ফ্লাডলাইট

আশরাফুলের ম্যাচ ফিক্সিং, এবং ভুলে যাওয়া কিছু পুরনো প্রশ্ন!

আশরাফুল ম্যাচ ফিক্সিং,নিয়ন আলোয় neon aloy

পুরানো একটা বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলবো, যেটা নিয়ে কখনোই কিছু বলিনি বা লিখিনি।

মোহাম্মদ আশরাফুল এবং ফিক্সিং নিয়ে কখনো কথা বলার ইচ্ছা ছিলোনা। কারন ফিক্সিং কখনোই সমর্থন করতে পারবো না। মোহাম্মদ আশরাফুলের শাস্তির ব্যাপারে তাই কোন আপত্তি নাই। শাস্তিটা আশরাফুলের প্রাপ্য ছিলো। আশরাফুলের জন্য সাফাই গাওয়া আমার উদ্দেশ্য না বরং সব ফিক্সারকেই শাস্তি পেতে দেখতে চাই আমি।

কিন্তু সত্যি সত্যি কি বিসিবি ফিক্সিং ইস্যুতে নিরপেক্ষ ছিলো? ফিক্সিং এর শিকড় কি বিসিবি উৎপাটন করেছিলো? নাকি এক আশরাফুলকে সাজা দিয়ে বাকি সবাইকে আড়াল করা হয়েছে?

অনেকেই আশরাফুলকে বেঈমান, দেশদ্রোহী বলে বিষয়টা ইতি টেনেছেন, কিন্তু কেউই বলেনা আশরাফুলের সাথে অন্য যারা ছিলো তাদের কেন শাস্তি হয়নি? সবাই বলে আশরাফুল দোষ স্বীকার করেছে ধরা পড়ার পর, আকসু (এন্টি করাপশন এন্ড সিকিউরিটি ইউনিট-আইসিসি) প্রমান দেওয়ার পর চাপে পড়ে স্বীকার করেছে সুতরাং আশরাফুলকে সাধুবাদ দেয়ার কি আছে? সাধুবাদ অবশ্যই দিবোনা কিন্তু এটাও সত্যি এক আশরাফুল ছাড়া কেউই দোষ স্বীকার করেনি। আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোন ফিক্সার দোষ স্বীকার করেনি, আদালতে যেয়েও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছে প্রায় সবাই।

আকসু বিপিএলে আসলে কি পেয়েছিলো? ঢাকা গ্লাডিয়েটরসের কয়েকটা ম্যাচ নিয়ে আকসু’র সন্দেহ ছিলো। অন্তত দুটি ম্যাচে ফিক্সিং নিশ্চিত হয়ে আকসু তদন্তে নামে। অধিকতর তদন্ত করে আকসু আশরাফুল এবং আরো কয়েকজনের জড়িত থাকার প্রমান পায়। খেয়াল করেন, আশরাফুল একা নয়, আরো কয়েকজন জড়িত থাকার প্রমান পায় আকসু।

তদন্ত চলার সময় আশরাফুল আকসুর কাছে আন্তর্জাতিক ম্যাচে স্পট ফিক্সিং করার কথা স্বীকার করে। সাথে এটাও জানায় ২০০৪ সালে জুয়াড়ীদের সাথে তার প্রথম পরিচয় হয় খালেদ মাহমুদ সুজন এবং খালেদ মাসুদ পাইলটের মাধ্যমে। বিষয়টা জানতেন মোহাম্মদ রফিক নিজেও। এমনকি পরে অন্য এক ঘটনায় আশরাফুলকে ৭ লাখ টাকা দেয়া হয় কিন্তু নির্ধারিত শর্ত পূরন না করেই আউট হয়ে গেলে ওই টাকা ফেরত দেন তিনি রফিকের মাধ্যমে। যদিও জুয়াড়ী টাকা ফেরত নেয়নি। অন্তত এরকম খবরই প্রকাশ পায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে

আকসু’র কাছে আশরাফুলের আন্তর্জাতিক ম্যাচে ফিক্সিং এর প্রমান ছিলো এটা কোন রিপোর্ট বা বক্তব্যে পাইনি। আশরাফুল নিজেই জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে জানান। এসব খবর সবই “লিকড” নিউজ, সাংবাদিকদের “গোপন সূত্র” মারফত পাওয়া খবর। আন্তর্জাতিক ম্যাচে ফিক্সিং করেছেন এমনটা না আশরাফুল নিজে মিডিয়াতে বলেছে, না আকসু বলেছে আর না-ইবা বিসিবি বলেছে। সুতরাং লিকড নিউজের সূত্রে যদি আশরাফুলের নিজের কথায় সে আন্তর্জাতিক ম্যাচে ফিক্সিং করেছে বলে ধরে নেয়া যায় তাহলে একই সূত্রে সুজন, পাইলট এবং রফিক এই তিনজন কেন ফিক্সার হবেনা? আর আকসুর কাছে যদি আগে থেকেই প্রমান থাকে তাহলে অবশ্যই ডিটেইলস প্রমান ছিলো, আশরাফুল এবং বাকি তিনজনেরই।

সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে বিসিবি এবং আইসিসি সংবাদ সম্মেলন করে শুধুমাত্র বিপিএলে ফিক্সিং করেছে এমন ৯ জন প্লেয়ার বা কর্মকর্তা আছে বলে জানায়। দীর্ঘ তদন্ত করে বিসিবি এবং আইসিসি কেন শুধুমাত্র বিপিএল ফিক্সিং এর কথা জানালো? যেখানে আশরাফুল নিজে আন্তর্জাতিক ম্যাচে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে? খুব সম্ভবত আন্তর্জাতিক ম্যাচ টানলে অনেকে ফেঁসে যায় তাই।

পয়েন্ট হচ্ছে বিসিবি এবং আইসিসি তদন্ত করে ৯ জনের নাম পেলো। এরপর একজন সাবেক বিচারপতিকে প্রধান করে করা তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে বিচার চলে, কয়েক দফা শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল জানায় ৬ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ প্রমানিত হয়নি, আশরাফুল নিজেই দোষ স্বীকার করেছেন এবং সাজা পেয়েছেন।

আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, আশরাফুল আগেই স্বীকার করেছেন তিনি ফিক্সিং করেছেন। এটা নিয়ে কথা নেই। কিন্তু বাকিদের বেলায় ট্রাইব্যুনালে কিছু প্রমান হয়না কিভাবে? বিসিবি এবং আকসু তথা আইসিসি তাহলে কি তদন্ত করে ৯ জন জড়িত পায়? আকসু’র তদন্ত কি তাহলে ভুয়া ছিলো? বিসিবি’র তদন্ত মিথ্যা ছিলো? কিসের উপর ভিত্তি করে তাহলে ৯ জন জড়িত দাবি করেছিলো?

আশরাফুল দোষ স্বীকার করেছেন, সুতরাং তার সাজা হবেই। কিন্তু বাকিদের বেলায় কিছুই পেলেন না ট্রাইব্যুনাল? এটা কিভাবে সম্ভব? একটা দলে আশরাফুল একাই ফিক্সার?

আকসু তদন্তের শুরুতেই যে আশরাফুলের সাথে আরো কয়েকজন জড়িত বলে জানিয়েছিলো সেটা কি মিথ্যা ছিলো? এখন মনেহয় আশরাফুল যদি সালমান বাট বা মোহাম্মদ আসিফের মত দোষ অস্বীকার করতো তাহলে অন্তত ট্রাইব্যুনালে দলিল-তথ্য দিয়ে আকসু’র প্রমান করা লাগতো, সেক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালে প্রকাশ্যে অনেক নাম চলে আসার সুযোগ ছিলো।

এই বিচার কেমন বিচার ছিলো যেখানে শুধু যে দোষ স্বীকার করে সেই সাজা পায়, আর বাকিরা পার পেয়ে যায়! আর বিসিবির উচিৎ ছিলো আরো উচ্চ আদালতে যাওয়া কারন তাদের তদন্ত ট্রাইব্যুনালে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তারা পেল ৯ জন অথচ ট্রাইব্যুনাল পেলো না! কিন্তু অদ্ভুত বিষয় বিসিবি তদন্ত প্রক্রিয়াই বন্ধ করে দিলো। এক আশরাফুল সাজা পেলো আর সব ঠান্ডা!

বিসিবি’র উচিৎ ছিলো বিষয়টা ধামাচাপা না দিয়ে আশরাফুলের কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গিয়েছিলো তার মাধ্যমে এই ফিক্সিং কেলেঙ্কারির শেকড় পর্যন্ত যাওয়া। তাহলেই ক্রিকেট কলঙ্কমুক্ত হতো। দোষ করেছে অনেকে সাজা পাচ্ছে আশরাফুল একা- এটা ন্যায়বিচার হয়নি।

বরং বিসিবি’র উচিৎ ছিলো আন্তর্জাতিক ম্যাচের বিষয়গুলোও আমলে নিয়ে বিচার করা। একজন ফিক্সার আশরাফুল নিষিদ্ধ অথচ অন্যান্য অভিযুক্ত সুজন জাতীয় দলের ম্যানেজার, পাইলট ঘরোয়া ক্রিকেটের কোচ এবং রফিক বিসিবি’র একাডেমি দলের স্পিন পরামর্শক। এ কেমন বিচার?

আমরা পত্রিকার “গোপন সূত্রে” এটাও জানি বিপিএলে মোশাররফ রুবেল, রবিন আর মোহাম্মদ রফিকের বিরুদ্ধে ফিক্সিং এর শক্তিশালী প্রমান থাকার পরেও অজানা হাতের ছায়ায় তারা পার পেয়ে গেছেন, আর ধরা পড়েছেন আশরাফুল।

আর একটা কথা। আমাদের সিনিয়র প্লেয়াররা অতীতে জুনিয়রদের গাইড করতে পারেনি ঠিকমত। এই ফিক্সিং বাদ দিলেও আইসিএলের কথা বলবো আমি, হাবিবুল বাশার মাত্র এক বছর আগেও জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন (২০০৭ সাল), রফিক তখন কিছুদিন আগেও জাতীয় দলের সেরা স্পিনার, সিনিয়র প্লেয়ার। তাদের চোখের সামনে যখন নাফিস, আফতাব, ধীমানদের মতো জাতীয় দলের নিয়মিত প্লেয়াররা আইসিএলে যায় তখন তাদের উচিৎ ছিলো সেটাকে প্রতিহত করা। তাদের ক্যারিয়ার তখন শেষ কিন্তু এদের তো মাত্র শুরু ছিলো- তাই না? বাশার আবার অধিনায়ক হয়েছিলেন। বাশারের মাধ্যমেই ঢাকা ওয়ারিওর্সের প্লেয়ার গোছানো হয়েছিলো শুনেছি পত্রিকা মারফত। অর্থাৎ, বাশার, রফিকরা সিনিয়র হিসেবে সঠিক পথ দেখাতে ব্যর্থ ছিলেন, আমার চোখে তারা অপরাধী।

আইসিএল শুনলে আফসোস হয়। এই আইসিএলে আশরাফুলের অফার ছিলো চার কোটি টাকা, সেই অফার ফিরায় দিতে পারলেন আর কয়েক লাখ টাকার জন্য ফিক্সিং করলেন! কি দরকার ছিলো আশরাফুল!!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top