ইতিহাস

একটি হত্যাকান্ড, যা কেড়ে নিয়েছিল ১ কোটি ৮০ লক্ষ প্রাণ!

neon aloy ফ্রানয ফারদিনান্দ নিয়ন আলোয়

সকালে পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙল গৃহকর্ত্রীর, প্রতিদিনের মত কর্মচারীদের সকালের রান্নার জন্য তাড়া দেন তিনি। গৃহকর্তাকে ডেকে তুললেন ঘুম থেকে। এটা তার রোজকার রুটিন। কিন্ত আজ দিনটা ভিন্ন, আজ তাদের ভালবাসার ১৪ বছর পূর্ণ হল। বৈবাহিক জীবনের ১৪ বছরে কত ঝড়, কত কষ্ট এসেছে কিন্ত তাদের ভালবাসা একটুও কমেনি। ভালবেসে তিনি উপহার দিয়েছেন দুই কন্যা ও এক পুত্র।

এতক্ষণ আমরা যাদের কথা বললাম তাঁরা হলেন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি’র হবু সম্রাট ফ্রানয ফারদিনান্দ ও তার স্ত্রী সোফি। আজকের দিনটা যেমন তাদের জন্য বিশেষ, তেমনি মানব ইতিহাসেও বিশেষ একটি দিন হয়ে থাকবে।

নিয়ন আলোয়

পরিবারের সাথে ফ্রানয ফারদিনান্দ

তাদের এই ভালবাসার পথ এত সুখের ছিল না। তার চাচা অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সম্রাট ফ্রানয জোসেফের শত অমত সত্ত্বেও তিনি সোফি চটেককে (Sophie Chotek) বিয়ে করেন। সোফির পরিবারের কেউ কখনো কোন রাজবংশের ছিল না। এজন্য তাঁকে বিয়ের পরও নানা অবজ্ঞা করা হত। যেমন রাতে পারিবারিক ভোজনে তাকে স্বামীর কাছে বসতে দেওয়া  হত না, নিরাপত্তার জন্য কোন দেহরক্ষী ব্যবস্থা ছিল না, এমনকি  বলা হত তার সন্তানরা কখনও সিংহাসনের দাবি করতে পারবে না।

২৮ জুন, ১৯১৪ ভোর বেলা সারাজেউ (Sarajeuo) এর একটি পার্টিতে অংশ গ্রহণের জন্য লিলযা (Lilza) হতে রেলগাড়িতে করে রওনা দেন। তাঁরা সারাজেউ এর একটা সেনানিবাসে ওঠেন। সকাল ১০ টায় তাদের গাড়ীবহর সারাজেউ এর Appel Quary এর উদ্দেশ্যে রওনা হয়| তাদের গাড়ীবহরে তিনটি গাড়ী ছিল। প্রথম গাড়ীতে তিনজন লোকাল ও পুলিশের নিরাপত্তা প্রধান ছিলেন, দ্বিতীয় গাড়ীতে সারাজেউ-এর পুলিশ প্রধান ও মেজর ছিলেন, তৃতীয় গাড়ীতে ফারদিনান্দ ও তার স্ত্রী সোফি ছিলেন| তাদের নিরাপত্তার জন্য সর্বমোট মাত্র ৬০ জন পুলিশ মোতায়েন ছিল।

প্রথম হামলাকারী মেহেদাসিচ (Mehedasic) হামলা করতে বার্থ হন। ১০ টা বেজে ১০ মিনিটের দিকে দ্বিতীয় হামলাকারী ফ্রানযের গাড়ী লক্ষ্য করে বোমা ছুঁড়েন। কিন্তু বোমা লক্ষ্যচ্যুত হয়। ১৫-২০ জন হতাহত হন। হামলাকারী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে চেয়েছিল, কিন্তু জনগণ তাকে ধরে গণপিটুনি দেয়।

গাড়ীবহর যথা সময়ে টাউন হলে পোঁছায় যেখানে মেয়র ফচিম চারচিচ (Fchim Carcic) তাদের সাদরে আমন্ত্রণ জানান। ফারদিনান্দ রেগে বলেন “মেয়র সাহেব, আমি এখানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছি আর আপনি আমাদের স্বাগত জানাচ্ছেন বোমাবাজি করে? মানে কি এসবের?” অনুষ্ঠান শেষ হবার পর ফারদিনান্দ বোমা হামলায় হতাহতদের দেখার জন্য হসপিটাল যেতে চান। যদিও অফিসার ও অনুষ্ঠানের সবাই তাকে নিষেধ করেছিলেন।

নিয়ন আলোয়

ফ্রানয ফারদিনান্দ

সবার নিষেধ উপেক্ষা করে তিনি হাসপাতালের দিকে রওনা হলেন। কে জানত তার জনদরদী মনোভাব তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাবে!

প্রথম হামলার বার্থতার ঘটনা ইতিমধ্যে হামলাকারী দলের বাকি সদস্যরা জেনে গেল। তাদের মধ্যে উনিশ বছর বয়সী প্রিন্সিপ (Princip) অন্যতম। সে খবর পাওয়ামাত্র গাড়ী যে রাস্তায় যাবে, তার মোড়ে একটা ফলের দোকানের পাশে অবস্থান নিল। ঈশ্বর হয়ত প্রিন্সিপের সাথে ছিলেন। কিছুক্ষণ এর মধ্যে ফারদিনান্দের গাড়ী চলে আসল। প্রিন্সিপের সাথে ছিল অটোমেটিক পিস্তল, তার বুকে ছিল একটাই প্রত্যয়- যেভাবে হোক সার্বিয়াকে রক্তচোষা অস্ট্রিয়ানদের হাত থেকে স্বাধীন করতে হবে। প্রিন্সিপ প্রথম গুলি ফারদিনান্দকে করে, এরপর সে গভর্নর পতিনর্ককে (Potinork) গুলি করতে উদ্যত হয়, কিন্তু গুলি ফারদিনান্দের স্ত্রী সোফির শরীরে লাগে এবং স্বামী-স্ত্রী দুইজনই মারা যান। যদিও প্রিন্সিপের কোন উদ্দেশ্য ছিল না ফারদিনান্দের স্ত্রীকে মারার।

এই ঘটনার এক মাসের মধ্যে জার্মানীর মদদে সার্বিয়ার বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করে অস্ট্রিয়া। অন্য দিকে রাশিয়া, ফ্রান্স এবং বেলজিয়াম সার্বিয়াকে সমর্থন দেয়। এভাবে ইউরোপর অনন্য পরাক্রমশালী দেশগুলো দুইটি মেরুতে বিভক্ত হয় এবং জন্ম নেয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা The great war। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে অস্ট্রিয়া ও সার্বিয়ার রেষের কারণে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, কিন্তু ভাগ্যদেবতা অনেক আগে থেকে এই যুদ্ধ লিখে রেখেছিলেন হয়তো!

নিয়ন আলোয়

অট্ট ভন বিস্মাক (Otto von Bismarck)

বিষয়টি পরিষ্কার হতে হলে আমাদের যেতে হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ‘খলনায়ক’ জার্মানীর ইতিহাসের দিকে। জার্মানী মূলত রোমান সাম্রাজ্যের অংশ। কালের বিবর্তনে রোমান সাম্রাজ্য ভাঙতে থাকে। জার্মানী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়। এর মাঝে দুইটি বড় রাজ্য প্রুসিয়া (Prussia) এবং অস্ট্রিয়া (Austria)। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ছিল ভিয়েনা, মূলত এটি পুরো জার্মানীর রাজধানী ছিল।

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে গোটা ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের জোয়ার আসে। সেই জোয়ারে জার্মানীও ভেসে যায়। কিন্তু প্রুসিয়া অস্ট্রিয়ার তুলনায় দ্রুত উন্নত হতে থাকে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভেদ বাড়তে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৭১ সালে প্রুসিয়ান মিনিস্টার অটো ভন বিসমার্ক (Otto Von Bismarck) এর নেতৃত্বে প্রুসিয়া আরও কিছু রাজ্য নিয়ে জার্মান সাম্রাজ্য ঘোষণা করে। এই ঘটনাকে ইতিহাসে বলে “The Unification of Germany”। এর কারণে গোটা ইউরোপে ক্ষমতার সমবণ্টন আনার প্রয়োজন পরে। এভাবেই রোপিত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বীজ। আর দ্রুত গতিতে ছুটতে থাকা উন্নয়ন ও ক্ষমতার দম্ভের কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অনেকটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।

ফারদিনান্দের  সেই হত্যাকারী প্রিন্সিপের বয়স ছিল মাত্র উনিশ বছর। তিন সপ্তাহ বিচার হবার পর তার বয়স মৃতুদণ্ডের জন্য কম হওয়ায় বিচারক তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন। ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে মাত্র ২৩ বছর বয়সে কারাগারে যক্ষ্মা রোগে আক্রন্ত হয়ে মারা যান তিনি। প্রিন্সিপ কারো কাছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের খলনায়ক, আবার কারো কাছে নির্যাতিত সার্বিয়ানদের স্বাধীনতার জন্য জীবন দেয়া এক নায়ক। যদিও তার হাতের অটোমেটিক পিস্তলের লক্ষ্য ফারদিনান্দ হলেও ট্রিগারে তার আঙ্গুলের এক চাপেই লেখা হয়ে গিয়েছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত এক কোটি আশি লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যু পরোয়ানা!

নিয়ন আলোয়

ফ্রানয ফারদিনান্দের আততায়ী প্রিন্সিপ

আসলে ইতিহাস তারাই লেখে যারা জিতে যায়।

 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top