ক্ষমতা

ধর্মীয় সহিংসতা- শান্তির প্রতীক ধর্ম দায়ী, নাকি পুরোটাই লালসার রাজনীতি?

ধর্মীয়-সহিংসতা নিয়ন আলোয় neonaloy

ফিলিস্তিন, সিরিয়া, মায়ানমার অথবা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে কোন মুসলমান হত্যা বা অপমৃত্যুর খবর শুনলে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের কিছু কিছু মুসলমানের বুক ভেঙে যায়। অন্তরের গভীর থেকে প্রার্থনা করেন মৃত মানুষগুলোর জন্যে এবং অন্তরের গভীর থেকে ঘৃণা করেন উনাদের হত্যাকারীদেরকে। আবার এই একই সময়ে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী কিছু কিছু মানুষ মুসলিম হত্যায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন!

আবার একই সময়ে পৃথিবীর অন্য কোন প্রান্তে কোন খ্রিষ্টান অথবা ইহুদী হত্যা বা অপমৃত্যুর শিকার হলে ওই ধর্মের মানুষজনের গভীর দু:খ প্রকাশ এবং আগের একই মুসলমান তৃপ্তি সহকারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন যে পৃথিবী থেকে কিছু কাফের কমে গেলো!

বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুসলমানরা অত্যাচারের শিকার বা শোষণের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া। এই অবস্থায় কিছু মুসলিম বলবেন যে পুরো পৃথিবীতে এখন মেজরিটি হত্যা বা খুনের শিকার হচ্ছেন মুসলমানরা। পৃথিবীর সব ইহুদী-খ্রিস্টান শুধু মুসলিমদেরকে মারার জন্যে উঠেপড়ে লেগে আছে!

মুসলিম বিদ্বেষ কিংবা মুসলিম বিরোধী মনোভাব খুবই প্রকট বিশ্বের বেশিরভাগ রাষ্ট্রেই। তবে ব্যাপারটা কি শুধুই ব্যক্তিগত ঘৃণা বা বিদ্বেষ? নাকি অন্য কিছু ?

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হতেই পারে ব্যাপারটা ধর্মীয় বিদ্বেষ। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস বলে অন্য কথা, রাজনীতির কথা। বর্তমান সময়ে মুসলমানদের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খারাপ সময় যাচ্ছে এবং ইতিহাস সাক্ষী দেয় এই খারাপ সময় পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরকেও কোন না কোন এক সময়ে পার করতে হয়েছে।

কিভাবে?

পৃথিবীর অথবা পৃথিবীর ধর্মগুলোর ইতিহাস পড়েছেন?? Jared Diamond এর Guns, Germs and Steel অথবা Scot Adams এর The Religion War অথবা God’s Debris?!
Omer Bartov এর In God’s Name?
কিংবা বাংলায় ভবেশ রায়ের ‘বিশ্বজয়ের কথা’?

বইগুলোতে খুব ভালো করে লিখে দেওয়া হয়েছে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ। সভ্যতার ক্রমপরিবর্তনের সাথে সাথে সংস্কৃতি ও ধর্মের সাথে রাজনীতির সংমিশ্রণ এবং রাজনীতির মাঠে পুরুষ্ট ঢাল হিসেবে ধর্মের অপব্যবহার। একটু সময় করে বইগুলো পড়ে নিন, চিন্তা করতে কাজে দিবে।

গণহত্যা বা জেনোসাইডের নাম নিলে প্রথমেই আসে তেরশো শতাব্দীতে মঙ্গোলীয়দের কথা, খুব বিশেষ করে বললে চেঙ্গিস খানের কথা। আনুমানিকভাবে ধরা হয় প্রায় ৫ কোটি মানুষের গণহত্যা হয় মঙ্গোলীয় সময়ে!

জী! ভুল দেখছেন না, সত্যিই ৫ কোটি!
অনেক রেফারেন্সে ৬/৭ কোটিও ধরা হয়! তখন কিন্তু মুসলমান বা অন্য কোন ধর্ম দেখে মানুষ মারা হয় নি। মোটকথা এইসব ধর্মীয় কোন কারণ ছিল না।

তাহলে কেন নির্বিচার এই হত্যাযজ্ঞ?
কারণ তারা মঙ্গোলদের শাসনের বিরোধিতা করেছিল। শুধু এটুকুই যথেষ্ঠ ছিল যে কাউকে মেরে ফেলার জন্য। কেউ বিরোধিতা করেছে? তাকে মেরে ফেল! কি চাইনিজ, কি কোরিয়ান, কি আরব, কি তুর্কী, কি পারসিয়ান- মঙ্গোলরা কাউকেই ছাড়েনি।

আধুনিক সভ্যতার শুরুর দিকে সাম্রাজ্যবাদ ছিল মানব হত্যার প্রথম কারণ।

একটু খেয়াল করবেন যে তখন কিন্তু এরকম যুদ্ধ বিমান, বোমা, বন্দুক এসব ছিল না। হাত দিয়ে ব্যাবহার করা যায় এরকম ধারালো অস্ত্রই ব্যাবহার করা হয়েছিলো।

আপনি চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকুন- পাঁচ কোটি মানুষকে ছুরি কিংবা তলোয়ার দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে!!!

মঙ্গোলীয়দের পরে সবচেয়ে বড় গণহত্যা হয়েছিল ১৬শ শতাব্দীতে ইউরোপে যা ”Thirty Years War” নামে পরিচিত। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধর্মযুদ্ধ ধরা হয় এই যুদ্ধকে।
তাও মধ্য ইউরোপে?!
চমকে যাবার মতো না? এই সময়ের সবচেয়ে সভ্য জাতি! তারা কিনা ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ করা মানুষ মেরেছে মাত্র ৪০০ বছর আগে?!
৩০ বছর (২৯ বছর ১১ মাস ১ সপ্তাহ) ধরে যুদ্ধ চলে ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী এবং তাদের বিরোধীদের মধ্যে। অকালে মৃত্যু হয় প্রায় ৭৫ লক্ষ মানুষের! মজার ব্যাপার হচ্ছে রোমান শাসক দ্বিতীয় ফার্ডিন্যান্ড ক্ষমতায় আসার পরেই তার ক্যাথলিক ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া নিয়েই শুরু হয় যুদ্ধ। যার পুরোটাই রাজনৈতিক।

এরপরে চলে আসে খুব পরিচিত একটা নাম, এডলফ হিটলার! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ”The Holocaust” নামে পরিচিত এই গণহত্যায় আনুমানিক ৬০ লক্ষ থেকে এক কোটি কিংবা তারও বেশি ইহুদীকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেন এডলফ হিটলার! তবে এর মধ্যে ক্যাথলিক এবং খ্রিস্টানও ছিল উল্লেখযোগ্য।

তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা যাওয়া ৫ থেকে ৮ কোটি মানুষের তুলনায় হিটলারের ওই কিছু পরিমাণ ইহুদী হত্যা তো কিছুই না!
হিটলারকে সরাসরি দায়ী করা হয় প্রায় দু’কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে।

আফগানিস্তান যুদ্ধ প্রায় ৩ লক্ষ ৬০ হাজার, ইরাক যুদ্ধে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ আমেরিকা। বর্তমানে সিরিয়া এবং লিবিয়াতেও চলছে মৃত্যুর খেলা।

শান্তিতে নোবেল পাওয়া আন সাং সূ চি-ও কিন্তু ক্ষমতার গন্ধ পেয়েই মানুষ মেরে মেরে শান্তি রক্ষা শুরু করে দিয়েছিলেন!

ধর্মীয় দিক দিয়ে নিজেদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় হিসেবে দাবী করেন মুসলমানরা। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে এই দিকে আমার মুসলমান ভাইয়েরাও কিন্তু দুধে ধোয়া তুলশী পাতা নয়!!

১৯১৫ সালে Armenian genocide নামে পরিচিত গণহত্যায় তুর্কিরা হত্যা করে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ মানুষ। এর বেশিরভাগই ছিল খ্রিস্টান।

ইরাক-ইরান যুদ্ধে মারা যায় প্রায় সাড়ে ১২ লক্ষ মানুষ। এর মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ ইরাকী এবং সাড়ে ৭ লক্ষ ইরানি। এক মুসলমান ভাই আরেক মুসলমান ভাইকে আদর করে মেরে দিয়েছে আর কি!!

সৌদি আরব দিনে-দুপুরে বোমা মেরে হত্যা করছে স্কুলশিশুদের। মাত্র কয়েকদিন আগে আমেরিকার চুক্তি হওয়া ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র হাতে আসার পরে আরও কার কার উপর যে বোমা ফেলবে তাই এখন ভাবার বিষয়। উল্লেখ্য যে চুক্তির পর পরই কাতারের উপর এর কালো ছায়া পড়তে শুরু করেছে!

আহহা!!
পরের ঘরের খবর রাখতে গিয়ে তো নিজের ঘরের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম!!

আমাদের প্রতিবেশী মুসলিম দেশ, আমাদের ভাই, আমাদের জাতীয় ক্রিকেট প্রেম “ডাকলর্ড” ম্যারি মি আফ্রিদির দেশ পাকিস্তানের মুসলমান ভাইরাও কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের ৩০ লক্ষ মেরে দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালে এবং এর প্রায় বেশিরভাগই ছিল মুসলমান!

মুসলমান-মুসলমান ভাই ভাই। আমাদের মুসলমান ভাই পাকিস্তান! খুব আদর করেছিলে আমাদেরকে মুসলিম ভাই হিসেবে! মাত্র ২ লক্ষ ধর্ষণ করেছিলো ভালোবেসে!

ফিলিস্তিন নিয়ে আজকে পৃথিবীর মুসলমানদের চোখের পানি শেষ হয় না। ইহুদীরা জোর করে দখল করে নিচ্ছে ফিলিস্তিন। অথচ ৬৩৬-৩৭ খৃষ্টাব্দে যে মুসলমানরা স্থানীয় কিছু ইহুদীদের সহায়তায় ফিলিস্তিন দখল করে মুসলিম শাসন শুরু করেছিল এবং ইহুদীদেরকে বের করে বিতাড়িত করেছিল তার খবর তো রাখতে চাইনি। ইহুদীরা তাদের নিজেদের এলাকা পুনরুদ্ধার করছে একইভাবে যেভাবে তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল! কিংবা হিটলারের হাতে খুন হওয়া প্রায় ৬০ লক্ষ থেকে এক কোটি ইহুদীর হত্যা যার মধ্যে প্রায় ২৫ লক্ষ ছিল শিশু-কিশোর!

আপনি কেন তাদেরকে দোষ দেবেন ? তাদের দোষ কোথায় ?
পৃথিবীর মানচিত্র থেকে তাদেরকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল। তারা লড়তে শিখেছে। নিজেদেরকে শেষ হয়ে যেতে দেয় নি।

নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে কে ছাড় দেয়?
আপনি দেবেন?

সময় পাল্টেছে, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের উন্নতি হয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে সামরিক নীতির এর সাথে পাল্টেছে পুনরুদ্ধারের ধরণ। কিন্তু শেষ কথা তো একটাই নিজের স্বদেশ ফেরত চাই!

ইতিহাসে খুন হওয়া ইহুদীরা কি মানুষ ছিল না??
ইতিহাসে খুন হওয়া খ্রিষ্টানরা কি মানুষ ছিল না??
ইতিহাসে খুন হওয়া মুসলমানরা কি মানুষ ছিল না??

মহাবিশ্বের অনন্তকালের মধ্যে খুব ক্ষুদ্র একটা সময়ের জন্যে আমরা জীবন পাই।
একবার চোখ বন্ধ করলেই এই পৃথিবী আর নেই।

একবার ভাবুন, একবার চলে গেলেই চলে যাওয়া হল। অনন্তকাল কিংবা Infinity পর্যন্ত যাই হয়ে যাক না কেন আপনি আমি আর এই জীবন পাবো না। এই পৃথিবী পাবো না। সবকিছুই থাকবে শুধুমাত্র আপনি-আমি ছাড়া। জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া হচ্ছে জীবন।
এই জীবন আমরা এত তুচ্ছ মূল্যহীন করে ফেলি কেন ??
যে পৃথিবী ছিল জীবনের আখড়া সেই পৃথিবী এখন মৃত্যু উৎপাদনের মেগাফ্যাক্টরি!

পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই পবিত্র। প্রতিটি ধর্মই শান্তির কথা বলে, মানুষের কথা বলে।
মানব সভ্যতার উন্নতি ও মঙ্গলের কথা বলে।
শান্তির প্রসারই যখন প্রতিটি ধর্মের মূলমন্ত্র এবং সারকথা তবে ধর্মের নামে এত হানাহানি কেন পৃথিবীতে ?
ধর্মের নামে কেন এত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে?

প্রতিটি ধর্মেই খুব গুরুত্ব দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে মানুষের জীবনের মূল্যের কথা। কিন্তু মানুষ প্রকৃতিগত ভাবেই নৃশংস এবং স্বার্থান্বেষী। বিভিন্ন ধর্ম, নৈতিকতা, মনুষ্যত্ব এইসব ব্যাপারগুলো আসলে মানুষের ঠুনকো বাহ্যিক একটা আবরণ। পুরো মানব সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই মানুষ ধর্মকে ব্যাবহার করে আসছে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে। শান্তির ধর্ম হয়েছে স্বার্থান্বেষী মহলের ক্ষমতা গ্রাসের হাতিয়ার এবং ক্ষমতার পথে বাধা হওয়া মানুষ হত্যার ঢাল।

প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদ থেকে অপব্যবহার হতে হতে বর্তমান সময়কার আধুনিক পুঁজিবাদেও ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করা হচ্ছে ধর্মকে। বাহ্যিক-ভাবে পৃথিবীর সকল সময়ের সকল শাসকগণই ধর্মকে পুঁজি করে প্রণয়ন করেছেন শাসন ব্যবস্থা।

বাহ্যিকভাবে যে ধর্মেরই প্রলেপ থাকুক না কেন মনের ভেতরে পৃথিবীর সকল মানুষের একটাই নীতি ”Survival Instinct” কিংবা ”Survival for the fittest”। এর বাইরে বাকীটুকু পুরোটাই লোক দেখানো ভাঁওতাবাজি।

হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, ইহুদী, ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ, ইথনিক, কিংবা সেকুলার অথবা পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সবাই কিন্তু দিনশেষে একই স্বার্থপর মানুষ।

পার্থক্য একটাই-
”কেউ বাঁচতে গিয়ে মারে আর কেউ মেরে দিয়ে বাঁচে।”

Most Popular

To Top