নাগরিক কথা

ধর্ষক, ধর্ষিতা এবং আমাদের মানসিকতা

নিয়ন আলোয়

বনানীতে গতকালের ধর্ষনের ঘটনায় আমি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছি। সেখানে কিছু মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ভিকটিম তরুনীর প্রতি আঙ্গুল তুলেছেন। তাঁকেই অপরাধী বানিয়ে ফেলছেন। তাঁরা কেউ কেউ বলছেন-

১) ধর্ষনের মামলা দেয়া এখন সস্তা।
২) মেয়েরা এখন ইচ্ছে করে ফাঁসাতে এই ধরনের মামলা দেয়। 
৩) এত রাতে মেয়েটা জন্মদিনের দাওয়াত খেতে গেলো কেন? 
৪) আরে এইসব মেয়েরা আগেই শারীরিক সম্পর্ক করেছে, আরেকবার সমস্যা কোথায়?
৫) মেয়েটা কি ভালো?

অনেকগুলো মন্তব্যের মধ্যে আমি জাস্ট বেছে বেছে কয়েকটা বললাম। এগুলো যে আজকে এই ঘটনায় বলেছে তা নয়। গত মে মাসের বনানীর রেইনট্রি’র ধর্ষনের ঘটনার সময়েও এই একই যুক্তি আমরা দেখেছি, পড়েছি ও শুনেছি।

যে দেশে ৪ বছরের, ৮ বছরের বাচ্চা ধর্ষিত হলে কিছু জনতা সেই বাচ্চাকেও দোষ দেয় সেখানে একজন এডাল্ট তরুনীর ক্ষেত্রে আসলে কি বলা হবে তা বিস্তারিত বলাটাই বাহুল্য মাত্র।

একটা দেশের একেবারে সাধারণ নাগরিকেরা যখন দেশের ভেতর একটা অপরাধকে ঠিক এইভাবে বিশ্লেষন করে, ভাবে কিংবা বলে তখন আসলে ভাবতেই হয় এই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বার বার মনে পড়ে সেই চলিত ম্যাক্সিমটির কথা। “একটি দেশের জনগনের চিন্তা ভাবনার আকারেই সমাজের কাঠামো নির্মিত হয়”

আমি দেশে যাবার পর দেখেছি ঢাকা শহরের অধিকাংশ মানুষ তাঁর আশে পাশের পরিবেশটি কে দূষিত করে রাখে। যেমন যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে, রাস্তার উপরেই পেশাব করতে বসে যায়, হাগতে বসে, কফ ফেলে, থুতু ফেলে, নাক ঝাড়ে। আমরা যেখানে সেখানে প্লাস্টিক ফেলি, বোতল ফেলি, ময়লা ফেলি। দিনের পর দিন এইসব ময়লার পাশ দিয়েই আমরা হেঁটে যাই, আমরাই নাক চেপে ধরে সরকারকে গালিগালাজ করি।

অনেকের মনে হতে পারে ধর্ষনের ঘটনার সাথে উপরের প্যারাটির সম্পর্ক কি? সম্পর্ক আছে। এটাই দেখাতে চাওয়া যে আমরা আসলে নিজেরাই আমাদের পরিবেশ, আমাদের চিন্তার জগৎ, আমাদের ভাবনার স্থানটিকে এতই কলুষিত করে রেখেছি যে এখানে নিরাময় পাওয়া কিংবা আইনের শাষনের চিন্তা করাটাই রীতিমত অসম্ভব।

একটা মেয়ে ধর্ষিত হয়ে থানায় গেছে। অভিযোগ করেছে। আমাদের মত এমন “কোয়াজি” ইসলামিস্ট দেশে এই কাজটি খুব কঠিন। কেননা একটি মেয়ে ধর্ষিত হয়েছেন এটি জানার পর থেকে সে মেয়েটির জীবন সোজা কথায় নরক হয়ে যায়। এমন একটি অবস্থা যেখানে হবেই, সেখানে একটি মেয়ে যে শখ করে থানাতে গিয়ে মামলা দেবে না, সেটি বলা বাহুল্য। অথচ এই ব্যাপারটিকে আমাদের দেশের সাধারন জনতা কিভাবে নিচ্ছে?

জনতা প্রশ্ন করছে এত রাতে জন্মদিনের দাওয়াতে গেলো কেন? প্রেম করেছে কেন? বাসায় গেলো কেন? এমনকি এগুলো নিয়ে লেখালেখি হলেও সাধারন জনতা বিরক্ত হয়।

“হীরক রাজার দেশে” নামে চলচ্চিত্র রয়েছে এবং এটি নিয়ে আমরা প্রায়ই কথা বলি কিন্তু অপর পিঠে আমরা ভাবিনা যে হীরক রাজারা একটা দেশে জন্মাতে পারে বোধহীন, নির্লিপ্ত, জ্ঞানহীন আর বিবেচনাহীন জনতার আধিক্যের ফলেই। আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশের একটা বড় অংশের সাধারণ নাগরিকেরা যেভাবে চিন্তা করেন এবং অপরাধ, সমাজ, মানুষ,জীবন, অর্থ-কড়ি, কালচার ঠিক যেইভাবে তাঁদের কাছে বিশ্লেষিত হয় সেটি বড় ভয়ানক।

আইনের শাষন পেতে হলে সাধারন জনতা যদি র‍্যাশনাল চিন্তা না করতে পারে, নোশন অফ প্রোপোরশোনালিটি যদি এতটা ভয়াবহ ভাবে তাঁদের কাছে বিশ্লেষিত হয়, বেসিক চিন্তার এত বাইরে দিয়ে মানসিকতা যদি এতটা সংকীর্ণ চিন্তার মধ্যে দিয়ে যায় তবে এই রাষ্ট্র নিয়ে আশা করা, স্বপ্ন দেখা একেবারেই বৃথা।

বনানীর রেইনট্রি’র মেয়েদের এখন কি অবস্থা আপনারা জানলে মন খারাপ করবেন। তাঁদের জীবনটা ঠিক কতটা বদলে গেছে, তাঁদের সমাজ, সারাউন্ডিংস, তাঁদের আশে পাশের মানুষ, জীবনের অর্থ যেভাবে পালটে গেছে কিংবা তাঁদের কন্ঠে যে হতাশার শব্দ আমি পাই, এগুলো জানলে আপনারা অনেকেই দুঃখ পাবেন। হতাশ হবেন।

অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেছেন, আপনি বনানীর ভিকটিমদের নিয়ে এত লাফালাফি, মাতামাতি কেন করেন? আপনার ইন্টারেস্টের যায়গাটা কি?

লক্ষ্য করে দেখবেন, প্রশ্নের মধ্যেই এসে গেছে “ইন্টারেস্ট” বা লাভ-ক্ষতির ব্যাপারটি। সাধারণ মানুষ ভেবেই নিচ্ছে, আমার নিশ্চই একটা ব্যাক্তিগত লাভ বা পাবার ব্যাপার রয়েছে। তা না হলে কেন বলছি।

প্রখ্যাত সাংবাদিক ফারজানা রুপা আপা খুব চমৎকার একটা কথা বলেছিলেন আমাকে। হুবুহু লিখতে না পারলেও সারমর্ম বলছি। তিনি বললেন, “নিঝুম এই বনানীর অপরাধের যদি বিচার না হয়, এই অপরাধীদের যদি শাস্তি না হয়, এই অপরাধ টি যদি আস্তে আস্তে হারিয়ে যায় তবে আমাদের সামনের সময়ে মেয়েদের জন্য এক ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে খুব কম ধর্ষনের ঘটনায় এতটা তোলপাড় হয়েছে। এত কিছুর পরেও যদি আমরা ব্যার্থ হই তাহলে এই জাতীয় সকল অপরাধী একটা মেসেজই পাবে যে, বনানীর ঘটনায় কিছু হয় নাই, তাইলে আমাদের কিছু হবে না। এবার সেটা টঙ্গীতে হোক কিংবা শ্যামলীতে”।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা যদি কোনদিন সার্টিফাইড একটা ব্যার্থ রাষ্ট্রের তকমা গায়ে লাগাই কিংবা রাষ্ট্র হিসেবে আমরা শেষ হয়ে যাই তবে এর দায়ভারের একটা বড় অংশ আমাদের সাধারন জনতারই নিতে হবে। একজন ধর্ষিতা যখন আমাদের দেশের সাধারন জনতার কাছেই দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার, চতূর্থবার নিগৃহীত হয়, আমাদের কাছে একের পর এক নিপীড়িত হয় তখন আশার যায়গাটা কোথায় থাকে? আমরা তো শেষ পর্যন্ত একজন ভিকটিমকেই শেষের ছুরির কোপটাই দিচ্ছি।

ভুলে গেলে চলবে না যে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষিত অসংখ্য নারীকে তাঁদের স্বামীরা মেনে নেয় নি, সন্তানরা মেনে নেয়নি। তাঁদের ফেলে রেখে নিজ নিজ কাজে চলে গেছেন।এক ঘরে করেছিলেন। অসংখ্য নারীকে বিভিন্ন এন জি ও সংস্থা অন্য দেশে নিয়ে গেছেন মুক্তিযুদ্ধের পর কারন স্বামীরা তাঁদের আর ঘরে নেয় নি।

একটি দেশের মুক্তি সংগ্রামে যখন নিপীড়িত নারীদের শুধু ধর্ষিত হবার দায়ে স্বামী ফেলে রেখে চলে যায় সেখানে তো এই দেশের কপালে সেই ৭২ সাল থেকেই অভিশাপের টীকা লেগে রয়েছে।

আমরা আমাদের চরিত্র মুক্তিযুদ্ধের পর পরই দেখিয়েছি। ৪৬ বছর পর হয়ত এসব নিয়ে কথা বলাটাই অর্থহীন।

লেখকঃ নিঝুম মজুমদার

[এই লেখাটি নিঝুম মজুমদারের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সংগৃহিত]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top