ইতিহাস

রেইনবো ওয়ারিয়র- আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ভুলে যাওয়া ইতিহাস

রেইনবো ওয়ারিয়র নিয়ন আলোয় neon aloy

গ্রীনপীস (GreenPeace) একটি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা যার মূল লক্ষ্য পৃথিবীর শান্তি ও পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে কাজ করা। ১৯৭১ সালে একটি ছোট জাহাজ ও হাতেগোনা কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে যাত্রা শুরু হয় গ্রীনপীসের। সংগঠনটির অন্যতম মূল লক্ষ্য পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী অপরাধীদের চিহ্নিত করা। স্বাভাবিকভাবেই, তাদের এই প্রয়াসে অনেক কর্পোরেশন ও দেশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি সাধন করছে এমন যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ আইনের ভিত্তিতে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার পিছনে গ্রীনপীসের রয়েছে বিপুল ভূমিকা। ইন্টারনেটে ভাসমান নানান ধরনের নীতিকথার মধ্যে “When the last tree is cut, the last river poisoned, and the last fish is dead, we will discover that we can’t eat money” (পৃথিবীর বুকে শেষ গাছটি যখন কেটে ফেলা হবে, শেষ নদীটিও যখন দুষিত হয়ে যাবে, শেষ মাছটি মরে যাবে- শুধুমাত্র তখনই আমরা বুঝতে পারবো খাদ্য হিসেবে টাকা জিনিসটা অচল) গ্রীনপীসের মূল বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। গ্রীনপীসের নিজস্ব জাহাজের নাম রেইনবো ওয়ারিয়র (Rainbow Warrior)। বর্তমানে রেইনবো ওয়ারিয়রের তৃতীয় সংস্করণ পৃথিবীর মহাসাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  

প্রথম রেইনবো ওয়ারিয়র ১৯৭৮-৮৫  সাল পর্যন্ত গ্রীনপীসের ফ্ল্যাগশীপ ছিল। প্রত্যক্ষ উপস্থিতির মাধ্যমে তিমি শিকার, পারমাণবিক পরীক্ষণ, ও পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যবহৃত হত জাহাজটি। ১৯৮৫ সালে রেইনবো ওয়ারিয়র প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ফ্রান্সের পারমাণবিক পরীক্ষণে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মুরুরোয়া দ্বীপে ভ্রমণ করার কথা।  

কিন্তু তার আগেই রেইনবো ওয়ারিয়র আন্তর্জাতিক রাজনীতির কুৎসিত পন্থার শিকার হয়। সেই বছরের ১০ জুলাই ফরাসী প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি দল রেইনবো ওয়ারিয়রে বিস্ফোরক স্থাপন করে ডুবিয়ে দেয়। অপারেশনটির নাম দেয়া হয়েছিল “Operation Satanique”। অপারেশনটি পরিচালিত হয় ফরাসী গোয়েন্দা সংস্থা DGSE-এর আদেশে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড সমুদ্রবন্দরে।

রেইনবো ওয়ারিয়র নিয়ন আলোয় neon aloy

রেইনবো ওয়ারিয়রে বোমা হামলায় প্রাণ হারানো ফটোগ্রাফার ফেরনান্দো পেরেইরা

অকল্যান্ড বন্দরে থাকা অবস্থায় রেইনবো ওয়ারিয়র পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। এই সুযোগে ২ জন ফরাসী গুপ্তচর জাহাজটি ঘুরে দেখেন ও তথ্য সংগ্রহ করেন। লিউটেন্যান্ট ক্রিস্টীন ক্যাবোন জাহাজের যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভ্রমণ মানচিত্র ও ডুবিয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। তথ্য সংগ্রহ শেষে অন্য ২ জন গুপ্তচর ডুবুরী সরঞ্জাম নিয়ে রেইনবো ওয়ারিয়রের নিচে অবস্থান নেন। জ্যাক ক্যামুরিয়ে ও অ্যালেইন টনেল আলাদাভাবে রেইনবো ওয়ারিয়রের জলরেখার নিচে দুটি লিম্পেট মাইন স্থাপন করেন। জাহাজের নাবিকদের স্থানান্তর করার পর্যাপ্ত সময় দেয়ার লক্ষ্যে ১০ মিনিটের ব্যবধানে ২টি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। দ্বিতীয় বিস্ফোরণে জাহাজের নিচের ডেকে অবস্থানরত ফটোগ্রাফার ফেরনান্ডো পেরেইরা মৃত্যুবরণ করেন। দ্বিতীয় বিস্ফোরণের ৪ মিনিট পর রেইনবো ওয়ারিয়র আংশিক নিমজ্জিত হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে

ফ্রান্সের লক্ষ্য ছিলো কোন ধরণের প্রাণহানি এড়িয়েই কার্যসমাধা করা। কিন্তু ফেরনান্ডো পেরেইরা মারা যাওয়ায় বিব্রতকর এই দূর্ঘটনার প্রেক্ষিতে নিউজিল্যান্ডের মিত্র রাষ্ট্র ফ্রান্স কিছুটা বিপাকে পড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে তারা বাকি সবার মতই এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করে। নিউজিল্যান্ডের ফরাসী এমব্যাসি থেকে বিবৃতিতে বলা হয় “ফরাসী সরকার প্রতিপক্ষের সাথে এধরণের আচরণের পক্ষপাতী নয়।” নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তদন্ত শুরু হয় মূহুর্তের মধ্যে। এই অভিযানে অংশ নেওয়া প্রায় সবাই পালিয়ে যেতে পারলেও ৩০ ঘন্টার মধ্যেই ফরাসী গুপ্তচরদের মধ্যে ২জন ধরা পড়েন। সুইস পাসপোর্টধারী গুপ্তচরদের বিবৃতি অনুসারে ফ্রান্সের অপরাধ প্রমাণিত হয়। পরমূহুর্ত থেকে নিউজিল্যান্ড সরকার “সন্ত্রাসী হামলা” এর পরিবর্তে “আন্তর্জাতিক আইন অবমাননা” হিসেবে ঘটনাটি বর্ণনা করতে শুরু করে।

বেরনার্ড ট্রাইকটের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি ফ্রান্সকে নিরপরাধ এবং “কেবল গ্রীনপীসের নজরদারী করা” গুপ্তচরদের উদ্দেশ্য ছিল বলে দাবী করে। তবে The Times পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে ফাঁস হয়ে যায় এই অভিযান ফরাসী রাষ্ট্রপতি মিটারেন্ডের অনুমতি নিয়েই করা হয়েছিল। আর এ খবর প্রকাশের সাথে সাথেই এ ঘৃণ্য হামলায় ফ্রান্স সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগসাজশ প্রমাণিত হয়। পদত্যাগ করেন ফরাসী প্রতিরক্ষামন্ত্রী চার্লস হেরনু এবং গোয়েন্দা সংস্থা DGSE-এর প্রধান পিয়েরে ল্যাকস্টকে বরখাস্ত করা হয়। সে বছর ২২ সেপ্টেম্বর ফরাসী প্রধানমন্ত্রী লরেন্ট ফ্যাবিউসের দেয়া বিবৃতিতে তিনি স্বীকার করেন যে ফরাসী গুপ্তচররা সামরিক আদেশে রেইনবো ওয়ারিয়র ডুবিয়ে দেয়ার কর্মসূচি গ্রহন করে। পারমাণবিক পরীক্ষণের প্রতিবন্ধক গ্রীনপীসের কর্মকান্ড স্থগিত করা ছিল এই অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য।

নিউজিল্যান্ডের আদালতে আটককৃত ফরাসী গুপ্তচরদের বিরুদ্ধে মানবহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ১০ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়। কিন্তু এরপর শুরু হয় নতুন খেলা! সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামীর মুক্তির জন্য ফ্রান্স সরাসরি নিউজিল্যান্ডের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এমনকি, তাদের মুক্তি দেওয়া না হলে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটির পক্ষ থেকে তাদের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে- এমন হুমকিও দেওয়া হয়! বিপদে পড়ে যায় নিউজিল্যান্ড। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তারা অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যেত কেননা তাদের অর্থনীতির একটা বড় অংশ নির্ভরশীল ছিল যুক্তরাজ্যে কৃষিপণ্য রপ্তানির উপর।

রেইনবো ওয়ারিয়র নিয়ন আলোয় neon aloy

বোমা হামলার পাঁচদিন পরে তোলা ছবি- অকল্যান্ড বন্দরে কাত হয়ে অর্ধনিমজ্জিত রেইনবো ওয়ারিয়র

এক পর্যায়ে নিউজিল্যান্ড বাধ্য হয় সমঝোতায় আসতে। তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব হাভিয়ের পেরেজ দে চুয়েলারের মধ্যস্থতায় এক সমঝোতা চুক্তি সাক্ষরিত হয় ফ্রান্স ও নিউজিল্যান্ডের মাঝে। এই সমঝোতায় উল্লিখিত ছিল- নিউজিল্যান্ড সরকারকে ফ্রান্স সরকার ৬.৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপুরণ হিসাবে দিবে এবং নিউজিল্যান্ডের সার্বভৌম ভু-খন্ডে অবৈধভাবে হামলা চালানোর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে। এর বিনিময়ে নিউজিল্যান্ড আটক দুই বন্দীকে ফ্রান্সের হাতে হস্তান্তর করবে এবং এই দুই সাজাপ্রাপ্ত আসামী ফ্রান্সের সামরিক ঘাঁটি হাও আতোলে অন্তত ৩ বছরের জন্য কারাদন্ড ভোগ করবে। এই চুক্তি অনুসারে ১৯৮৮ সালের মধ্যেই দুই বন্দীকে ফ্রান্সের হাতে হস্তান্তর করে নিউজিল্যান্ড। কিন্তু চুক্তি ভঙ্গ করে ফ্রান্স। হাও আতোলে দুই বন্দীর তিন বছর করে কারাদন্ড ভোগ করার কথা থাকলেও এর আগেই চিকিৎসার ছুতো দেখিয়ে তাদের বের করে আনে ফ্রান্স সরকার। এর মধ্যে আলাইন মাফার্ত ফরাসী সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং ১৯৯৩ সালে কলোনেল পদে পদোন্নতি পান। অপর বন্দী ডমিনিক প্রিউ-ও নির্ধারিত সময়ের আগেই হাও আতোল থেকে বের হয়ে আসেন এবং তার পুরনো চাকুরিতে যোগদান করে পরবর্তীতে পদোন্নতি পান।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলায় ফ্রান্স পুরোপুরি বেঁচে যেতে পেরেছিল- ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। এই অভিযানটি ছিল তাদের গোয়েন্দা বিভাবগের ইতিহাসে অন্যতম বাজে ব্যার্থতা। যে উদ্দেশ্যে তারা রেইনবো ওয়ারিয়র ডুবিয়ে দিয়েছিলো, সেটি তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দেয়। রেইনবো ওয়ারিয়র অকার্যকর জাহাজে পরিণত হলেও তার পক্ষ হয়ে নিউজিল্যান্ডের একাধিক বেসামরিক প্রমোদতরী ফ্রান্সের পারমাণবিক পরীক্ষণের প্রতিবাদ জানাতে সমুদ্রপথে রওনা দেয়, যার ফলে ফ্রান্স সরকার সেই পরীক্ষণটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া, গ্রীনপীসের ক্ষতি পর্যালোচনায় ফ্রান্স সরকার ১৯৮৭ সালে ৮.১৬ মিলিওন ডলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিশোধ করে সংগঠনটিকে। একই সাথে বোমা হামলায় নিহত পেরেইরার পরিবার ও জীবনবীমা কোম্পানীকেও সর্বসাকুল্যে ২.২ মিলিওন ফ্রাঙ্ক ক্ষতিপূরণ দেয় ফ্রান্স সরকার।

পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক নীতির প্রতি অবহেলার দৃষ্টান্তে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাথে সম্পর্ক শিথিল হয় নিউজিল্যান্ডের। এদের পরিবর্তে নিউজিল্যান্ড প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট ছোট রাষ্ট্র এবং প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্কের উপর জোর দিতে শুরু করে।

পুরো ঘটনাটি পর্যালোচনা করলে এটাই বলা যায়, ষড়যন্ত্র করে হয়তো অর্থ এবং ক্ষমতার জোরে বিচার থেকে পার পেয়েছিল ফ্রান্স সরকার। কিন্তু পরিশেষে শুভবুদ্ধির মানুষরা রুখে দাঁড়ানোয় সফল হয়নি তাদের দুরভিসন্ধি। তারপরেও, মিত্ররাষ্ট্র নিউজিল্যান্ডের সাথে ফ্রান্সের শিষ্টাচার-বহির্ভূত আচরণ আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি কালো দাগ হয়েই থাকবে।

[কভার ইমেজ হিসেবে ব্যবহৃত ছবিটি রেইনবো ওয়ারিয়র-২ এর]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top