বিশেষ

একজন সস্তা বাজারী লেখকের প্রতি আমার যত অভিযোগ…

neon aloy হুমায়ুন আহমেদ নিয়ন আলোয়

লোকটার সাথে প্রথম পরিচয় ১৯৯৫ সালে, যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি। ছোটবেলায় পড়তে শিখার পর থেকেই আম্মা লক্ষ্য করেছিলেন, আমি রাত ৯টায় বিটিভি’র নাটকের শেষে যে ক্রেডিট যেতো, সেটাও পড়ে ফেলছি লেখাগুলো দ্রুত স্ক্রল করার আগেই! কম বয়সেই পুত্রের মাঝে একজন উঠতি পাঠকের ছায়া দেখে আম্মা ক’দিন পরেই হাতে একটা বই ধরিয়ে দিলেন, নাম “নীল হাতি”। বইটি ছিল কয়েকটি ছোটগল্প নিয়ে। আর বইয়ের নাম দেখে স্বাভাবিকভাবেই শিশুমনে আগ্রহ জাগলো- হাতি আবার নীল হয় নাকি?! সূচীপত্র দেখে তাই সেই গল্পটি-ই পড়া শুরু করলাম। সেই শিশু বয়সে আমার মতই একটা ছেলের সবচেয়ে পছন্দের খেলনাটি হারিয়ে যাওয়া, আবার ফিরে পাওয়ার গল্পটি যে মনে সারাজীবনের জন্য ছাপ ফেলে গিয়েছিল- তা বলাই বাহুল্য। এভাবেই আমার বই পড়ার হাতেখড়ি, তাও একজন বাজারী লেখক, একজন হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে। আর সেখানেই জীবনে ধংসের সূত্রপাত।

অবশ্য বই-টই পড়ার এই আগ্রহটা পারিবারিকভাবেই পাওয়া বলা যায়। মা-বাবা-খালা-মামারা সবাই ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বইপোকা। একমাত্র মামা যিনি, তিনি তো সবার চেয়ে আরেক কাঠি সরেস! বলা ভাল, আমাদের মামা আমাদের সব ভাইবোনদের কাছে সুপারম্যানের চেয়ে কম কিছু না। আমাদের জানামতে, তিনি হেলিকপ্টার-প্লেন-রকেট চালানো আর চাঁদে যাওয়া ছাড়া মানুষের পক্ষে সম্ভব আর সব কাজই করে ফেলেছেন। তো, এই মামা-খালাদের ছিল বিশাল এক বইয়ের সংগ্রহশালা। “নীল হাতি” পড়া শেষ করে যখন আম্মার কাছে নতুন বইয়ের আবদার করলাম, আম্মা বললেন “তোমার মামার অনেক বই আছে, ওখান থেকে নিজের পছন্দমত একটা খুঁজে পড়া শুরু করো”।

মামার সেই বুকশেলফ ছিল আমাদের জন্য সোনার খনি। শুধু সোনার খনি না, সাথে আলীবাবার চল্লিশ চোরের গুপ্তধনের ভান্ডারও! কারণ, শুধু যে মামার সংগ্রহের বইগুলো সেই শেলফে ছিল, তা-না। সাথে আম্মা আর খালাদের যত বই, সেগুলোও বলা যায় খালাদের কাছ থেকে একরকম চুরি-ডাকাতি করেই লুটের মালের পাহাড় গড়েছিলেন মামা! অবশ্য এই লুটের রাজত্ব বেশিদিন টিকাতে পারেননি তিনি। আমরা ভাগ্নে-ভাগ্নিরা পড়তে শিখার পর সেই লুটের সম্পদ ডাবল লুট করে নিজেদের শোকেস আর ড্রয়ারগুলো সমৃদ্ধ করেছি। কেননা, ছোটবেলা থেকে খেলনাগাড়ির জন্য যে আবদার ছিল বাবা-মা’র প্রতি, সেটা সুকৌশলে তারা ডাইভার্ট করে দিয়েছেন বইয়ের প্রতি।

ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে ফেলার জন্য দুঃখিত। ফিরে আসি সেই সস্তা বাজারী লেখকের কথায়। আমাদের বাসায় যে বইয়ের ভান্ডার ছিলো (বেশিরভাগই বাবা-মা’র সংগ্রহ করা, বাকিগুলো মামার শেলফ থেকে চুরি করা), তার বেশিরভাগই ছিলো বাজারী লেখক হুমায়ূন আহমেদের বই। নিঃসন্দেহে আমার বাবা-মা বেশ নিম্নরুচীর মানুষ। নাহলে তাঁরা যেই শেলফে সমরেশ মজুমদার, হুমায়ূন আজাদের বই রাখেন; মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এক নাম্বার সেক্টর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম আর স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের চরমপত্রের এম আর আখতার মুকুলের বই রাখেন, সেই একই বুকশেলফে এরকম সস্তাদরের হুমায়ূন আহমেদের বই কেন রাখবেন? আমার পাঠাভ্যাস এবং রুচী নিচে নামানোর জন্য তাই আমার মা-বাবা’ই দায়ী। এবং এ দাবী আরো জোরদার করা যায়, যখন আমি দেখি বাসার মুরুব্বীদের সামনেই আমি বড়দের প্রেমের উপন্যাস পড়ছি, কিন্তু কেউ তেড়ে এসে শাসন কর যাচ্ছে না! কি দায়িত্বজ্ঞানহীন বাবা-মা আমার!

এবার যাই আরো পিছনের কথায়। তখনো পড়াশুনা শুরু করিনি, বয়স তিন কি চার হবে। বিটিভি তখন ছিলো বাংলাদেশের একমাত্র বিনোদন মাধ্যম। সেই চ্যানেলেই প্রচারিত হয়েছিল একটি নাটক- “কোথাও কেউ নেই”। সেই বয়সে প্রেম-ভালবাসা বুঝতাম না, কিন্তু এটা মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো যে কালো সানগ্লাস চোখে, ব্যাকব্রাশ করা চুলে হাতে চেইন ঘুরানোটাই স্মার্টনেস! আর সে কি আবেগ মানুষজনের সেই নাটক নিয়ে! নাটক শুরু হওয়ার পর পাড়ার অলি-গলিতে যেগুলোতেই চায়ের দোকানে ক্যাসেট প্লেয়ার ছিলো, সবগুলোতে দিনরাত বাজা শুরু করলো “হাওয়া মে উড়তা যায়ে…” গানটা। এভাবেই তো বিদেশী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ শুরু হলো বাংলাদেশে, তাই না? এখানেই কি শেষ? নাটক দেখে কোথায় মানুষ বিনোদন নিবে, তা না। বাকের ভাইয়ের কেন ফাঁসীর রায় হলো- এই ইস্যুতে মিছিল পর্যন্ত নেমে গেল ঢাকার রাস্তায়! নাটকের লেখক হুমায়ূন আহমেদ নাকি সে সময় বেশ ক’দিনের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন নিজ বাসগৃহে। কলমের খোঁচায় বাকের ভাইকে ফাঁসীতে ঝুলানোর পিছনে তিনি দায়ী- এ কথা জানলে হয়তো রাস্তায় গণধোলাইও খেতে পারতেন। অবশ্য এরকম বাজারী লেখক সস্তা সব বই আর নাটক লিখে গণধোলাই খাওয়াটাই তো উচিৎ!

এবার ফিরে যাই আরো পিছনে। তখনো এসব কিছু বুঝি না। কিন্তু পরে জেনেছি, এই লোক নাকি বিশাল রাষ্ট্রদ্রোহীও ছিলেন একসময়। যে সময়টায় বাংলাদেশে চলছিলো ঘোর রাজনৈতিক সেন্সরশিপ। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, রাজাকার- এসব শব্দ উচ্চারণ করা যখন নিষিদ্ধ ছিলো গণমাধ্যমে। একাত্তরের প্রচন্ড সংগ্রাম, আর সে সংগ্রামে বেঈমান রাজাকারদের কীর্তিকলাপ যখন ভুলতে বসেছিলো এদেশের মানুষ, তখন এইদেশের সরকারী টেলিভিশন চ্যানেলেই এই বাজারী লেখক তোতাপাখির মুখে উচ্চারণ করিয়েছিলেন “তুই রাজাকার!” নিশ্চয়ই তিনি বিদেশী কোন অপশক্তির টাকা খেয়ে এই নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন, নাহলে শান্ত-সৌম্য-সমাহিত স্বৈরশাসনের যুগে কে চাবে দেশকে অস্থিতিশীল করতে? আর একটা মানুষ বিনোদনের সাথে কেন রাজনীতি মিশাবে? দেশ তো বেশ সুন্দর অতীতের তিক্ত স্মৃতি ভুলে রাজাকারদের সাথে হাত হাত রেখে সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো! অবশ্য বাজারী লেখকরা টাকার লোভে কত কী-ই তো করতে পারেন, তাই না?

আবার ফেরত আসি ১৯৯৫ সালের বিটিভি’তে, যখন আমি হুমায়ূন আহমেদকে নতুন-নতুন চিনেছি। একটা নাটক শুরু হলো বিটিভি’তে- “আজ রবিবার”। এক পাগলাটে পরিবারের পাগল সব মানুষজনের অদ্ভুত সব কাজকর্ম নিয়ে সে গল্প। ২০০০ সালের পরে জন্ম নেওয়া কিংবা কাছে আসার গল্পের যুগের অনেকেই হয়তো এই নাটকটির সাথে পরিচিত নন, তবে ইদানিংকালের “Aaj Robibar Memes” এর কল্যাণে আস্তে আস্তে পরিচিত হচ্ছেন তিতলি ভাইয়া-কঙ্কা ভাইয়া-আনিস ভাই-বড়চাচা-ফুলী আর মতি’র সাথে। আর আজ রবিবারের সময়কারই আরেকটি নাটক ছিলো “নক্ষত্রের রাত”। অভিনয়ে ছিলেন আবুল হায়াত, জাহিদ হাসান, শমী কায়সার, আব্দুল কাদের, আজিজুল হাকিম প্রমুখ। এগুলো কোন জাতের নাটক ছিলো? দেশ যখন আস্তে আস্তে আধুনিকতার দিকে এগুচ্ছিলো হিন্দি সিনেমায় গোবিন্দ আর রাভিনা ট্যান্ডনের টেনিসের পোষাক পরে গলফ কোর্সে ফুটবল হাতে হ্যান্ডবল খেলার অদ্ভুত কোরিওগ্রাফি’র কিম্ভুত নাচানাচি দেখে, সেসময় এরকম আটপৌরে গেরস্থালি’র সাদামাটা গ্ল্যামারবিহীন সুতী শাড়ি-ফতুয়া-পাঞ্জাবী পরিহিত চরিত্রগুলো পূর্ণিমা রাতে বাসার উঠোন কিংবা ছাদে বসে জোছনাবিলাস করে হাসন রাজার গান গাইতো। কি নিদারুণ সস্তা রোমান্টিসিজম রে বাবা! এসব নাটক বানিয়ে কি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ?

এবার আসি তার কমেডি ধাঁচের নাটকের দিকে। তিনি যে “হাবলঙ্গের বাজারে” কিংবা “প্যাকেজ সংবাদ” নাটকেই যে তিনি কমেডি সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, তা না। “সবুজ সাথী” নাটকে তিনি মফিজ পাগলার কমেডি দিয়েই গ্রামগঞ্জের মানুষের মধ্যে মৌলিক স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তুলতে চেয়েছেন। আরে ভাই, হেলথ সেক্টর কি এত ফেলনা আর ছেলের হাতের মোয়া নাকি যে কমেডি দিয়েই মানুষকে সচেতন করা যাবে? এই বাজারী লোককে নিয়ে আর পারা গেলো না। এই লোক বিনোদনে রাজনীতি মিশায়, স্বাস্থ্যখাতে বিনোদন মিশায়। কি বিপদরে বাবা!

নাটক নাহয় বাদ দিলাম এবারের মত, আসি সিনেমায়। যে লোক আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মত মহান পেশায় নিয়োজিত, তার কি দরকার সিনেমা বানানোর? আর বানাবেনই যখন, শখের বশে এক-দুইটা বানিয়ে শখ মিটান; একেবারে চাকরি ছেড়ে সিনেমা বানানো শুরু করতে হবে তাই বলে? কেন, বাংলাদেশে কি মেধাবী পরিচালকের অভাব পড়েছিলো? কি সুন্দর ময়ূরী-মুনমুন-ড্যানি সিডাকদের নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছিলেন মেধাবী পরিচালকরা। এরমধ্যে হুমায়ূন আহমেদ এসে সুশীলতা ফলালেন দেখেই তো ওদের সিনেমাগুলোকে অশ্লীল-কদর্য-অসুস্থ মনে হতে লাগলো। আর ঢাবি’র সম্মানিত শিক্ষক হয়ে এফডিসি’র মত নোংরা জায়গায় পদচারণা, তাও বড় পর্দায় বড় করে নিজের নাম দেখিয়ে! তারচেয়ে বরং হুমায়ূন আহমেদ যদি এফডিসি’র পাশে কারওয়ানবাজার মাছের আড়তে পাইকারী ব্যবসায় নামতেন, অন্তত কিছু মানুষ কম জানতো! আর সিনেমা বানালে এর মধ্যে দুইটাই বানাতে হবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে? বাংলা সিনেমার সেই অন্ধকার যুগে ওনাকে এত আলোকিত সিনেমা বানাতে কে বলেছিলো? নাকি নিজের বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন বলে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে নিজের বাপের সম্পত্তি ভাবতে শুরু করেছিলেন? অবশ্য সস্তা বাজারী লোক বলেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করে খাওয়া যায়! আর দেশের কত নায়ক-নায়িকা-পরিচালক একশো-দুইশো সিনেমা বানিয়ে ফেললো, তাদের কোন বিকার নেই। আর তিনি হাতেগোনা কয়টা সিনেমা বানিয়ে সে অভিজ্ঞতা নিয়ে বইও লিখে ফেললেন! কি ভয়ানক সস্তা রে ভাই!

নাহ, আর মনেহয় এরকম সারকাজম চালানো যাচ্ছে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি ওনার প্রচন্ড বড় ভক্ত। সেই ছোটবেলা থেকে অভ্যাস ওনার বই পড়ার। প্রতিবছর বার্ষিক পরীক্ষার পর চলে যেতাম বড় খালার বাসায়। আমি আর ভাইয়া শীতকালে লেপের নিচে ঢুকে দুইজন দুইটা বই হাতে নিয়ে পড়া শুরু করতাম। বইগুলোর লেখকও ছিলেন দুই ভাই- হুমায়ূন আহমেদ এবং মুহাম্মদ জাফর ইকবাল! কখনো কখনো হেসে কুটিকুটি হতাম। পাশের রুম থেকে বড়খালু গম্ভীর গলায় ডাক দিতেন সেই হাসি শুনে- “তোমরা এখনো ঘুমাও নাই?”

সারকাজম করে হলেও কিভাবে তাহলে এই লেখককে নিয়ে উল্টাপাল্টা বলি যিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন জোছনার সাথে, ঝুম বৃষ্টির রোমান্টিসিজমের সাথে? যেভাবে তার গল্পে উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারগুলোর কথা, সেগুলো তো আমাদের নিজেদেরই রোজ দিনকার গল্প ছিলো!

হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের সংখ্যা নেহায়েত কম না। তাই সব বই নিয়ে আলোচনা করাও সম্ভব না। তারপরও কিছু বইয়ের কথা সংক্ষেপে না বললেই নয়।

“আসমানীরা তিন বোন”, “তোমাকে”, “রুমালী” গল্পগুলোতে তিনি যেভাবে নারী চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাঁটাছেড়া করেছেন, এখন পর্যন্ত আর কেউ তার ধারেকাছে যেতে পেরেছে বলে আমার মনে হয়নি। কিংবা তার অগণিত গল্পে উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বেকার ছেলেগুলোর কথা, তাদের পরিবারগুলোর কথা। এই যেমন “কবি” কিংবা “অপেক্ষা” গল্প দু’টির কথাই যদি বলি, এত গভীর চিত্র কি আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন? বেশ কিছু মূলধারার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী তিনি লিখেছেন। তবে এর মধ্যে “শূন্য” কিংবা “ওমেগা পয়েন্ট” গল্পগুলো কি একেবারেই অনবদ্য নয়? ইতিহাসভিত্তিক যে উপন্যাসগুলো লিখেছেন- “জোছনা ও জননীর গল্প”, “দেয়াল”; সেগুলোতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে এগুলো ইতিহাসকে আশ্রয় করে লেখা, কিন্তু এগুলোই ইতিহাস নয়। তারপরেও তার লেখনীর জোর এত বেশি ছিল যে পাঠক উপন্যাসে ঢুকে নিজেরাই সেই সময়টাতে উপস্থিত হয়েছেন, সেই সময়টাকে উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন, সেই সময়ের একজন মানুষের মত অসহায় বোধ করেছেন, রাগান্বিত হয়েছেন, শোকে পাথর হয়েছেন, ক্রোধে ফেটে পড়েছেন। এমনকি অনেককেই দেখি এই উপন্যাস দু’টি থেকে ঐতিহাসিক রেফারেন্স নিতে, যেগুলো অনেকসময়ই ভুল হয়। তবে একে কি ইতিহাস-বিকৃতি বলা যায়? না। কারণ লেখক হিসেবে তিনি শুরুতেই শক্তভাবে মানা করেছেন এগুলোকে রেফারেন্স হিসেবে ধরতে। আর এখানেই তার সাফল্য। ব্যাক্তি হুমায়ূনকে ছাপিয়ে গিয়েছেন ঔপন্যাসিক হুমায়ূন। আর এটাই কি একজন গল্পকারের প্রকৃত সার্থকতা নয়?

তার সৃষ্টি করা যে বিশেষ চরিত্রগুলো- হিমু, মিসির আলী কিংবা শুভ্র; এদের মত করেই বা ভেবেছে কে কবে? এই চরিত্রগুলো ঘুরেফিরে আমার কাছে হুমায়ূন আহমেদের নিজেরই আংশিক প্রক্ষেপণ। ভেবে দেখুন, এই তিন চরিত্র মিলিয়েই কি হুমায়ূন আহমেদ নন? শুভ্রর মাঝে আমি তরুণ হুমায়ূনকে খুঁজে পাই, যে কিনা পড়াশোনা করেই দিনের পুরোটা সময় পার করতো। যদিও সে সময়ই তার লেখাগুলো প্রকাশে সূচনা।

মিসির আলীকে আমি দেখি হুমায়ূন আহমেদের বৈজ্ঞানিক এবং যুক্তিবাদী মানসিকতার পরিচায়ক হিসেবে। জগতে যা কিছু ঘটে, তার প্রায় সবই কোন না কোন কার্যকারণেই ঘটে। তবে এর বাইরেও কি রহস্যময় পৃথিবীতে অব্যাখ্যনীয় ঘটনার জন্ম হয় না? সেই অব্যাখ্যনীয়-অকল্পনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে মিসির আলীর মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদ কি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেননি?

সবশেষে আসি হিমু’র কথায়। সম্ভবত হিমালয়কে হুমায়ূন আহমেদের কোন নির্দিষ্ট বয়স কিংবা স্টেজের পরিচায়ক হিসেবে ধরা যায় না। বরং হিমু ছিল হুমায়ূন আহমেদেরই সমান্তরাল আরেকটি সত্ত্বা। ব্যাক্তি হুমায়ূন যা করতে চেয়েও করতে পারেননি, সেটাই তিনি করাতেন হিমুকে দিয়ে। যেসব অদ্ভুত ফ্যান্টাসি তার নিজের সৃষ্টির জগতে খেলা করতো, তার পুরোটাই তিনি বাস্তবায়ন করাতেন হিমু চরিত্রটিকে দিয়ে। নাহলে কোন সংসারী মানুষের পক্ষে কি সম্ভব পকেটবিহীন পাঞ্জাবী পরে ঢাকার রাস্তায় রাত-বিরাতে হাঁটা, যখন-তখন পুলিশের সাথে ফাজলামী করা? ইট-কাঠ-পাথরের এই মেগাসিটিতে বন্দি হয়ে আমাদের সবার মনেই কি একবারের জন্য ইচ্ছা জাগে না সব মায়া ছুঁড়ে ফেলে স্বাধীন হতে? হুমায়ূন আহমেদেরও যে করতো না, তা অবশ্যই না। সেই চাওয়াগুলোই মিলে গিয়েছে আপনার-আমার সেই সুপ্ত স্বাধীনতা-অন্বেষী সত্ত্বাটার সাথে, যার সাথে আমরা নিজেরাও হয়তো পরিচিত ছিলাম না। আর সে কারণেই হিমু চরিত্রটি হতে পেরেছে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী চরিত্রগুলোর মধ্যে একটি। যে হিমুপনা নিজে করেছি একটা সময়, ঝুম বৃষ্টিতে রমনা পার্ক কিংবা হেয়ার রোডের রাস্তায় একা হেঁটে, কিংবা রাতের পর রাত ভার্সিটি জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধুর সাথে সিলেট শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে- নিজের সেই হিমু সত্ত্বাটাকে ভয়ানকভাবে মিস করি এখন প্রতিটি মুহুর্তে!

ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদকে বিশ্লেষণ করার স্পর্ধা হবে না কখনোই। তবে তার যে জিনিসটি সবচেয়ে ভাল লাগতো, সেটি হলো নিজের জীবন নিজের মত করে বাঁচার প্রবল আকাংক্ষা। নিজে যা ভাবতেন, যা বিশ্বাস করতেন- সেগুলো অবলীলায় প্রকাশ করার সুতীব্র দুঃসাহস তার ছিলো। যেমন ধরা যাক শাবিপ্রবি’র ছাত্রী হলের নামকরণের ঘটনাটি। শহীদজননী জাহানারা ইমামের নামে হলের নামকরণ বিষয়ক জটিলতায় কিন্তু তার মাথা ঘামানোর কথা ছিলো না। এটি ছিলো রাজনৈতিক, সামাজিক, এবং সাম্প্রদায়িকভাবে প্রচন্ড স্পর্শকাতর একটি ইস্যু। কিন্তু তিনি বসে থাকেননি। অনুজ মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ফোনকলে সপরিবারে চলে গিয়েছেন সিলেট, বসেছেন অনশনে। এখানেই আফসোস। আমরা এখন হাজারো সেলিব্রিটি লেখক-বুদ্ধিজীবী হয়তো পাই রাতের টকশো আর দিনের ফেসবুক গরম করার জন্য, কিন্তু একজন হুমায়ূন আহমেদ পাই না।

তার জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা সম্ভবত ছিলো তার কন্যার সমবয়সী মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করা। হ্যাঁ, শুধু আমাদের সমাজ কেন, পৃথিবীর কোন সমাজই মনে হয় না এখনো এরকম অসমবয়সী ভালবাসাকে মেনে নিতে পেরেছে। এমনকি সভ্যতা এবং প্রগতিশীলতার আদর্শ মানা হয় যাদের, সেই ফরাসীরাও মাসকয়েক আগে তাদের সদ্যনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির স্ত্রীকে নিয়ে হাসিতামাশা করেছে। তবে যেখানে হুমায়ূন আহমেদ নিজের চড়া সুরে বাঁধা অনুভুতিটা অনুভব করতে পারছিলেন, সেখানে কি তার নিজের সাথে মেকি অভিনয়ের কোন সুযোগ ছিলো? নাকি এই মেকি অভিনয় করে তিনি নিজে ভাল থাকতে পারতেন? মানুষ কি ভাবলো আর না ভাবলো সে চিন্তা করে মনে হয় না তিনি নিজের জীবনের কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবু তার ভাগ্য ভাল, ফেসবুক-পূর্ববর্তী সময়ের ঘটনা এটা, ফেসবুকারদের তীব্র কুরুচীপূর্ণ প্রতিক্রিয়া তাকে ভোগ করতে হয়নি।

লেখাটি শুরু করেছিলাম একজন অনুরাগী হিসেবে তার সস্তা বাজারী যত কাজ আছে, তার বিরুদ্ধে কিছু লিখবো ভেবে। কিন্তু হলো না। হ্যাঁ, তার সস্তা কিছু কাজ আছে হয়তো, সেটা আমাদের কাদের নেই? দিনশেষে তিনিও তো একজন মানুষই ছিলেন আপনার-আমার মতই। তবে তাই বলে “অমুক লেখক কখনো এমনটা করেননি যেটা হুমায়ূন করেছেন; তাই তিনি বাজারী লেখক, সস্তা নাট্যকার” এই তুলনায় যাওয়াটা সম্ভবত বোকামী। প্রত্যেকটি সৃষ্টিশীল মানুষেরই নিজস্ব কিছু দর্শন থাকে, নিজেদের কাজগুলোর পিছনে কিছু কার্যকারণ থাকে। হুমায়ূন আহমেদও তার ব্যাতিক্রম নন। তাই বলে একাধিক সৃষ্টিশীলের মাঝে মল্লযুদ্ধ বাধিয়ে তুলনামূলক পর্যালোচনায় যাওয়াটা সম্ভবত বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

লেখাটি বেশ বড় হয়ে গেলো। আসলে যেই মানুষটাকে নিয়ে লিখছি, তার জীবন এবং কাজের ব্যাপ্তিটাই এত বিশাল যে এত বড় লেখাতেও তার ন্যুনতম অংশ তুলে আনা সম্ভব না। তারপরেও, স্মৃতির ভান্ডার প্যান্ডোরার বাক্সের মত খুলে গেলো। নিজের স্মৃতি থেকেই পুরো লেখাটা লিখলাম। তাই প্রচুর ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে, হুমায়ূন আহমেদের অনেক ভাল ভাল কাজের কথা বাদ পড়তে পারে। কখনোই সাহিত্য বিশেষজ্ঞ কিংবা বিশ্লেষক কোনটাই ছিলাম না। একজন হুমায়ূন-ভক্ত হিসেবে নিজের জীবনে তার প্রভাবটি বর্ণনা করার ধৃষ্টতা দেখালাম তার মৃত্যুবার্ষিকীতে। সে কারণেই লেখাটিতে নিজের “আমিত্ব” প্রচন্ডভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। যেকোন ভুলত্রুটির জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। আশা করি গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা চলবে।

Most Popular

To Top