নাগরিক কথা

তো জনাব, আপনি কোন গলির কুকুর?

গলির কুকুর নিয়ন আলোয় neon aloy

বছরদুয়েক আগের ঘটনা। সেটাও ছিল রোজার মাস, ধানমন্ডি যাবো বলে মগবাজার মোড় থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিচ্ছি। মিটারে গেলে ৯০-১০০ টাকার বেশি হওয়ার কথা না ভাড়া, কিন্তু সিএনজি’র মামা ভাড়া দাবী করলেন ২৫০ টাকা। এমনিতে ঢাকায় হেঁটে বা সাইকেলেই চলাফেরা করি, পারতপক্ষে সিএনজি’তে চড়ি না। কিন্তু সেদিন বেশি তাড়া থাকায় দামাদামি করে ১৮০ টাকায় উঠে পড়লাম। উঠে সিএনজিচালককে বললাম, “এই যে মামা আপনারা মিটারে না গিয়া ভাড়া বাড়ায় নেন আমাগো জিম্মি কইরা, কাজটা কি ঠিক? আয়-রোজগার তো হালাল হয় না মিয়া!” মামা উল্টা খেঁকিয়ে উঠে জবাব দিলেন, “রাখেন আপনার হালাল। দুইন্যার লোকজন স্যুট-টাই পইরা ঘুষ খায়া বেড়াইতেসে, আমাগো মত গরীবরে একটু বাড়ায় দিতেই আপনাগো চুলকানি উঠে খালি”। বাকি রাস্তা তার সাথে তর্ক-বিতর্ক হলো এই নিয়ে যে একজন হারাম খাচ্ছে বলে কি আপনার হারাম খাওয়াও জায়েজ কিনা? একটা খারাপ কাজ দিয়ে আরেকটা খারাপ কাজ কিভাবে জাস্টিফাই করে মানুষ? সরকারী অফিসার ঘুষ খায়, আর আপনি ভাড়া বেশি নেন- তাইলে অফিসারেরটা খারাপ আর আপনারটা ন্যায্য হয় কেমনে? যাই হোক, ইফতারের পরপর রওনা দিয়েছিলাম বলে একটানে ধানমন্ডি পৌঁছে গিয়েছিলাম ১৫-২০ মিনিটে। তাই সিএনজি’র মামার সাথে কোন আপোষে আসা যায়নাই এই সংক্ষিপ্ত তর্কে। অবশ্য ওনার যে যুক্তি, ১৫ মিনিট কেন, ১৫ দিন আলোচনা করলেও কোন সিদ্ধান্তে আসা যেত বলে মনে হয় না।

তার কয়েকদিন পরের ঘটনা। ভেন্যু আবারও সেই মগবাজার মোড়। ফ্লাইওভারের কাজ তখনো চলছিলো বলে সে এলাকার তখন এমনিতেই নরক-গুলজার অবস্থা। আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম বেইলি রোডের দিকে। হলি ফ্যামিলির সাইডের রাস্তাটা, যেদিক দিয়ে কাকরাইলের ওদিক থেকে গাড়ি আসছিলো- সেদিকটা পুরো জ্যাম। উল্টোদিকে ইস্পাহানি কোয়ার্টারের এদিকের রাস্তা অর্ধেকই খোঁড়াখুঁড়ি করা, তাও যা একটুখানি রাস্তা অবশিষ্ট ছিল স্বাভাবিক গাড়ি চলাচলের জন্য, সেদিকেও গাড়ি যাচ্ছে না। কেন? কারণ হেয়ার রোড-মিন্টো রোডের ওদিক থেকে ভিআইপি গাড়িবহর রংসাইডে এসে পুরো রাস্তা দখল করে ফেলেছে! গুনে গুনে ৭টা ভিআইপি গাড়ি, প্রত্যেকটার সাথে ১-২টা করে পুলিশ প্রটোকলের পিকআপ! হ্যাঁ, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাড়ি গুনেছিলাম সেদিন, কারণ আমার পায়ে হেঁটে যাবার রাস্তাটাও ছিল না সেখানে। দাঁড়িয়ে গাড়ি গুনছিলাম, আর মনে মনে গজরাচ্ছিলাম এই ভেবে যে এরা তো আমাদের মত সাধারণ জনগণের টাকায় বেতন পাওয়া আমাদেরই কর্মচারী। এদের বিবেক না থাকুক, একটু চক্ষুলজ্জাও কি নাই যে এভাবে প্রকাশ্যে অপরাধ করে যাচ্ছে পুলিশের সাইরেন বাজিয়ে সবাইকে শুনিয়ে? অথচ সেই সাতটা গাড়ির মধ্যে সেদিন উপমন্ত্রী-সচিব-বিচারক সবার গাড়িই ছিলো!

এত এত ঘটনা নিয়ে ভ্যাজর-ভ্যাজর করে যাওয়ার কারণ খুবই সামান্য। গতকাল রাতে ধুম করে একটা ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেল ফেসবুকে- এক ইউনিভার্সিটির শিক্ষক প্রকাশ্যে কলার ধরে শাঁসাচ্ছেন এক বাসচালককে আর দাবী করছেন তিনি এই এলাকার মাস্তান। ঠিক এরকম একটা ঘটনা দেখেছিলাম হোটেল সোনারগাঁওয়ের আগের রেলক্রসিংটায়। একটি সরকারী প্রাডো গাড়ি রাস্তায় আড়াআড়ি করে রেখে এক সিএনজি অটোরিকশার গতিরোধ করেছে, সেইসাথে প্রায় পুরো রাস্তাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তো অটোরিকশার অপরাধ কি তা জানা যায়নি, তবে সরকারী গাড়ি থেকে পুলিশের কনস্টেবল আর ড্রাইভার নেমে সিএনজি’র ড্রাইভারকে ঠিক প্যাঁদানি না দিলেও তুমুল চোটপাট দেখিয়ে যাচ্ছে। উঁকি দিলাম প্রাডো গাড়ির ভিতরে। সৌম্য চেহারার, কিন্তু জাঁদরেল গোঁফের এক ভদ্রলোক আপন মনে ফোন টিপাটিপি করছেন। তার হয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দপ্রাপ্ত তার স্যাঙাতরা যে তার পদমর্যাদা বুঝানোর জন্য চোটপাট দেখাতে গিয়ে পিছনে আরো এক-দেড়শো গাড়ির জ্যাম বাঁধিয়ে বসেছে সে বিষয়ে তাঁর কোন ভ্রুক্ষেপই নেই! ভুল আশা করেছিলাম আমি-ই। জনাবের মাথায় পুরো দেশের চিন্তা, ১০০-১৫০ গাড়িতে বসে ঘেমে-নেয়ে যাওয়া ৪০০-৫০০ মানুষের ক্ষুদ্র গন্ডিতে চিন্তা করলে কি চলে?

তো যা বলছিলাম, বর্তমান ইস্যু সেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের অসভ্য আচরণ। এই আচরণ এতই অমানবিক, এতই অসভ্য, এতই অপ্রত্যাশিত যে এই ইস্যুর তোড়ে রাঙ্গামাটির ভূমিধ্বসও ইস্যুতেও ধ্বস নামবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমি যদি বলি তিনি যা করেছেন, ঠিকই করেছেন- আমাকে কি তেড়েফুঁড়ে মারতে আসবেন? তিনি তো ভুল কিছু করেন নাই! কেন? একটু ধৈর্য্য ধরুন, ব্যাখ্যা করছি।

ছোটবেলায় হিন্দি সিনেমা দেখে একটা ডায়ালগ শিখেছিলাম- “আপনি গালি মে কুত্তা ভি শের হ্যায়”। বাংলা তরজমা দাঁড়ায়- নিজের গলিতে নেড়ি কুকুরও বাঘের মত আচরণ করে। তো সেই সম্মানিত শিক্ষক যে দাবী করেছেন তিনি সেই এলাকার মাস্তান, ভুল কিছু তো করেন নাই! বাংলাদেশ যে এভাবেই গায়ের জোরে চলছে সেটা তো নিজের চোখে দেখা কয়েকটা ঘটনা দিয়েই বুঝেছি এতদিনে। ঘটনাটা যদি ঢাবি ক্যাম্পাসে না হয়ে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের ওদিকে হতো, আপনার কি মনেহয় শিক্ষক মহোদয় তখন এরকম হম্বিতম্বি দেখানোর সাহস পেতেন? বরং বাসচালক-শ্রমিকরা এক হয়ে তাঁর গায়ে দু-চার ঘা বসিয়ে দিলেও অবাক হতাম না! নিজের ভার্সিটিরই এরকম ঘটনা আছে। শাবিপ্রবি’র কিছু স্টুডেন্টের সাথে কি কারণে যেন শ্যামলী বাসের লোকজনের কথা কাটাকাটি হওয়ায় পুরো বাসস্ট্যান্ডের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে তাদের আটকে রাখে। খবর পেয়ে ভার্সিটির প্রক্টর তাদের উদ্ধার করতে গেলে দোকানের শাটার নামিয়ে তাঁকেসহ পিটুনি দিয়েছিলো পরিবহনশ্রমিকরা। এই ঘটনা নাহয় আঞ্চলিক। কয়েকদিন আগেই যে আদালতে সাজা পাওয়া দুই বাস এবং ট্রাকচালকের মুক্তির দাবীতে পুরো দেশ পরিবহন ধর্মঘট ডেকে অচল করে দিয়েছিলো পরিবহন শ্রমিকরা, তখন কি তাদের উপর আপনার মেজাজ খারাপ হয়নি? তখন কি হাতের কাছে এক-দুইটাকে পেলে দুই-চার ঘা কিল বসিয়ে দিতেন না তাদের পিঠে?

শুধু কি অশিক্ষিত, “অসভ্য” পরিবহনশ্রমিকরাই এভাবে সাধারণ জনতাকে জিম্মি করে রাখছেন? আর কেউ কি রাখছেন না? আমাদের একটা কমন ধারণা সরকারী অফিস মানেই ঘুষের পিরামিড। আর এই পিরামিডে সবার উপরে, মানে সবথেকে বেশি বখরা পান প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তারা। এ সপ্তাহে একটা প্রতিবেদন দেখে এই ধারণাও ভুল প্রমাণিত হলো। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত বিসিএস ক্যাডাররা তাদের চাকরির প্রথম মাসের বেতন উত্তোলন করতে পারছেন না, কেননা এজি অফিসের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীরা ঘুষ চাচ্ছে ফাইল ক্লিয়ার করার জন্য! নিজের হোমগ্রাউন্ডের কি পাওয়ার বুঝেছেন এবার? নিজের উঠোনে বাগে পেয়ে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদেরকেও ইদানিং জিম্মি করছে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীরা! এজি অফিসের গলির কুকুরগুলোর খুব সম্ভবত নিজেদের বাঘের সমতুল্য মনে করে ঠিক পোষায় না, ড্রাগন-গডজিলা কিছু একটা ভাবতে হয় নিজেদের। নতুন চাকুরিতে জয়েন করা এই তরুণ অফিসাররা যে এখনো বেঁচে আছেন, ড্রাগনের নিঃশ্বাসেই ভস্ম হয়ে যাননি- এটাই কি তাদের চৌদ্দ পুরুষের সৌভাগ্য নয়?

এতক্ষণ পড়ছেন, আর হয়তো ভাবছেন যে আপনি সিএনজিচালক না, সরকারী কর্মকর্তা না, অথবা আলোচ্য সেই শিক্ষকও না! আপনি নিশ্চয়ই তাহলে বিরাট সভ্য ব্যক্তি! কোনভাবেই না? সুযোগ পেলে দুই নম্বুরি ঠিকই করেছেন যখন যেভাবে পেরেছেন। কেন বলছি? কারণ উপরে এখন পর্যন্ত যাদের কর্মকান্ড বর্ণনা করেছি, তারাও আপনার-আমার মত সাধারণ মানুষের কাতার থেকেই উঠে এসেছেন, “অসাধারণ” কেউ হয়ে আসমান থেকে পড়েননি টপাক করে। তাদের সাথে আপনার পার্থক্য একটাই- তাদের ক্ষমতা আছে, তাই তার অপব্যবহারও করতে পারছেন তারা নিজ নিজ ক্ষমতা অনুসারে। আর আপনার ক্ষমতা নাই, তাই আপনি খুব একটা সুবিধা করে উঠতে না পেরে ক্ষমতাবানদের দুটো কথা শুনিয়ে মনের জ্বালা মিটাচ্ছেন। দিনশেষে আপনি “সুযোগের অভাবে সৎ”- এটাই বাস্তবতা।

অনেক উদাহরণ দিয়েছি, আর না। এবার একটা উপলব্ধি দিয়ে উপসংহার টানি। মানুষ নিজে যেরকম, সে সবকিছুকে সেভাবেই বিচার করে। যিনি ভাল মনের, তিনি একটা খারাপ ঘটনার মধ্যেও হয়তো ভাল কোন দিক খুঁজে পান। আর যিনি মতলববাজ, তিনি কোন ফেরেশতার সাক্ষাত পেলেও মনে মনে সন্দেহ করবেন, “এই ব্যাটার আসলে ধান্ধাটা কি? চায় কি সে?” এটা বললাম কারণ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ডামাডোলে ফেসবুকে কিছু ট্রল দেখার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য হয়েছে। একটিতে পাকিস্তানের ম্যাপের সাথে একটি কুকুরের সাদৃশ্য দেখানো হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে দেখা যাচ্ছে বাঘের থাবা থেকে বাঁচতে একটি কুকুর প্রাণপণে দৌঁড়াচ্ছে। বলাই বাহুল্য, এখানে বাঘের গায়ে বাংলাদেশের পতাকা আঁকা, আর কুকুরের গায়ে ভারতের। এগুলো থেকেই আসলে বুঝা যায়, কুকুর আসলে কারা। কুকুর আমরা বাঙ্গালীরাই, নতুবা উঠতে-বসতে একে-ওকে কুকুর ভাবার বাতিকে ভুগতাম না দিনরাত। আর নিজেদের কুকুর বলে স্বীকার করে নিবোই না বা কেন? কুকুরের সাথে খুব একটা কি পার্থক্য আছে আমাদের? নিজের গলিতে সবারই গলা দিয়ে হালুম বের হয়, অন্য গলিতে গেলেই যা একটু ফাঁপড় আর কি!

তো জনাব, আপনি কোন গলির কুকুর?

Most Popular

To Top