ফ্লাডলাইট

জিম্বাবুয়েঃ ভস্ম থেকে উঠে আসবে কি ফিনিক্স?

জিম্বাবুয়ে ফিনিক্স নিয়ন আলোয় neon aloy

ওয়ানিদু হাসারাঙ্গাকে মাথার উপর দিয়ে ছয় মেরেই উল্লাসে শূন্যে লাফ দিলেন সিকান্দার রাজা, বাঁধভাঙা উল্লাস জিম্বাবুয়ের ড্রেসিংরুমের সামনের বেলকনিতে। ধুঁকতে থাকা জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে যেন প্রাণের সঞ্চার, সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলোর দেখা, মাত্রই যে ইতিহাস রচিত হয়েছে হাম্বানটোটায়! একটা দুইটা বছর না, পাক্কা ষোল বছর পর বিদেশের মাটিতে কোন টেস্ট-প্লেয়িং দেশের বিরুদ্ধে সিরিজ জয়! সেই ২০০১ সালে বাংলাদেশের সাথে জয়ের পর শ্রীলংকার সাথে আজকে সিরিজ জয়। আট বছর পর বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়। ২০০৯ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিলো প্রসপার উৎসেয়ার জিম্বাবুয়ে। সাথে যোগ হলো আরো একটি রেকর্ড, শ্রীলংকার সাথে প্রথম সিরিজ জয়।

এই সিরিজ জয় শুধু সিরিজ জয় না, এই সিরিজ জিম্বাবুয়েকে নতুন এক চেহারায় দেখালো। পুরা সিরিজ জুড়ে একটা মাত্র ম্যাচ বাদ দিয়ে ব্যাট হাতে শাসন করেছে জিম্বাবুয়ে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনশো তাড়া করে জিতেছে কোন দল শ্রীলংকার মাটিতে আর সেটা প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ে। সিরিজে দুইবার তিনশোর উপরে রান হয়েছে। সেঞ্চুরী পেয়েছেন সলেমান মিরে আর পুরানো যোদ্ধা হ্যামিল্টন মাসাকাদজা। এমন দাপুটে একটা জয় অবশ্যই জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের জন্য বিশেষ কিছুই। বিশেষ করে শ্রীলংকার মাটিতে শ্রীলংকাকে হারানো সহজ কাজ নয়।

সময়টা খারাপ যাচ্ছিলো জিম্বাবুয়ের জন্য। বছরের শুরুতে আফগানিস্তানের সাথে সিরিজ হার, গত মাসে স্কটল্যান্ডের সাথে ১-১ সিরিজ ড্র, নেদারল্যান্ডের সাথে লিস্ট “এ” ম্যাচের সিরিজে এক ম্যাচে পরাজয় (২-১)। অবশ্য ইংলিশ কন্ডিশনে এই দলের কারো খেলার অভিজ্ঞতা নাই সম্ভবত, কারন ২০০৪ সালের পর আর ইংল্যান্ড সফর করেনি জিম্বাবুয়ে।

তবে এই সিরিজের পর মনে হচ্ছে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং তিন বিভাগেই যথেষ্ঠ উন্নতি করেছে জিম্বাবুয়ে। দলরে কোচিং প্যানেলটাও যথেষ্ঠ অভিজ্ঞ। সাবেক জিম্বাবুইয়ান লিজেন্ড হিথ স্ট্রিক আছেন হেড কোচ হিসেবে, তার সাথে আছেন সাউথ আফ্রিকার দুই লিজেন্ড, ব্যাটিং কোচ ল্যান্স ক্লুজনার আর বোলিং কোচ মাখায়া এনটিনি।

একের পর এক ধারাবাহিক সমস্যার কারনে জিম্বাবুয়ে হারিয়েছিলো কিছু অসাধারন প্রতিভা। শন আরভিন, এন্ডি ব্লিগনাটের মতো কিছু প্লেয়ার দেশে ছেড়েছিলেন। আবার বর্তমানে নিউজিল্যান্ড দলে খেলা কলিন ডি গ্রান্ডহোম, ইংল্যান্ড দলে খেলা গ্যারি ব্যালান্সরা তরুন বয়সেই দেশ ছাড়েন। বর্তমানে ইংলিশ কাউন্টি দল সারের দুই ভাই স্যাম কারেন আর টম কারেন তারাও জিম্বাবুয়ের সন্তান।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে জিম্বাবুয়ে। প্রধান নির্বাচক হিসেবে আনা হয়েছে টাটেন্ডা টাইবুকে, হেড কোচ হিসেবে দ্বায়িত্ব নিয়েই হিথ স্ট্রিক উদ্যোগ নেন ভিনদেশে পাড়ি জমানো ক্রিকেটারদের ফিরিয়ে আনার। প্রথমেই ফিরিয়ে আনেন অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানো সলেমান মিরেকে। প্রায় দুই বছরের বেশি সময় পর ফিরে সলেমান মিরে মাসাকাদজার সাথে গড়ে তুলেছেন বিধ্বংসী এক জুটি। তার বিগ হিট গুলা দেখে বোঝা যায় কেন বিগ ব্যাশের দল মেলবোর্ন রেনিগেডস তাকে দলে নিয়েছিলো। শোনা যাচ্ছে কলপ্যাক চুক্তির মেয়াদ শেষে আগামীবছর ফিরে আসবেন ব্রেন্ডন টেইলর এবং কাইল জার্ভিস।
এগিয়ে এসেছে আইসিসি, ঋণের সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট বোর্ডকে বিভিন্ন ধারদেনা মেটানোর জন্য দিয়েছে ১৯ মিলিয়ন ডলার।

জিম্বাবুয়ের এখন দরকার পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলার সুযোগ। আর সেটাই সমস্যা। বড় দলগুলার উচিৎ জিম্বাবুয়ের সাথে সিরিজ খেলা। ভুলে গেলে চলবেনা এই জিম্বাবুয়ের ছিলো একটা সোনালী অতীত। রাজনৈতিক কারনে ইংল্যান্ডের সাথে ২০০৪ সালের পর থেকে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ, একই কারনে অস্ট্রেলিয়া ২০১৪ সাল পর্যন্ত সফর করেনি। ভারত সাম্প্রতিক সময়ে দুইবার সফর করে অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সাহায্য করেছে। বাকি দলগুলো জিম্বাবুয়ে সময়ে সময়ে গেলেও নিজেদের দেশে ডাকছেনা খেলার জন্য।

আজ জিম্বাবুয়ে সিরিজ জেতার পর খেয়াল করলাম আমাদের দেশে তাদের প্রচুর ফ্যান আছেন। খুবই ভালো লেগেছে দেখে। কারন জিম্বাবুয়ে আমাদের খুবই খারাপ সময়ের বন্ধু। বাংলাদেশের সাবেক কোচ ডেভ হোয়াটমোর বলেছিলেন আমাদের প্রথমে জেতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, সেটা ২০০৫ সালের দিককার কথা। সেই অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য আমরা কেনিয়া, জিম্বাবুয়ে, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডের সাথে সিরিজ খেলেছি ২০০৮ সাল পর্যন্ত নিয়মিত। জিম্বাবুয়ের সাথে খেলেছি ২০১৬ সাল পর্যন্ত। একথা বললে মিথ্যা বলা হবেনা যে বাংলাদেশের জেতার অভ্যাস গড়ে উঠেছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয় পেয়ে পেয়েই। আমাদের তামিম, সাকিব, মুশফিকরা তাদের ক্যারিয়ারের শুরুতে প্রতিপক্ষ হিসেবে সবচেয়ে বেশি পেয়েছে এই জিম্বাবুয়েকে। তাদের হাত পেকেছে জিম্বাবুয়ের সাথে খেলেই। প্রতিবছর অন্তত একটা সিরিজ যেন নিয়ম ছিলো! মজা করে মানুষ বলতো “গরীবের এশেজ”, মর্যাদার লড়াই।

সেই দিনগুলো আমরা যেন ভুলে না যাই। আর জিম্বাবুয়ের এই ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ে বিসিবি যেন তাদের পাশেই থাকে সেটাই প্রত্যাশা করি। অনেকেই এখন বলেন জিম্বাবুয়ের সাথে খেলে কি হবে? জিম্বাবুয়ের সাথে খেলা আর্থিকভাবে লাভজনক নয় ইত্যাদি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই খারাপ সময়ের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু।
যাইহোক, জিম্বাবুয়েকে সিরিজ জয়ের জন্য অভিনন্দন। পুরো সিরিজেই জিম্বাবুয়ের খেলা দেখে দারুন বিনোদন পেয়েছি। প্রশংসা তাদের প্রাপ্য।

আর বাংলাদেশের সকল জিম্বাবুইয়ান ফ্যানদের সাথে তাল মিলিয়ে একটাই চাওয়া- এখান থেকেই যেন ঘুরে দাঁড়ায় জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট, যেন ফিরে আসে নব্বই-এর দশকের সেই সোনালী জিম্বাবুয়ে। আরো অনেক অনেক সাফল্যের প্রথম সাফল্য যেন আজকের এই সিরিজ জয়টাই হয়, এটাই হোক সাফল্যের শুরু।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top