ইতিহাস

জ্যোতির্ময় জ্যোতির্বিদ রাধাগোবিন্দ চন্দ্র

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র নিয়ন আলোয় neon aloy

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র। একজন পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষক এবং বাঙ্গালী।

জ্যোতির্বিজ্ঞান বা আকাশ বিষয়ক গবেষণা দুই ভাগে হয়। প্রথমত পর্যবেক্ষণমূলক (observational), দ্বিতীয়ত বিশ্লেষণমূলক (analytical)রাধাগোবিন্দ চন্দ্রর কাজ ছিলো পর্যবেক্ষণ নিয়ে। যার জন্ম হয় সেই অবিভক্ত ভারতবর্ষ থাকাকালীন সময়ে ১৮৭৮ সালের ১৬ জুলাই, যশোর জেলার বাগচর নামক এক পল্লীগ্রামে। যা বর্তমান বাংলাদেশের অংশে পড়ে

মজার ব্যাপার হলো, রাধাগোবিন্দের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিন্তু একেবারেই ছিলো না। প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলেন পরপর তিনবার। প্রবেশিকা হচ্ছে বর্তমান এসএসসি সমপর্যায়ের পরীক্ষা। সেই হিসেবে তিনি স্কুলের গণ্ডি পেরুতেই পারেননি। নিজেকে নিয়ে নিজেই লিখেছেন, ‘শেষবার প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হইয়া রাধাগোবিন্দ বিদ্যালয় পরিত্যাগ করেন, কিন্তু অধ্যয়ন পরিত্যাগ করেন নাইআর তারপর আমরা পেয়েছিলাম একজন অনন্য সাধারণ জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে।

অসমাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরে কর্মজীবনও ছিলো রাধাগোবিন্দর প্রচণ্ড সংগ্রামের। ছিলেন যশোর কালেক্টরেট অফিসের চাকুরে। পেশার প্রথমে কেরানি। অনেক পরে, প্রমোশন পেতে পেতে অবসরের আগে হয়েছিলেন কোষাধ্যক্ষ। বিয়ে একুশ বছর বয়সে। জনক, দুই সন্তানের।

বড় হয়েছিলেন অসচ্ছল পরিবারে। যেখানে ভাঙ্গা ঘরের ভাঙ্গা চালের ফাঁক দিয়ে রাতে আকাশ দেখা খুব স্বাভাবিক ব্যাপারতখন থেকেই হয়তো তার কৌতূহল আকাশ নিয়ে। তারপর স্কুলে হাতে পান বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী লেখক অক্ষয়কুমার দত্ত’র জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য বই – চারুপাঠ। যেখান থেকে তার জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পথ চলার শুরু। সে সম্পর্কে রাধাগোবিন্দ’র আত্মকথায় পাওয়া যায়, ‘অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ পড়িয়া, নক্ষত্রবিদ হইবার জন্যে আর কাহারো বাসনা ফলবর্তী হইয়াছিল কিনা জানি না, আমার হইয়াছিল। সেই উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল বাসনার গতিরোধ করিতে আমি চেষ্টা করি নাই’চারুপাঠে কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে একটাই প্রবন্ধ ছিলো। নাম – ব্রহ্মাণ্ড কি প্রকাণ্ড”

প্রত্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশে বড় হতে থাকা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে উৎসাহী রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের পক্ষে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে জানাটা সহজ ছিলো নাতার এমন একটি বিষয়ে উৎসাহ যে সম্পর্কে চেনা জানা কেউ নেই মেন্টরিং করারনেই বইপত্র। তারপরেও খুঁজে পেতে আকাশ ও জ্যোতিষ্কদের নিয়ে যা পাওয়া যায় তাই পড়তেন, যারা এই বিষয়ে অগ্রগণ্য বা কিছুটা জানতেন, তাদের খুঁজে পেতে কথা বলতেন। আড্ডা দিতেন, তাদের সংস্পর্শে সময় কাটাতেন। বুঝার চেষ্টা করতেন এবং আকাশ দেখতেন। ব্যাপারটি ছিলো শখের, অনুসন্ধানের। বয়স বাড়ার সাথে সাথে অনুসন্ধানের শখটি পরিণত হলো গবেষণায়।  

রাধাগোবিন্দর প্রথম গবেষণামূলক কাজ বলা যায় হ্যালির ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করা। স্থান, সেই পরিচিত নিবাস-যশোর। সময়, ১৯১০ সালের এপ্রিল মাস। ধার করা ছোট একটি বাইনোকুলার দিয়ে তিনি তখন পর্যবেক্ষণ শুরু করেন।

তারপর আস্তে ধীরে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে বৃদ্ধি পেলো তার মহাকাশ পর্যবেক্ষণ। পর্যবেক্ষণগুলো সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে লাগলো। দিন দিন তিনি বুঝতে পারছিলেন এই ছোট বাইনোকুলার আর কুলোচ্ছে না। ১৯১২ সালে তিনি নিজের বেতনের সিংহভাগ জমানো টাকা আর জমি বিক্রি করে দিয়ে প্রাপ্ত টাকা একত্র করে ৩ ইঞ্চি ব্যাসের একটি টেলিস্কোপ কিনেন।

রাতের আকাশ ছিলো বলতে গেলে তার মুখস্থ। যে সব নক্ষত্রগুলো রাতের আকাশে দেখা যায়, সেই সব কোথায় কি আছে নিমিষেই বলে দিতে পারতেন। এরপর, ১৯১৮ সালের ৭ই জুন। তিনি দেখেন বেশ উজ্জ্বল একটি নক্ষত্র রাতের আকাশে। যা কোন ধরণের পরিচিত তারাচিত্রেই নেই। এটি ছিল নোভা অ্যাকুইলা-৩জ্যোতির্বিজ্ঞানে নোভা বলতে দৃশ্যমান সেই সব জ্যোতিষ্কদের বলা হয় যারা হুট করে প্রচণ্ড উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং আস্তে আস্তে পূর্বের অবস্থায় ফিরতে কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় নেয়। নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণের জন্য মূলত নোভা দেখা যায় পৃথিবী থেকে।

রাধাগোবিন্দ তার এই নোভা পর্যবেক্ষণ এবং সেই সম্পর্কিত তথ্য বিখ্যাত হার্বাড মানমন্দির-এ পাঠান। ফলশ্রুতিতে তাকে করে নেওয়া হয় আভসো’র সদস্য। আভসো বা AAVSO এর পূর্ণরূপ- American Association of Variable Star Observers এটা এমন একটা সংগঠন যারা কাজ করেন বিষম নক্ষত্রদের নিয়ে। এদিকে এস্ট্রোনোমিকাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার জার্নালের তথ্য অনুসারে রাধাগোবিন্দ এশিয়ার প্রথম নোভা অ্যাকুইলা এর আবিষ্কারক

আভসো’র সদস্য হয়ে কাজ করা শুরু করার পর তার কাজ ত্বরান্বিত হতে থাকে। ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়সাথে হতে থাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি। এই সময়ে তিনি শুরু করেন তার সব চাইতে পছন্দর বিষয় বিষম তারা নিয়ে কাজ করা, যা স্বীকৃত তার গবেষণার মূল কাজ হিসেবে।

আমরা আকাশ যখন দেখি, তখন তারাদের মিটিমিটি করতে দেখি। এটা হয় আমাদের বায়ুমণ্ডলের জন্য। বায়ুমণ্ডলের বাঁধায় নক্ষত্রর আলো সরাসরি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে আসে না বিধায় এই মিটিমিটি দেখা। এই মিটিমিটি করে জ্বলাকে উপেক্ষা করলে অথবা বায়ুমন্ডলের বাধা বিবেচনা থেকে বাদ দিলেও এমন কিছু তারা দেখা যায়, সেগুলোর ঔজ্জ্বল্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ে-কমে। এই হ্রাস-বৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর হয়। যে তারাগুলোতে উজ্জ্বলতার এমন হ্রাস-বৃদ্ধি দেখা যায় তাদের বলা হয় বিষম তারা, ইংরেজিতে Variable Star এই বিষম তারাদের মাঝে অন্যতম প্রধান ধারার একটি হচ্ছে Cepheid Variable Star , যেখানে নক্ষত্রর আঁকার এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে নক্ষত্রর আচরণ বিষম হয়।  অন্যটি আরেকটি পরিচিত ধারা Eclipsing Variable Star, এখানে একটি নক্ষত্র অন্য আরেকটি নক্ষত্রকে নিয়ে বাইনারি ব্যবস্থা তৈরি করে ঘুরার সময় একটার আড়ালে অন্যটা হারিয়ে যায়। আবার ফিরে আসে। আমরা দেখি তারাটির উজ্জ্বলতার কম বেশি হচ্ছে।

রাধাগোবিন্দ বিষম তারা গুলো পর্যবেক্ষণ করতেন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে। বিষম তারাগুলো পাশের কোন স্থির উজ্জ্বল তারা সাথে তুলনা করে লিপিবদ্ধ করতেন প্রাপ্ত তথ্য। পর্যবেক্ষণগুলো করতেন তার সেই তিন ইঞ্চি টেলিস্কোপ দিয়ে। রাধাগোবিন্দর কাজ এতোটাই চমৎকার ও সূক্ষ্ম হচ্ছিলো যে তার কাজে সহায়তার জন্য ১৯২৬ সালে আভসোর উদ্যোগে ৬ ইঞ্চি ব্যাসের একটি প্রতিসরণ টেলিস্কোপ জাহাজে করে আমেরিকা থেকে পাঠানো হয়।

১৯১৯ থেকে ১৯৫৪ সালে ৩৭,২১৫টি বিষম বা ভ্যারিয়েবল নক্ষত্র সম্পর্কে তিনি আভসো’কে তার পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্য সরবরাহ করেছিলেন! যা সেই সময়ে সহায়তা করেছিলো বিষম তারাদের শ্রেণিবিভাগ তৈরিতে। সাথে রাধাগোবিন্দর পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্য নিয়মিত ভাবে ব্যাবহার হতো নানান জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক রিপোর্ট এবং জার্নালে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পৃথিবীর বিখ্যাত সব গবেষণা পত্রে।

গত ২০১৫ সালে একশ বছরের উল্লেখযোগ্য ভ্যারিয়েবল স্টার পর্যবেক্ষকের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে আভসোযেখানে মোট ৬৬ জন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কথা বলা আছে যারা কাজ করেছেন বিষম তারা পর্যবেক্ষণ নিয়ে। সেই তালিকায় তিনিই একমাত্র বাঙ্গালি এবং ভারতীয় উপমহাদেশের একমাত্র জ্যোতির্বিদ। (লিংক)

তারপর অনেক বছর ধরে অনেক কাজের পরে রাধাগোবিন্দ যখন বুঝতে পারলেন তার বয়স হচ্ছে,  গবেষণার মতো পর্যবেক্ষণ করার অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছেন, তখন তার আভসো থেকে পাওয়া ৬ ইঞ্চি টেলিস্কোপটি ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। হাত ঘুরে সেটা পান ভাইনু বাপ্পুযিনি ছিলেন আরেকজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। তাকে বলা হয় বর্তমান ভারতের আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক। ভাইনু টেলিস্কোপটি সংরক্ষণ করেন কাভালুর মানমন্দিরে রাধাগোবিন্দ চন্দ্রর স্মৃতিকে উদ্দেশ্য করে।

বিষম তারা ছাড়াও রাধাগোবিন্দ বিভিন্ন গ্রহ, চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ, উল্কা ইত্যাদি নানা ঘটনা সম্পর্কে নিখুঁত পর্যবেক্ষণ তথ্য সংগ্রহ করেছে 

ফলশ্রুতিতে ততদিনে রাধাগোবিন্দ আভসো ছাড়াও সদস্যপদ এবং সম্মাননা পেয়েছেন, ব্রিটিশ এস্ট্রোনোমিকাল এ্যাসোসিয়েশন, অ্যামেরিকান মেটেওর সোসাইটি, অ্যামেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্টোরি ও ফ্রান্সের লিয়ো অবজারভেটরির মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে। আর ফ্রান্সের শিক্ষা অধিদপ্তর ১৯২৮ সালে তাকে সম্মানসূচক উপাধি দিয়েছিলেন Officer d’ Academic’

১৯৪৭ সালে অবিভক্ত ভারত রাজনৈতিক কারণে বিভক্ত হলে রাধাগোবিন্দ দেশবিভাগের বেশ কয়েক বছর পর সপরিবারে ভারতে চলে যান। ততদিনে তিনি অবসর নিয়ে নিয়েছিলেন যশোর কালেক্টরেট অফিসে থেকেতার অনেক পরে রাধাগোবিন্দর মহাপ্রয়াণ ঘটে ১৯৭৫ সালের এপ্রিলের ৩ তারিখ ভারতের বারাসাত এলাকায়। পরিসমাপ্তি ঘটে একজন স্বশিক্ষিত জ্যোতির্বিজ্ঞানীর নশ্বর জীবনের। মৃত্যুর পূর্বে তিনি শুধু গবেষণাই করেননি লিখেছিলেনও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য। লিখতেন নিয়মিত বিখ্যাত দেশ, প্রবাসী, জ্ঞান ও বিজ্ঞান সহ বিভিন্ন পত্রিকায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের চমকপ্রদ ঘটনা এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ নিয়ে। তাছাড়া এর বাইরে তিনি লিখেছেন চারটি বই। ধূমকেতুসৌরজগৎসবিতা ও ধরণীএবং, নক্ষত্রজগৎযার মাঝে শুধু মাত্র ধূমকেতু বইটি প্রকাশিত হয়েছিলো তার জীবদ্দশায়।

পরিশেষে, তার কর্মজীবন, অবসর জীবন নিয়ে সমগ্র জীবনটাকেই তুলনা করা হয় প্রাচীন ভারতীয় মুনিঋষিদের সাথে। নিভৃতচারী, নৈশ তাপস, অনুসন্ধিৎসু, নিষ্ঠা ও ধৈর্যের বলে যিনি সর্বদা সংগ্রাম করেছেন, তারপর পরিণত হয়েছিলেন পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানে অনন্য এক ব্যাক্তিত্বে। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য, রাধাগোবিন্দ চন্দ্র বিশ্বব্যাপী যথোপযুক্ত সম্মান আর স্বীকৃতি পাবার পরেও বাঙ্গালি হয়েও বাংলাদেশের মানুষের কাছে তার পরিচয় অনেকটা অজানাই রয়ে গিয়েছে। তারপরেও তিনি অনুপ্রেরণার নিদর্শন হিসেবে দেখিয়ে গিয়েছেন সামাজিক প্রতিকূলতা আর পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকেও কি করে বিশ্বমানের গবেষণা কাজ করতে হয় শুধুমাত্র আগ্রহ, নিষ্ঠা আর একাগ্রতা দিয়ে।

[লেখাটি এর আগে বিজ্ঞানপত্রিকা “পর্যবেক্ষণ” এ প্রকাশিত হয়েছিলো]

তথ্যসূত্র :
১. বাংলার জ্যোতির্বিদ – নাঈমুল ইসলাম অপু
২. https://www.aavso.org/
৩. রাধা গোবিন্দ চন্দ্র – সুজন কুমার দেব
৪. Rada G. Chandra : A little known Indian Astronomer and the AAVSO – Dr. R. Chakrabarti
৫. https://www.aavso.org/media/jaavso/3073_1.pdf

[আপনার জানা আছে এরকম কোন নিভৃতচারী গবেষকের কথা? আমাদের সাথে শেয়ার করুন neonaloymag@gmail.com ঠিকানায় ইমেইল করে।]

Most Popular

To Top