নাগরিক কথা

যুদ্ধে জয়ী এক রণজিতের গল্প; বাবার গল্প!

যুদ্ধজয়ী বাবা নিয়ন আলোয় neon aloy

খুব ছোট আমি তখন। বয়স তিন কিংবা চার হবে। অফিস থেকে বাবা ফিরলে চুপটি করে তার জুতোটা নিজে পরতাম। নিজের পায়ের কাছে দানবাকৃতির সে জুতো সামলানোই বড় কষ্ট ছিল। তারপরেও পরতাম। এ ছিল এক অসাধারণ আবেগের অভ্যাস।

আরেকটু যখন বড় হলাম, শুনতাম নির্বাচন, নির্বাচন। বাসার নষ্ট ফ্রিজের ভেজিটেবল বক্সকে ব্যালট বানিয়ে বাবার মত নির্বাচনের ডিউটি করতাম। আর ভোটার হত আমাদের বাসার নিকটবর্তী বস্তির আমার বয়সী খেলার সাথীরা। এর উদ্যোক্তাও বাবা। বলতেন, ওদের সাথে খেলে জীবন কি সেটা শিখতে হবে।
কিছুদিন পর খেলার বিষয় গেল পাল্টে। খেলাটা এবার অফিস-অফিস খেলা। বাবার মতো অফিসার সাজতাম। কেউ হত সিএ, কেউ পিয়ন। তবে সবসময় আমি অফিসার ছিলাম না। পিয়নও হতে হত, সিএর দায়িত্বও পালন করেছি।

এসব বলছি কেন তা বিস্তারিত বলব একটু পরে। এবার যাকে উৎসর্গ করে এই লেখা, তাঁর কথা বলি। বাবা। আমার বাবা। বীর মুক্তিযোদ্ধা রণজিত কুমার ঘরাই। খুব জানতে ইচ্ছে করে পরলোকগত পিতামহীর কাছে, কি বুঝে এত যথার্থ নাম রেখেছিলেন ছেলের! “রণজিত” (যুদ্ধকে জয় করেছে যে)। সাহসী যোদ্ধা রণজিত ১৯৭১ সালে সম্মুখযুদ্ধ করেছিলেন ৯ নং সেক্টরে। সুন্দরবন এলাকায়।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে ১১ ভাইবোনের পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে ঝাঁপিয়ে পড়েন জীবনযুদ্ধে। বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ থানায় দিনরাত খেটে গড়ে তোলেন ছোট্ট খাবার হোটেল ‘বঙ্গবন্ধু চা বাসর’। সকাল থেকে রাত খাটুনি, তার পাশাপাশি পড়াশোনা।

ডিগ্রী পাশ করতেও সংগ্রাম। সে বছর পুরো উপজেলায় পাশ করেছিলেন মাত্র দুজন। তার একজন আমার বাবা। তারপর অনেকটা নাটকীয় ভাবেই পুলিশ সার্ভিসে। দারোগার চাকরিটা করতে করতেই বিসিএস পরীক্ষার আবেদন করলেন। ফলাফল- বিসিএস প্রশাসনে অন্তর্ভুক্তি। ১৯৭৩ সালের ব্যাচে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান। এরপর রণজিত ঘরাই ছিলেন প্রশাসন ক্যাডারে সাহসিকতার আইকন। কোমরে লাইন্সেস করা রিভলবার আর বুকে অসীম সাহস। এ নিয়েই লড়ে গেছেন সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তার অধিক্ষেত্রে পরীক্ষার হলকে নকলমুক্ত করেছিলেন সে আমলেই। তার মধ্যে অন্যতম ছিল যশোরের অভয়নগর উপজেলা। জায়গার নামটা মনে রাখবেন। পরে কিছু সংযোগ আছে বৈ কি! ভোলার মনপুরা উপজেলার প্রথম টিএনও ছিলেন বাবা। দুর্যোগ মোকাবেলায় রেখেছিলেন অসামান্য অবদান। সে টান থেকেই হয়ত মনপুরা দ্বীপের নামে আমার নাম রেখেছিলেন মনদীপ। জানি দীপ এ ব-ফলাটা নেই। সেজন্যই হয়ত মনের আলো ছড়াবার একটা সুযোগও পেয়েছি নাম থেকে।

এরপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করে সরকারের উপসচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরে যাওয়ার পরও নিজের জীবনযাত্রাটা বেছে নিয়েছেন নিজের মত করেই। আমার মা’র নামে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের ছোট্ট গ্রাম বলভদ্রপুরে গড়ে তুলেছেন “বাসন্তী মৎস ও কৃষি খামার”। নিজের হাতে সাজিয়ে তুলেছেন পুরো জায়গাটাকে। ছোট ৯ ভাইবোনকে মানুষ করেছেন। দুই সন্তানকে গড়ে তুলেছেন বিসিএস ক্যাডার হিসেবে।

ছেলেবেলায় বাবার জুতো পায়ে দেয়া ছোট্ট আমি সময়ের আবর্তনে যোগদান করেছি সেই প্রশাসন ক্যডারেই, ২০১৩ সালে। বাবার অফিস করা দেখে অফিস-অফিস খেলা রূপ নিয়েছে বাস্তবে।

যুদ্ধজয়ী বাবা নিয়ন আলোয় neon aloy

বাবার সাথে লেখক মনদীপ ঘরাই।

তবে, জীবন চমকে দেয়। দিতেই থাকে। কিছুক্ষণ আগে একটা জায়গার নাম বলেছিলাম, মনে আছে? যশোরের অভয়নগর। ১৯৮৮-৮৯ সালে বাবা এই উপজেলায় ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে। দাপটের সাথে লড়ে গেছেন অন্যায় ও পরীক্ষার নকলের বিরুদ্ধে। ঠিক ২৮ বছর। সময়ের কাটা এনে দাঁড় করালো অন্যরকম Déjà vu বা পুনরাবৃত্তির সামনে। মার্চে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদান করেছি শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত যশোরের অভয়নগর উপজেলায়। আরও অবাক করা ঘটনা হল, ইউএনও স্যার বহি:বাংলাদেশ ছুটিতে থাকায় গত দেড়মাস ধরে বসছি বাবার আসনে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে।

এ এক অন্যরকম অনুভূতি। শৈশবের বাবার জুতো পরার আবেগ। অফিস-অফিস খেলার অনুভূতি। বোঝানো যাবে না। চোখ বোঝে। তাই প্রতিক্রিয়া জানাতে একদম দেরি করে নি।

বাবার অর্জন পাহাড়সম। সে পাহাড়ে চড়তে চাই না। চাই পর্বতসম অর্জনকে কুর্নিশ করে বাবার সুনামটা ধরে রাখতে। চেষ্টা করছি অবিরাম। নিজের মত করে।

সম্পদের প্রাচুর্য নেই আমার বাবার। তবে আছে আকাশছোঁয়া সাহস আর আত্মবিশ্বাস। বাবাকে কখনও ঘাবড়াতে দেখিনি। বিচলিত হতে দেখিনি কঠিন বিপদের ক্ষণেও। ছোটবেলা থেকে খুব ভয় পেতাম। শ্রদ্ধাও করতাম খুব। কোনোদিন বলা হয়নি— তোমাকে খুব খুব বেশি ভালবাসি বাবা। বাবা দিবসে তোমাকে প্রণাম।

লেখকঃ মনদীপ ঘরাই,
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top