নাগরিক কথা

বাবা ফেরিওয়ালা ছিলেন, তবুও শিক্ষিত করেছেন আমাদের

বাবা ফেরিওয়ালা নিয়ন আলোয় neon aloy

আজ থেকে বছর চৌদ্দ, কিংবা তারও কিছু আগে যখন আমি প্রাইমারী পড়া বালক ছিলাম, বেহায়া বায়নায় যাকে দু’টাকার চকলেট কিনে দিলেই শান্ত হয়ে যেতো, রবীন্দ্রনাথের ফটিকের মত সাইকেল টায়ার ঘুরিয়ে যার দিন যেতো খেলার সাথীদের সাথে- তখন আমার বাবার একটা ছোট্ট দোকান ছিল। প্রসাধনী পণ্যের দোকান। এর আগে বাবা আমাদের গ্রামের চৌমুহনীতে একটা নাস্তার দোকান চালাতেন। বেশ জমতো দোকানটা। আমরা সীমান্ত এলাকার লোক আর সীমান্ত থেকে প্রতিদিন নানান ধরনের ভারতীয় পণ্য এদেশে উঠানামা করতো। সে সুবাদে প্রায় মানুষই ভিড় জমাতো আমাদের দোকানটাতে। তারপর বাবার ইচ্ছানুরূপ তিনি কসমেটিকসের ব্যবসা ধরলেন। ঢাকার চকবাজার থেকে পাইকারী ধরে মাল কিনে তা মেলায় কিংবা গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করতেন। আমার বাবার একটা ভ্যানগাড়ি ছিল। তাতে সবুজ জালের খাঁচা ছিল যেন বাচ্চারা কোন কিছু টেনে ছিঁড়ে না নিতে পারে। সেসময়ে আমরা গ্রামে ফেরি করা ছাড়াও বিভিন্ন মেলায় দোকান দিতাম। আমার প্রায়-ই মনে পড়ে পহেলা বৈশাখের মেলার কথা। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত, আর তার মাঝখানে একটা মাজার। তখন অবশ্য কাঁটাতারের বেড়া হয়নি বলে মানুষ সহসা যাতায়াত করতে পারতো এদেশ থেকে ওদেশে। স্থানটার নাম ছিল বদরপুর। বদরপুর একটা গ্রামের নাম। সে গ্রামের নাম কেন্দ্রিক মেলার নাম রাখেন এলাকার মুরব্বিরা। আমি যখন কথা বলতে এবং পথ-ঘাট চিনতে শিখেছি, তখন থেকে বাবার ব্যবসায় সাহায্য করার জন্য উনার সাথে থাকতাম।

এখনো গ্রামের সে স্থানটাতে আমাদের একটা নাস্তার দোকান আছে। আমি পড়াশুনার তাগিদে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আছি আর ভাইয়া চাকরীর তাগিদে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট। বাবা এখন একা পুরো দোকানটা সামলায়। জানি এতে বাবার অনেক কষ্ট হয়। তিনি এই বয়সে আমাদের জন্য এতো কষ্ট করেন, তা অন্য বাবাদের মাঝে এই দৃষ্টান্তটা বিরল।

যখন বাবা মেলায় দোকান দেওয়ার পরিকল্পনা করতেন, তখন পহেলা বৈশাখের আগের দিন ঝিঁক ঝিঁক রোদের মাঝে আমি আর বাবা সাইকেল নিয়ে সেই মেলার স্থানে যেতাম। বাবা সাইকেলে করে স্টল তৈরীর জন্য বাঁশ, পর্দার কাপড়, শাবল, তাক সাজানোর কাঠ আর প্রয়োজনীয় দড়ি নিয়ে নিতেন। আমরা দুজন হেঁটে হেঁটে মাইল সাতেক পথ যেতাম বনের মধ্য দিয়ে। কিছুটা পথ সমতল ছিল, আবার কিছুটা বেশ দুর্গম। কড়া রোদের মধ্যে বাবা শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়তেন আর আমি হাত দিয়ে গর্তের মাটি উপরে ফেলতাম। বাবার শরীর থেকে কিভাবে ঘাম বের হত তার ছবি আজো আমার হৃদয় দর্পনে আঁকা। তারপর সব কিছু ঠিকঠাক করে বাবা সাইকেলের পেছনে আমাকে বসিয়ে আবার বাড়ি ফিরে আসতেন।

বাবা ফেরিওয়ালা নিয়ন আলোয় neon aloy

লেখকের বাবা

তারপরের দিন পহেলা বৈশাখ। আমরা মেলায় বেচাকেনা করার জন্য ভোর পাঁচটায় ভ্যানগাড়িতে সব মালপত্র উঠিয়ে আবার হেঁটে হেঁটে সেই সাত কিলো পথ পাড়ি দিতাম। সেখানে পৌঁছে আমরা ব্যাগ থেকে পিঠা বের করে সকালের নাস্তা সেরে নিতাম। মা বাড়ি থেকে বড় যত্ন করে নতুন ধানের চালের গুড়ি দিয়ে পিঠা বানিয়ে দিতেন সকালের নাস্তার জন্য। আর তারপর বাবা আমাদের স্টলে একে একে সব কিছু সাজাতেন আপন ইচ্ছায়। আমাদের স্টলে বেশীরভাগই ছিল কিশোরীদের সাজের জিনিসপত্র। ছোট বাচ্চার দোলনার উপর বেঁধে দেয়া ফুল, সাত বছরের শিশুটার ফেঁ-ফুঁ করা বাঁশি, ষোল বছরের তরুণীর হাতের বেলিবারি চুড়ি, কৃষ্ণচুড়া রঙের লাল টিপ, মাথার খোঁপা, পা রাঙানোর আলতা থেকে শুরু করে শেষবয়সী প্রৌঢ়া বিধবার চুল বাঁধার কালো লেইসফিতা। আমাদের পাশে আরো অনেক স্টল বসতো। কেউ তরমুজ, কেউ নববর্ষের খাবার, কেউ হাত রাঙানো লেখনী, আবার কেউ বা জামা বিক্রেতা ইত্যাদি ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা তথা মেলা শেষ অবধি বাবার সাথে একসাথে থাকতাম আমি।

সেদিনে বাবাকে বিভিন্ন রকমে দেখতাম। কখনো হাসি মুখে, আবার কখনো গোমড়া মুখে। যখন পণ্য বিক্রি কম হত, তখন বাবার মন খারাপ হতো আর সেটা উনার মুখে ফুটে উঠতো। আর যখন বিক্রি বেশি হত, তখন বাবার মুখে চৈত্রের রৌদ্রোজ্জ্বল বর্ণ থাকতো। বাবার সুখ-দুঃখের নির্জন সাক্ষী ছিলাম আমি। কে জানে? দিনশেষে মেলা থেকে ফেরার পথে বাবা হয়তো একটা বাসিফুলের মালা কিনে নিতেন আমার মায়ের জন্য। যে তার হাসির বিনিময়ে কিনে নিতে পারেন গোটা পৃথিবী।

কোন সন্তান হয়তো ১লা বৈশাখের দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবদি তার বাবার সাথে থাকতো না। একমাত্র আমি আর বাবা একসাথে থাকতাম।

আমরা বাইরে থাকি, বাবা আজো আমাদের দোকানটা চালায়। এই রমজানে তিনি একা একা ইফতারি তৈরি করে সেগুলো বিক্রি করেন। আজো তিনি আমাদের জন্য কষ্ট করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। আমার বাবা একজন মূর্খ ফেরিওয়ালা ছিলেন বটে। কিন্তু তারপরেও শিক্ষিত করেছেন আমাদের সব ভাইবোনকে। আমাদের জন্য যত পরিশ্রম বাবা করেছেন এবং এখনো করছেন, সে শ্রমের ঋণ কখনো পরিশোধ করার মত নয়। ভাল থাকুক বাবা, বেঁচে থাকুক দীর্ঘদিন।

লেখকঃ দেলোয়ার হোসেন,
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top