গল্প-সল্প

ছোটগল্পঃ চার্লি…

চার্লি নিয়ন আলোয় neon aloy

ঘুম থেকে উঠে কফির পেয়ালার সাথে পত্রিকাটা সময়মত না পেলে আমি আজমল খন্দকারের মেজাজ ঠিকঠাক থাকে না। পত্রিকা এখনো আসে নাই, কফির স্বাদ পেশাবের মত লাগে। পেশাব পানের পূর্ব অভিজ্ঞতা অবশ্যই আমার নাই, সেকেন্ডারি ছোট একটা অভিজ্ঞতা আছে, খুবই সিক্রেট, সবকিছু সব জায়গায় বলতে নাই। আমারই এক ব্যবসায়ী বন্ধুর মুখে আল্লাহ কোন লাগাম দান করেন নাই, একাবারে অসহায়। বিয়ের প্রথম রাতে বউয়ের সাথে তার রতিক্রিয়ার রগরগে বর্ণনা শুনিয়ে সে যে সন্তুষ্টি আস্বাদন করেছিল, রতিক্রিয়ায় বোধ হয় এতোটা আস্বাদ নিতে পারে নাই। সারারাত গলায় মাল চালানের পর সকালে যে হলদেটে পেশাব কড়কড় শব্দে আমি ছাড়ি, দূর্গন্ধে এর স্বাদ সম্পর্কে আমার বেশ ধারণা হয়ে যায়। পত্রিকা ছাড়া কফির স্বাদ ঐ বস্তুর মতই। রক্তে আজকাল চিনির বাড়াবাড়ি রকম নর্তন কুর্তন চলে, চিনি ছাড়া ঐ বস্তু পান করি। আর্টিফিসিয়াল সুইটেনার দিয়ে কিছুদিন ট্রাই চালানো হয়, কষা স্বাদ, শাওয়ার ছেড়ে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি যাপনের মত একটা অনুভূতি। সাত সকালে সবুজ লনে আমার অলস মাথার উপর মেঘেরা ভিড় করে, সুঁই দিয়ে ফুটো করে দিলেই ঝিরঝির হামলে পড়বে। পত্রিকা না হলে হচ্ছে না, পেশাব পেয়ালা হাতে কতক্ষণ বসে থাকা যায়। পত্রিকা যে আমি আগাগোড়া মুখস্ত করি এমন না। এটা আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভ্যাসের অংশ, প্রায় সময় পত্রিকার প্রথম পেইজটাও চোখ বুলিয়ে দেখি না, তারপরও ওটা সামনে থাকলে ভালো লাগে। গতকালের পত্রিকাটা দেখা হয় নাই। ওটা একটু নেড়েচেড়ে দেখব বলে হাতে তুলি। বড় বড় শিরোনামে লেখা, ‘…… নিখোঁজ’। আমার সামনে জিভ বের করে চার্লি দাঁড়িয়ে। জ্বলজ্যান্ত মানুষ নিখোঁজ করে ফেলা কি আর যেনতেন ব্যাপার! চাইলেই কি আর নিখোঁজ হওয়া যায়? স্পেসিফিক ম্যাকানিজম ফলৌ করলে ঠিকই নিখোঁজ করে ফেলা সম্ভব, হাড্ডিগুড্ডিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু দু-চার মাদারচোদ নিয়ে ঝামেলা হয়ে যায়, ওই মাদারিরা ঠিকমত কাজ সামলে নিতে পারে না। ওদেরকে মিশনে যে কেন পাঠায়, বেড়াছেড়া করে দেয়, ফ্যাব্রিকেশনের পর ফ্যাব্রিকেশন লাগে। চার্লি এক্সাইটেড হয়ে লেজ নাড়ে। আমি কথা বললে চার্লি ওভাবেই রেসপন্স করে। একমাত্র চার্লির সাথেই আলাপে আমার আরামবোধ হয়, দ্বিমত শুনলেই খুলিতে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করতে ইচ্ছা করে, চার্লির ওসব বদ অভ্যাস নাই।

প্রশস্ত রাস্তা, দুপাশে শিরিষ গাছের সারি। মাঝখানে পিচঢালা রাস্তায় যতদূর চোখ যায় লোকজনের চলাচল খুব একটা চোখে পড়ে না। গেইট থেকে তিন কিলোমিটার দূরে মূল ভবন, আমার গন্তব্য। হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় সমস্ত শরীর জুড়িয়ে আসে। রাতে ঠিকভাবে ঘুম হয় নাই উত্তেজনায়, রাজ্যের ক্লান্তি এসে চেপে ধরে। বুক ধড়ফড় করে, যৌবনের সংক্ষিপ্ত রাত্রি তামাদী, ঘেমে নেয়ে একাকার। হঠাৎ রাত্রি শেষে ম্যাচিউরিটির প্রবেশ পথে এসে এমন বিটকেল কোন উদ্বেগ এসে আমাকে গ্রাস করবে তা কোন দিন মাথায় আসে নাই। আমার হাটু থরথর কাঁপে, উত্তেজনায়। এই তিন কিলোমিটার অতল এক দূরত্ব, গেইট থকে মূলভবনের মাঝের স্পেইসটুকু যে চক্রান্ত করে তা আমার বোধগম্য না। বয়স্থদের কাছ থেকে একাডেমির অভিজ্ঞতা শোনা হয় ঠিকই, বিশ্বাস হয় না। অথচ আমার হাতের পেশাব পেয়ালা এখন শান্ত, তাতে কোন অনর্থক কোলাহল নাই। রুচি জিনিসটা আপনাতেই মাটি ফুঁড়ে গজায় না। পত্রিকা, কফির কম্বিনেশনে যে মিউজিক আমি উপভোগ করি তা তিন কিলোমিটারের ডিভাইন কন্সপিরাসিতে লিপিবদ্ধ। আমার হাটায় জড়তার কোন ছাপ নাই, এলিগেন্ট। আমি আজমল খন্দকার যখন বসে থাকি, যখন বিশ্রামে, আমার পেশীর কম্পন, শরীরের উষ্ণতা, শাণিত নখ, চারপাশের আভাময় রেখার উত্তেজনা থেকে সহজেই যে কেউ অনুমান করতে পারে আমি ঝাঁপ দেয়ার জন্য প্রস্তুত। অত ফ্যব্রিকেশনের দরকার আমার পড়ে নাই। ঐ মাদারিরা ডিফেক্ট প্রোডাক্ট। নিশ্চিত কফির পেয়ালায় টুংটাং শব্দ তারা লাগিয়েই রাখে, কফির সাথে আর নানা জিনিসের কম্বিনেশন নিয়ে আসতে অক্ষম। চার্লি লেজ নাড়ে। কাজের ছোকরাটা একটু দূর থেকেই আমার ভাব ভঙ্গি বুঝে নেয়। চার্লির সাথে যখন আমি কথা বলি, তখন বিরক্ত করা যাবে না, সিরিয়াস কনভার্সেশন।

নিখোঁজ সংবাদটা দেখেই আমার রক্ত টগবগ করে। চোখের সামনে পুরো ক্যারিয়ার একটা স্লাইড শৌতে প্লে হয়। একাডেমি থেকে ফিরে একটা ব্যাপার খেয়াল করি, বন্ধুরা আমাকে বেশ সমীহ করে আজকাল, আবার সুযোগ পেলে এ-ও স্মরণ করিয়ে দেয় অতীত যেন ভুলে না যাই। নির্মম সত্য হলো, সেটা স্মরণ করার প্রয়োজনীয়তা আমি কখনো অনুভব করি না। সেন্টু একদিন পিঠে চাপড় দিয়ে বলে, “দোস্ত, তুমি তো অখন ফুরফুর কইরা উড়তে থাকবা, পাখির লাহান, আমাগোর দিকে একটু নজর রাইখো”। আমার মেজাজ তখন খানিক বিগড়ে যায়। প্রথমত, সেন্টু নামটা আমার পছন্দ না, এক কথায় অশিক্ষিত একটা নাম । দ্বিতীয়ত, পিঠে চাপড়টা ঊর্ধ্বতন ছাড়া অন্য কেউ দিলে আমার প্রেস্টিজে লাগে। আমি তখন কপালে দাপুটে ভাঁজ তুলে, ঠান্ডা চোখে বরফের চোখা খন্ড সবার বুকে বিঁধিয়ে বলি, “সময় সামনের দিকেই এগিয়ে যায়, তাই না সেন্টু। পিছনের দিকে ফিরে তাকাবার সুযোগ কোথায়? যখনই তাকাই, একেবারে শূন্য। অতীত আমাদের কারোরই থাকে না, ওসব সিম্পলি বুলশিট। আই এম আ সেলফ-মেইড নকটারনাল অ্যানিমল, আমার কোন অতীত নাই, থাকা উচিতও নয়। একেবারে সেলফ-মেইড বললে ভুল হবে অবশ্য। আমার তো আগ্রহ ছিল। আগ্রহ ছিল বলেই আমি ইভলভ করেছি, সেটা সবার থাকে না। গৃহকাতরতায় মশগুল প্রাণিগুলোকে দেখলে করুণা হয় – জঘন্য, গেঁয়ো, হিংসুটে, গাড়ল- ফিউচার নাই, একেবারে ফিউচার নাই। তারাই আমার চারপাশে ভিড় জমায় নয়তো আমি তাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলি”। কড়কড়া ঝরঝরে শুকনো ভাতের মত শব্দগুলো গিলতে বন্ধুদের দম বন্ধ হয়ে আসে, তারা আমাকে সহজে আর ঘাটায় না।

পত্রিকা ডেলিভারির চ্যাংড়া খাটাশটা কখন যে আসবে, কফি ঠান্ডা থকথকে হয়ে গেল। কাজের ছোকড়াটা আরেক পেয়ালা কফি দিয়ে যায়। ঐ বেটা আমার মেজাজ মর্জি ভালোই বুঝে, একবার টেবিলের নিচে মাথা আটকে প্যান্ট খুলে পাছা বরারর বেল্ট দিয়ে বেশ চপকানি দেয়া হয়, এরপর থেকে আমার মেজাজ মর্জি ওর নখদর্পণের বিষয়। আমি অবশ্য নিজেকে ব্রুট ভাবি না, যে আদর করতে জানে সেই শাসন করতে জানে। এটা সেটা যখন কিনতে পাঠাই, টুকটাক টাকা যা ফেরত আসে তার হিসাব আমি নেই না। ব্যাটার বোনের বিয়ের খরচার টাকাটা তো আমিই দিলাম। এটাই প্রকৃতির নিয়ম, যে অকাতরে সরবরাহ করে সে প্রাণ সংহারও করে, প্রপার এক্সচেইঞ্জ, পিউর গিফট সেটা প্রকৃতির বিষয় না। আমার অতীত নিয়ে অনেকেরই বিশাল কিউরিসিটি। আর বরাবরই আমি তাদের হাঁ করে থাকা মুখে ছাই ফেলে তাদের অসুখী, হতাশ, বিষণ্ন, ক্লান্ত করে রাখি। নেভার বি কিউরিয়াস চার্লি, সুখে থাকার প্রাইম ফর্মুলা। তুমি যদি কখনো কিউরিয়াস হও আমি তোমাকেও নিখোঁজ করে দিতে পারি। হো হো হো। তাদের কিউরিসিটি আবার যে খুব খারাপ লাগে তা না, ব্যাপারটা বরং আমি এঞ্জয় করি। তারা বিস্মিত, কোনভাবেই আমাকে চিনতে পারে না, দীর্ঘদিন পর আমাকে দেখে মনে করে কোন ভিনগ্রহী যেন হাজির, আমার বন্ধুরা। তাদের দোষ নাই তাতে। এক মুহূর্তের ব্যবধানে আমি নিজেই নিজেকে চিনতে পারি না, একেবারে আগাপাছা অন্য কেউ, বন্ধুরা ধীর দৃষ্টে সাবধানে আমাকে পর্যবেক্ষণ করে, অবন্ধুরা একটু দূর থেকে। সময় যেন কোন মহান শিল্পীর মত আমার শরীরে হাতুড়ি বাটাল চালায়। আমার অভিব্যাক্তি, ভঙ্গি, চলন, বলন, পান, সেবন, গলাধঃকরণ যেন অন্য কারো। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া থকথকে কফি খেতে চার্লিও অস্বীকৃতি জানায়। এই বেটার গতরেও চর্বি জমেছে, কয়দিন না খাইয়ে রাখতে হবে।

প্রজাপতির কখনো মনে পড়ে না যে সে শুঁয়োপোকা ছিল। আমি আজমল খন্দকার তো আর প্রজাপতি না, শুঁয়োপোকা আর প্রজাপতির মাঝখানের অগাধ নীরবতার ব্যাপারে আমি সচেতন। পরিবর্তনের দিকটা আমি অনুভব করি, এমনকি একটা গল্পও ফাঁদতে পারি। আমার প্রিয় গল্পটা বলে অনেককেই বিব্রত করি। বুঝলেন, আমি মফস্বল থেকে উঠে আসা একেবারেই বিশেষণবিহীন প্রাণী ছিলাম। চোখে এক পশলা স্বপ্ন ঘন হয়ে ঝুলত, কথাতে লেগে থাকত গেঁয়ো একটা গন্ধ, বিশেষণ বলতে ওটুকুই- গেঁয়ো। কিন্তু অনেকেই, বুঝলেন, গেঁয়ো স্বভাবটা উতরাতে পারে না, টাকা-পয়সা সমেত ঐ গেঁয়োই থেকে যায়। কার দাদার নাম কি, কার বাপে কোন পেশায় নিয়োজিত ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রশ্নের উপর প্রশ্ন। গরু, ছাগল, গাধার সাথে মিশতাম, এখনো মিশি, কথা বলি, কিন্তু তারা তো আমার হিরো না। তাদের মধ্যে যারা একটু সম্ভ্রান্ত, মিমিক করতাম। জেসচার-পসচার আয়ত্ত করতে আর পয়সা তো খরচ করতে হয় না। প্রথম প্রথম আরোপিত মনে হত, পরে একেবারে ন্যাচারাল হয়ে গেল। অর্জন আর উত্তরাধিকারের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব আছে। আমি এসবের ভ্যালু জানি, আমি জানি আমাকে আরো অর্জন করতে হবে। প্রয়োজন শুধু সঠিক নায়ককে বেছে নেয়া। চলতে ফিরতে বাছবিচার করি না ঠিক, বাট রিগার্ডিং মাই হিরো আই মেইড আ ভেরি কেয়ারফুল মুভ। পত্রিকায় টিভিতে যখন তাকে দেখতাম খুবই সাবমিসিভ ফিল করতাম, ঠিক কার সামনে মাথা নত করলে গর্ব আর তৃপ্তি হাজারগুণ বেড়ে যায় সেই সিদ্ধান্তটা গুরুত্বপূর্ণ।

একাডেমির মূল গেইটের সামনে প্রথম যখন দাঁড়াই, এক অবেদ্য শক্তির বলে আমি সটান স্থির। কয়েক মুহূর্তের জন্য করুণ মনে হয়েছিল নিজেকে, বিস্ময়াবিষ্ট। ভজন, আরাধনা, আত্মসমর্পনের জন্য তখনই প্রস্তুত। একাডেমির দুনিয়াটা ভয়ের দুনিয়া। আমার চারপাশে ভয় তখন জমাট বেঁধে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত, এখনো আছে। এর কোন টাইমলাইন নাই, নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় চিহ্নিত করাও সম্ভব না যে উপড়ে ফেলবে কেউ। আর সব সাধারণেরা যে ক্ষেত্রটাতে বিচরণ করে সেটার নামও ভয়, ওখানেই ঘুম থেকে উঠে, প্রেয়সীকে চুমো খায়। এখানে ভয়ে থাকার কারণ অবশ্যই আছে, সিমপ্লি টেরিবল একটা স্পেইস। তাদের সাথে আমার পার্থক্যটা এই জায়গাতে যে আমি ঠিকঠাক আমার ভয়ের জায়গাটা লৌকেইট করতে পারি। আমি এখন গোলকধাঁধার পথহারা পথিক না, বরং তার অংশীদার। অন্যের ছোট ছোট ভয়গুলো আমার করুণায় ছেলেখেলা। আমার সামনে ডামফাউন্ডেড শিকার মেপে মেপে নিঃশ্বাস নিতে থাকে, আতঙ্কিত। লুক চার্লি, হাউ আই হৌলড মাই কাপ। হাতের এই জড় পেয়ালাটাও শিউরে উঠার সাহস পায় না। চার্লি লেজ নাড়ে।

প্রথম যখন পোশাকটা গায়ে চড়ে, কিছুটা ভয় হয়, সম্ভ্রম। ঐ সম্ভ্রম থেকে স্বাধীনতার আস্বাদ ঠোঁট জিভ আর গলায় মাখাই। সম্ভ্রমে বশ্যতা থাকে, তার বিনিময়ও পাই। আমি গহীন গোলকধাঁধার অংশ, আতঙ্ক, ভয় এখন আমার কাছ থেকে উৎসারিত হয়ে আর সবের শিরা উপশিরায় বয়ে যায়। তাদের ভিতরে বয়ে যাওয়া ভয়ের প্রবাহটা ঠিকঠিক অনুভব করতে পারি, এমনকি চাইলে স্পষ্ট দেখতেও পারি। আমার নখর শাণিত, আহ, শাণিত আর উজ্জ্বল। টোট্যাল ইউনিফর্মটাকেই ভয় করি, শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। কিন্তু এই ভয়কে যখন গায়ে চড়াই, খোদ নিজে সম্ভ্রমের কারণ হয়ে যাই, ডিভাইন ম্যান্ডেট। আমার গায়ের ডোরাকাটা পশম তখন আরো উজ্জ্বল, আজরাইলের চোখ। আমার চেহারাও আছে নানানরকম, আলোর বেগে এক চেহারার কপাট খুলে আরেক চেহারার আশ্রয় নিতে পারি। আমার সন্তানাদি আছে, স্ত্রী আছে। গোলকধাঁধায় বন্ধু শুভাকাঙ্ক্ষীও আছে অনেক। ওসব রাতে তখন আমি অন্য কেউ, আমার পোশাক তখন আলাদা। আমার চোখে তখন হিংস্রতা থাকে, তার সাথে হলুদ পশমগুলো একটু বেশি প্লেইফুল। তারা তখন আমাকে বলে পিউর জেন্টলম্যান। হিংস্রতা আর নোংরা যৌনতায় ভরপুর কৌতুকের সাবধানী মিশ্রণে মহীয়ান এক পুরুষ, নানান বয়সী মেয়েরা তখন আমার সাথে এক রাত কাটানোর জন্য অস্থির হয়ে উঠে। কিছুদিন আগেও যখন এ ধরণের কৌতুক করতাম, বন্ধুরা বিরক্ত হতো। এখন আমার চারপাশের কীটের ঝাঁকেরা ফালতু কৌতুকেও হাসিতে গড়াগড়ি খায়। আলোয় ঝলমল সেসব সেলিব্রেশন নাইটে মেয়েদের ঐসব অস্থিরতায় অভক্তি আসে, মাঝে মাঝে অনাগ্রহে নিতান্ত জৈবিক তাড়নায় এক দুজনকে চমৎকার সময় উপহার দেই, তারাও কৃতজ্ঞ হয়। তারা হয়ত জানে না আমি আজমল খন্দকারের মর্দাঙ্গির আশ্চর্য আভার উৎস আমার ইউনিফর্ম। হয়ত ব্যাপারটা ঠিক উলটো, আমি পোশাকটাকে বেছে নেই না, বরং এই পোশাকই আমাকে বেছে নেয়, শুদ্ধ করুণা। আমার চাইতেও আরো হাজারগুণ বেশি জীবিত এই ইউনিফর্ম। হয়ত এই পোশাকের আলাদা করে প্রয়োজন এখন আমার নাই, চামড়ায় তার সমস্ত আভা খোদাই করে নিয়েছি। আমার শরীর খোদ এখন ঊর্ধতনের অনুগ্রহের বরে সমৃদ্ধ। ইন ফ্যাক্ট, আমার কোন স্টোরি নাই, ডেস্টাইনড এন্ড ব্লেসড। যখন আমি ডেস্টাইনড, তখন কোন গল্প ফাঁদার প্রচেষ্টাও বৃথা। যার অনুগ্রহে আমি সমৃদ্ধি আর মোক্ষ লাভ করি তাকে প্রশ্ন করাটা অবান্তর বলে বিশ্বাস করি, নীচ আত্মারাই শুধু বিরোধ করে বসে। ইউনিফর্মের জাদুটা এখানেই, ওসব নীচ আত্মাও এর অনুগ্রহে সম্ভ্রান্ত হয়। ধারালো শ্বদন্ত তখন অন্যসব নীচ প্রাণীদের ঘাড়ে বসিয়ে দেয়াটাও একটা অনুগ্রহ, ওসব রক্তে এখন অবশ্য তার ঘেন্না এসে গেছে, কেমন জানি কালচে। একাডেমিতে আজমল খন্দকারের সুনাম তো আর কম না। একাডেমি কিভাবে আমার লাইফ ট্র্যাক বদলে দিল, কিভাবে আমার চিন্তা আর দক্ষতা শাণিত করে তুলল, সে বিষয়ক লেকচার দিতে প্রায়ই ডাক আসে, “………………সুদূর থেকে একজন শিকারীকে আর সব প্রাণী থেকে আলাদা করা যায়। তার ক্ষিপ্রতা, ঋজু শির, শক্ত মেরুদণ্ড আর সবার ঈর্ষার কারণ। আমাদের কাউকেই কখনো মেরুদন্ড বাঁকা করতে হয় না, আমাদের কেউ যদি পানিশড হই, তা শির উঁচু করে গ্রহণ করার মত মানসিক শক্তি রাখি। ডিসিপ্লিন ইটসেলফ ইজ ফ্রিডম, আমাদের শরীর আর মানসের দাম্ভিক ক্ষিপ্রতা এই ডিসিপ্লিনেরই ফসল। আমাদের ইনস্টিংকট, এলিগান্স, ইন্টেগ্রিটি কোটি কোটি অকেজো জন্তু থেকে আলাদা, ভীষণসুন্দর। অল অভ আস আর ব্লেসড বাই দ্যা গ্রেইস অভ গড”, উপরওয়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে আমার লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন শেষ হয়, হাততালিতে লেকচার হল গুমোট হয়ে যায়।

রাত যখন গভীর হয় প্রিয় জ্যাক ডেনিয়ালসের বোতলের সাথে আমার সৌহার্দ্য বাড়তে থাকে। অন্ধকারেই ড্রিংক করতে স্বস্তি, অন্ধকারে কখনো আমার সমবেদনা জাগে না। হলদে পানির প্রতি চুমুকে গলার ভিতর এক ঝাঁক আগুনের কণা তিড়তিড় করে নেমে পেটের ভিতর সুড়সুড়ি দেয়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, শরীর ঝিম মেরে আসে, শরীরের প্রতিটি কণা নিজের মত চলতে শুরু করে, মাথার ভিতরের সুতাগুলো একে একে জট খুলে আবার দলা পাকিয়ে যায়। ড্রিংক করার মজাটাই এখানে, শরীর আমার নিয়ন্ত্রণে থাকতে চায় না, আমি ডিকটেইট করি, প্রতিটি কণা তখন চূড়ান্ত অনিচ্ছায় আমার বাধ্য, অনুগত। মৃত্যু জিনিসটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের মাতলামি, এনার্কি, শরীর কণাগুলো তখন আর কোন হুকুম আমলে নেয় না। পেটে ঐ জিনিস চালান হওয়ার পর ঘুমের বারোটা বেজে যায়। দেয়াল ঘড়ির প্রতিটা গতি কাউন্ট করতে পারি সহজে। ঘরের জানালার পর্দা ছিঁড়ে চাঁদের আলোর অশরীরী, ধীর, ঠান্ডা গতিবিধির সবটুকু মাপজোখ করতে পারি। নেশার শেষের দিকটা জানি কেমন, বমি হয় না, আবার তা জিভের গোঁড়ায় আটকেও থাকে, ডিসগাস্টিং। সামনে কেউ থাকলে খালি বোতলটা তার মাথায় ছুঁড়ে দিতাম। দুর্ভাগ্যবশত কেউ তখন সামনে থাকে না, ঘরের মেঝেতেই ছুঁড়ে ফেলি বোতলটা। অবশ্যই তা আমার দূর্ভাগ্য, পেট মোটা একটা বোতল দিয়ে কারো মাথা থেঁতলে দেয়ার শখ অনেক দিনের। রাত যত গভীর হয় আমিও তত একা হই। আমি কোন দুখী প্রলাপ বকছি না, ব্যাপারটা এঞ্জয় করি। এতে ফিলোসফ্যিকাল কিছু নাই। ব্লাড  অ্যান্ড ওয়াইনের কম্বিনেশনটা কিন্তু দারুণ, একত্রে তারা চূড়ান্ত সন্তুষ্টি এনে দেয়। মাঝে মাঝেই এই কম্বিনেশনটা প্র্যাকটিস করি। তখন ওয়াইনের লেভেলটা একটু কমিয়ে নিতে হয়। মাতালেরা কখনো শিকার এনজয় করে না, ঐটা তাদের কাছে দুঃস্বপ্ন। আমি যখন শিকারে বের হই তখন কতগুলো স্টেপ ফলৌ করি, রিচ্যুয়াল। প্রত্যেক রিচুয়ালের সুস্পষ্ট কতগুলো ধাপ থাকে, আগে পরে হলে চলবে না। হলুদ লাভার বোতল থেকে ২৫০ মিলি ঢক ঢক গলায় চালান করে দেই, সাথে তিনটা সিগারেট, একটা কমও না বেশিও না। লাভার উদগীরনে যখন গ্র্যাভিটির সাথে আমার সম্বন্ধ নাজুক হয়ে আসে, সঙ্গী সাথীদের সাথে যোগাযোগ করি। নকশাটা আগেই রেডি থাকে। রিচ্যুয়াল টিচ্যুয়াল ওসব বাজে কথা, হো হো হো। কোনটা আগে করি আর কোনটা পরে তার ঠিক নাই। আসল কথাটা বলি, আমরা মার্ডারের পরিকল্পনা করি, গাড়ি নিয়ে বের হই, পরিকল্পনা মোতাবেক তুলে আনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী অবশ্য সবকিছু হয় না, ট্রেইস থেকেই যায়। ইভেন খুব উঁচু মানের শিল্পকর্ম নীরবতার জন্ম দিতে পারে না, শোরগোল লেগেই থাকে। মাঝে মাঝে একেবারে আদি ইতিহাসের প্রথম খুনের মত কোন খুন করতে ইচ্ছা করে, একেবারে নিখাদ শিল্প। অজানা শিলাপাথরের নিচে আলামত চাপা, অথচ তার পরিণতি ইতিহাস জুড়ে। খুন করার আগে মরমি ভাবনা! হাস্যকর। হলুদ লাল লাভা গলায় পড়লেই মরমি ভাবনা মাথায় দোলা দেয়, কন্ট্রোল করা মুশকিল। একটা ব্যাপার অবশ্যই স্বীকার করা উচিত, কোন খুন যখন আমি আর আমার সঙ্গীরা শেয়ার করি, অসম্ভব রকম কমিউন্যাল ফিলিং হয়, সবার বীচি সবার হাতে, ভ্রাতৃত্ব। পরিপূর্ণ আমোদ আমার কপালে কখনো জুটে নাই। টার্গেটকে যখন তুলে আনি, বেটা মাদারফাকার গাড়িতে অন্তিম যাত্রার ফিজিক্যাল ডিস্টেন্সেই ভিতরে ভিতরে মারা যায়, ঠান্ডায় জমে যায়, ঠান্ডা শরীরে কোথা থেকে যেন চিকন ঘাম নাকে, মুখে, পিঠে শীতল আতঙ্কে বয়ে যায়। অনেকে কাপড়েই হাগামুতা করে দেয়, ভয়ে। আমি জাস্ট ফিজিক্যাল ডেথটাকে কনফার্ম করি, তারপর লাশটাকে ঠিকানাবিহীন করার পালা। মরাকে মারার মধ্যে আনন্দ নাই। গাড়ি থেকে নেমে যেটাকে সামনে পেলাম সেটাকেই পয়েন্ট ব্ল্যাংক শটে খুলি উড়িয়ে দিলাম, ছক কেটে খুন করে ঐ আনন্দ জুটে না।
কাজের ছোকরাটা সময় মতই ছুটে আসে, চার্লির বডিটার ব্যবস্থা সে অন্যান্য সকালের মতই ঠিকঠাক করে ফেলবে।

লেখকঃ ইউসুফ হিরণ

Most Popular

To Top