ইতিহাস

টাইটানিকঃ নিছক দুর্ঘটনা, নাকি ষড়যন্ত্র?!

টাইটানিক ষড়যন্ত্র নিয়ন আলোয় neon aloy

টাইটানিক নামটির সাথে পরিচয় নেই এমন মানুষ পৃথিবীর বুকে খুবই কম। ৩৫০০ যাত্রী বহনের ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজটি ছিল তখন পর্যন্ত নির্মিত সর্ববৃহৎ। ১৯০৯ সালে টাইটানিক নির্মাণের কাজ শুরু হয়, যা সম্পন্ন হয় ১৯১২ সালের ২ এপ্রিলে। কয়লাচালিত দুটি স্টিম ইঞ্জিনের গর্জনে টাইটানিকের সর্বোচ্চ গতি ছিল ২১ নট বা ৩৯ কি.মি প্রতি ঘন্টায়। ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল ক্যাপ্টেন এডয়ার্ড স্মিথের অধীনে যাত্রা শুরু করে টাইটানিক। ব্রিটেনের সাউথহ্যাম্পটন থেকে যাত্রা শুরু করা টাইটানিকের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক। প্রকৌশল জগতের অসাধারণ এই নিদর্শনের স্থপতি ছিলেন থমাস অ্যানড্রু। নির্মাণশেষে শুভমুক্তির লগ্নে থমাস দাবী করেন- “টাইটানিক কখনই ডুববে না!”

যাত্রা শুরুর পঞ্চমদিনেই নির্মাতাদের ভুল প্রমাণ করে অ্যাটলান্টিকের অতলে তলিয়ে যায় প্যাসেঞ্জার ক্রুজটি। অন্ধকার মহাসাগরে ভাসমান বিশাল আকৃতির বরফের চাঁইয়ের সাথে সংঘর্ষ হয় জাহাজটির। ১৫০০ যাত্রীর প্রাণহানী ঘটে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ শান্তিকালীন নৌ-দূর্ঘটনায়। ঘটনার আকস্মিকতায় নানা থিওরি দাঁড়া করানো হয় অবিনশ্বর দাবীকৃত জাহাজটির পরিণতি ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে। এত বিপুল পরিমাণ প্রাণনাশের জন্য কি বা কারা দায়ী তা নিয়ে এখনও আগ্রহ আর গবেষণার কমতি নেই। সাধারণ দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া হলেও অনেকের মতে বিশাল কোন ষড়যন্ত্রের শিকার ছিল অলিম্পিক শ্রেনীর এই জাহাজটি। ১১৫ বছর পরও কৌতুহলের সীমা নেই সেই রাতের ঘটনা নিয়ে। আর এই কৌতুহল থেকে জন্ম হয়েছে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের।

টাইটানিক ডুবে যাওয়া নিয়ে বহুল আলোচিত ৫টি ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথাই এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো এই আর্টিকেলে।

১) টাইটানিক কখনোই ডুবেনি!

১৯৯৬ সালে অক্সফোর্ডের প্লাস্টারকর্মী রবিন গার্ডেনার একটি বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম “Titanic: The ship that never sank(?)”। বইটিতে গার্ডেনার দাবী করেন টাইটানিকের পরিবর্তে সেদিন টাইটানিকের জমজ জাহাজ অলিম্পিক যাত্রা করে এবং আটলান্টিক মহাসাগরে তলিয়ে যায়। যুক্তি হিসেবে তিনি টাইটানিক যাত্রার আগের কয়েক বছরের ঘটনার পর্যালোচনা করেন।

অলিম্পিক ছিল টাইটানিকের অবিকল প্রতিকৃত একটি জাহাজ যা ১৯১০ সালে মুক্তি পায়। বাইরে থেকে অবিকল একই রকম দেখতে জাহাজ দুটির পাটাতন লিনোলিয়াম দিয়ে তৈরী ছিল। টাইটানিক যাত্রা শুরুর আগে সে পাটাতন কার্পেট দিয়ে ঢেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নির্বাহী প্রধান ব্রুস ইসমে। ১৯১১ সালে অলিম্পিকের সাথে নৌবাহিনীর একটি জাহাজের (HMS Hawke) সংঘর্ষ হয়। রিপোর্ট মতে হক জাহাজটি অলিম্পিকের বেশি কাছে চলে আসার কারণে নাব্যতার টানে অলিম্পিকের সাথে ধাক্কা খায়। এইচএমএস হক একটি যুদ্ধজাহাজ হওয়ায় এর কাঠামো অলিম্পিকের কাঠামোর থেকে অনেক শক্ত ছিল, ফলে অলিম্পিকের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নৌমন্ত্রনালয়ের তদন্তে অলিম্পিককে দোষ দেয়া হয় এই দুর্ঘটনার জন্য।

টাইটানিক ষড়যন্ত্র নিয়ন আলোয় neon aloy

সমুদ্রের তলদেশে ডুবে যাওয়া “টাইটানিক” এর ছবিতেও মিলে অলিম্পিকের সাথে এর সাদৃশ্য! [ছবি কৃতজ্ঞতা- সোশ্যাল শর্টহ্যান্ড]

এই রায়ের প্রেক্ষিতে অলিম্পিক মেরামতের ইন্স্যুরেন্সের টাকা বাজেয়াপ্ত করে “লয়ড’স অব লন্ডন” নামের একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী। অলিম্পিকের মেরামতের অর্থ সংকটে হোয়াইট স্টার লাইন অর্থনৈতিক বিপাকে পড়ে। অলিম্পিক মেরামতের কারণে টাইটানিক নির্মাণের কাজ বিলম্বিত করতে হয়।
রবিন গার্ডেনারের মতে, এমতাবস্থায় অন্তত একটি জাহাজ ভ্রমণযোগ্য রাখার জন্য টাইটানিকের নির্মাণ বন্ধ করে অলিম্পিক মেরামত করে তা টাইটানিক নামে চালিয়ে দেয় হোয়াইট স্টার। আসল টাইটানিক পরবর্তিতে অলিম্পিক নামে যাত্রা করে। লাইফবোট, সংকেত ঘন্টা আর নামফলক ছাড়া কোন অংশেই জাহাজের নাম লেখা ছিল না এবং অন্য সকল যন্ত্রাংশ টাইটানিক আর অলিম্পিকের মধ্যে বিনিমেয় ছিল। অর্থাৎ অলিম্পিক খুব সহজেই টাইটানিকের স্থান নিয়ে যাত্রা করতে পারতো।

২) ঠান্ডা মাথায় প্রতিপক্ষকে খুন!

টাইটানিকের যাত্রীদের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। এদের মধ্যে অনেকে- যেমন জন জেকব, বেনজামিন গুগেনহাইম, ইসিডর স্ট্রাউস ছিলেন আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠনের ঘোর বিরোধী। তিনজনই টাইটানিক দুর্ঘটনায় মারা যান।

গবেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা খ্যাতনামা ব্যাবসায়ী জে.পি মর্গানের মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল এবং এ পরিকল্পনার যারা বিরোধিতা করেছিলো, তাদের তিনি টাইটানিকে তুলে দেন হত্যা করার উদ্দেশ্যে। মর্গান একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন যিনি একাই মার্কিন ব্যাংকিং সিস্টেমকে ১৯০৭ সালের মন্দায় রক্ষা করেন। তার অবদানেই জেনারেল ইলেক্ট্রিক আর U.S Steel এর মত কর্পোরেশনগুলো গঠিত হয়।

টাইটানিকের প্রথম ভ্রমণে মর্গানের জন্য একটি আলাদা ডেক রাখা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মূহুর্তে তিনি তার ভ্রমণ বাতিল করেন যার প্রেক্ষিতে বিত্তশালী প্রতিদ্বন্দীদের হত্যার ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন শুরু হয়।

৩) পানিনিরোধী দরজাঃ

টাইটানিক ডোবা অসম্ভব- এই দাবী করার মূল কারণ ছিল এর অভিনব পানিনিরোধী দরজা, যা আগে কোন জাহাজে ব্যবহার করা হয়নি। এই দরজাগুলো বন্ধ থাকলে টাইটানিকের কম্পার্টমেন্টগুলো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণরুপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো, ফলে একটি কম্পার্টমেন্ট পানি পূর্ণ হলেও অন্য কম্পার্টমেন্টে পানি প্রবেশ করতে পারার কথা না।

একটি তত্ত্বে দাবি করা হয় টাইটানিকের এই দরজাগুলো খুলে দেয়া হলে দূর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কম্পার্টমেন্টগুলো থেকে পানি অপসারিত হয়ে জাহাজটি স্থির অবস্থায় ভেসে থাকার কথা। ফলে সে সময়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মূল্যবান সময় হাতে পেতো জাহাজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যাক্তিবর্গ

তবে এই তত্ত্ব কোন বিতর্ক ছাড়াই ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয় কারণ টাইটানিকের ক্ষতিগ্রস্ত কম্পার্টমেন্টগুলোর মধ্যে এই পানিনিরোধী দরজা ছিল না। পানির স্তর কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ছিল না টাইটানিক প্রকৌশলীদের।

১৯৯৮ সালে Discovery Channel একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরী করে “Titanic: Secrets Revealed” শিরোনামে। সেখানে কম্পিঊটার মডেল দিয়ে দেখানো হয় যে পানিনিরোধী দরজাগুলো খুলে দেওয়া হলে টাইটানিক বাস্তবের থেকে আরো ১.৩০ঘন্টা আগেই ডুবে যেত!

৪) কয়লাচালিত ইঞ্জিনঃ

কয়লাচালিত জাহাজের কয়লার স্বতস্ফূর্ত দহনের কারণে প্রায়ই আগুন ধরার ঘটনা ঘটতো। টাইটানিকের যাত্রা শুরুর ১০ দিন আগে কয়লাগারে আগুন লেগেছিল বলে বিবৃতি পাওয়া গেছে এবং এই আগুন যাত্রার শুরুর পরও জ্বলতে থাকে। এই আগুন নেভানোর একমাত্র উপায় ছিল সাধারণ কয়লা সরিয়ে নিয়ে জ্বলন্ত কয়লা বয়লার মেশিনে ঢেলে দেয়া।

অনেকে মনে করেন উক্ত আগুনের কারণে টাইটানিকের স্টিল নির্মিত কাঠামো দূর্বল হয়ে পড়ে। বরফের সাথে ধাক্কা খাওয়ার ফলে কাঠামোর দূর্বল অংশগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যাদের মতে, কয়লার আগুন নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে টাইটানিকের স্টিম ইঞ্জিনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কয়লা ঢেলে দেয়া হয়, ফলে টাইটানিক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গতিতে চলতে থাকে। অতিরিক্ত গতির ফলে বরফ সতর্কতা জারি করা হলেও টাইটানিক কর্মকর্তারা দিক নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন।

৫) অদ্ভুত মমি এবং একটি কাকতালীয় গল্পের মিলে যাওয়া!

এই দুটি তত্ত্বে ষড়যন্ত্র কম, কুসংস্কারের প্রাধান্যই বেশি। একজন ইতিহাসবিদের মতে টাইটানিকের ব্রিজে এক মিশরীয় ফারাওয়ের মমি রাখা হয়েছিল। মমিটি আমেরিকার ন্যাচারাল হিস্টরি মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। মমিটি অভিশপ্ত ছিল বিধায় এর অভিশাপেই টাইটানিকের শেষ আবাস আটলান্টিকের তলায় হয়েছে- এমনও বিশ্বাস করেন হাতে গোনা কয়েকজন।

১৮৯৮ সালে গল্পকার ও উপন্যাসিক মর্গান রবার্টসন একটি বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম “Wreck of the Titan: Or, Futility”। আশ্চর্যজনকভাবে, বইটিতে বর্ণিত ঘটনা টাইটানিকের ডুবে যাওয়ার সাথে অনেক অংশে মিলে যায়। এ থেকে অনেকে ধারণা করেন মর্গান রবার্টসন আগে থেকেই জানতেন টাইটানিকের পরিণতি এবং সে সম্পর্কে সতর্ক করেন সকলকে। টাইটানিক দূর্ঘটনার পর এই লেখকের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়! এ ঘটনাটির বিস্তারিত পাবেন এই লিংকে- “টাইটান এবং টাইটানিকের গল্প”

টাইটান টাইটানিক নিয়ন আলোয় neon aloy

কল্পকাহিনী যখন নিষ্ঠুরভাবে মিলে যায় বাস্তবতার সাথে!

তবে যত ধরনের তত্ত্বই দেওয়া হোক না কেন, টাইটানিক দুর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্টে কোন পরিবর্তন আসেনি। নির্বাহী তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুসারে, টাইটানিকের দূরদর্শক ফ্রেডরিক ফ্লীট রাত ১১:৪০ ঘটিকায় এক বিশাল আকৃতির বরফখন্ড দেখতে পান এবং তা সম্পর্কে ব্রীজকে অবহিত করেন। ফার্স্ট অফিসার উইলিয়াম মারডক ইঞ্জিন বন্ধ করে প্রতিবন্ধকটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু সেটা করার পর্যাপ্ত সময় ছিল না। টাইটানিকের ডান পাশে বরফ খন্ড আঘাত করে, যার দরুন সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে ৫টি কম্পার্টমেন্টে জাহাজের খোল সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজের পানিনিরোধী কম্পার্টমেন্ট অকার্যকর হয়ে সেখানে পানি ঢুকতে থাকে। একের পর এক কম্পার্টমেন্ট পানিপূর্ণ হয় এবং টাইটানিকের সামনের দিক পানির নিচে তলিয়ে যেতে থেকে। ধাক্কা লাগার ২ ঘন্টা ৪০ মিনিট পর টাইটানিকের পশ্চাৎভাগ সোজা উপরের দিক উঠে আসে এবং সামনের ভাগ সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়। এক পর্যায়ে কাঠামোর উপর প্রযুক্ত তীব্র চাপে টাইটানিক দুভাগে বিভক্ত হয় এবং পেছনের দিক আলাদা হয়ে কিছুক্ষণ ভেসে থাকে। এরপর দুটি ভাগ আলাদা আলাদা অবস্থায় স্থান করে নেয় আটলান্টিক মহাসাগরের ৩.৭ কি.মি গভীরতায় সমুদ্রতলে।

Most Popular

To Top