বিশেষ

একটি বোকা বাক্স, কিংবা হারিয়ে যাওয়া আমাদের শিশুদের শৈশব…

শিশু নিয়ন আলোয় neon aloy

সেদিন ফেসবুকে ফ্রেন্ড সাজেশনে আসা এক লাস্যময়ী তরুণীর ছবি নজরে পড়তেই চোখ আটকে গেল। ঘন মেকআপের আবরণে আচ্ছাদিত মুখ, অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বাঁকানো ঘাড়, পাউট করা সূঁচালো ঠোঁট আর একরাশ আবেদন ভরা দুই চোখ জোড়ায় এক অদ্ভুত আহবান। এখনকার তরুণীদের প্রোফাইল পিকচারে এমন ছবি তো হরহামেশাই দেখা যায়, কিন্তু এই ছবিটায় কি যেন এমন অদ্ভুত এক ব্যাপার আছে যা আমাকে ধন্দে ফেলে দেয়। অবাক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকি ছবিটির দিকে। খুব চেনা চেনা লাগে মেয়েটিকে আমার। অদম্য কৌতুহল থেকেই ঢুকি তার প্রোফাইলে। হঠাৎ যেন বিদ্যুৎ শক লাগে আমার! সারা শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে যায়। প্রোফাইল পিকচারে যে মেয়েটিকে দেখছি সে কেউ নয়, আমারই এক ছাত্রী। এতেও অবাক হতাম না যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক হত। কিন্তু যে মেয়েটার কথা বলছি, সে কোন তরুণী নয়, বরং পঞ্চম শ্রেনীর একজন ছাত্রী! বয়স বড়জোর দশ কি এগার। কি অদ্ভুত এক সময়ে বসবাস আমাদের!

যে বয়সে এই মেয়েটির কাজল পরা দুই চোখে শিশুসুলভ সারল্য থাকার কথা ছিল, সে বয়সে এই মেয়েটি নিজেও জানেনা দু’চোখে সে কিসের আবেদন ছড়িয়ে কাকে কি আহবান করছে। তার এই দুই চোখ জুড়ে থাকার কথা ছিল কত সম্ভব আর অসম্ভবের কল্পনা, কিংবা কত নিস্পাপ দুষ্টুমী কিংবা অজানাকে জানার এক অদম্য কৌতুহল। পাউটে জড়ানো সেই বিকৃত মুখভঙ্গির পরিবর্তে সেই পবিত্র ঠোঁট জোড়ায় থাকতে পারত বাঁধভাঙ্গা উচ্ছসিত হাসির ঢেউ। কিন্তু না, আজ আমাদের বালিকারা হঠাৎ করেই জোর করে তরুণী হয়ে গিয়েছে। তাদের কথাবার্তা, পোশাক, সাজসজ্জা আর সর্বোপরি তাদের এ্যাটিটিউডে কিসের বার্তা দিচ্ছে সত্যি-ই আমরা জানিনা। আমি এখানে প্রাপ্তবয়স্ক আধুনিক তরুণীদের নিয়ে কোন মন্তব্য করছিনা কিন্তু। আমি এখানে বলছি শুধুমাত্র দশ থেকে ১৫/১৬ বছরের কিশোরীদের কথা। একজন প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী কিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবে, এটি একান্তই তার ব্যাক্তিগত ব্যাপার কিন্তু একটি বালিকা, যে প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিকের গন্ডিই এখনো পেরোয়নি তার যদি নিজেকে লাস্যময়ীভাবে উপস্থাপন করা কিংবা জোর করে নিজেকে বড় প্রমাণ করাই জীবনের অন্যতম আগ্রহের বিষয় হয়- তবে সেটা যথেষ্ট চিন্তাভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এখন একটু ভাবুন তো কেন এমন হচ্ছে। আমরা নিজেরাই কি আমাদের সন্তানদের শিশু থাকতে দিচ্ছি? আগে আমাদের বিনোদনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম ছিল গল্পের বই। খুব ছোট থাকতে ঠাকুরমার ঝুলির রাক্ষস-খোক্কস আর রাজপুত্র-রাজকন্যারা ছিল আমাদের স্বপ্নের চরিত্র। আর একটু বড় হলে সে জায়গা দখল করল তিন গোয়েন্দা, কিশোর থ্রিলার, মাসুদ রানা, জাফর ইকবাল স্যারের অপু, দিপু আর মহাকাশের সব নাম না জানা কল্পকাহিনীর চরিত্ররা। কৈশোর আর তারুণ্যের সন্ধিক্ষণে হুমায়ন আহমেদ, সুনীল, শীর্ষেন্দু আর সমরেশরাই আমাদের অনেক নির্ঘুম রাত্রির কারণ হয়ে আছে। কিন্তু আজ আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে শিশুদের জন্য বিনোদন কি আমরা সত্যিই কিছু রাখতে পেরেছি? ইংরেজী মাধ্যমে পড়া স্মার্ট আধুনিক জেনারেশন তো বাংলাই পড়তে পারেনা ভাল করে, তাই এই অসম্ভব সুন্দর কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ তারা পাবে কিভাবে? এদিকে গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মত অন্তর্জালের রঙ্গীন দুনিয়া তো আছেই, অনবরত হাতছানি দিয়েই চলেছে তাদের এক মরণনেশার দিকে। এর থেকে তাকে বাঁচাতে তার সামনে খুলে রেখেছেন কার্টুন চ্যানেল? এ আরেক বিড়ম্বনা। একটু খেয়াল করে দেখবেন কি এখানে কি দেখছে আমাদের সন্তানেরা? হিন্দীতে ডাব করা বিকৃত ভাষার কিছু অদ্ভুত চরিত্রের লম্ফঝম্প আর নয়তো চীন কিংবা জাপানিজ পটভুমির অকালপক্ক কিছু শিশুচরিত্রের বিচিত্র কর্মকান্ড। যাদের মাঝে অবশ্যই একটি মেয়ে ক্যারেক্টার থাকবে এবং যাকে নিয়ে সেই অকালপক্ক বালকদের মধ্যে চলছে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা এবং তাদের জীবনের মুল উদ্দেশ্যই হল কিভাবে এই মেয়েটিকে ইম্প্রেস করা, তা যে উপায়েই হোক না কেন। এক সময় টম এ্যান্ড জেরি ছিল শিশুদের পছন্দের তালিকায়। আমাদেরও ভাল লাগত অনেক। অনেক মজার কার্টুন সন্দেহ নেই কোন, কিন্তু এই টম এ্যান্ড জেরিতেও কখনো কখনো কিছু মেয়ে বিড়াল কিংবা কিংবা ইঁদুরের আবির্ভাব ঘটত যাদের আবেদনময়ী পোষাক আর অঙ্গভঙ্গি দেখলে আপনার একধরনের অদ্ভুত অস্বস্তি হবে ঠিক সেরকম যেরকম আমার ছাত্রীটির প্রোফাইল পিক দেখে হয়েছিল আমার।

এবার কার্টুন চ্যানেল থেকে চোখ ফিরিয়ে নেই বিভিন্ন রিয়েলিটি শো’গুলোর দিকে। দেশ কিংবা দেশের সীমানা পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের চ্যানেলগুলোতে দেখি শিশুদের জন্য গান অথবা ডান্স কম্পিটিশনের প্রোগ্রাম করা হয়। আপনি যদি একটু খেয়াল করেন, সেখানে দেখবেন শিশু বনসাই করার এক অসুস্থ প্রতিযোগীতা। শিশু বনসাই কেন বললাম? আপনি ছয় বছরের বালিকা দিয়ে “চোলি কে পিছে কেয়া হে” নাচাচ্ছেন এবং তার কাছ থেকে মাধুরীর মত ইংগিতপূর্ণ এক্সপ্রেশন আশা করছেন। যে বাচ্চাটি এই এক্সপ্রেশন যথার্থ ফুটিয়ে তুলতে পারছে তার ভুয়সী প্রশংসা করছেন সম্মানিত বিচারকগণ! বিচারকের প্রশংসা পেয়ে এর পরের পর্বে শিশুটি “মুন্নি বদনাম হুয়ি” নাচের প্রাক্টিস শুরু করে দিচ্ছে জোরেশোরে এবং সেই সাথে পারফেক্ট এক্সপ্রেশন। গানের ক্ষেত্রেও তাই। মানব বনসাই তৈরির এমন কারখানা আর দেখেছেন কোথাও? আর এইসব প্রোগ্রামের একনিষ্ঠ দর্শক আমাদের কোমলমতি সন্তানেরা!

এখন আপনারা আমায় কনজারভেটিভ বলতেই পারেন। হয়তো বলতে পারেন এসবের মাধ্যমেই তাদের সেক্স এডুকেশনের প্রাথমিক পাঠদান সম্পন্ন হয়। এছাড়া টিভি ছাড়লে এ ধরনের দৃশ্য তো তারা হরহামেশাই দেখছে। কিন্তু সে তো বড়দের প্রোগ্রাম, শিশুদের প্রোগ্রামেও যে প্রাপ্তবয়স্ক উপাদান আনতেই হবে- এমন তো নয়। এছাড়া এখানে লক্ষ্যণীয় যে আমাদের দেশে কিন্তু এখনো স্কুল পর্যায়ে সেক্স এডুকেশন শুরু হয়নি, যা হয়তো এসব কার্টুন যে সব দেশে তৈরি হয় সেসব দেশে চালু হয়েছে। আর তাই, এই কার্টুনগুলোর ইফেক্ট সেসব দেশে একরকম, আর আমাদের দেশে অন্যরকম। আমাদের সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে আমরা আমাদের শিশুদের সামনে এক অদ্ভুত জগতের সন্ধান দিচ্ছি আবার নিজেরাই সেই জগত নিয়ে কোন প্রশ্ন করা পছন্দ করছি না, ধমক দিয়ে থামিয়ে দিচ্ছি। ফলশ্রুতিতে আমাদের শিশুরা এক অদ্ভুত প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছে দিন দিন। তাদের এই অবদমিত আগ্রহের প্রকাশ ঘটছে বিভিন্নভাবে যার কিছু কিছু নমুনা আমি আমার আগের লেখাটাতে দিয়েছি।

এখন প্রশ্ন হল এ থেকে উত্তরনের উপায় কি? প্রযুক্তি আটকাতে পারবনা, কাজেই সেক্স এডুকেশন? আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় তা আকাশ কুসুম কল্পনা। তাছাড়া সঠিক ভাবে তা না দিতে পারলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনাই বেশি। কাজেই আবার সেই একই সমাধান- সময়। সময় দিন সন্তানদের, এটাই প্রথম সমাধান। এছাড়া আর যা আমরা করতে পারি-

  • শিশুটি একটু বড় হতে থাকলেই বই তুলে দিন তার হাতে। ওদের সাথে মজার মজার গল্প করে আগে গল্পের প্রতি তাদের আগ্রহ জাগিয়ে তুলুন, তারপর দেখবেন ওরা নিজেই ঝুঁকে পরেছে গল্পের বইয়ের প্রতি। যে একবার এই দুনিয়ার প্রকৃত স্বাদ পাবে, তার কাছে ডোরেমন বা সিন চ্যাং তাদের যতই আকর্ষনীয় গ্যাজেট নিয়ে আসুক না কেন, পাত্তাই পাবে না।
  • কো-কারিকুলার এ্যাক্টিভিটিজে উৎসাহিত করুন আপনার সন্তানকে। আপনার জীবনে খুব ইচ্ছে ছিল গান শেখার, তাই সেই ইচ্ছা সন্তানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার জন্য তাকে হারমনিয়াম কিনে দিয়ে জোর করে সা-রে-গা-মা-পা শেখাবেন, তা নয়। আগে বোঝার চেষ্টা করুন কোন দিকে তার আগ্রহ। তারপর সেদিকে তাকে চালিত করুন।
  • দৈহিক সৌন্দর্য্যের চেয়ে মানসিক সৌন্দর্যের মুল্য যে অনেক বেশি- এটা সবসময় তাকে বোঝান। আপনার সন্তানটি যেন তার আদর্শ হিসেবে একজন সঠিক মানুষকে বেছে নিতে পারে সে ব্যাপারে তাকে উৎসাহিত করুন। আমাদের কন্যাসন্তানেরা বরাবরই সাজসজ্জার দিকে একটু আগ্রহী হয়। তাদের পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা যেন ঠিক তাদের বয়স অনুযায়ী হয় এ ব্যাপারটি খেয়াল রাখুন। প্রত্যেকেই তাদের সন্তানদের স্ব-স্ব ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করুন। বাচ্চার জিনিস কেনার সময় চেষ্টা করুন সীমিত দামের মধ্যেই কেনার। আপনি যতই সম্পদশালী হোন না কেন, চেষ্টা করুন সেটা সন্তানদের না বোঝানোর।
  • আপনার সন্তান যতই ইংরেজী মাধ্যমে পড়ুক না কেন, ইংরেজী ভাষাটি যেন সে সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবেই শেখে সেদিকে খেয়াল রাখুন। দেশীয় সংস্কৃতি থেকে তাকে দূরে রাখবেন না। ইংরেজীর পাশাপাশি তাকে বাংলা বই এনে দিন, বাংলা গান, মুভি, নাটক দেখুন একসাথে বসে। মনে রাখবেন, বিলেতী কায়দায় অনর্গল ইংরেজী বলতে পারা সন্তানের দিকে তাকিয়ে যতই আনন্দ হোক না কেন, দিনশেষে কিন্তু আমরা সবাই সেই ভেতো বাঙ্গালিই।

আসলে এক অস্থির সময়ে নিয়ে ফেলেছি আমরা আমাদের সন্তানদের। এখানে তাদের দোষ কি বলুন? তাই আমাদেরই দায়িত্ব তাদের একটি সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করা। নগরায়নের এই যুগে না দিতে পারছি তাদের একটি যথার্থ খেলার মাঠ, না দিতে পারছি একটি খোলা আকাশ। বিনোদনের জন্য তাই একমাত্র ভরসা টিভি নামক এক বোকা বাক্স যার থেকে আমরা শৈশবে কিছুটা শিক্ষনীয় কিছু পেলেও আমাদের সন্তানরা পাচ্ছেনা কিছুই। বিনোদনের এই সেক্টরে সবচেয়ে অবহেলিত হল শিশুরা। ঈদে বস্তাপঁচা একঘেয়ে নাটক হবে একশটা, কিন্তু তার মাঝে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজলেও শিশুদের জন্য একটি মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান খুঁজে পাবেন না। আর নাটক দেখাবেন? সেই নাটক থেকে সে যা শিখবে তা হল এক অদ্ভুত বিকৃত ভাষা। আঞ্চলিক ভাষা এক জিনিস, আর শুধুমাত্র লোক হাসানোর জন্য ভাষার বিকৃতি অন্য জিনিস। প্রমিত বাংলার ব্যাবহার আর নেই কোথাও। কি দেখাবেন তবে আপনার সন্তানদের? এক অদ্ভুত জাতি আমরা, সবকিছুই সহ্য হয়ে যায়। কোথাও কোন অভিযোগ নেই তাই। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার আগেই এখনি অভিভাবকদের এ ব্যাপারে আওয়াজ তোলা দরকার।

তাই সবশেষে দেশের এই সেক্টরে যারা কাজ করেন সেই মেধাবী নির্মাতাদের প্রতি অনুরোধ, এদেশের শিশুদের দিকে একটু নজর দিন। তাদের জন্য সুস্থ বিনোদনমূলক ও শিক্ষনীয় অনুষ্ঠান বানান। আমাদের সন্তানদের বিকৃত হিন্দীর ডোরেমন, হাতোরি, সিন চ্যাং এর নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করুন। শিশুদের এই সেক্টরটিকে অবহেলার চোখে দেখবেন না। সর্বোপরি, আমাদের সন্তানদের একটি সুস্থ শৈশব উপহার দিন , সুস্থ বিনোদনের অভাবে তাদের শৈশব টিকে একটি বিভিষিকায় পরিনত করবেন না প্লিজ।

লেখিকার আগের লেখাটি পড়ে আসুন এই লিংকে ক্লিক করে- প্রিয় অভিভাবকগণ, একটু শুনবেন কি?

এই আর্টিকেলের কভার ফটোটি তুলেছেন তরিকুল ইসলাম অপু

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top