গল্প-সল্প

পদ্মকুঁড়ি বৃত্তান্ত এবং অন্যান্য

নিয়ন আলোয়

ঘটনাটা বেশ বিস্ময়কর তো বটেই। এতটা অবাক লাগতো না, যদি রুবিনার বাবা মোর্শেদ আলী একজন আদর্শবান স্কুল শিক্ষক না হতেন; পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব, আর্থিক সচ্ছলতা, পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারা– সব মিলিয়ে মোর্শেদ আলী গ্রামে বিশিষ্ট ব্যক্তি। সকালবেলা মোর্শেদ আলীর লম্বা-চওড়ায় ঘোড়াদৌড় সমান উঠানে দুইটা মোরগ তার স্বরে পক পক পক পআআত চিৎকার পাড়ছে। মোরগ দুটির যুগপৎ চিৎকার ছাপিয়ে মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। খানিকটা কৌতুহল থেকেই ওই বাড়িতে উঁকি দিলাম। বাড়িভর্তি মানুষ গমগম করছে; মোর্শেদ আলী ব্যস্ত সমস্ত হয়ে ছুটাছুটি করছেন দিগ্বিদিক– “চায়ের ফ্লাস্ক কই?  হামিদা! দেওয়ান সাহেবরে একটা পান বানাই দেও তো, পুরান আত্মীয় নতুন কুটুম হইছেন; খাতির করন লাগে না?” স্বামীর উৎফুল্ল রসিকতায় হামিদা বানু কুটিকুটি হয়ে হাসছেন। যে কোলাহল শুনে এসেছিলাম, সেটা আসলে কলহাস্য। মোর্শেদ আলীর কড়ি বর্গার আটচালা বৈঠকখানার বারান্দায় ছেলে বুড়োতে গমগম করছে; উঠানের রোদের স্রোতে সম্মিলিত হাসির কলরোল আর পুলকিত কণ্ঠের হাঁকডাক মিশে প্রাণের বন্যা বইছে। এর কথা, তার হাসি শুনছি আর ইতস্তত পায়ে হেঁটে বৈঠকখানার দিকে এগুচ্ছি; কিছুতেই এই আকস্মিক  উৎসবমুখরতার কারণটা ধরতে পারছি না। সোহেলকে বৈঠকখানায় পাওয়া গেলে রক্ষা। সোহেল আমার বন্ধু। ওর কাছে যেতে আমার ভদ্রতাসূচক সময়ের তোয়াক্কা করতে হয় না।

বৈঠকখানার দরজার মুখে হামিদা বানু কাজের ঝি মন্নাফের মাকে কী নিয়ে যেন তিরস্কার করছেন- “একটা কাজ ঠিক কইরা করতে পারবা নিজে থেইকা? ছুঁড়ি বেটি বুড়ি হইছো কি বাও বাতাসে! তুমরারে নিয়া আর পারা গেল না মন্নাফের মা।”  আমার দিকে চোখ পড়তে মাথার আঁচলটা আধহাত টেনে দিলেন– “কাজল আসলা কতক্ষণ?”  “এইতো চাচী, মাত্রই। সোহেল কই গেছে চাচী?”

“বাজারে পাডাইছি আঁইশনা অলা বড়মাছ কিনতে। জামাইর বাড়িতে পাডান লাগে তো; তোমার চাচা বুড়ো মানুষ কয় দিক সামাল দিবো কও দেহি।”  কার জামাইর বাড়ি, কিসের জামাইর বাড়ি না বুঝে আমি সোহেলের মা’র মুখের দিকে ভ্যাবলানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। আমার মুখভঙ্গি দেখে নিজেই শুধরে নিলেন- “ও বাপু! তুমারে তো বলা হয় নাই। আইজ বাদ আসর আমার রুবিনার বিয়া। এ্যাই দেখো, আমি একলা মানুষ কয়দিক সামলাই; এরে খবর দাও, তারে ডাইকা আনো সব আমার ঘাড়ে- হুট করে ঠিক হইল তো বাবা। ঘরে ঘরে ঘরকন্যা- আমার বড় ভাইয়ের পোলা শিহাবের লগে…”

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হামিদাবানু রান্না ঘরের দিকে ছুটলেন। তার আজ কাজের অন্ত নাই। বরযাত্রী চলে আসবে আর কিছুক্ষণ পরেই, দুপুর গড়িয়ে এলো বলে। যদিও দেওয়ান সাহেব বলেছেন খেঁজুর, বাতাসা দিয়ে দোয়া করে কবুল পড়িয়ে নিবে আপাতত। শুভ কাজে দেরি করতে নেই। জাঁকজমক, রংঢং পরে করা যাবে। তবুও বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা; বললেই তো খেঁজুর খাইয়ে বিদায় করা যায় না।

বৈঠকখানার পিঁড়ার ধারে আমি চন্দ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে আছি। প্রবল বিস্ময়ের ঘোর কিছুতেই কাটছে না। রুবিনা এই বিয়েতে রাজি? তা কী করে হয়? আর সোহেল? শিহাবকে সোহেলের চেয়ে ভালো আর কে জানে, তার আবার মামাতো ভাই। দুইটা কিশোরী মেয়ে কুলায় করে দূর্বাঘাস তুলে নিয়ে যাচ্ছে হলুদ গোসলের জন্য, নিজেদের মধ্যে কী যেন বলে হেসে ভেঙে পড়ছে, এসব কিছুই আমাকে স্পর্শ করছে না। আমি দাঁড়িয়েই আছি, মনে হচ্ছে সাঁড়াশি দিয়ে কেউ আমার পা দুটিকে মাটিতে গেঁথে দিয়েছে। আকাশের নীল ফিকে হয়ে এসেছে, রোদ মরে গিয়ে লাউএর মাচায় ময়লা আলো গা এলিয়ে পড়েছে; বাতাসের ধুলার রুক্ষ গন্ধ। অনতিদূরে মাঠজুড়ে সর্ষের হলুদ নদীর বুকে সমুদ্রদোলা ঢেউ। এমনই এক চৈতী বিকেলে পাঁচ বছর আগে আমি আর সোহেল মিলে শিহাবকে কসবা সীমান্ত দিয়ে বর্ডার ক্রস করে দিয়েছিলাম। এ এক জীবন-মরণ খেলা। এপারে পুলিশ আর ওপারে অনিশ্চিত জীবনের পথে যাত্রা; সেই সংকটময় সময়েও শিহাব সিগারেটের ভেতরে গাঁজার পুরিয়া ভরে ভুসভুস ধোঁয়া ছাড়ছিল। এই শিহাবকে বিশেষভাবে মনে রাখার কোন কারণ ছিলো না। মামাতো ভাই না হলে সোহেলেরও মনে রাখার গরজ থাকার কথা না।

“কিরে কাজল, এলি কখন?” সোহেলের ডাকে সম্বিত ফিরে আসে আমার, ওর হাতে বিশাল বড় দুইটা পাকা রুই; কানকোর ভেতর দিয়ে দড়ি ঢুকিয়ে কায়দা করে বেঁধে রাখা হয়েছে। মানুষের নাকেও তো এমন দড়ি বাঁধা থাকে,  সেই দড়ি অদৃশ্য আর ভীষণ শক্ত  গিঁট বাঁধা… কী সব আবোল তাবোল ভাবছি! মাথাটা জানি কেমন করছে, মাছ দুটোর সাদাটে ফ্যাকাসে চোখে নিজের স্বরূপ দেখতে পেলাম যেন।

“আরে শালা, তুই হাঁদার মতো এখানে দাঁড়িয়ে কেন?” প্রকৃতিস্থ হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে বললাম,  “এই কিছুক্ষণ হবে…” সোহেলের কণ্ঠে কৈফিয়তের সুর, “আর বলিস না, হুট সব কিভাবে যেন হয়ে গেছে। রুবির…” আমার আর শুনতে ইচ্ছে করলো না; বললাম, “হ্যাঁ, চাচী বলেছে। কিন্তু সোহেল তাই বলে শিহাব? রুবি মেনে নিতে পারলো?”  “তুই তো সবই জানিস কাজল, চেষ্টা তো কম কিছু করি নি… এজ্যুকেশনাল কোয়ালিফিকেশন, স্কুলের চাকরিটা দেখে অনেকেই আগায়। শেষতক আর হয় না!…তাছাড়া শিহাব গ্রীণ কার্ড পেয়ে গেছে; রুবিকেও নিয়ে যাবে….” একটু দম নিয়ে স্বগতোক্তির মতো বললো, “রুবির গায়ের রংটা আরেকটু লাইট হলে শ্যামলা বলে চালানো যেতো।” এইটুকু হড়বড় করে বলে সোহেল অন্দরের দিকে ছুটলো। এমন বিশদ ব্যাখ্যা করে নিজেকেই সে বুঝালো? সোহেলের চোখে হেরে যাওয়া, লজ্জা, দ্বিধা, হতাশা? নাকি অন্য কিছু? নাকি এসব কিছুই না, পুরোটাই আমার, একান্ত আমার… আমিই আরোপ করছি সোহেলের উপর? বাস্তবতাকে হয়ত সোহেল কিংবা রুবিনা দুজনেই সহজ করে গ্রহণ করতে পেরেছে। আমারই বা গলার কাছে এমন দলা পাকাচ্ছে কেন? যেন ঠিক নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আর ওইদিনের ঘটনাটা? শিহাবের বর্তমান যে অতীতকে ছেড়ে রুবিনার দ্বারে আসে নি, তা রুবিনা না জানুক, সোহেল কি জানে না?

কথাটা সোহেলকে বলার সময় কি এখনো আছে? এইতো সেদিন আমেরিকা থেকে ফেরার পরের সপ্তাহেই শাফিনদের বাড়ির রাস্তার ঢালু কিনারে মাতাল হয়ে গড়াচ্ছিল শিহাব। কোথাকার কোন আখড়ায় গিয়ে মদ গিলেছে কে জানে! শাফিনদের এখানে এসে আর সামলাতে পারে নি। বেহেড হয়ে ওখানেই কাদাজলে পড়ে গোঙ্গাচ্ছিল। তখন অন্ধকারের পর্দা সরে গিয়ে আবছায়া আলোর আভা দিগন্তরেখায় স্পষ্ট হয় হয় করছে। গোঙ্গানির শব্দ ধরে ধরে শাফিনের ছোট ভাই মুরাদ গিয়ে কাদাজলে মাখামাখি শিহাবকে তুলে আনে, পরনের লুংগি আব্রু রক্ষার দায়িত্ব ভুলে ভাঁজ খুলে স্থানচ্যুত হয়ে গড়াচ্ছে। কাঁপা হাতে লুংগি ধরে সে মুরাদকে বলে, “ইয়াংম্যান, লজ্জা পাওয়ার কিছু নাই। পোশাক একটা বাহুল্য ছাড়া কিছু না। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো আমাদের সোসাইটি এই বাহুল্য খুব পছন্দ করে!” মুরাদ কিছুটা বিব্রত হয়, আস্তে আস্তে বলে, “ভাই, আমারে ধরেন, মানুষজন আইসা পড়বে। আসেন আপনারে বাড়ি পৌঁছায় দেই..” শিহাব জড়িয়ে আসা ভারী কন্ঠে হুংকার ছাড়ে, “আরে রাখো তোমার মানুষজনের কেচ্ছা… শালার মানুষজন!  সব শালা ভান করে ভালো মানুষ সাইজা থাকে; আমি মদ খেয়ে রাস্তায় পইড়া আছি তাই আমি মাতাল… লম্পট। গোপনে সব হালাল বুঝলা মুরাদ, গোপনে সব হালাল। এই হইলো তোমার সমাজ, আগাগোড়া ভন্ডামী দিয়ে ঠাসা …. গট ইট?” মুরাদ আর কথা না বাড়িয়ে কোনভাবে টেনে হিঁচড়ে শিহাবকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে। মুরাদের মুখে এই কেচ্ছা শুনে ছোট বেলার বন্ধু শিহাবের সাথে আর দেখা করার রুচি হয় নি আমার। কিন্তু সোহেল এটা কিভাবে পারলো? আর রুবিনা কোন অভিমানে এমন আত্মাহুতি দিচ্ছে?

“শালা! তুই এখনো এখানেই দাঁড়িয়ে ক্যান? কাজ আছে, আয় আমার সাথে।” আমার বুকের ভেতরে একটা গলাকাটা মুরগী তরপাচ্ছে যেন। চলে যাওযার কথা যে বলবো কণ্ঠে স্বর ফুটছে না। কোনভাবে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললাম, “নারে থাকতে পারছি না। মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। পরে এসে রুবিনাকে দেখে যাবো একদিন।” সোহেলের হাত ছাড়িয়ে উত্তুরে পথ ধরে সোনাতলী মাঠের দিকে হাঁটতে থাকলাম উদ্দেশ্যহীন। গলার ভেতরে বুকের কাছে গরম বাষ্প ফুটছে যেন। মুক্ত বাতাসে আজকাল অক্সিজেনের এত সংকট নাকি? আচ্ছা রুবিনা এখন কী করছে?

সবকিছু কেমন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্ল্যাকবোর্ড থেকে চক দিয়ে লেখা একবার মুছে ফেললে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। কিন্তু স্মৃতি তো স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা যায় না। আপাতদৃষ্টে মুছে গেছে মনে হলেও সামান্য ইঙ্গিত পেলেই জ্বলজ্বলে হয়ে ভেসে উঠে মনের দেয়ালে। শিহাবের মায়ের সে দম্ভোক্তি, “দরকার ধরলে বাপে মায়ে পুলায় তিনজনে জেলের ভাত খামু। তবুও বেশ্যা মেয়েছেলেরে পুতের বউ করে ঘরে আনুম না। দেওয়ান বংশের পুলা বিয়া করবে বেশ্যা বেটিরে! ছ্যা ছ্যা ছ্যা” সোহেল আর আমি সেদিন শিহাবের মাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পান্নার সাথে শিহাবের বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলাম। সোহেল তখন ফুপুর হাত ধরে বলেছিল, “কিন্তু ফুপু পান্নার সাথে শিহাবের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। শিহাব বিয়ে করার কথা দিয়েছিল পান্নাকে।”

শিহাবের মা মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছিল, “পুরুষ মাইনসের জাত কত কিছু কইবার পারে। তাই বইলা খুল্লামখুল্লা হইয়া নিজেরে মেইল্যা দিতে হইব? আদতে বেশ্যার জাত। আমার পুলার নামে মামলা করছে। করুকগ, কী করবার পারে করুক। দুই দিন বেশি ভোগান্তি হইবো আর কি। আইন আদালত কিন্যা লওয়ার সম্পদ উপরওয়ালা দিছে আমারে।”

আমার আর সোহেলের কথায় পড়ে শিহাব অবশ্য একবার পান্নাকে স্বীকৃতি দিতে  নিমরাজি হয়েছিলো, পরে দেওয়ান বাড়ির মর্যাদা রক্ষার জন্য মা’র মাথার দিব্যি রাখাকেই সে অধিকতর যৌক্তিক মনে করলো। টাকাপয়সা দিয়ে শেষতক আইন আদালত কিনে দেওয়ান বংশের মান রক্ষা হয়েছিল। তবু ভুগতে হয়েছে শিহাবকে, রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুরের মতো আজ ওখানে তো কাল সেখানে, মাঠে-ঘাটে জঙ্গলে দিন কেটে দিন, রাত কেটে দিন পোহাতে হয়েছে। পান্নার আইনজীবী আলো মুখার্জী পারিবারিক আদালতে অধিকার বঞ্চিত নারীদের নিয়ে কাজ করেন বলে এইটুকু সম্ভব হয়েছিলো।

চৈতী বাতাসে যেন ড্রাগনের দীর্ঘশ্বাস, সে উত্তপ্ত নিশ্বাসের আগুনে আকাশ তামাটে বর্ণ ধারন করেছে। সোনাতলি মাঠের পুব কোণে একটা মাত্র বেঢঁপ শিমুল গাছ। তার শাখায় শাখায় লাল আগুনের দাপাদাপি, চোখ ঝলসে যায়। আমি এখানে কেন এলাম? রুবিনার শিমুল গাছ নিয়ে বাড়াবাড়ি আদিখ্যেতাই কি আমাকে এখানে নিয়ে এল? অদ্ভুত সব কথা বলতো রুবিনা, “কাজল ভাই, শিমুল ফুল কেমন লাগে আপনার?” “ভালোই তো, সুন্দর ফুল!” “উহু, শিমুল কিন্তু আহামরি সুন্দর ফুল নয়। গাছ থেকে পড়লেই কেমন ন্যাতা ন্যাতা হয়ে যায়। শিমুল যতক্ষণ ডালে থাকে ততক্ষণই রূপ ঝলসায় চোখে।” এমন অনেক অদ্ভুত তথ্য নিয়ে রুবিনা আমার ঘরে হাজির হতো যখনতখন। শিমুল গাছটার ফুলের ফোঁকড়ে কোথায় যেন বসে একটা ঘুঘু ডাকছে করুণ সুরে। আমার অসহ্য লাগছে। ক’টা বাজে? বরযাত্রী চলে আসার কথা এতক্ষণে। রুবিনা নিশ্চয় বউ সেজে বসে আছে। কিংবা আয়নার সামনে বসে কপালের টিপটা উপরে-নিচে, ডানে-বামে করে দুই ভুরুর ঠিক মধ্যিখানে নিঁখুত বসাবার চেষ্টা করছে?

ভালোবাসা ব্যাপারটা কখনোই আমি পরিস্কার করে বুঝতে পারি নি। রুবিনা কি আমাকে ভালোবাসতো? সময় অসময়ে কেন আসতো আমার ঘরে? চড়ুইপাখির মতো অস্থির ছুটাছুটি করতো ঘরময়, এটাসেটা বই হাতে নাড়াচাড়া করতো, অদ্ভুত (নাকি উদ্ভট?) সব কথা বলতো, হঠাৎই ফুঁড়োৎ করে প্রায় উড়ে চলে যেত। সবই অহেতুক অকারন? একদিন এসে চুপ করে আমার বিছানার কোণে বসলো, কথা নেই, হাত-পা ছুঁড়াছুঁড়ি করা অস্থিরতা না, চুপ করে চেয়ে আছে। আমি তখন জীবনানন্দের ধূসর পংক্তিমালায় ডুবেছিলাম। আমার সাড়া না পেয়ে নিজেই বললো, “কাজল ভাই, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য কী জানেন?” আমি মুখ না তুলেই বললাম, “নাহ,জানি না। সৌন্দর্য একটি আরোপিত কনসেপ্ট।  একেক জনের কাছে সুন্দরের ধারনা একেক রকম।” আমার তত্ত্বকথায় সে কান দিলো না মোটেও, আনমনে বললো, “আমার কাছে দুইটা দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়। একজন ক্ষুধার্ত মানুষ তৃপ্তি করে ভাত খাচ্ছে, মুখে লোকমা তুলছে মনোযোগ দিয়ে- ধীর, ছন্দময় গতি, স্থির প্রসন্ন চোখ, অপার্থিব সুখ, আহা! আর নিবিষ্ট মনে বই পড়ছে কোন মানুষ, পৃথিবীর সুন্দরতম! তাকিয়ে থেকে জগত সংসার ভুলে যাওয়ার মতো সুন্দর!”

“তুই কবি হয়ে গেলি নাকি রুবি? ক্ষুধা, ভাত খাওয়ার দৃশ্য এসব বেচে মানুষ বিখ্যাত  কবি হয়। হাহাহা!” আমার রসিকতায় রুবিনার মন ছিলো না একবিন্দু, চোখ পাকিয়ে কপাল টান করে বললো, “আমি চিন্তা করেছি খুব বই পড়ুয়া কোন ছেলেকে বিয়ে করবো। সে পড়বে, আমি লুকিয়ে দেখবো। আবার কখনো মাঝরাতে কোন একটা বই শেষ করার পরে আমার বুক হুহু করে কান্না উথলে আসবে, সে কোন প্রশ্ন করবে না; আলতো করে কাছে টেনে পিঠে তার শান্ত স্নিগ্ধ  হাত বুলিয়ে দিবে চুপচাপ।”এইটুকু বলে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে ঝড়ের বেগে বের হয়ে চলে গিয়েছিলো সেদিন। আজ এতদিন পরে রুবির সেই কণ্ঠ আমার বুকের ভেতর মেঘের মতো গুড়ুগুড়ো করে কেন বাজছে? তবে কি রুবি আমাকেই উদ্দেশ্য করে বলেছিল ওসব? রুবি আমাকে ভালোবাসতো? নাকি দিগন্তরেখার আলোকচ্ছটার ধুম্রজালে ক্ষণিকের জন্য বিহ্বল হয়েছিলো?

আর পান্না শিহাবকে ভালোবেসেছিল? প্রতারককে ভালোবাসা যায়? নাকি আপস করতে চেয়েছিল নিজের সাথে। অস্তিত্বমূল টিকিয়ে রাখতে নিজের সাথে কত রকম ছলনা না যে করতে হয় নারীদের। হাইকোর্টে জামিন পেয়ে ইন্ডিয়া হয়ে শিহাব আমেরিকা চলে গেলো শেষতক। আলো মুখার্জী নিজের ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে মাথা হাত দিয়ে বসে রইলেন দুইদিন।তৃতীয় দিনে পান্নাকে ডাকলেন, “তোমার সাহসের প্রশংসা করা ছাড়া তো কিছু করতে পারলাম না, পান্না। আর তো উপায় নেই…. ওটা রেখে আর কী হবে?…. শেষ করে ফেলো..” ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে পান্না দৃঢ় কন্ঠে কেবল বললো, “না!”

“আহা! বোকা মেয়ে, তোমার সমস্ত জীবন পড়ে আছে…. বুঝতে পারছো না কেন? তোমাকে পড়াশোনা কন্টিনিউ করতে হবে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে..!”

পান্না যেন কিছুই শুনতে পেলো না, ওর রুক্ষচুল, মুখের রেখা গুলো জেদ করে প্রকট হয়ে উঠেও কেমন মিইয়ে গেলো। বরফের শীতলতায় জমে যাওয়া গলায় অদ্ভুত অন্য জগতের স্বর, “জানেন, ওর বয়স ১৪ সপ্তাহ হয়েছে। ও এখন একজন পূর্নাঙ্গ মানুষের অবয়ব ধারণ করতে শুরু করেছে। চুল, ভ্রু গজাতে শুরকরেছে; স্নায়ুতন্ত্র, ব্রেইন প্রায় সুগঠিত হয়ে গেছে… নীরবে প্রাণের স্পন্দনের আয়োজন হচ্ছে আমার ভেতরে… ও নিশ্চিন্তে বেড়ে উঠছে একটু করে। ৪ সপ্তাহ বয়সে সে কেবল একটা থকথকে রক্তমাংসের ছোট্ট পিণ্ড ছিলো…. লাল টকটকে পদ্মকুঁড়ির মতো। আর মাত্র কয়েক মাস পরে এই পদ্মকুঁড়িটা একটা প্রস্ফুটিত পদ্মফুল হয়ে ফুটবে… আমার পদ্মফুল!” খাবি খায় পান্না, ওর কালি পড়া চোখের নিচে ভয় ধরানো হিম শীতল অন্ধকারের ছায়া; একটু থেমে বলে, “যখন একা থাকি, আমার মসৃণ তলপেটে হাত রাখি। জানেন,নিজেকে ঈশ্বরের মতো মনে হয়! আমি পারি! আমি প্রাণ সৃষ্টি করতে পারি…. পৃথিবীকে উপহার দিতে পারি জীবন্ত পদ্মফুল… আমি কথা দিয়েছিলাম, শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের পৃথিবীতে যে করেই হোন আনবো আমার পদ্মফুলটাকে…!” পান্নার কোটরাগত ক্লান্ত চোখের মণি ধপ করে জ্বলে উঠে, সে অপ্রকৃতস্থের মতো বলতেই থাকে, “আপনি বলেন আমাকে… ঈশ্বর কি তার সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে পারে? সৃষ্টি তো নিজের অস্তিত্বের আরেক অংশ…।” আলো মুখার্জী খেই হারিয়ে ফেলেন, থতমত করে বলেন, “কিন্তু তোমার পদ্মফুলকে তো পৃথিবী চাচ্ছে না। পদ্মফুল নিজেও বড় হয়ে তোমাকে, নিজেকে অভিসম্পাত করবে… তখন তুমি কি করবে?”

এই কদর্য পৃথিবীর শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের জন্য জীবনের এত তৃষ্ণা; এত টান! এই টানই দেহ আর দেহের সুরে মনের ভাষা ছুতোছলে ভালোবাসা খুঁজে খুঁজে জীবনের তৃষ্ণা জাগায়; সচেতনে কিংবা অবচেতনে? দেহতানে সুর বাঁধতে বাঁধতে পুলক বিহ্বল পান্নার এলোচুলে উষ্ণ নিঃশ্বাসের ঢেউয়ে কণ্ঠ গাঢ় করে শিহাব বলেছিল, “আমাকে বিশ্বাস করো না, পাগলী। ওসব রেজিস্টারি ফেজিস্টারি কোন ব্যাপার হইলো? এই যে তাকাও আমার দিকে… আমি আছি! ঠিক তোমার আছি!”

সানাইয়ের করুন সুর চিলের চিৎকারের মতো আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়ে চরাচরে ছড়িয়ে পড়ছে। রুবিনার বেনারসি আঁচলের নিচে মুখ লুকোচ্ছে অস্তাচলগামী সূর্য। সানাইয়ের সুর বড্ড খারাপ। এত করুণ হয়ে বাজে, হৃদয় নিঙড়ে কী যেন ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে কোথায় জানি; বড় ব্যথা ব্যথা লাগে! সোনাতলি মাঠের ম্যাড়ম্যাড়ে রোদে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর ঘর্মাক্ত জীবনের সুতীব্র সোঁদা  গন্ধ। শিমুলের ডালে ঘুঘুর ডাক বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আকাশের ওপারে বহুদূরে উপরে চলে যাচ্ছে। অনেক উপরে।

এইতো আর কিছুক্ষণ। সর্ষে মাঠের হলুদ নদী নরম হবে কনে দেখা আলোয়। পদ্মকুঁড়ি বিসর্জন দেওয়া ঈশ্বরীর চোখে সন্ধ্যার কুয়াশা; সামাজিক দিনের আলোর বুকে অন্ধকারের পর্দা নামছে ধীরে। এইতো আর কিছুক্ষণ। তারপরেই অন্ধকারের ক্যানভাসে নতুন নতুন পদ্মকুঁড়ি বৃত্তান্ত আঁকা হবে আলো-আঁধারির খাঁজে… ভাঁজে… মসৃণ… নিঁখুত… পেলব… সমতল… উপত্যকা…. গিরিখাদ… উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি… উষ্ণ লাভা…. সমুদ্রদোলা ঢেউয়ের আশ্চর্য্য দুর্বোধ্য রহস্যময়তা ঘিরে একটি পদ্মকুঁড়ি; ঈশ্বরীয় ক্ষমতায় গর্বিত কোন নারী ফিনাইলের গন্ধের সমুদ্রে বিসর্জন দিবে পদ্মফুলের স্বপ্ন। তবুও নবপরিণীতার শরীরজুড়ে ঘোর; অভিসারিকার করতলে বিহ্বল স্বপ্নালু ভোর; এইতো আর কিছুক্ষণ!

Most Popular

To Top