নিসর্গ

সাকিব আল হাসানের সাথে চীনের দিনলিপি- কুনমিং থেকে বেইজিং

নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বঃ সাকিব আল হাসানের সাথে চীনের দিনলিপি- সূচনার প্রারম্ভ!]

আমরা গিয়েছিলাম চাইনিজ এক্সপ্রেস এয়ারওয়েজে। আমরা মনে করেছিলাম সাকিব ভাই আর তার পরিবার হয়তো অন্য ফ্লাইটে যাবেন। কিন্তু উনি আমাদের সাথেই একই ফ্লাইটে উঠেন।

সাকিব ভাইয়ের লাগেজ দেখে মনে হলো একদম একজন Perfect Globetrotter। ওনার কাঁধে সবসময় একটা Gucci Bag থাকে যেটাতে বাংলাদেশের লাল-সবুজের স্ট্রাইপ দেওয়া। আর থাকে একটা বিশাল কালো স্যুটকেস, যেটাতে কোলকাতা নাইট রাইডারসের ব্যাজ লাগানো। আমাদের সাথের সফরে উনি অব্রির জন্য নিয়েছিলেন একটা গোলাপী রঙের স্ট্রলার।

আমাদের ফ্লাইট শুরু হলো বেলা ২:৩০ মিনিটে। মোটামুটি ৩ ঘন্টা ফ্লাইট শেষে আমরা পৌঁছাই চায়নার স্থানীয় এয়ারপোর্ট কুনমিং-এ। ওখান থেকে আমাদের ট্রানজিট ফ্লাইট করে বেইজিঙে পৌছানোর কথা।

কিন্তু বিধি বাম। কুনমিং থেকে বেইজিং রুটের বিরূপ আবহাওয়ার কারণে আমাদের ফ্লাইট ডিলে হয়ে যায় অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। সাকিব ভাইয়ের সাথে আমরা সবাই মিলে অপেক্ষা করতে যাচ্ছি এয়ারপোর্টে।

আমরা মোটামুটি ঘন্টাখানেকের মতো এয়ারপোর্টে থাকি। এই ১ ঘন্টায় সাকিব ভাই একবারো কোন অস্হিরতা অথবা বিরক্তি দেখাননি। বরং অব্রিকে নিয়ে এয়ারপোর্টে হেঁটেছেন, ওর সাথে বসে বসে খেলেছেন। ১ ঘন্টা পর এয়ারলাইন্স কোম্পানী থেকে আমাদেরকে একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয় ফ্লাইট ফিক্সড না হওয়া পর্যন্ত থাকার জন্য।

আমরা এয়ারপোর্টের বাইরে যাওয়ার জন্য চলা শুরু করি। নিচে এক্সিট পয়েন্টের কাছাকাছি এসেই দেখতে পাই বাংলাদেশী অনেক ট্যাক্সিচালক এবং বাংলা হোটেল মালিকরা তাদের বিজনেস কার্ড নিয়ে অপেক্ষা করছে বাংলাদেশি যাত্রীদের বরণ করার জন্য। তারা তখন সাকিবকে দেখতে পায়। শুরু হয় সেল্ফি যুদ্ধ আর হাত মেলানোর জন্য তাড়াহুড়ো। বাধ্য হয়ে আবারো আলাইনাকে কোল থেকে নামিয়ে দিতে হয় তাকে।

আলাইনা খুবি চঞ্চল আর মিশুক। তাই কোল থেকে নেমেই সে এদিক-ওদিক হাঁটতে থাকে, চাইনিজ বাচ্চাদের সাথে দুষ্টুমি করতে থাকে। সাকিব ভাই হাত মেলাতে মেলাতে আর সেল্ফি তুলতে তুলতে আলাইনার দিকেও খেয়াল রাখতে থাকেন। অলরাউন্ডার যেমন মাঠে, তেমনি পরিবারেও।

এর মাঝে হাঁটা অবস্থায় একজন হাত মেলাবে বলে হাত বাড়ায়, সাকিব ভাই হাত বাড়িয়ে দেন হাঁটতে থাকা অবস্থায়। কিছু সেকেন্ড পরে দেখি তিনি সাকিব ভাইয়ের হাত চেপে ধরে টানছেন আর পকেট থেকে ফোন বের করে সেল্ফি তুলতে চাচ্ছেন। সাকিব ভাই একটু বিরক্ত হন ব্যাপারটায় কারণ অযথা তার হাত ধরে না টেনে বললেই হত যে উনি ছবি তুলতে চাইছেন। সাকিব ভাই বলেন, “ভাই ছবি তুলবেন তুলেন, কিন্তু হাত টানেন কেন?” আগেও বলেছি সাকিব ভাই বেশ স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। উনি বললেন “ভাই হাত না টেনে সেল্ফি তুলেন!” আমরা পিছন থেকে সবই দেখছিলাম। আর নিজেকে তার জায়গায় ভাবছিলাম।
সুপারস্টার হওয়ার সুফল আমরা এই সফরে খুব বেশি দেখিনি কিন্তু এমন বিড়ম্বনা অনেক দেখেছি ওনার সাথে।

মনে হচ্ছিল ওনার জায়গায় আমি থাকলে হয়তো নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারতাম না। লোকটার পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনলাম, “এহ! শালা ভাব নেয়।” অবাক হয়ে ভাবলাম, ১০ টা ছবি তুলতে পেরেছে ঠিকই কিন্তু একবার না করাতেই একজন লোক “ভাব” বেশি নিয়ে ফেলল। এ আর এমন কি! এরই মাঝে আমরা তাদের পার করে গেটের দিকে চলে আসি। অপেক্ষা করতে থাকি গাড়ি আসার জন্য।

কুনমিংয়ের আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা হওয়াতে সাকিব ভাই ঝটপট ছোট্ট আলাইনার জন্য মোটা পোশাক বের করে পরিয়ে দেন।
আমাদের ৩ জন ফ্যানের একই গাড়িতে উঠার সুযোগ হয় সাকিব পরিবারের সাথে। সাকিব পরিবারের জন্য আসে প্রথম গাড়িটি। আমরা গাড়িটির কাছে দাঁড়িয়ে তখন পরের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি। সাকিব ভাই গাড়ির পিছনে আরো জায়গা আছে দেখে বলেন “ভাই আপনারা উঠে পরেন এই গাড়িতেই। পিছে জায়গা আছে তো! আরেক গাড়ির জন্য ওয়েট করার প্রয়োজন নেই।”

আমি, ধ্রুব আর ফারদিন সাকিব ভাইয়ের সাথে একই গাড়িতে উঠি হোটেলে যাওয়ার জন্য। একই গাড়িতে ছিল শিশির ভাবি, অব্রি আর নাফিজ ভাই।

যা মনে হলো সাকিব ভাই গাড়ির অনেক বড় পোকা। আমরা যেই গাড়িতে উঠলাম ওটা আমাদের কাছে একেবারেই নতুন কোম্পানীর ছিল। কিন্তু সাকিব ভাই দেখেই বুঝলেন ওটা একটা বুইক গাড়ি।

গাড়িতে উঠে সাকিব ভাই নাফিজ ভাইয়ের সাথে গাড়ির গল্প শুরু করলেন। ভাইয়া সম্ভবত Audi A8 মডেলের গাড়ি কিনবেন বা কিনছেন সম্প্রতি। ওটা নিয়েই কথা বলছিলেন। গল্পের ফাঁকে ফাঁকেই উনি অব্রির সাথে খেলছিলেন।

একসময় অব্রি পানি খেতে চায়। তার জন্য সাকিব ভাই পানির বোতল আমার হাতে দিয়ে অব্রির জন্য টাওয়েল বের করেন। এরপর ওকে পানি খাওয়াতে খাওয়াতে বলেন, “এতটুকু মানুষ তার খাওয়ার জন্য ২ জন মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ল হাহাহা।”

হোটেলে নেমেই সাকিব ভাই নাফিজ ভাইকে বললেন, “ভাই এরা যেহেতু হোটেলে নিয়ে আসছে, তাইলে তো মনে হয় আজকে রাতটা থাকতে হবে। খাবারের ব্যবস্থা করেন।” নাফিজ ভাই বলেন, “কি খাবা সাকিব?” সাকিব ভাই বললেন, “দেখি আপনি চায়নায় বাংলা খাবার খাওয়াতে পারেন নাকি। হাঁসের মাংস আর ভর্তা দিয়ে ভাত।”
নাফিজ ভাই বলেন, “Deal Done!”

এগুলো শুনতে শুনতে আমরা হোটেলের রুমের চাবি পেয়ে গেছি ততক্ষণে। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হবার কিছুক্ষণ পর মীম ভাই কল দিয়ে বললেন, “তোমরা নিচে চলে আসো ডিনারের জন্য বের হবো”।

আমরা ভেবেছিলাম হয়তো ফাস্টফুড খাবো। কিন্তু নাফিজ ভাই তার নেটওয়ার্কের যাদুতে কুনমিং-এও বাংলাদেশি হোটেল বের করে ফেলেন।

এ হোটেলের মেনু শুনলে যে কারো জিভে পানি চলে আসতে বাধ্য। গরম ভাত, হাঁসের মাংস, ১০ রকমের ভর্তা, ডাল, পুঁটি মাছ ভাজি এবং মাছের ঝোল। খেতে খেতে আমি নাফিজ ভাইকে জিজ্ঞাস করলাম সাকিব ভাই কি ডিনার করে ফেলেছে নাকি। নাফিজ ভাই জানালেন সাকিব আর তার ফ্যামিলির জন্য আমাদের ডিনার শেষে এই খাবারগুলো প্যাকেট করে নিয়ে যেতে হবে।

খাওয়া শেষে আমরা হোটেলে ফিরতে আরো ঘন্টাখানেক লাগলো। হোটেল গেটে নেমে দেখি ইতোমধ্যেই আমাদেরকে এয়ারপোর্টে নেওয়ার জন্য এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ বাস নিয়ে হাজির। তারমানে আমাদের ফ্লাইট রেডি।

কিন্তু তখনো সাকিব ভাই সহ আমাদের আরো ২ জন ফ্যান এর ডিনার হয়নি। কি করা যায়, তা ভাবতে ভাবতেই আমরা সবাই লাগেজ গুছিয়ে হোটেলে চেক আউট করে ফেললাম। এরপর সাকিব ভাই সহ সবাই মিলে বাসে উঠে রওনা দিলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।

[পরবর্তী পর্বঃ সাকিব আল হাসানের সাথে চীনের দিনইপিঃ বেইজিং-এ প্রথম দিন]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top