নাগরিক কথা

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক না হতে পারাটাই কি আমার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছিলো?

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়ন আলোয় neon aloy

একটা সময় আমার স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। প্রশাসন ক্যাডারের চাকুরিতে যোগ দেয়ার ১৫ দিন পরে আমার নিজের প্রিয় ক্যাম্পাসে এই মর্মে ভাইভাও দিতে গিয়েছিলাম। আরও অনেক অস্বাভাবিক মেধাবীর ঠ্যালায় আমি বাদ পড়ে যাই। সেসময়ের ভিসি স্যার আমাকে ভাইভায় বলেছিলেন “তোমরা দেশের মাথা, হর্তাকর্তা হবা। কেন আসবা এখানে, যেখানে সারাজীবন এক ক্যাম্পাসে থাকতে হবে? তাছাড়া তোমার জায়গায় তো আমরা একটা ছেলেকে পাঠাতে পারছি না চাকুরীতে। এটা তো অপচয়।”

সত্যি কথা বলতে অনেকেই বুঝতে চাইতো না কেন আমি শিক্ষক হতে চাই। আমার পরিবার বিশেষত বাবা ছিলেন ঘোর বিরোধী। তিনি সারাজীবন ছোট্ট একটা চাকুরি করেছেন, আমলা বিশেষত ইউএনও/এসি ল্যান্ডের গ্ল্যামার দেখেছেন। তার কাছে এই চাকরি ছেড়ে শিক্ষকতায় যাওয়া এক প্রকার অপরাধ। এবং এতবছর চাকুরি করার পরও বাবার গর্বিত মুখ দেখতে ভাল লাগে। আব্বা আমার কর্মস্থলে গিয়েছেন একবার মাত্র। গিয়ে আমার অবর্তমানে আমার স্টাফদের কাছে জিজ্ঞেস করেছেন আমি কেমন অফিসার? মানুষের সাথে আমার ব্যাবহার কেমন এইসব!

যাইহোক, শিক্ষক হওয়ার সেই পাগলামি আমার অনেক দিন ছিল। অনেকেই জানেন সেটা। এখন এতদিন পরে দেশের মানুষ, ব্যাচমেট, সিনিয়র, জুনিয়রের বিপুল ভালবাসা পেয়ে প্রায়শই ভাবি আমি সব মিলিয়ে অনেক ভাল আছি। এর চেয়ে বেশি আর কি চাইতে পারতাম জীবনের কাছে?

কিন্তু আমি সেই সময় কেন পাগলের মত ভার্সিটির শিক্ষক হতে চাইতাম? নিজের কাছে উত্তর খুঁজতে গেলে দেখি আমি আসলে শিক্ষকতাকে আরো একটি পেশা হিসেবে ভাবতাম না, সেভাবে নিতেও চাইনি। এখনো ভাবি না। শিক্ষকতা একটা প্যাশন, একটা ব্রত।

আরেকটা গভীর কারন ছিল। সেটা হল অবারিত পেশাগত স্বাধীনতা। মুক্ত পাখির মত চিন্তার, ভাবতে পারার, মত প্রকাশের ফ্রিডম। জ্ঞান অর্জন, বিতরণ, ছড়িয়ে দেয়ার লোভ। সেই ছোটবেলা থেকেই প্রচুর পড়বার চর্চা ছিল। স্বপ্ন দেখতাম একসময় মোটামুটি মানের বুদ্ধিজীবী হয়ে যাব। ব্রেইন বন্ধক রাখা টাইপ না, সত্যিকার মুক্ত চিন্তার সিভিল সোসাইটির অংশ। ভার্সিটির শিক্ষক হলে এক্ষেত্রে কোন বাধা থাকবে না। সরকারি চাকুরের মত নিয়ম, বিধি, আচারে আবদ্ধ খাঁচার পাখির জীবন নয়। কথা বলা, লেখা, দেশের ভাল মন্দ বিষয়ে মতামত দেয়া, সামাজিক ভুল ক্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেয়া ” আহমদ ছফা” টাইপ কেউ হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল আমার। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, কলাম লিখে বুদ্ধিভিত্তিক সমাজের কেউ একজন হবার ইচ্ছা থেকেই শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম আমি।

সেই কেউ একজন হয়ে উঠতে না পারার কষ্ট এমনিতেই সময়ের সাথে সাথে কমে এসেছে। তবু কোন এক সময় চাকরী-বাকরি ছেড়ে ফুলটাইম লেখালেখি শুরু করে দেব এমন ভাবতে ভাল লাগে আমার।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক না হতে পারার কষ্ট একদম নেই। বরঞ্চ মনে হয় যা হয়েছে তা ভালই হয়েছে, যা হবে তা ভালই হবে। আমাদের জাতির বিবেকদের অন্তহীন কোন্দল, স্বার্থের দ্বন্দ্ব আর অসহিষ্ণু ব্যাক্তি আক্রমন দেখে নিজের শিক্ষক না হওয়াটা আশীর্বাদ মনে হয়।যখন আমাদের এক স্যার (বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) মতপ্রকাশের জন্য আরেক স্যারের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করে দেন, পত্রিকায় কলাম লেখার জন্য সবচেয়ে নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়, ক্লাসে জেন্ডার স্টাডিজের নিরীহ ক্লাস নিতে গিয়ে কাউকে মামলা করে চাকুরী ফিরে পেতে হয় তখন শিক্ষক না হয়ে সরকারের চাকর হিসেবে সাহস করে ফুল লতাপাতা নিয়ে যে দুয়েক লাইন লিখি তাই বিশাল বিরাট ব্যাপার মনে হয়। তবে সিনিয়র হতে হতে জীবনের নানা হিসাব নিকাশ আমাকেও নির্মোহ, উদাসীন এক ধান্ধাবাজে পরিণত করে কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়। বাকিটা তোলা থাকুক সময়ের হাতে।

লেখকঃ
সাইফুল ইসলাম
সিনিয়র সহকারী সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
(বর্তমানে ও এস ডি হিসেবে ইউনিভার্সিটি অভ ম্যানচেস্টার, ইংল্যান্ড এ অধ্যয়নরত),
২৮তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top