডের এইসব বিষয়ে আগ্রহ ছিলোনা, কিন্তু আফগানিস্তানকে নিয়ে এশিয়ার পাঁচটা দেশ পূর্ন সদস্য হাওয়ায় আইসিসির সভাগুলায় এশিয়ার আধিপত্য বেড়ে যাওয়ার ফলে ইংল্যান্ড চাইছে ইউরোপের আরো দেশ উঠে আসুক। ফলে ভবিষ্যতে স্কটল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ড যেকোন বিষয়ে ইংল্যান্ডের সাপোর্ট পাবে বলেই ধারনা করা যায়।

আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেট কখনোই থেমে থাকেনি, যখন নিষিদ্ধ ছিলো তখনো না। আর এখন যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার সম্মান পেয়েছে তখন নিশ্চিত আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেট দ্রুতই সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। ক্রিকেটের সত্যিকারের ফ্যানরা নিশ্চয়ই সেটা চায় কারন ক্রিকেটের বিশ্বায়নে সেটা খুবই দরকার!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top