গল্প-সল্প

“প্রতিবিম্ব” – রিফাত হাসানের ছোটগল্প

neon aloy প্রতিবিম্ব রিফাত হাসান নিয়ন আলোয়

কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। তাতেই হঠাৎ উল্টোদিক থেকে দ্রুতপায়ে হেঁটে আসা একটা ছেলের সাথে ধাক্কা লেগে গেল। আমি সাথে সাথে ঘুরে তাকালাম। কিন্তু ছেলেটা একবারও ফিরে তাকালো না। যেভাবে হাঁটছিল সেভাবেই হেঁটে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি আবার সামনে তাকালাম। এই শহরটা ঠিক আগের মতই আছে, একটুও বদলায়নি। ঠিক পাঁচ মাস তের দিন পর আমি পা রাখলাম এই শহরের বুকে। এখন আমি দাঁড়িয়ে আছি চারুকলার ঠিক সামনে। শাহবাগ থেকে টিএসসি পর্যন্ত এই ছোট্ট রাস্তাটা যেন আগের চেয়ে আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এই কয়েক মাসে।

“স্যার ফুল নিবেন, ফুল?”

টিএসসি’র সামনে এসে রাস্তার পাশে একটা বেঞ্চে বসতে না বসতেই দশ-এগারো বছরের একটা বাচ্চা ছেলে ঘিরে ধরল আমাকে। একটু ভালো করে দেখতেই অবশ্য ছেলেটাকে চিনতে পারলাম আমি। একসময় আমি নিয়মিত আসতাম এখানে। এই ছেলেটাও তখন আমাকে চিনত। এখন অবশ্য চিনতে পারার কোনো প্রশ্নই আসে না। আমার সারা মুখ জুড়ে এখন পাঁচ মাসের অযত্নে বর্ধিত দাড়িগোঁফের জঙ্গল, আর গায়ের রঙও নিশ্চয় আগের চেয়ে অনেক পোড়া।

“কিরে তোর নাম তো রুনু, তাই না?”

ছেলেটা একটু অবাক হল মনে হল, ভালো করে দেখার চেষ্টা করল আমাকে। আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম।

“দেখ চিনতে পারিস কিনা আমাকে। মনে হয় না পারবি।”

ছেলেটা অবশ্য আমাকে চেনার প্রতি আর কোনো আগ্রহ দেখালো না। নিরস মুখে বলল, “ফুল নিলে নেন। আর না নিলে বইলা দেন নিবেন না। অন্য লোকের কাছে যাই।”

আমি আবারো একটু হাসলাম, “আমি একা মানুষ ফুল নিয়ে কী করব? তার পরেও তুই যখন এত করে বলছিস দে একটা ফুল। ভালো দেখে দে।”

একটা লাল গোলাপ আমার হাতে দিয়ে চলে গেল ছেলেটা। আমি ক্লান্ত হয়ে একবার আকাশের দিকে তাকালাম। সন্ধ্যা হতে এখনো দেরি আছে কিছুক্ষণ। সুব্রত আসবে সন্ধ্যার পরে। ততক্ষণ একা একাই অপেক্ষা করতে হবে আমাকে।

মধ্যবিত্ত শব্দটা আমি প্রথম শুনি খুব ছোটবেলায়। তখন সম্ভবত ক্লাস টু কি থ্রীতে পড়ি। অন্য দুটো শ্রেণীর চেয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণী যে সবদিক দিয়েই সেরা এই ধারণা কীভাবে কীভাবে যেন তখন থেকেই মাথায় ঢুকে গিয়েছিল আস্তে আস্তে। আর এ জন্য একটা প্রচ্ছন্ন গর্বও ছিল সবসময়। এর পিছনে কারিগর ছিলেন আমার বাবা। আমার মধ্যবিত্ত বাবা একটা কাজ খুব ভালো পারতেন, সেটা হল স্বপ্ন দেখতে শেখানো। খুব ছোটবেলা থেকেই গভীর রাতে বাসার ছাদে মাদুর পেতে একপাশে আমি আর একপাশে আমার বড় বোনকে নিয়ে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকতেন আমার বাবা। সে সময় বাবা খুব আস্তে আস্তে গল্প বলতেন আমাদের। জীবনের গল্প। অভিজ্ঞতার গল্প। অনুপ্রেরণার গল্প। আমাদের দৈনন্দিন জীবন অবশ্য আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতই ছিল। একটা ছোট্ট মফস্বল শহরের ছোট্ট একটা বাসায় থাকতাম আমরা। ছোটবেলায় ঈদের আমেজ আসার আগেই নতুন জামা কিনে এনে আমাদের চমকে দিতেন বাবা। তারপর হঠাৎ একদিন কোরবানীর ঈদে আর নতুন জামা এল না। মা বুঝিয়ে বললেন যে এখন তো বড় হয়ে গেছি, বছরে একবার ঈদে নতুন জামা কিনলেই হয়। ক্লাস সিক্স সেভেনে থাকতেই আমরা বুঝতে পারলাম যে সবসময় স্কুলে বেতন দেওয়ার সময় আসলেই বাবাকে মনে করিয়ে দিতে হয় না। স্কুলে স্যাররা অনেক সময়ই এটা ওটা কিনতে বলে, সবকিছু বাবাকে বলতে হয় না। প্রতিদিন স্কুল থেকে রিকশায় না ফিরে মাঝে মাঝে হেঁটে এসে টাকা বাঁচাতে হয়। এরকম আরো অনেক কিছু। এসব শিখতে শিখতেই হঠাৎ একদিন আমরা বড় হয়ে গেলাম। মধ্যবিত্ত পরিবারের লড়াইটা ততদিনে ভালো করেই শেখা হয়ে গেছে। কিন্তু সে সময়টা ছিল স্বপ্ন দেখার বয়স। শৈশবের সেই স্বপ্নগুলো তখন আরো বেশি করে দেখতাম। স্বপ্নগুলোর মধ্যে অবশ্য তখন কিছু পরিবর্তন এসেছিল। শৈশবের স্বপ্নগুলো ছিল শুধু নিজেকে ঘিরে। কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর, যখন আস্তে আস্তে আমরা পরিচিত হতে শুরু করলাম সমরেশ-সুনীলের লেখার সাথে, তখন স্বপ্নগুলোও আস্তে আস্তে শাখা-প্রশাখা মেলতে শুরু করল। আমরা স্বপ্ন দেখতাম পরিবর্তনের, দেশকে পরিবর্তনের, সমাজকে পরিবর্তনের। আর মনে মনে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম যে আমাদের এই ঘুণেধরা সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরাই।

আমার জীবনে প্রথম আঘাত ছিল আমার মায়ের মৃত্যু। আমি তখন সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছি। একদিন কলেজ থেকে ফিরে শুনি মা রান্না করতে করতে হঠাৎ করেই মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে। আমি সাথে সাথে হাসপাতালে ছুটলাম। বড় বেশি নির্জন ছিল সেই দুপুরটা। আমাদের ছোট্ট মফস্বল শহরটাও যেন সেই প্রচণ্ড গরমের দুপুরে খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।

মা মারা যান পরেরদিন সন্ধ্যায়। আমাদের ছোট্ট বাসাটা হঠাৎ করেই যেন খুব বেশি নির্জন হয়ে পড়ল। রাতে বাবার বাসায় ফেরার সময়টা প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়তে থাকল। কয়েক দিন এক ধরণের ঘোরের মধ্যে থাকার পর বীথি আপু আস্তে আস্তে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করলেন। কিন্তু একবার সুর কেটে গেলে যা হয়, কিছুতেই তা আর মেলে না। আমার বন্ধুবান্ধব কোনোদিনই খুব বেশি ছিল না, আস্তে আস্তে আরো বেশি একা হয়ে পড়লাম আমি। আমাদের ছোট্ট মফস্বল শহরটার অলিগলিগুলোতে সারাদিন এলোমেলো ঘুরে বেড়াতাম আমি। একা একা। বিথী আপু তখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। আস্তে আস্তে আপুরও ভার্সিটিতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।

বিথী আপুর বিয়ে হয়ে যায় হঠাৎ করেই। বাবা কোত্থেকে যেন পাত্র ধরে এনেছিল। ওদের নাকি কয়েক পুরুষ ধরে অনেক বড় ব্যবসা ছিল। আমি খুব বেশি আগ্রহ দেখাই নি। আবার একেবারে অনাগ্রহও দেখাই নি। আসলে তখন আমাদের পরিবারের তিনজন মানুষ ছিলাম তিনটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। একজনের পৃথিবীতে আরেকজন নিতান্তই আগন্তুক। আপু অবশ্য আপত্তি তুলেছিল, এখন অন্য বাড়িতে চলে গেলে আমাদেরকে কে দেখবে এরকম যুক্তি দেখিয়েছিল। আমরা সেসব নিয়ে খুব বেশি ভাবি নি। তারপর একসময় আপুও চুপ করে সবকিছু মেনে নিল। ঠিক সময়েই আপুর বিয়ে হয়ে গেল। বিদায়ের সময় আপু আমাকে জড়িয়ে ধরে অর্থহীন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল তখন আমার চোখও একটু ভিজে উঠেছিল। এইটুকুই। তারপর আস্তে আস্তে আপুও হারিয়ে গেল আমাদের জীবন থেকে।

আমাদের বাসাটা আরো বেশি নির্জন হয়ে পড়ল। দুটো আলাদা পৃথিবী আর তার বাইরে একটা দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করে ফেললাম আমরা দুজন। আমি আর বাবা। সারাদিন কারো সাথে কারো দেখাই হত না। কে কোথায় থাকি, কে কী খাই কেউ কারো খোঁজ নিতাম না। তবে দিনশেষে আমি আর বাবা সেই ছোটবেলার মত ছাদে মাদুর পেতে চুপচাপ পাশাপাশি শুয়ে থাকতাম। ছোটবেলার মত কোনো গল্প বলতেন না বাবা। তবু নিঃশব্দেই অজস্র কথা হত আমাদের।

বাবা যখন মারা যায় তখন আমি কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। হলে থাকতাম। আমাদের মফস্বল শহরের ছোট্ট বাসাটায় বাবা তখন একা থাকতেন। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি যখন আমাদের ছোট্ট শহরটায় এসে নামলাম তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। সমস্ত শহর ভেসে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। বৃষ্টির মধ্যেই তড়িঘড়ি করে বাবার কবর দেওয়া হয়। শেষবারের মত আমি যখন বাবাকে দেখি, বাবা তখন চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ কেন যেন আমার মনে হল, সেই ছোটবেলার মত বাবা মাদুর পেতে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে আছেন। এখনই আস্তে আস্তে বলবেন, “তূর্ণ………………”

“স্যার চিনতে পারছি আপনারে।”

বসে থাকতে কখন যেন অতীতের স্মৃতির সমুদ্রে চোরাবালির মত ডুবে গিয়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। খেয়াল হল যখন দেখলাম সেই ফুল বিক্রি করা ছেলেটা আবার কখন যেন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

“চিনতে পারছিস? বল তো তাহলে আমি কে?”
“ঐ যে এক আপার সাথে আগে প্রায়ই আসতেন।”

আমি একটু হাসলাম, “ঐ আপাকে মনে আছে তোর?”
“মনে থাকব না ক্যান? আপা খুব ভালো ছিল।”
“ও… এখন আর আসে না তোর আপা?”
“না। ম্যালা দিন হইয়া গেল আপারে আর দেখি না।”

আর কোনো কথা না বলে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি।

সামিয়ার সাথে আমার পরিচয় হয় ফার্স্ট ইয়ারের একদম শেষে। ও অন্য ডিপার্টমেন্টের ছিল। ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষায় আমাদের পাশাপাশি সিট পড়েছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও কাকতালীয়ভাবে আরো কয়েকবার দেখা হয়েছিল আমাদের। এবং আশ্চর্যজনকভাবে একসময় আমাদের মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ক্লান্ত বিকেলে কার্জনের খোলা মাঠে হাঁটতে হাঁটতে আমরা আমাদের জীবনের গল্প করতাম। জীবনের ঝুড়িতে আমাদের দুজনেরই বলার মত অনেক গল্প জমা ছিল। আর সেজন্যই হয়তো আমাদের মধ্যে এত ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিল। কোথায় যেন একটা মিল ছিল আমাদের দুজনের জীবনে। সামিয়াও ঠিক আমার মতই খুব একা ছিল। ওর বাবা-মা অবশ্য বেঁচে ছিলেন, আর ওদের পরিবারকেও আমাদের মত ঠিক মধ্যবিত্তের পর্যায়ে ফেলা যেত না। তবুও একাকীত্বের কষ্টটা সমস্ত পৃথিবীতেই এক। পড়ন্ত বিকেলে আমরা পাশাপাশি হেঁটে বেড়াতাম কার্জন থেকে টিএসসি, টিএসসি থেকে শাহবাগ। কথা বলতে বলতে কোনো এক বিষণ্ন গল্পের মাঝখানে এসে হঠাৎ থেমে যেত সামিয়া, আমি তখন ওর চোখের কোণে স্পষ্ট অশ্রু চিকচিক করতে দেখতাম। ঠিক কোন মুহূর্তে আমরা একজন অপরজনকে ভালোবেসেছিলাম তা হয়তো আমরা কেউই বলতে পারব না। কিন্তু খোলা আকাশের নিচে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কোনো এক বিষণ্ন বিকেলে যখন আকাশের ফোটা ফোটা অশ্রু এসে পড়ত আমাদের উপর, আমি তখন চোখে বৃষ্টিতে ভেজার তীব্র ইচ্ছা নিয়ে ওর চোখের দিকে তাকাতাম। ওর চোখেও একই ইচ্ছা দেখতাম আমি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুখ ফুটে কেউই আর কিছু বলতাম না। একসময় আস্তে আস্তে গিয়ে রাস্তার পাশে শেডের নিচে দাঁড়াত সামিয়া। ধীর পায়ে ওকে অনুসরণ করতাম আমি।

ভার্সিটিতে এসে আমার আরো একজন খুব ভালো বন্ধু হয়েছিল। ওর নাম ছিল সুব্রত। সুব্রত এসেছিল ঢাকা থেকে বহুদূরে বান্দরবানের একটা ছোট্ট গ্রাম থেকে। ফার্স্ট ইয়ার থেকেই আমরা একসাথে শহীদুল্লাহ হলে থাকতাম। খুব কম কথা বলত ও, অন্যরা যখন হৈ চৈ করত তখন ও রুমে চুপচাপ শুয়ে বই পড়ত। দুজনের বৈশিষ্ট্য একই রকম ছিল বলেই হয়তো খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিল আমাদের। সন্ধ্যার পর নিয়ন আলোয় এলোমেলোভাবে শহরের রাজপথগুলোতে একসাথে হেঁটে বেড়াতাম আমরা দুজন। গভীর রাতে হলের পুকুরের পাশে সবুজ ঘাসে শুয়ে আমরা আমাদের স্বপ্নের কথা বলতাম। আমার স্বপ্নগুলো ছিল অনেক বড়। প্রথম যৌবনের স্বপ্নগুলোও তখন বদলে গিয়েছে, এখন আমি স্বপ্ন দেখতাম আমার অনেক টাকা হবে। তারপর একদিন একটা ট্রাভেল ব্যাগ হাতে নিয়ে সমস্ত পৃথিবী ঘুরতে বের হয়ে পড়ব। আমার কথা শুনে সুব্রত নিঃশব্দে হাসত। তারপর একসময় ধীরে ধীরে বলতে শুরু করত ওর স্বপ্নের কথা। আমার মত এত বড় স্বপ্ন ছিল না ওর। ও বলত পড়াশোনা শেষ করে ও ফিরে যাবে ওর ছোট্ট গ্রামে। সেখানে পাহাড়ের কোলে ছোট্ট শিশুদের জন্য একটা স্কুল তৈরি করবে। পাহাড়ের কোলে অযত্নে বেড়ে ওঠা সেইসব শিশুদেরকে ও এভারেষ্টে ওঠা শেখাবে। অন্ধকার পৃথিবীতে বড় হয়ে ওঠা শিশুদেরকে একটা আলোর পৃথিবী উপহার দেবে। কথাগুলো বলতে বলতে সুব্রতর চোখমুখ অন্যরকম হয়ে যেত। দীর্ঘসময় চুপচাপ শুয়ে থাকতাম আমরা। হয়তো আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার দিকে তাকিয়ে অনুপ্রেরণা খুঁজত সুব্রত।

আমরা যখন থার্ড ইয়ারের মাঝামাঝি তখন একটা গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মারা যায় সুব্রত। পুলিশের খাতায় সেটা অ্যাকসিডেন্ট হিসেবেই লেখা আছে। কিন্তু আমি কখনো মন থেকে তাকে অ্যাকসিডেন্ট হিসেবে মানতে পারি নি। কলেজে পড়ার সময় ও খুব ভালো আবৃত্তি করতে শিখেছিল। আর সেজন্য মুখচোরা স্বভাবের হয়েও ক্যাম্পাসে জড়িয়ে পড়েছিল দু-একটা সংগঠনের সাথে। তাদের ভিতরের বিভিন্ন অসঙ্গতি সহজ সরল সুব্রত কখনোই মানতে পারে নি। প্রথম প্রথম ও শুধু অবাক হয়ে দেখত। তারপর আস্তে আস্তে প্রতিবাদ করতে শিখে গিয়েছিল। রাতে ঘুমানোর আগে পাশাপাশি শুয়ে ভিতরে জমানো সব ক্ষোভ প্রকাশ করত আমার কাছে।

ওর মৃত্যুকে তাই আমি কখনোই শুধু অ্যাকসিডেন্ট বলে মানতে পারি নি।

সুব্রত মারা যাওয়ার পর আমি আর সামিয়া আরো অনেক বেশি কাছাকাছি চলে আসি। দীর্ঘদিন ধরে আমি খুব ডিপ্রেশনে ছিলাম। সামিয়াই আমাকে ডিপ্রেশন থেকে আস্তে আস্তে বের করে আনে। আমরা কেউ কাউকে কোনোদিন কোনো ভালোবাসার কথা বলি নি। আসলে জীবন আমাদের এত বেশি অভিজ্ঞতা দিয়েছিল যে আমরা আমাদের সম্পর্কটাকে ভালোবাসা বলে কোনো নাম দিতে চাই নি। সুব্রতর স্মৃতি আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে। আমরা আবার নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। থার্ড ইয়ার পাশ করে ফোর্থ ইয়ারে উঠি। তারপর এলো ফোর্থ ইয়ারের মাঝামাঝি একটা দিন। সেদিন বিকেলে আমি আর সামিয়া সদরঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীতে একটা নৌকা ভাড়া করেছিলাম এক ঘণ্টার জন্য। আমরা যখন মাঝ নদীতে তখন বুড়িগঙ্গার পানির নিচে ভেসে থাকা ক্লান্ত সূর্যর দিকে তাকিয়ে সামিয়া হঠাৎ বলেছিল, “আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, তূর্ণ। সামনের মাসেই বিয়ে।”

আমি ভীষণভাবে চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম মুহূর্তের মধ্যে। গলায় কৃত্রিম উচ্ছ্বাস ফুটিয়ে বলেছিলাম, “ভালো তো। পাত্র কী করে?”

আমার সহজ প্রশ্নটারও সামিয়া কোনো উত্তর দেয় নি। বেশ কিছুক্ষণ ভেজা চোখে তাকিয়ে ছিল অন্যদিকে। তারপর অন্যদিকে তাকিয়েই একসময় আস্তে আস্তে বলেছিল, “তুই আমাকে বিয়ে করবি, তূর্ণ?”

আমার উত্তর দিতে এক মুহূর্তও দেরি হয় নি, “করব। তুই শুধু আর কয়েকটা মাস অপেক্ষা কর প্লীজ।”

আমি কেন সেদিন একথা বলেছিলাম জানি না। কয়েকমাস পরেই আমাদের ভার্সিটি লাইফ শেষ হয়ে যেত, কিন্তু তখনই যে আমি সামিয়ার জন্য যোগ্য হয়ে উঠতাম তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। তবুও তখন কোথা থেকে যেন একটা অসম্ভব আত্নবিশ্বাস এসে ভর করেছিল আমার উপর। সামিয়াকে পাওয়ার জন্য আমি যে কোনো কিছু করতে পারি।

সামিয়ার পরিবার আমাদের সম্পর্কটাকে মেনে নিয়েছিল। তারা কয়েকমাস অপেক্ষা করতেও রাজি হয়েছিল। শুধু একটা শর্ত দিয়েছিল, দুজনকেই পড়াশোনা শেষ করে ভালো কিছু করতে হবে। আমি ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো ছাত্র ছিলাম। সামিয়াকে পাওয়ার জন্যই হয়তো, শেষ কয়েকটা দিন আমি অসম্ভব পড়াশোনা করেছিলাম। পাশ করেই একটা মোটামুটি ভালো চাকরিও পেয়ে গেলাম। ওর পরিবার চেয়েছিল তখনই আমাদের বিয়েটা হয়ে যাক। কিন্তু তখনই হঠাৎ আমি একটা স্কলারশীপ পেয়ে গেলাম বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে। ফুল ফ্রি স্কলারশীপ না, আর তাছাড়া ভিসা, পাসপোর্ট, প্লেনের টিকিট সবকিছু মিলিয়ে বেশ একটা মোটা অঙ্কের টাকা টাকা প্রয়োজন ছিল। সামিয়ার পরিবার কিছুটা সাহায্য করতে রাজি হয়েছিল, আমি রাজি হই নি। কোথায় যেন আত্নসম্মানে একটু বাঁধা লেগেছিল। নিজেই টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করলাম কিছুদিন। কিছুতেই কিছু হল না। এই শহরে আমার পরিচিত মানুষ খুব বেশি ছিল না।

এরকম সময়ে হঠাৎ একদিন আমাকে ডেকে পাঠান আমার বড় খালা। উনি ঢাকায়ই থাকতেন। খালুর বিশাল ব্যবসা ছিল এই শহরে। খুব গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তাই ছোটবেলা থেকেই আমি সবসময় এড়িয়ে চলতাম তাকে। আমার সবসময় মনে হত উনি একটা রহস্যের দেয়াল তুলে রেখেছেন তার চারপাশে, কুয়াশার মত অস্পষ্ট কিন্তু দুর্ভেদ্য একটা দেয়াল। আমি যখন উত্তরায় উনার বাসায় গেলাম তখন একবার ভাবলাম কত দিন পর আমি তার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। সঠিক উত্তরটা বের করতে পারি নি।

বড়খালা আফরোজা আমিন যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন তখন এক মুহূর্ত তাকে দেখে চোখ নামিয়ে নিয়েছিলাম আমি। এত প্রখর ব্যক্তিত্বের মানুষের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। আমার সামনে উনি বসলেন। তারপর ধীরে ধীরে প্রশ্ন করলেন, “এত দিন আসনি কেন?”

এ প্রশ্নের উত্তর ছিল আমার কাছে। খালু মারা যাওয়ার পর এই প্রাসাদের প্রত্যেকটা আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন এক নিসঙ্গতা। এই নির্জন প্রাসাদে এলে দম বন্ধ হয়ে আসত আমার। কিন্তু আফরোজা আমিনের কঠিন ব্যক্তিত্বের সামনে কিছুই বলতে পারলাম না আমি। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে উনি আর কথা বাড়ালেন না। সরাসরি আসল প্রসঙ্গে এলেন, “আমেরিকায় স্কলারশীপ পেয়েছ শুনলাম?”

এবার আমার অবাক হওয়ার পালা ছিল। আমি উনাকে কিছুই বলি নি এ বিষয়ে। তবুও আমি কেন যেন অবাক হলাম না। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমাকে ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে এই মহিলার কাছে হয়তো পৃথিবীর কোনো কিছুই গোপন থাকে না।

আমি এবারও কোনো উত্তর দিলাম না।

“শুনলাম তোমার বেশ কিছু টাকা লাগবে। তোমার খালু কত টাকা রেখে গেছেন আমি নিজেই জানি না। টাকাগুলো শুধু শুধু নষ্ট হচ্ছে। এরমধ্যে তোমার যদি কিছু কাজে লাগে তাহলে ভালই হয় অনেক।”

আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। আমার আত্নসম্মান বোধটাও আস্তে আস্তে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনাটাকে ঘটতে দেখলাম। আফরোজা আমিন বললেন, “শুধু এই কথা বলার জন্য আমি তোমাকে ডাকি নি।”

কথাটার মধ্যে কিছু একটা ছিল। আমি চমকে মুখ তুলে তাকালাম তার দিকে। দেখলাম উনি খোলা জানালা দিয়ে বাইরের নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখের কোণে স্পষ্ট চিকচিক করছে অশ্রু।

“গতকাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নটা দেখার পর কারো সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছা করল।”

আমি কিছু বললাম না। সারাজীবন রহস্যের চাদরে নিজেকে মুড়ে রাখা একজন মানুষের এরকম পরিবর্তনে আমার অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে খালা বললেন, “আমিও একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তোমাদের মত। আমাদের সাথে একটা ছেলে পড়ত। তোমার মতই খুব মেধাবী ছিল। সে-ও স্কলারশীপ পেয়েছিল সেই সময়, কমনওয়েলথ স্কলারশীপ। সেইসময়ের সবচেয়ে দামী স্কলারশীপ। ও কিন্তু বিদেশে পড়তে গেল না। কেন জানো? কারণ তখন দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ইচ্ছা করলেই ও তখন বিদেশে চলে যেতে পারত, তা না করে ও যুদ্ধ চলে গেল।”

এই পর্যন্ত বলে হঠাৎ থেমে গেলেন আফরোজা আমিন। তখনো তিনি তাকিয়ে খোলা জানালা দিয়ে বাইরের ঘন নীল আকাশের দিকে। চোখ থেকে আবার কখন ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু পড়া শুরু হয়েছে নিজেই বুঝতে পারেন নি।

সম্ভবত আমার জীবনে প্রথমবার, আমি কোনো প্রশ্ন করলাম তাকে। ছোট্ট একটা প্রশ্ন।

“যুদ্ধ শেষে কি ছেলেটি আবার ফিরে এসেছিল?”

আফরোজা আমিন কোনো উত্তর দিলেন না। সম্ভবত তার জীবনেও প্রথমবার।

ছোট্ট একটা গল্প। এরকম অজস্র গল্প ছড়িয়ে আছে আমাদের ইতিহাসের আনাচে কানাচে। একটি ছেলে, যে খুব সুন্দর একটা জীবন পেতে পারত, সে সবকিছু বিসর্জন দিয়ে যুদ্ধে চলে গেল। শুধুমাত্র একটা স্বাধীন মানচিত্রের জন্য যুদ্ধ। এই যে আজকে আমরা স্বাধীন, এই যে আমরা স্বাধীনভাবে হাঁটছি কার্জন থেকে টিএসসি, টিএসসি থেকে শাহবাগ, ঐ ছেলেগুলো যদি নিজেদেরকে বিসর্জন না দিত তাহলে কি আজ আমরা এরকম পারতাম? কিংবা ওরা যদি স্বার্থপর হত? যদি ওদের প্রচণ্ড দুঃসাহস না থাকত?

সেদিন রাতে অনেকদিন পর শহীদুল্লাহ হলের পুকুরের পাশে বসে ছিলাম আমি। একা। গভীর রাতে হঠাৎ কে যেন এসে বসল আমার পাশে। আমি তাকিয়ে দেখলাম। সুব্রত। আমি একটুও ভয় পেলাম না, কিংবা অবাক হলাম না। আমার মনে হল আমি যেন ওর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম এতক্ষণ।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর একসময় আস্তে আস্তে কথা শুরু করল সুব্রত।

“কেমন আছিস,তূর্ণ?”
“এই তো ভালো। তুই কেমন আছিস রে সুব্রত?”
“আমি ভালো নেই রে তূর্ণ।”

হাহাকারের মত শোনালো সুব্রতর কথা। “আমি সারাজীবন স্বপ্ন দেখতাম ঐ ছোট্ট পাহাড়ী শিশুগুলোকে এভারেষ্টে ওঠা শেখাব। আমার সে স্বপ্ন তো আর পূরণ হল না রে।”

আকাশে তখন পূর্ণচন্দ্র উঠেছে। তার প্রতিবিম্ব পড়েছে দিঘীর অথৈ পানিতে। আমার পাশে বসে আছে সুব্রত। সারাজীবন ও শুধু একটাই স্বপ্ন দেখে এসেছে। একটা ছোট্ট স্বপ্ন।

সেই রহস্যময় রাতেই আমি বুঝতে পারলাম জীবনের প্রকৃত অর্থ কী।

“কী বলছিস তুই তূর্ণ? তুই সত্যি সত্যি এত দূরে চলে যাবি?”

সামিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আমার দিকে, ওর আশ্চর্য সুন্দর চোখ দুটি দিয়ে। আমি কোনো উত্তর দিলাম না। আমি জানতাম ওটাই ছিল আমাদের শেষ দেখা। আমরা বসে ছিলাম ধানমণ্ডি লেকের পাশে একটা ছোট্ট বেঞ্চে। সন্ধ্যার রহস্যময় আলো তখন গ্রাস করে নিচ্ছে এই মায়াবী শহরটাকে। এমন চমৎকার একটা মুহূর্তকে আমার কথা বলে নষ্ট করতে ইচ্ছা করল না। সামিয়াও হয়তো তা বুঝতে পারল, তাই আর কোনো কথা বলল না ও।

দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকার পর আমি ক্লান্ত কণ্ঠে বললাম, “তুই ভালো থাকিস, সামিয়া।”

ওটাই ছিল আমাদের শেষ কথা।

আমার নতুন জীবন বেশ চমৎকারভাবেই শুরু হয়েছিল। পাহাড়ের উপর একটা ছোট কুঁড়েঘর বেঁধে থাকতাম আমি। নিচ দিয়ে কুলকুল করে বয়ে যেত পাহাড়ী নদী। পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠা শিশুগুলোও ছিল চমৎকার। কয়েকদিনেই ওরা আমাকে নিজেদের একজন করে নিয়েছিল। আর কী প্রচণ্ড উৎসাহ ছিল ওদের শেখার। ওদের সাথে খুব চমৎকারভাবে সারাদিন কেটে যেত আমার। শুধু গভীর রাতে, যখন পাহাড় ঘেঁষে চলে যাওয়া নিসঙ্গ নদীর পাশে এসে দাঁড়াতাম আমি, তখন বুকের বাম পাশে কোথায় যেন একটা চিনচিন ব্যথা করত। একটা অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করতাম আমি। আমার অবচেতন মন প্রতিদিন আশা করে বসে থাকত অসম্ভব, অলীক কোনো কল্পনা নিয়ে। একদিন সকালে হঠাৎ চোখ মেলে দেখব…

সামিয়ার চিঠি আসে ঠিক তিনমাস পর। দীর্ঘ একটা চিঠি লিখেছিল সামিয়া। আমাদের জীবনের সব অদ্ভুত গল্পগুলোকে হৃদয়ের সমস্ত আবেগ দিয়ে লিখে পাঠিয়েছিল ও আমাকে। সেই চিঠি পড়েই আমি জানতে পারি যে ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ছেলে থাকে জার্মানীতে, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বিয়ের পর ও চলে যাবে চিরদিনের জন্য।

চিঠিটা আমি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম পাহাড়ী নদীতে। নিঃসঙ্গ নদীটা আপন করে নিয়েছিল আমার সমস্ত অনুভূতিগুলোকে। শেষ টুকরোটি যখন হারিয়ে গেল পানিতে, তখন হঠাৎ আমার খুব হালকা মনে হয়েছিল নিজেকে। নিজেকে সত্যি সত্যি অনুভূতিশূন্য একজন মানুষ মনে হয়েছিল আমার। মনে হয়েছিল হৃদয়ের সমস্ত আবেগ যেন আমি বিসর্জন দিয়ে দিলাম আজ এই নিঃসঙ্গ নদীতে।

সুব্রত এসেছিল আরো দুইমাস পর। সেদিন গভীর রাতে আমি বসেছিলাম নদীর পাশে একটা পাথরের উপরে। সুব্রত নিঃশব্দে এসে বসেছিল আমার পাশে। দীর্ঘসময় আমার কেউ কোনো কথা বলি নি। নিজেদের অস্তিত্ব অনুভব করেছি শুধু। হয়তো নিঃশব্দে আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল সুব্রত।

একসময় ও বলেছিল, “তূর্ণ তোর মনে আছে ঢাকায় থাকতে আমরা প্রায়ই গভীর রাতে এলোমেলোভাবে শহরে হাঁটতাম?” একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে আমি বলেছিলাম, “মনে আছে।”

একটা ছোট পাথর তুলে নদীর অথৈ পানিতে ছুঁড়ে মেরেছিল সুব্রত। তারপর বলেছিল, “অনেকদিন তোর সাথে আর ঘোরা হয় না রে। তুই ঢাকায় চলে আয় একদিনের জন্য। তারপর তুই আর আমি একসাথে ঘুরব, সারারাত।”

“কীরে, অনেকক্ষণ বসে আছিস নাকি?”

আমি চমকে তাকালাম। আমার পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে সুব্রত। সেই থার্ড ইয়ারে ওকে যেরকম দেখেছিলাম ঠিক সেরকমই আছে। একমাথা কোঁকড়ানো চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ও বলল, “কীরে কথা বলছিস না যে?”

“কেমন আছিস রে তুই, সুব্রত?”
“আমি অনেক ভালো আছি রে তূর্ণ, অনেক ভালো।”

সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। আলো আর অন্ধকারের মিলনে একটা অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে সমস্ত পৃথিবীজুড়ে। আমার মনে হল পৃথিবীর সমস্ত রহস্য যেন জমাট বাঁধছে আমাদের দুজনকে ঘিরে।

রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট বেঞ্চে পাশাপাশি বসে রইলাম আমরা দুজন। আমি আর সুব্রত।

রাত গভীর হওয়ার অপেক্ষায়।

লেখকঃ
রিফাত হাসান
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

Most Popular

To Top