লাইফস্টাইল

‘চিকিৎসায় অবহেলা’ বনাম ‘অতি-উৎসাহী সাংবাদিকতা’, ভুক্তভোগী কে?

নিয়ন আলোয়

১.

প্রায় ৬ বছর আগের কথা। অভিজাত পাড়ার এক ঝলমলে প্রাইভেট হাসপাতালে মর্নিং ডিউটি করছি।

আমি ছিলাম CCU এর দায়িত্বে। হঠাৎ খবর এলো হাসপাতালের VIP কেবিনে দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান ভর্তি হয়েছেন। আমি রিলাক্সড্ ফিল করলাম, কেবিনের দায়িত্ব আমার না।

রিলাক্সড্ অবস্থা বেশীক্ষণ স্থায়ী হলো না, মিনিটখানেকের ভেতরে কেবিনের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদ্বয় এসে জানালেন তারা আজকে CCU দেখবেন। দু’জনই আমার সিনিয়র। কাজেই ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা হিসেবে আমাকেই আগুনের মাঝে ঝাঁপ দিতে হলো।

পান্থপথের এক বিশেষায়িত হাসপাতালের কোন এক ছুটির দিন। কোনো এক ব্যক্তির মেজর অপারেশন হবে। মেইন সার্জন ওয়াশ নিয়ে বসে আছেন। যার অপারেশন হবে তিনি এই দেশের আইন কাঠামোর সাথে সংশ্লিষ্ট এক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি। অন্য সময় অ্যাসিট্যান্ট সার্জনের অভাব হয় না, এবার অভাব দেখা গেলো।

হাইপ্রোফাইল ব্যক্তি ও প্রাইভেট হাসপাতাল বাদ দেই। সরকারী হাসপাতালে আসি।

সকাল সকাল হাসপাতালে ঢুকে গত রাতে ইমার্জেন্সী ডিউটি করা ডাক্তারের সাথে কথা বলে মনটা খারাপ হলো। কথায় কথায় জানতে পারলাম, গতরাতে হার্ট ফেইলিউরের এক রোগীকে প্রয়োজনীয় একটি ইনজেকশন্ (Frusemide) না দিয়েই উচ্চতর হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।

ডাক্তারের সাথে কথোপকথনের কিছু নমুনাঃ
আমিঃ আর কিছু না হোক, ইনজেকশন ফ্রুসেমাইড’টা দিতে পারতা, রোগীটা শ্বাসকষ্টে রাস্তায়ই মারা যেতে পারে!
নাইট ডাক্তারঃ আরে রাখেন, রোগীর অবস্থা যায় যায়, ইনজেকশন দিমু ভালোর জন্য, পরে রোগী মারা গেলে মাইর তো খামুই। পরদিন পেপারেও ‘ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’ তে আমার নাম থাকবো।
আমিঃ নিজের বাপ হইলে কি করতা?
নাইট ডাক্তারঃ ধূর মিয়া, আপনে ইনজেকশন দিয়েন। আমি দিমু না, নিজে বাঁচলে বাপের নাম।

২.

উপরের ঘটনাগুলোয় একটা জিনিস স্পষ্ট। অধিকাংশ চিকিৎসক পেশেন্ট ম্যানেজ করার আগে এখন নিজের Safety ও Security-এর কথা আগে চিন্তা করছেন, পরে পেশেন্ট ম্যানেজম্যান্ট। ঘটনা কিন্তু এরকম হবার কথা ছিলো না, আজ থেকে ১৫ বছর আগেও অবস্থা কিন্তু এমন ছিলো না…..

Bronchial Asthma (এক ধরণের শ্বাসকষ্ট) তে চিকিৎসক Hydrocortisone ইনজেকশন দেবার পর রোগী মারা গেলো।চিকিৎসাটি সঠিক ছিলো। পরদিন পেপারে খবর বের হলো, ‘ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’। চিকিৎসককে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো।

এক নায়ক মারা গেলো। চিকিৎসকরা জরুরীভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন, নায়কসাহেব তা অগ্রাহ্য করে বিদেশে যাবার মনস্থির করেছিলো, বিধাতা অবশ্য তাকে সে সময় আর দেন নি।

ফলাফলঃ বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হবার পরও কিছু চিকিৎসককে এখনো ঘন্টার পর ঘন্টা আদালত প্রাঙ্গনে হাজিরার জন্য বসে থাকতে হয়।

এক শিশু মারা গেলো। শিশু বিশেষজ্ঞ সঠিক চিকিৎসাই দিয়েছিলেন। জনতার প্রহারের সাথে তাঁকে হজম করতে হয়েছিলো অপসাংবাদিকতার রিপোর্টিংকেও।

এহেন অবস্থায় চিকিৎসকরা আগে নিজের পিঠ বাঁচাবেন, সেটি কি অস্বাভাবিক?

৩.

আপনারা বুঝবেন কিনা জানিনা-তবে একটা কথা বলি। কোন চিকিৎসকই চান না যে তার রোগী মারা যাক, এটা তার জন্য ডিসক্রেডিট।

এই অনন্ত নক্ষত্রবীথি যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর তুলনায় মানুষের ক্ষমতা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়ে চিকিৎসকেরা মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর সময় পাশে থাকেন, যেটা সরাসরি ডিল করেন মহাক্ষমতাবান সৃষ্টিকর্তা।

সেই ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়েই এই চিকিৎসকেরা সময় সময় আপনাদের জন্য এক বুক সাহস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এটা কি তুচ্ছ করার মত কোনো বিষয়?

এখন যদি প্রশ্ন করিঃ এদেশে চিকিৎসকরা কি Freely রোগীদের উপর রোগীর স্বার্থে তাদের অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারছেন? যদি না পারেন, তবে কি বুঝতে পারছেন, তাদের কুণ্ঠাবোধের উৎস কোথায়?

৪.

কিছুদিন আগে পেপার পড়ছিলাম। ‘চিকিৎসকের নৈতিক স্খলন’- শিরোনাম দেখে ভিতরে পড়া শুরু করলাম। পরকিয়া সংক্রান্ত রসালো ব্যাপার-স্যাপার। সাংবাদিক সাহেব যাকে চিকিৎসক বলে অভিহিত করেছেন, তিনি আদতে কোন চিকিৎসকই নন, একজন কোয়াক!

মৃত্যুশয্যা থেকে চিকিৎসকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা আর মহান আল্লাহ’র ইচ্ছায় খাদিজা ফিরে এলো, পেপারে একটার পর একটা হেডলাইন। সাংবাদিক সাহেবেরা একেকদিন একেকজনের প্রশংসা করেন। চিকিৎসকদের প্রসংসা করতে কোনো সাংবাদিক সাহেবকে এগিয়ে আসতে দেখিনি, এটলিস্ট আমার চোখে পড়েনি।

যে চিকিৎসক নয় তাকে চিকিৎসক বানিয়ে পরকীয়ার রসালাপ তৈরি করে চিকিৎসক সমাজের সুনাম নষ্ট করতে সাংবাদিক সাহেবদের দ্বিধা নেই (ব্যতিক্রম আছে), তাদের দ্বিধা হয় ভালো কাজের প্রশংসা করতে। হলুদ সাংবাদিকতা আর কাকে বলে!

সাংবাদিক সাহেবদের বলি- “ভুল চিকিৎসা” এর কচকচানি বাদ দিন, চিকিৎসা ভুল না সঠিক ছিলো, সেটা এ বিষয়ের এক্সপার্টদের উপরে ছেড়ে দিন। তার চেয়ে বরং এক কাজ করুণ, লিখুন “চিকিৎসকের অক্লান্ত চেষ্টার পরও রোগী মারা গেলো”….বিলিভ মি অর নট, আমি বাজি ধরে বলতে পারি, এদেশের চিকিৎসকরা তাদের ক্ষুদ্র লজিস্টিক সাপোর্ট নিয়েই রোগী বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন।

৫.

সাংবাদিকদের কথা বললাম, এবার এদেশের জনগণের কথা বলি।

প্রখ্যাত এক ব্যক্তিত্ব দেশের বাইরে মারা গেলেন। দেশে এসে তার নিকটাত্মীয়রা ভুল চিকিৎসার অভিযোগে কানাঘুষা শুরু করলেন, আমেরিকার ঐ হাসপাতালের বিরুদ্ধে মামলা করার কথাও শুনলাম। বলে রাখি, ঐ হাসপাতাল ও তার চিকিৎসকদের টিকিটিও তারা স্পর্শ করতে পারেন নি।সেটা বাংলাদেশ না।

বিদেশে কোটি টাকা খরচ করে মারা গেলেও সমস্যা হয় না, এদেশে পান থেকে চুন খসলে ডাক্তারদের লাঞ্ছনা করা হয়। এদেশের জনগণ ভুলে যায়, এদেশের প্রত্যেক চিকিৎসক কত সীমাবদ্ধতার মাঝে থেকে শত শত রোগী দেখতে বাধ্য থাকেন।চিকিৎসকদের রূঢ আচরণ তারা করতে দেখেন, তার পেছনের কারণ তারা খুঁজতে যান না। এদেশের জনগণ ভুলে যায়, তারা এবং তাদের দেশের চিকিৎসকেরা এই দেশেরই আলো, হাওয়া, মাটিতে বড় হওয়া। এদেশের জনগণ কেন এমন মনে করে যে, এদেশের চিকিৎসক থেকে বিদেশী চিকিৎসকদের দরদ বেশী হবে? মায়ের চেয়ে মাসীর মমতা কি কখনো বেশী হয়?

বিদেশে রোগী মারা গেলে মাথা নিচু করে এদেশে ঢোকেন, দেশে মারা গেলেই ডাক্তারের দোষ! হিপোক্রেসীর একটা লিমিট রাখুন। যে আচরণ বিদেশে গিয়ে করেন, তা এদেশে চিকিৎসকদের সাথে করে দেখুন। সে ভালোবাসার শতগুণ আমরা ফেরত দিব, We promise।

৬.

‘জন্মিলে মরিতে হইবে’ কাজেই চিকিৎসক হিসেবে Sometimes we have to stop। কিন্তু সার্বিকভাবে চিকিৎসকরা এখন এতোটাই Insecured ফিল করেন যে, তারা এখন মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকেও ডি-শোল্ডারিং করে চলছেন। এ অবস্থা সামগ্রিকভাবে শুভ নয়, কাম্য নয়।

শরৎচন্দ্রের দেবদাসে’র শেষ কয়েকটি লাইন আমার খুব পছন্দের। লাইনগুলো বলিঃ “মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময় যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে-যেন একটি করুণার্দ্র স্নেহময়মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে……”

চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবায় আমরা নিরন্তর ছুটে চলি। একটা সময় মৃত্যুর কাছে আমাদের থামতে হয়। এই সময়টা রোগীর সাথে সাথে চিকিৎসকেও এই দেশের প্রেক্ষাপটে এক কঠিন সময় পার করতে হয়। আমরা চাই, ‘একটি করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে রোগীর জীবনের অন্ত হোক‘। আমরা চাই একটি Dignified end of life এর। এদেশ কি আমাদের সে অবস্থা নিশ্চিত করার সুযোগ দিবে?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top