ক্ষমতা

যখন ছাত্রলীগ আর শিবির গান গায় একই সুরে!

২০১৩ সালের ৮ ই ফেব্রুয়ারী লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে কাদের মোল্লার রায়ের বিরুদ্ধে সমাবেশ করতে গেলে কাদের মোল্লার সমর্থক, জামাত-শিবির, বিএনপি’র নেতাকর্মীরা আমাদের দিকে ডিম ছুঁড়ে মারে। এর একটি আমার হাঁটুতে এসেও পড়েছিলো। সেসব প্রমাণ আছে। ছবি আছে।

এই ঘটনার প্রায় সাড়ে চার বছর পর গতকাল ছাত্রলীগের কর্মীরা গণজাগরন মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের গাড়ীতে ডিম ছুঁড়ে মেরেছে, ইট মেরেছে, তথা আক্রমণ করেছে। ইমরান ভাইয়ের বিরুদ্ধে আদালতে মানহানির একটি মামলা দেয়া হয়েছে। আদালতকে সম্মান দেখিয়ে, আইনকে সম্মান দেখিয়ে ইমরান ভাই সেই মামলাতে হাজিরা দিতে গেলে তাঁর উপর এই হামলার ঘটনা ঘটে।

প্রথম দিকে ছাত্রলীগ গণজাগরণের সাথে ছিলো। বলা ভালো যে উপরের নির্দেশে ছিলো। আস্তে আস্তে গণজাগরণ মঞ্চ যখন সরকারের নানান ব্যার্থতা, নানান সমালোচনা শুরু করলো তখন ছাত্রলীগ কেন্দ্রের বাঁশীর সুর অনুযায়ী পালটে যেতে লাগলো। এটি অবশ্য যে কোনো রাজনৈতিক দলগুলোকেই বা তাদের অঙ্গসংগঠনকেই করতে হয়। কেননা রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর কিংবা নেতাকর্মীদের মেরুদন্ড বলতে কিছু নেই। নেতা যদি বলে “চুদির ভাই” তাহলে পেছনের নেতাকর্মীরাও একই সুরে ও শব্দে হুক্কা হুয়া আওয়াজ দেবে। এটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচার। ইনফ্যাক্ট এই দেশের সংবিধানের ৭০(ক) অনুচ্ছেদ-ই এই কালচারের একটি বড় প্রমাণ।

আক্রমণের দিক থেকে ছাত্রলীগ ও জামাত-শিবিরের মধ্যে মূলতঃ পার্থক্য নেই। ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মী বিশ্বজিৎ নামে একটি ছেলেকে কুপিয়ে স্পট খুন করে ফেলেছিলো। অন্যদিকে শিবিরের নেতারা হাতের পায়ের রগ কাটে, ব্রাশফায়ার করে ইত্যাদি।

কিন্তু মুশকিলে পড়ে যাই আদর্শের প্রশ্নে। আদর্শের দিক থেকে ছাত্রলীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আর শিবির মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের। কিন্তু আবার ব্যবসা, টাকার ভাগ-বাটোয়ারা, স্বার্থ, রাজনৈতিক লোভ-লালসা এসবের দিক থেকে দুইটি পক্ষই অভিন্ন আচরণ করে। আর উপরে যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলেছি সেটিও এদের কাছে ক্রমেই ম্রিয়মান হয়ে গেছে। এখন অসংখ্য জামাত-শিবিরের ছেলে হাল ধরেছে ছাত্রলীগের। সুতরাং আদর্শের ব্যাপারে বড় গলায় কথা বলতে যাওয়াটা এখন বেশ ঝক্কির।

ছাত্রলীগ-আওয়ামীলীগে আমার অনেক বড় ভাই আছেন, বন্ধু আছেন, আত্নীয়-স্বজন রয়েছেন। সুতরাং সবাইকে একই পাল্লায় মেপে কথা বলাটা হয়ত অন্যায় এবং সমীচিন নয়। কিন্তু গত ৮ বছরের অভিজ্ঞতায় বলতেই হয় যে ছাত্রলীগ এখন আসলে একটা ধান্দাবাজির আখড়া ছাড়া আর কিছু নয়।

দলীয় নাম ব্যবহার করে, পুলিশ প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এরা যা মন চায় তাই করে। এইতো গতকালই খবরে পড়লাম যে এক ছাত্রলীগের নেতা একজন স্বামীকে একটা ঘরে বেঁধে রেখে সেই লোকের স্ত্রীকে ধর্ষন করেছে। আবার আজকেই সংবাদপত্রে দেখলাম বিয়ানীবাজারে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে একজন খুন। পরশুদিন দেখলাম একটা পেয়ারার জন্য ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। ইনফ্যাক্ট ইমরান ভাইয়ের গাড়িতে ডিম মারার পর এরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে টেন্ডার নিয়ে মারামারি করেছে বলে পত্রিকাতেই পড়েছি। এইভাবে বলতে গেলে গত ৮ বছরের অপরাধের ফিরিস্তি সামনে চলে আসবে যা লিখে শেষ করা সম্ভব না।

ইমরান ভাইকে ডিম মারার পর কর্তব্যরত পুলিশ সাংবাদিকদের ক্ল্যারিফিকেশন দিয়েছেন এই বলে যে, “ওরা তো ইট মারেনি, ডিম মেরেছে।” যেন ডিম মারাটা কোনো অন্যায় নয় কিন্তু ইট মারলে পুলিশ ছাত্রলীগ নেতাদের একহাত দেখে নিত। একজন পুলিশ অফিসার যখন ছাত্রলীগের এহেন অপরাধ জায়েজ করবার জন্য আক্রমনের অস্ত্র নিয়ে পার্থক্য করেন কিংবা সাংবাদিকদের বুঝবার চেষ্টা করেন, তখন আমাদের মত নাদান পাব্লিককে বুঝে নিতে হয় যে কি হচ্ছে।

ক’দিন আগে লন্ডনে বসবাসরত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল ফেসবুকে বললেন তিনি দরকার হলে শিক্ষামন্ত্রীর বাসায় গিয়ে ইমরান ভাইকে চড় দিয়ে আসবেন এবং পিটাবেন। তারও আগে তিনি ইমরান ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়েও নোংরা কথা বলেছিলেন। চিন্তা করা যায়?

একজন মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে শারিরীক আক্রমণের ঘোষনা দিচ্ছে একজন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। সামান্যতম লজ্জার বালাই নেই, অস্বস্তি নেই, দ্বিধা নেই কিংবা সামান্যতম উৎকন্ঠা নেই। একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতার এইসব বক্তব্য ছাত্রলীগের বর্তমান চরিত্রকেই বারবার প্রকাশ করে।

ইমরান ভাইকে যদি ডিম ছুঁরে মারাটাই পরিকল্পনা হয়ে থাকে তাহলে তাঁর নামে মানহানির মামলা করতে গেলেন কেন? “ভদ্রলোকের” মত আইনের দারস্থ যখন হয়েছেন, তখন আদালতকেই সেটির সুরাহা করতে দিন। আদালতের প্রতি আস্থা না থাকলে, নিজেদের অভিযোগের প্রতি ভরসা না থাকলে যা হবার সেটিই আসলে হয়েছে। কারন অভিযোগকারী জানেন যে, তাদের অভিযোগ হয়রানীমূলক এবং এটি আদালতে টিকবে না। সুতরাং ডিম মেরে, ইট মেরে, বোম মেরে যদি প্রতিশোধ নেয়া যায়, সেটুকুই তারা করবার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।

ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীদের এইসব ঘটনায় আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ক্ষুব্ধ, বিব্রত ও আতংকিত। এরা চিকনগুনিয়া থেকেও ভয়ংকর হয়ে পড়েছে এখন। মশাকে নিয়ন্ত্রনে রেখে চিকনগুনিয়া থেকে বাঁচতে পারা যায়। কিন্তু ছাত্রলীগ থেকে কিভাবে বাঁচতে পারা যায়, সেটাই ভাবছি এখন।

লেখকঃ নিঝুম মজুমদার

[এই লেখাটি নিঝুম মজুমদারের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সংগৃহিত]

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top