ইতিহাস

অর্ধশত বছর যুদ্ধ করা এক যোদ্ধার গল্প

গিসলেইন কার্টন নিয়ন আলোয় neon aloy

কিছু মানুষের নেই মৃত্যুর ভয়, আর কারো কারো নেই ব্যাক্তিগত ক্ষতির শঙ্কা। কিন্তু এ দুটোকেই জয় করে অর্ধশত বছর যুদ্ধ করে যাওয়া এক যোদ্ধা হলেন আদ্রিয়ান পল গিসলেইন কার্টন ডি ওয়ার্ট। তার প্রতিটি যুদ্ধের ক্ষত যেন তার একেকটি যুদ্ধের সাক্ষী। তিনি জন্মগ্রহন করেন ৫ই মে ১৮৮০ সনে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস শহরে। তার মা ছিলেন আইরিশ বংশোদ্ভূত আর বাবা ছিলেন বেলজিয়ামের এক অভিজাত পরিবারের সদস্য। তবে পরবর্তীতে জানা যায় তিনি বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের অবৈধ সন্তান ছিলেন। শিশু বয়সে তিনি বেলজিয়াম এবং ইংল্যান্ডেই বড় হন। কিন্তু ছয় বছর বয়সে মা মারা গেলে তার জীবনে নেমে আসে পরিবর্তন। এরপর তার বাবা পরিবার নিয়ে মিশরের কায়রো চলে আসেন। সেখানে তার বাবা আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে ওকালতি করেন এবং আবার শেষ বয়সে বিয়ে করেন। আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সৎ মা এসেই গিসলেইনকে পাঠিয়ে দেন ইংল্যান্ডের এক বোর্ডিং স্কুলে। পরবর্তীতে এখান থেকে পাশ করে তিনি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু বেশীদিন চালিয়ে যেতে চাইলেন না কলেজ, কেননা এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ঘিরে ডাচ এবং ব্রিটিশদের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় দ্বিতীয় বোয়ের যুদ্ধ।

যদিও সে সময় তার বয়স ছিল ২০ বছর, কিন্তু যুদ্ধে নাম লেখাতে তিনি তার বয়স ২৫ বছর বলে দাবি করেন এবং স্কুলের পাট চুকিয়ে “ট্রুপার কার্টন” হিসেবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নাম লেখান। তবে দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হন এবং তাকে ইংল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়। এসময় তার বাবা জানতে পারে যে কার্টন লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছেন এবং এতে বেশ ক্ষিপ্ত হন তিনি। মজার ব্যাপার হল গিসলেয়ান কার্টন তার বাবাকে বলেন, তার ডাচদের উপর কোন ক্ষোভ নেই, বরং ব্রিটিশরা তাকে না নিলে তিনি ডাচদের হয়ে যুদ্ধ করতেন। কারণ তার নেশাই ছিল যুদ্ধ!

পরবর্তীতে গিসলেইন দ্বিতীয় রাজকীয় অশ্বরোহী বাহিনীতে যোগদান করেন এবং তাকে দক্ষিণ আফ্রিকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পরেই ১৯০১ সনের সেপ্টেম্বরে কার্টনকে সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট হিসেবে ৪র্থ ড্রাগন ব্যাটালিয়নে পাঠানো হয়। ১৯০২ সনে ডাচদের পরাজয়ের পর দুই বছর তিনি ইন্ডিয়া ছিলেন এবং এরপর আবারো তাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠানো হয়। এর দুই বছর পর কার্টনের সাহসিকতা এবং এত অল্প বয়সে যুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ব্রিটিশ নাগরিকের মর্যাদা দাওয়া হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কার্টনকে সোমালিয়াল্যান্ড-এ স্টাফ অফিসার হিসেবে পাঠানো হয় সোমালিয়াল্যান্ড ক্যামেল কোর এর দায়িত্ব দিয়ে। সোমালিয়াল্যান্ড সেসময় ছিল বর্তমান সোমালিয়ার একটি অংশ যেখানে এক ধর্মান্ধ বিদ্রোহীগোষ্ঠী তাদের শাসনে সোমালিয়াল্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটেন, ইতালি ও ইথিওপিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সূচনা করে যা দীর্ঘ ২০ বছর স্থায়ী হয়। সোমালিয়া তখন দক্ষিন আফ্রিকার অংশ ছিল। কার্টন এ যুদ্ধেই অংশগ্রহন করে তার সামরিক ক্যারিয়ারের সর্বপ্রথম পদক লাভ করেন। সোমালিয়াল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহীরা ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল এবং তারা নানভাবে ইউরোপিয়ান ও ইথিওপিয়ানদের আক্রমণ করত। কার্টন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে শিম্বার বেরিস নামক স্থানের বিদ্রোহী ঘাঁটিতে আক্রমণ করেন। কিন্তু বিদ্রোহীদের পরপর দুইটি গুলি তার মুখে এসে লাগে এবং তিনি তার বাম চোঁখ আর কানের একাংশ হারান। আহত হওয়ার পর তাকে যখন ইংল্যান্ড নিয়ে আসা হয়, তখন সেখানকার স্যার ডগলাস শিল্ড’স নার্সিং হোমের স্টাফ সার্জন তার চোখমুখের অদম্যতা দেখে বুঝে যান এটাই তার শেষ নয়। বরং তিনি বলেন, এটাই দরকার ছিল তার যুদ্ধে যাওয়ার সাহসের জন্য। এ আঘাতে তিনি ভেঙ্গে না পড়ে সেখান থেকে নিলেন প্রেরণা। তার এত উদগ্রীবতা দেখে সুস্থ হওয়ার আগে যেন হাসপাতাল ছেড়ে যেতে না পারেন, সেজন্য তার পরনের প্যান্টটা পর্যন্ত লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল ডাক্তারদের। তিনি ছিলেন এমনই এক যুদ্ধপাগল মানুষ!

১৯১৫ সনের এপ্রিল মে মাসে কার্টন ইয়েপ্রেসের দ্বিতীয় যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। এই যুদ্ধে হঠাৎ তার বাঁ হাতে মর্টারের শেল এসে পড়ে। এসময় ডাক্তাররা তাকে চিকিৎসা করলে তার হাতটা হয়তো বাঁচানো যেত, কিন্তু তিনি যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে আসতে চাননি। বরং যন্ত্রণা হচ্ছিল দেখে নিজেই নিজের দুটো আংগুল কামড়ে ফেলে দেন। যার কারণে পরবর্তীতে শিল্ড’স এর ডাক্তাররা তার পুরো বাম হাত ফেলে দিতে বাধ্য হন।

এরপর সামে যুদ্ধে কার্টন লেফট্যানেন্ট কর্ণেল হিসেবে লা বৈসেলে অবস্থিত গ্লৌসটেশেয়ার রেজিমেন্টের ৪র্থ ড্রাগন গার্ডসের নেতৃত্ব দেন। ১৯১৬ সনের ২ থেকে ৩ জুলাই-এ দু’দিনে তার সাথের তিনটি ব্যাটলিয়নের কমান্ডার নিহত হয়। এরকম তাদের সামরিক শক্তি দূর্বল হয়ে যাওয়ার পরও  তিনি এক মূহুর্তের জন্যও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরেননি। বরং তিনি তার মাথার খুলির একাংশ ও গোড়ালীতে মারাত্মক আঘাত পান। এমন অকল্পনীয় বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাকে সর্বোচ্চ সামরিক পদক ভিক্টোরিয়া’স ক্রস দিয়ে পুরষ্কৃত করে।

তার বীরত্ব এখানেই শেষ নয়। ১৯১৭ সনের জুলাই থেকে নভেম্বর জুড়ে চলা প্যাসচেন্ডেলের যুদ্ধে তিনি নিতম্বে গুলিবিদ্ধ হন। আবার ১৯১৭ সনের এপ্রিল-মে জুড়ে চলা এরাসের যুদ্ধে তার বাম কানের অবশিষ্ট অংশে গুলিবিদ্ধ হন। এরপর আবার ক্যাম্ব্রেই যুদ্ধ যা ১৯১৮ সনের নভেম্বর-ডিসেম্বর ব্যাপী চলেছিল, সেখানে তার পায়ে এসে গুলি লাগে।

এতকিছুর পরও তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, আমি প্রতিটা যুদ্ধ খুবই উপভোগ করেছি”। এ বীর যোদ্ধা ব্রিটিশ-পোল্যান্ড সামরিক মিশনের সহঅধিনায়ক হিসবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তার মূল দায়িত্ব ছিল পোলিশ-সোভিয়েত যুদ্ধ, পোলিশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান যুদ্ধ এবং চেক-পোলিশ সীমান্ত-দ্বন্দ্বের সময় এলাকায় শান্তি বজায় রাখা। দুর্ভাগ্যবশতঃ এ মিশন তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যার্থ হয়। তিনি সেখান থেকে চলে আসার সময় তার বিমান দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে লিথুনিয়ায় ক্র্যাশ করে এবং সেখানে কার্টন কারাবন্দি হন। কিছুদিন পর তিনি সেখান থকে ছাড়া পান এবং যুদ্ধকালীন সেক্রেটারি অব স্টেট চার্চিলের পক্ষে কাজ করা শুরু করেন।

১৯২০ সনের আগস্ট মাসে ওয়ারশ থেকে ট্রেনে ফেরার সময় রেড রাশিয়ান অশ্বরোহী বাহিনী আক্রমণ করলে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে তিনি ট্রেন থেকে পড়ে যান। কিন্তু ভাগ্য ভাল থাকায় কোন গুরুতর আঘাত ছাড়া আবার তিনি ট্রেনে উঠতে সক্ষম হন। তবে বলা যায়,  নিশ্চয় এ যাত্রায় তিনি আঘাত না পাওয়ায় শিল্ড নার্সিং হোমের সার্জনরা তাকে মিস করেছে, কেননা একের পর এক  আঘাত আর অপারেশন তাকে সেখানকার এক পরিচিত মুখ করে তুলেছিল।

কার্টন সামরিক বাহিনী হতে ১৯২২ সনের ডিসেম্বরে সোভিয়েত সীমানার কাছাকাছি পোল্যান্ডের ব্রিটিশ-শাসিত একটি প্রদেশ থেকে মেজর জেনারেল হিসেবে অবসর গ্রহন করেন। কিন্তু এর স্থায়িত্ব ছিল কেবল কিছুদিন। যুদ্ধ যে তার নেশা! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অবসর ভেঙ্গে ফিরে আসেন। জার্মান-সোভিয়েতের মিলিত আক্রমণের কারনে কার্টন যে মিশন থেকে অবসর নিয়েছিলেন, আবার সেখানেই যোগ দেন রোমানিয়াকে শত্রুর প্রভাবমুক্ত করতে। পথে জার্মান যুদ্ধবিমান তাদের উপর হামলা করলে তার একজন কর্মকর্তা মারা যায় কিন্তু তিনি আলৌকিকভাবে বেঁচে যান। রোমানিয়া বেশ বিপদজনক হয়ে উঠায় তাকে ইংল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়। সেখানে ১৯৩৯ সনে তিনি আবার মূল সামরিক বাহিনীতে ফিরে আসেন ভারপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল হিসেবে। ১৯৪০ সনের এপ্রিলে তিনি নরওয়ের নামোস শহরের এক অ্যাংলো-ফ্রেঞ্চ আক্রমনের নেতৃত্ব দেন। এসময় তার বিমানকে জার্মান যুদ্ধবিমান আক্রমন করে। তাই তাদের লক্ষ্য ট্রোনডিয়াম থাকলেও তাদের সরে আসতে হয়।

এরপর তাকে উত্তর আয়ারল্যান্ডে পাঠানো হয় ১৯৪০ সনের ৫ মে, জার্মান আক্রমণ মোকাবিলা করতে। সেদিনই ছিল তার ৬০তম জন্মদিন। এতদিন পর তিনি সেদিন সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেন যে তার আসলেই অনেক বয়স হয়ে গেছে। ১৯৪১ সনের ৫ এপ্রিল তাকে ব্রিটিশ-যুগোস্লোভিয়া মিশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু যোগদান দিতে আসার সময় তার প্লেন ক্র্যাশ করে এবং তিনি ইতালির হাতে বন্দি হন। এখান থেকে বেশ কয়েকবার তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। একবার সক্ষম হলেও তাকে আটদিন পর আবার খুঁজে আটক করা হয়। ইতালি পরবর্তীতে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে ব্রিটিশদের মিত্র হলে ১৯৪৩ সনের আগস্টে তিনি ছাড়া পান। চার্চিলের ব্যাক্তিগত সহযোগী হিসেবে তিনি ঐ বছরের অক্টোবরে চীনে যান এবং মাও ও চিয়াং কাই-সেক এর সাথে দেখা করেন। মাওকে তিনি তেমন একটা পছন্দ না করলেও চিয়াং কাই-সেককে তিনি বেশ পছন্দ করেন এবং চিয়াং কাই-সেক তাকে চীন সরকারের সাথে কাজ করতে আমন্ত্রণ জানান। তাই অবশেষে ১৯৪৭ সনের অক্টোবরে তিনি লেফট্যানেন্ট জেনারেল হিসেবে অবসর নেন।

চীন থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার সময় তিনি বার্মার রেঙ্গুনে যান এবং সেখানে পড়ে গিয়ে মেরুদন্ডে ব্যাথা পান। পরে শিল্ডের নার্সিং হোমে তার মেরুদন্ডের অপারেশন হয়। এ সময় ডাক্তাররা তার শরীর থেকে বেশ কিছু সংখ্যক স্প্রিন্টার বের করে আনেন যা ছিল তার বিভিন্ন যুদ্ধে সাহসীকতার এক একটি নিদর্শন। এরপর তিনি তার বাকি জীবন সাধারনভাবে আয়ারল্যান্ডে কাটিয়ে দেন।

এই যুদ্ধপাগল বীর সেনা জীবন থেকে সত্যিকারের অবসর গ্রহন করেন ১৯৬৩ সনের ৫ই জুন।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top