নাগরিক কথা

গৃহকর্ত্রীদের “নারীবাদ” এবং গৃহকর্মী নির্যাতনের মনস্তত্ত্ব

গৃহকর্ত্রীদের-নারীবাদ নিয়ন আলোয় neon aloy

গত কয়েকদিন ধরে আয়শা লতিফ নাম্নী এক কর্নেল স্ত্রীর গৃহকর্মী নির্যাতনের খবরটা বেশ ভাইরাল হয়েছে। খবরের সাথে ছবিতে দেখলাম পুচকে এক মেয়ে, ভয়ানক হয়ে তার চোখ ফুলে আছে, ফোলা ফোলা চোখের নিচে কালশিটে দাগ। মেরে শিশুটির মুখাবয়ব এতটাই বিকৃত করে দেওয়া হয়েছে যে ওর বয়স বোঝা যাচ্ছে না। ছবিটি দেখে প্রথমেই মনে হবে পঞ্চাশোর্ধ্ব কোন জটিল রোগগ্রস্ত বামন নারী। গা শিউরে উঠা সে ছবি। ওই ছবিটা দেখে খবরটা পড়ি নি। একটা পালাই পালাই মনোবৃত্তি হয়ত কাজ করে। কত দুঃসংবাদ আর নিতে পারে মন? এমন তো হয়েই থাকে বলে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম।
গা ঝাড়া দিয়ে ভুলে গেছি- চিন্তাটা শেষ না হতেই উইমেন চ্যাপ্টারে সুপ্রীতি ধরের লেখাটা চোখে পড়লো। শিরোনামটা ছিল: “গৃহকর্মীরা যখন গৃহকর্ত্রী হতে চায়”, ছিলো বলার কারণ হলো শিরোনামটা বদলে ফেলা হয়েছে তৎক্ষণাৎ। সঙ্গত কারণেই লেখাটা মনোযোগ আকর্ষণ করলো, এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। এসব তিনি কী বলার চেষ্টা করেছেন? আমি উনার লেখাটার আলোকে চিন্তা করছি, ওখানেই গৃহকর্মী নির্যাতনের পেছনের মনস্তত্ত্বটা পাওয়া গেলেও যেতে পারে।

সুপ্রীতি ধর লেখাটা শুরু করেছেন এভাবে, “আয়শা লতিফ ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা, এ সময় তার মনটা নরম থাকার কথা। কে জানে, হয়ত সে শারীরিক নানান জটিলতায় ভুগে ভুগে মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে, নইলে এমন সুন্দর পরিপাটী থাকা একটা মানুষ সামান্য ডিম পোড়ানোর অভিযোগে কন্যাসম শিশুকে এমনভাবে মারতে পারে?” লক্ষ্য করলে বোঝা যায় তিনি পাঠকের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়েছেন যে এত পরিপাটি সুন্দর মানুষ কন্যাসম শিশুকে মারতে পারেন কিনা, তবুও তিনি যখন মেরেছেন, তখন আমাদের ধরে নিতে হবে উনার মেজাজ খিটখিটে ছিল। মেজাজ খিটখিটে থাকলে শিশু গৃহকর্মীর জীবনটা মারধোর করে বিপন্ন করে দেয়াই যায়। এই সাফাইটা তিনি নির্যাতনকারী এক নারীর পক্ষে গাইলেন রীতিমত আর্টিক্যাল লিখে, সেই আর্টিক্যাল আবার প্রকাশ হয়েছে নারীবাদী পোর্টাল নামে পরিচিত ওয়েব পোর্টালে।

সমগ্র লেখাটাতে তিনি নির্যাতনকারী গৃহকর্ত্রীদের হয়ে সাফাই গেয়েছেন, কিছু যুক্তি উপস্থাপন করে প্রকারান্তরে গৃহকর্মী নির্যাতনের ব্যাপারটাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেই মনে হলো। তিনি বলেছেন, “উন্নত চিকিৎসার নাম করে” শিশুটিকে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে “ছোঁ মেরে” সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই মেয়েটির কী হয়েছে সেটা জানা যাবে না। এই কথা দিয়ে তিনি কী বোঝাতে চাইলেন? কারা ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে? উনি কি বলতে চাইলেন যে সত্যিকার অর্থে যতটা বলা হচ্ছে শিশুটি ততটা নির্যাতনের স্বীকার হয় নি? তাহলে প্রশ্ন আসে কতটুকু নির্যাতন আসলে বৈধ? এমন কি কোন মাত্রা আছে, যে মাত্রায় নির্যাতন করা বৈধ?

গৃহকর্মীরাও যে বিভিন্নভাবে গৃহকর্ত্রীদের মানসিক পীড়া দেয়, তাও তিনি তুলে ধরেছেন নিজের এবং অন্য আরেক নারীর অভিজ্ঞতার আলোকে। গৃহকর্মীরা যে কর্মজীবী মায়ের অবর্তমানে শিশুদের অনাদর, অবহেলা করে থাকে, ক্ষেত্রবিশেষে ভয়ভীতি দেখায় সে গল্প আমরা শুনে থাকি, এতে সত্যতাও আছে। তাই বলে পৈশাচিক উপায়ে গৃহকর্মীদের মেরে জীবন সংশয় করাটা বৈধ হয়ে যাবে? আর পাঁচ টাকা, দশ টাকা চুরির “মহা অপরাধে” ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো ঘটনার হার কত? কয়টা খবর অভিজাত ভবনের বাইরে আসে? সাবিনাকে মারের মাত্রা বেশি হয়ে যাওয়ায় মেডিক্যাল পর্যন্ত গড়িয়েছে বলেই না জানলো সবাই।

লেখিকা নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার আলোকে এক গৃহকর্মীর কথা উল্লেখ করেছেন, যার সাথে উনার পরিবারের পুরুষ সদস্যদের যৌন সম্পর্ক ছিলো। সেখানে গৃহকর্মীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কারণে তিনি বাড়ির পুরুষ সদস্যদের উপর কোন দায় আরোপ করছেন না। বেতনের বাইরে কয়টা টাকা বেশি পাওয়ার জন্য বা একটু জরিন ফিতা, স্নো পাউডারের লোভে অথবা নিছক জোর জবরদস্তির মুখে গৃহকর্মী যে কর্তামশাইয়ের যৌন ক্ষুধা মেটায় সেটাকে তিনি গৃহকর্মী মেয়েটির “দোষ” হিসেবে দেখেছেন। গৃহকর্মীদের ইনফিরিওরিটিকে ব্যবহার করে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা যে দিনের পর দিন যৌন নিপীড়ন করে থাকেন তিনি সেদিকে গেলেন না। কেন গেলেন না?

উনার লেখায় ফিরে যাই, “গৃহকর্ত্রী বাড়ির বাইরে গেলে ড্রেসিং টেবিল যে গৃহকর্মীর দখলে চলে যায়, সেটা তো সবারই জানা। এমনকি পরিপাটি করে সাজানো সাধের সংসারে একটু খানি বিষ ঢেলে দিতে গৃহকর্তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।” এই জায়গায় তিনি গৃহকর্তার ভূমিকাটা স্বীকার করে গেলেন, কিন্তু মূল দায় যেন গৃহকর্মী নারীটিরই। তবে কি যৌন নিপীড়ক, ধর্ষকামী গৃহকর্তার গৃহকর্মীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রতিশোধ নিতেই গৃহকর্মীদের উপর সামান্য অযুহাতে অকথ্য নির্যাতন করা হয়? এই কারণটাই কি গৃহকর্মী নির্যাতনের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে? এই মনস্তত্ত্ব থেকেই কি সামান্য ডিম পোড়ানো, বাসনকোসন ভাঙার জের ধরে পিশাচের মতো মারধর করা হয়?

লেখাটির প্রথম শিরোনামেও এই মনস্তত্ত্বের স্পষ্ট প্রকাশ দেখতে পাই- “গৃহকর্মীরা যখন গৃহকর্ত্রী হতে চায়” ; শিরোনামটা পড়ে মনে হবে সেই পিচ্চি মেয়েটি বুঝি আয়শা লতিফের জায়গাটা নিয়ে নিতে চেয়েছিল বলেই শিশুটির উপর নির্যাতন করা হয়েছে এবং এই নির্যাতনটা বৈধ নির্যাতন। পরে অবশ্য শিরোনামটি পরিবর্তন করে লেখা হয়েছে “গৃহকর্মী নির্যাতন: মূদ্রার এপিঠ ওপিঠ”, একই কথা জেনারেলাইজ করে কৌশলে বলা হয়েছে পরের শিরোনামে। এই কথা দিয়ে তিনি কী বোঝাতে চাইলেন? এক হাতে তালি বাজে না? গৃহকর্মী কর্ত্রীর মনমতো হোন না, কিন্তু কর্তার প্রয়োজনের হয়ে যায়, কাজে কর্মে ভজঘট করে ফেলে এবং কর্ত্রীরও মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় বলে মাঝেমাঝে মেডিক্যাল, সিএমএইচে পাঠিয়ে দেওয়া হয়– ইত্যাদি ইত্যাদি কাঁদুনি গেয়ে ইনিয়েবিনিয়ে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নির্যাতনকারীদের সাফাই গেয়ে গেলেন? যৌন নিপীড়ক গৃহকর্তার যৌনচাহিদা পূরণ করছে বা করতে বাধ্য হচ্ছে বলে গৃহকর্মীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা জায়েজ হয়ে যাবে?

ঘরের পুরুষপ্রবরের সাথে নারীবাদী ঝাঁজ খাটানো যায় না বলে গৃহকর্মীর প্রাণ সংহার করা হবে? এই ধরণের কথা শুনতে পেলে ভয় পেতে হয়, অবাক বিস্ময়ে হয়ে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। আরো বেশি বিচলিত হতে হয়, যখন দেখি নারীবাদী বলে পরিচিত লেখিকা এক নারীবাদী পোর্টালেই এমন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন। (উইমেন চ্যাপ্টার মূলত এবং সত্যিকার অর্থেই এলিট নারীদের একটা ক্লাবের মতো প্ল্যাটফর্ম বলেই প্রতীয়মান) গৃহকর্ত্রীদের এলিটিয় নারীবাদ গৃহকর্মীদের জন্য খাটে না তাহলে? গৃহকর্মী নারী কি নারী নয়, নাকি গৃহকর্মী নারীকে ‘চরিত্রহীনা’ (যেহেতু সে ঘরের পুরুষের সাথে শুতে বাধ্য হয়) বলা যাবে এবং সে “অপরাধে” তার প্রতি যেকোন নির্যাতন করা বৈধ হয়ে যাবে?

সর্বোপরি গৃহকর্মীগণ এলিট গোত্রের কেউ নয় বলে তার জন্য মানববাদ, নারীবাদ কাজ করবে না? উইমেন চ্যাপ্টার কি তবে এলিট নারীদের জন্যই নারীবাদী ভাবাদর্শ অনুসরণ করে।

আপনি যে “বাদী”ই হয়ে থাকেন, সে “বাদ”কে মানুষের পারপাস সার্ভ করতে হবে, মানুষের জন্য সত্য কথা বলার সৎ সাহস থাকতে হবে। প্রান্তিকজনের কথা বলতে হবে। আপনার মানবতা যখন স্পেসিফিক হয়ে যায়, অর্থাৎ যে মানবতা কারো জন্য কাজ করে, আর কারো জন্য কাজ করে না, তখন আর সেটা মানবতা থাকে না। তা হয়ে যায় গালভরা কথার হিপোক্রেসি। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ, ইতর-ভদ্র, গৃহকর্ত্রী-গৃহকর্মী ইত্যাদি শ্রেণী করণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যখন ঠিক করা হয় আপনি কার পক্ষে কথা বলবেন, সে আপনার নৈতিক কান্ডজ্ঞানের মুক বধিরতাই প্রকাশ করে, আপনার আইডিওলজির হিপোক্রেসি প্রকাশ করে।

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top