টেক

বরফের কফিনে আটকে পড়া দানবেরা কি বেরিয়ে আসছে?

বরফ দানব নিয়ন আলোয় neon aloy

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অনেক নেতিবাচক দিক সম্পর্কে আমরা কম-বেশি অবগত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, গ্রীন হাউস প্রতিক্রিয়া এদের মধ্যে অন্যতম। তবে সম্প্রতি দক্ষিণ মেরুর বরফ আচ্ছাদিত শ্বেতভূমির গবেষণায় চাঞ্চল্যকর একটি নতুন বিষয় উঠে এসেছে। গবেষকদের পাওয়া তথ্য অনুসারে, বৈশ্বিক উষ্ণতার থাকতে পারে আরো একটি ক্ষতিকর দিক, যে বিষয়ে আমাদের অনেকেরই বিন্দুমাত্র ধারণা নেই! যারা অণুজীববিদ্যার সাথে খুব একটা পরিচিত নন, তাদের জন্য নতুন এই আবিষ্কারটির প্রভাব আসলে কত সুদূরপ্রসারী- তা চিন্তা করা মুশকিল হতে পারে। এই মুশকিল আসান করে বিষয়টি তুলে ধরার জন্য আমদের মাধ্যমিক জীববিজ্ঞানের দারস্থ হতে হবে।

ভাইরাস শব্দটির সাথে পরিচয় নেই এমন মানুষ পৃথিবীতে খুবই কম, তার থেকেও কমসংখ্যক মানুষ হয়তো আছেন যারা ভাইরাস-সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হননি। আগেভাগেই বলা দরকার, এই ভাইরাস আপনার অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারের কাছে ধরা দেবে না। সাধারণ হেমন্তকালের সর্দি-কাশি(Influenza) থেকে মরণব্যাধি এইডস- সবই ভাইরাস-সৃষ্ট মানবদেহের রোগ। তবে রোগব্যাধিই ভাইরাসের একমাত্র পরিচয়, এটা ভেবে থাকলে ভাইরাস-কূলের সাথে বড্ড অন্যায় হয়ে যাবে।

ভাইরাস গবেষণার প্রথম থেকেই ভাইরাসকে জীব এবং জড়ের মধ্যকার সংযোগ হিসেবে গণ্য করা হয়। এমন ধারণার প্রধান কারণ হল ভাইরাস জীব এবং জড় উভয়ের ন্যায় আচরণ করতে পারে। বেঁচে থাকার জন্য তাদের দরকার অন্য কোষের সহায়তা। পোষক কোষের ভেতর প্রজনন করা ভাইরাসের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু এই পোষকের অভাবে ভাইরাস জড়বস্তুর ন্যায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে যুগ-যুগান্তর ধরে।

এখন আবার চলে যাই দক্ষিণ মেরুর বরফ জমা মাটির কথায়। মেরু অঞ্চলের এই মাটি অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় জমাট বেধে গঠন করে পার্মাফ্রস্ট (Permafrost)। এটি আসলে মাটি আর বরফের মিশ্রণে একটি কঠিন স্তর। এই স্তরের একটি বৈশিষ্ট্য হল এটি এক ধরণের প্রাকৃতিক পচনরোধক (Natural Preservative) হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, এই মাটিতে আটকে থাকা সকল জৈব পদার্থ অপরিবর্তিত থেকে যায় যুগের পর যুগ। বিজ্ঞানীদের মতে পার্মাফ্রস্ট হল ‘পৃথিবীর রেফ্রিজেরেটর’, যেখানে সৃষ্টির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সকল জীবেরই দেহাবশেষ পাওয়া সম্ভব। বলাই বাহুল্য এই পার্মাফ্রস্টে ম্যামথ, মানুষ, ঘোড়া, সামুদ্রিক মাছ এবং আমাদের আলোচ্য ভাইরাস মহাশয়রাও কালের সাক্ষী হয়ে আছেন।

বিগত দশ বছর পার্মাফ্রস্টে আটকে থাকা এই ভাইরাসদের নিয়ে গবেষণায় ২০১৫ সালে ত্রিশ হাজার বছর পুরাতন একটি ভাইরাসকে পূনরোজ্জীবিত করতে সমর্থ হয়েছেন গবেষকরা। ভাইরাসটির নাম মলিভাইরাস। ২০০৫ সালে প্রথম আবিষ্কৃত হয় এরকমই মিমিভাইরাস। প্রশ্ন জাগতে পারে, বর্তমান ভাইরাস আর এদের মধ্যে পার্থক্য কি? প্রথমত এই ভাইরাসগুলো আকারে বর্তমান সময়ের ভাইরাসের থেকে কয়েক গুণ বড়। শুধু আকৃতিতে যে এগুলো বড়- তা নয়, জীনের সংখ্যাও বেশি এদের। তুলনার সুবিধার্থে উল্লেখ করা যায়- মিমিভাইরাসের জীন সংখ্যা যেখানে ১২০০, সেখানে HIV এর জীন মাত্র ৯টি!

যেহেতু এই ভাইরাসগুলো পার্মাফ্রস্টে আটকে আছে এবং সেখান থেকে মুক্তি পেলে তারা আবার পোষক আক্রমণের ক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে, সেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে এই পার্মাফ্রস্ট যখন গলে যাবে তখন এই ভাইরাস মহাশয়রা আবার রাজত্বের সুযোগ পাবেন। পার্মাফ্রস্ট গবেষকদের অনেকেই এই মত পোষণ করছেন। আর এ কারণেই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ে সচেতন মানুষদের কপালে দুশ্চিন্তার আরেকটি ভাঁজ যুক্ত হয়েছে।

রাশিয়ার তুন্দ্রাঞ্চলে কয়েক শতাব্দী জুড়ে মানুষ ও গবাদি পশুর মরদেহ সৎকার করা হয়েছে পার্মাফ্রস্টে। এই সময়ের মধ্যে পৃথিবীর পরিবেশে অ্যানথ্রাক্স, বিউবনিক প্লেগ, গুটিবসন্ত, স্প্যানিশ ফ্লু-এর মত রোগের মহামারী উপদ্রব অতিক্রান্ত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে এমন অনেক মরদেহ পার্মাফ্রস্টে আছে, যারা এই রোগের ভাইরাস সমেত চাপা পড়েছে। পার্মাফ্রস্টের গলতে থাকলে তার সাথে সাথে এই মরদেহগুলোর পচন শুরু হবে এবং সেখানে বন্দী ভাইরাস পরিবেশে মুক্ত হবে। ২০১১ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় রাশিয়া অ্যাকাডেমি অফ সাইন্সের গবেষক বরিস রিভিক ও ম্যারিনা পডলন্যায়া বলেন, “পার্মাফ্রস্ট বিগলনের ফলে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর মহামারী রোগগুলো ফিরে আসতে পারে। যেখানে এই সব রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের দাফন করা হয়েছে সেখানে এটি ঘটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি”।

এসব জেনে কি মনে হচ্ছে না গরমের দিনে এসিটা বন্ধ রেখে গাছ তলায় বসে থাকাটাই ভালো? যদি না জেনে থাকেন, তবে জেনে রাখা ভাল যে আপনার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটাও কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য অনেকাংশে দায়ী! তবে এমন দুশ্চিন্তার ক্ষেত্রে অভয় দিয়েছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিজ্ঞান কলামের লেখক কার্ল জিমার। তিনি তার “A Planet of Viruses” বইটির জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন ভাইরাসবিদ্যায়। তার মতে, “নতুন আবিষ্কৃত তথাকথিতভাবে বিলুপ্ত এই ভাইরাসগুলো অ্যামিবার মত এককোষী জীবদের জন্য ক্ষতিকর, আমাদের জন্য নয়। মানবদেহে আক্রমণকারী ভাইরাস এখনও পার্মাফ্রস্ট থেকে উঠে আসেনি, তবে এর সম্ভাবনা আছে তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু নিত্যদিনে যত ভাইরাসের সাথে আমাদের ওঠা-বসা তাতে পার্মাফ্রস্টের দানবগুলো নিয়ে আমরা নিশ্চিন্তেই থাকতে পারি।” তিনি আরো বলেন, “পুনরোজ্জীবিত ভাইরাসগুলো ল্যাবরেটরীতে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে বরফ গলানোর পর সংক্রমণের ক্ষমতা পেয়েছে, এর মানে এই নয় যে তারা রাশিয়ার শ্বেত জগতে জম্বি হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। বরফ-মোড়ানো কফিন ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে রোগ সৃষ্টি করার সম্ভাবনা তাই অত্যন্ত ক্ষীণ।”

চাঞ্চল্যকর এই আবিষ্কারের জের ধরে এখন বিজ্ঞানীদের ভাইরাস নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। সে সাথে আমাদের পূর্বপুরুষ ও আমাদের উপর এই ভাইরাসের প্রভাব নিয়েও চিন্তা শুরু করেছেন জীবাশ্মবিদ্যার গবেষকগণ। ভাইরাসের কয়েক বিলিয়ন বছর অপরিবর্তিত থাকার এই ক্ষমতা এখন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেক রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস বিলুপ্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, এখন এই তত্ত্বে ফাটল ধরেছে আদিম এককোষীদের টিকে থাকার ক্ষমতায়।

নব্য আবিষ্কৃত ক্ষতিকর প্রভাবে নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে না তার মানে এই নয় যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। পৃথিবীর পরিবেশের উপর মানব সভ্যতারে ধ্বংসাত্মক প্রভাবগুলো এখনও বিদ্যমান। প্রভাবগুলো সম্পর্কে আমরা যতটা অবহিত সে তুলনায় আমাদের কর্মকান্ড হতাশাজনক। সচেতনতার অভাব এখনও স্পষ্ট আমাদের পরিকল্পনা ব্যবস্থায়। এভাবেই চলতে থাকলে পার্মাফ্রস্টে জমা ভয়ঙ্কর কিছু বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়ার সময়টা আমাদের হাতে থাকবে না। এর চেয়ে নিজ অবস্থান থেকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা ও এই সচেতনতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।

Most Popular

To Top