ফ্লাডলাইট

সন্ত্রাসী হামলা, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এবং ক্রিকেটপাগল বাংলাদেশীরা

নিয়ন আলোয়

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি শুরুর আগে যখন সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট দল ইংল্যান্ড সফরে ছিলো এবং অন্য দলগুলা সবেমাত্র ইংল্যান্ডে পা রাখতে শুরু করেছে ঠিক তখনই ২২ মে ভয়াবহ বোমা হামলায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ম্যানচেস্টার শহর। যদিও ম্যানচেস্টারে এবার কোন খেলা ছিলোনা তবুও নিরাপত্তা ইস্যু বেশ আলোচিত হয়। সাউথ আফ্রিকা দলের খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফের সদস্যরা কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করার পর তাদের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। ইংল্যান্ড সফরে সাউথ আফ্রিকা শেষ টেস্ট ম্যাচটা খেলবে ম্যানচেস্টারে, বোমা হামলার ঘটনাস্থল সাউথ আফ্রিকা দল যেই হোটেলে থাকবে তার বেশ কাছেই যে কারনে বাড়ানো হয়েছে সেই হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

নিরাপত্তা আশংকা মাথায় নিয়েই পর্দা উঠে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির। বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের ওপেনিং ম্যাচের টিকিট প্রায় এক বছর আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো। ওভাল যেন এক টুকরো মিরপুর! প্রায় ২৬ হাজার ধারনক্ষমতার ওভালে সেদিন অর্ধেক বা তার চেয়েও বেশি বাংলাদেশী ছিলেন নিজ দেশের খেলা দেখার জন্য।

৩ জুন ২০১৭, আবারো সন্ত্রাসী হামলা, এবার লন্ডনে। লন্ডনে বাংলাদেশ দল যেই হোটেলে ছিলো তার কাছেই। যেহেতু সবচেয়ে কাছে বাংলাদেশ দল ছিলো তাই মিডিয়া ছুটে গিয়েছিলো বাংলাদেশ দলের প্রতিক্রিয়া জানতে। সাংবাদিকদের মাশরাফি বলেন, “এই ধরনের ঘটনা যেকোন জায়গায় হতে পারে এখন। কোন দেশই নিরাপদ না। ইংল্যান্ড আমাদের দেশে গিয়েছিলো, আমি আবারো তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। হেলস এবং মরগান এখন হয়তো বুঝতে পারছে, তাদের দেশেও এসব হামলা হয়েছে”। ৫ তারিখে বাংলাদেশের ম্যাচ ছিলো ওভালে, সাংবাদিকেরা হয়তো শিরোনাম করার জন্য কিছু চাইছিলো, তাই আবারো প্রশ্ন নিরাপত্তা নিয়ে। মাশরাফির জবাব, “আমরা নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্ট, খেলার বাইরে আমরা হোটেল থেকে খুব বেশি বের হইনা, আমরা আগামীকালকের ম্যাচ নিয়েই চিন্তিত”।

আচ্ছা ধরা যাক, ঐ হোটেলে বাংলাদেশ ছিলোনা, অস্ট্রেলিয়া ছিলো। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিক্রিয়া যদি ভিন্ন হতো? ক্রিকইনফোর সিনিয়র স্টাফ জর্জ ডোবেলের একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম। তিনি বলেছেন যদি অস্ট্রেলিয়া হতো এবং অস্ট্রেলিয়া ওই হোটেলে থাকতে আপত্তি জানাতো? অথবা একদিন পরে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ খেলতে রাজি না হতো? নিরাপত্তা ইস্যুতে অস্ট্রেলিয়া হয়তো হোটেল থেকেই বের হলোনা। তাহলে? যতই ঘটনাটা বাড়াবাড়ি হোক মানুষ মেনে নিতো এবং অস্ট্রেলিয়া বলেই স্বাভাবিকভাবে নিতো। এখন যে কাজটা অস্ট্রেলিয়া করার অধিকার রাখে সেটা করার অধিকার বাংলাদেশেরও আছে। অবশ্যই আছে। জর্জ ডোবেল সেকারনেই বলেছেন ইংল্যান্ড যদি বাংলাদেশে সফর করায় বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ হয়ে থাকে তবে সুন্দরভাবে টুর্নামেন্ট পরিচালনায় সহায়তা করায় ইংল্যান্ড, ইসিবি এবং আইসিসির বাংলাদেশকে কৃতজ্ঞতা জানানো উচিৎ।

লন্ডন আরো একটা কারনে বাংলাদেশকে ধন্যবাদ দিতে বাধ্য, ৩ তারিখ সন্ত্রাসী হামলার পর লন্ডনের চিত্র কেমন হওয়া উচিৎ? আতংকের শহর, শোকের চাদরে ঢাকা গুমট এক পরিবেশ? কিন্তু তেমনটা হয়নি। বাংলাদেশের ম্যাচ উপলক্ষ্যে ইউকের বিভিন্ন শহর থেকে বাংলাদেশীদের আগমনে লন্ডন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে। প্রায় ১৩ হাজার বাংলাদেশী নেচে গেয়ে, উল্লাস করতে করতে রাস্তা দিয়ে দল বেধে স্টেডিয়ামে যান, যেমনটা আমরা মিরপুরে দেখি। আরো অসংখ্য বাংলাদেশী বড় পর্দায় শহরের গুরুত্বপুর্ন জায়গায় জড়ো হয়েছিলেন খেলা দেখার জন্য। ওভালে সেদিন ১৮ হাজার দর্শকের প্রায় ১৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশী ছিলেন। বাংলাদেশ প্রথম রানটা নেয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশীদের গলা ফাটানো উল্লাসে লন্ডন থেকে ভয়, আশংকা সব উধাও! খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন ওইদিন বাংলাদেশের খেলা না থাকলে এমনটা হতো? ধরা যাক অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের খেলা, কতজন আসতেন সন্ত্রাসী হামলার আশংকা পাশ কাটিয়ে খেলা দেখতে?

কার্ডিফে এবার ছিলো দর্শকখরা, চ্যাম্পিয়ন লীগের ফাইনাল নিয়ে যে উন্মাদনা ছিলো তার দশ ভাগের এক ভাগ ছিলোনা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নিয়ে। তার মাঝেও বাংলাদেশের খেলার দিন ওয়েলস হিসেবে প্রচুর দর্শক ছিলো মাঠে। ইংল্যান্ড থেকেও মানুষ ছুটে গিয়েছে লাল সবুজের টানে।

একই দৃশ্য ছিলো আয়ারল্যান্ডের ট্রাই নেশন সিরিজে। ইউকের বিভিন্ন শহর থেকে বাংলাদেশের সমর্থকরা ছুটে গিয়ে ছোটখাট বাংলাদেশ বানিয়ে দিয়েছে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দুটি অনুশীলন ম্যাচ, সাসেক্স এবং ডিউক অব নরফোকের সাথে দুটি ম্যাচেও প্রচুর বাংলাদেশী মাঠে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সবশেষ ইংল্যান্ড সফরে যায় ২০১০ সালে। লর্ডসে ঐতিহাসিক টেস্ট সেঞ্চুরী করার পর তামিম বলেছিলেন ক্যারিয়ারে হয়তো আর কখনোই ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পাবেন না তাই ওই সেঞ্চুরী তার জন্য বিশেষ কিছু। কেন বলেছিলেন তামিম এ কথা? কারন ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশের সিরিজ নেই। এটা এফটিপির হিসাবে, আর ইংল্যান্ডের নিজেদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০২২ পর্যন্ত তাদের যে সূচী তাতে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ নেই এখন পর্যন্ত। গত সাত বছরে পাকিস্তান, শ্রীলংকা সেখানে দুইবার সফর করেছে, সামনের আগস্ট মাসে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির বাইরে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাবে।

একটা সময় ছিলো বলা হতো বড় দলগুলা বাংলাদেশকে ডাকে না কারন দর্শক হয়না মাঠে, অর্থনৈতিকভাবে লাভ হয়না। কিন্তু এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফি প্রমান করেছে বাংলাদেশ মাঠে দর্শক টানতে সক্ষম। ইংল্যান্ডে প্রবাসী বাংলাদেশীর সংখ্যা শ্রীলংকা অথবা পাকিস্তানিদের চেয়েও অনেক বেশি। শ্রীলংকা যখন সফরে যায় তখন খুব আহামরি দর্শক ছিলোনা, একই কথা পাকিস্তানের বেলাতেও সত্য।

এখন তাই ইংল্যান্ডের উচিৎ নতুন করে ভাবা। বাংলাদেশের সাথে একটা হোম সিরিজ এখন আর অলাভজনক কিছু নয়। মাঠের লড়াই সেখানেও বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই, সবশেষ আট ম্যাচে সমান সমান চারটা করে জয় দুই দেশের। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ তিনশ রান করেছে যেটা অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড পারেনি। বাংলাদেশ এখন বিদেশের মাটিতে বেশি বেশি সিরিজ চায়। ক্রিকেটের আদি দেশ হিসেবে ইংল্যান্ডের উচিৎ এগিয়ে আসা।

আশার কথা ইংল্যান্ড এখন তাদের বনেদী আচরন থেকে সরে আসছে ধীরে ধীরে। মে মাসে প্রথমবারের মতো আয়ারল্যান্ডের সাথে হোম সিরিজ খেলেছে। দুই ম্যাচের ওই সিরিজের একটা ম্যাচ ছিলো হোম অব ক্রিকেট লর্ডসে, যেই ম্যাচের আশি ভাগ টিকেট বিক্রি প্রমান করে ইংল্যান্ডের দর্শকের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে এখন। তারাও এখন শুধু এশেজ বা বড় দলের খেলায় ডুবে নেই। তাছাড়া আয়ারল্যান্ড টেস্ট স্ট্যাটাস পেলে প্রথম টেস্ট ইংল্যান্ডের সাথে খেলবে বলেও নিশ্চিত করেছে ইসিবি।

খেলার মাঠের বাইরেও খেলা হয় আইসিসির সভায়। লন্ডনে চলছে আইসিসির সভা, বাংলাদেশ সেখানে দাবি জানাবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের সাথে হোম সিরিজ খেলার। আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে হোম সিরিজ নিশ্চিত করা এবং ডিসেম্বর ২০১৯ সালের ভেতর ইংল্যান্ড এবং ভারতের মাটিতে পূর্নাঙ্গ সিরিজ খেলার লক্ষ্য নিয়েই ২৩ জুন আইসিসির বার্ষিক সভায় যোগ দিবে বাংলাদেশ।

এখন শুধু প্রত্যাশা বিসিবির লক্ষ্য পূরন হয় যেন। আমরা যেন বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ড সফর করতে পারি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top