নাগরিক কথা

আমাদের ক্রিকেটপ্রীতি ও ধর্ষকামী মানসিকতা

ক্রিকেটপ্রীতি ধর্ষকামী নিয়ন আলোয় neon aloy

এই লেখাটা লিখতে গিয়ে আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। কারণ এই লেখায় আমাকে কিছু আপত্তিকর শব্দ, বাক্য ও বাক্য ব্যবহারের মানসিকতা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। কিন্তু লেখাটি যারা পড়বেন, তাদের মধ্যে অনেক শ্রদ্ধাভাজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ, আবার অনেক বয়োকনিষ্ঠ মানুষও আছে। কাজেই, এখানে কথা বলার ক্ষেত্রে একটু চিন্তা করেই বলতে হয়।

আমাদের ক্রিকেট প্রীতি বেশ প্রবল। শুধু ক্রিকেটপ্রীতি না, যেকোন প্রীতি বা ঘৃণা আমাদের বেশ প্রবল। আমাদের মাত্রাজ্ঞান, পরিমিতিবোধ সব সময়ই আফসোসের কারণ।

সে যাক গে… বলছিলাম ক্রিকেটীয় উন্মাদনার কথা।
ক্রিকেটীয় উন্মাদনা প্রকাশ করার জন্য বিশেষ কিছু ভাষা, কিছু শব্দ প্রায় সবাই ব্যবহার হয়ে থাকে। এসব শব্দ বা শব্দসমষ্টির ভেতরে ধর্ষকামী মানসিকতার একটা প্রচ্ছন্ন লক্ষণ কি একটু হলেও থাকে না?

যেমন, কোন দল হারলে অনেকেই উল্লসিত হয়ে স্ট্যাটাস দেন, “অমুক দেশকে ভরে দিয়েছে। ব্যথার চোটে আজ রাতে ঘুম হবে না হেতের।” এই ধরণের স্ট্যাটাস ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সবাই দিয়ে থাকে এবং সবাই লাইক/ রিয়েক্ট (বিনোদনমূলক হাহা রিয়েক্ট অবশ্যই) করে থাকে। এই “ভরে দেওয়া” শব্দটার মধ্যদিয়ে ধর্ষকামিতা প্রকট হয়ে উঠে।

একটু চিন্তা করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়।

ধর্ষণের মাধ্যমে যে কেবল জোর করে নারীদেহ দখলের মাধ্যমে যৌনক্ষুধা নিবৃত্ত করা হয় তা কিন্তু নয়, নারীকে শারীরিকভাবে আঘাত করে, ধ্বংস করে তার অস্তিত্বকে পরাজিত করার একটা প্রবণতাও থাকে। এবং সবশেষে সুযোগ পেলে ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করে ধর্ষকেরা। তার মানে হলো, ধর্ষণের সাথে কেবল যৌনক্ষুধা মেটাবার ব্যাপার জড়িত থাকে না; এর সাথে ধর্ষিত নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পরাজিত করার অসুস্থ আনন্দও ধর্ষক পেতে চায়। নারীর অস্তিত্ব, সম্মান সবকিছুকে পরাজিত করার মধ্যে এক বিকৃত আনন্দ আছে। ইতিহাসেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

যুদ্ধের পরপর যে ভূখণ্ড বা জাতিগোষ্ঠী পরাজিত হত, বিজয়ীরা তাদের নারীদের তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে বিজয়োল্লাস করতো। কোন জাতিগোষ্ঠীকে সর্বাংশে পরাজিত করার মোক্ষম এবং সর্বশেষ অস্ত্র হচ্ছে সে জাতির নারীদের উপর অত্যাচার এবং ধর্ষণ-নিপীড়ন করা। আর পাক বাহিনী তো যুদ্ধাবস্থায় ধর্ষণের তাণ্ডব চালিয়েছে যেন জিতে গেলেও সম্মানহানির যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয় বাঙালিদের।

খেলায় হেরে গেলেও পরাজিত দলের আত্মসম্মানবোধ আহত হয়। এ ব্যাপারটাকে “ভরে দেওয়া”র সাথে তুলনা করে তৃপ্তি লাভ করা হয়। ব্যাপারটাকে যত কুৎসিতভাবে সম্ভব উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়। কোন মাত্রায় কতখানি ভরে দেওয়া হয়েছে সেটাও কেউ কেউ বর্ণনা করতে ভুলে না।

পরশু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেখলাম একজনের। তিনি লিখেছেন, “ইন্ডিয়াকে থুতু ছাড়াই ভরে দিছে শ্রীলংকা।” এই স্ট্যাটাসে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ধর্ষণ যত তীব্র নিপীড়নমূলক হবে, তত আনন্দের হবে ধর্ষকের জন্য। এবং তত অপমানের, পরাজয়ের ও বেদনার হবে হেরে যাওয়া দল বা ধর্ষিতের জন্য। অর্থাৎ, ভরে দিতে পারলেই বিজয়। আর যেহেতু হেরে গিয়ে আত্মসম্মানবোধ আহত হয়েছে, কাজেই তাকে ভরে দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ ধর্ষিত হওয়ার মত একটা ব্যাপার হয়েছে এবং আমরা আনন্দ লাভ করছি। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়ায়, অতি অবশ্যই অবচেতনে হলেও ধর্ষণ সবার কাছে একটা গ্রহণযোগ্যভাবে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াচ্ছে!

ব্যাপারটা এমন যে, “আমি ভদ্রমানুষ বলে ধর্ষণ-টর্ষণ করতে পারি না, তবে ওতে যে আনন্দ আছে সেটা ঠিকই বুঝি।” যে বা যারা স্ট্যাটাসে ভরে দেওয়ার আনন্দ পায়, তাদের অবচেতন মনের ধর্ষকামিতাটা এমনই। যে সমাজ রোজকার ভাষায় ধর্ষকামিতাকে ধারণ করে, সে সমাজে ধর্ষণ কমে যাবে কী করে আশা করা যায়?

অনেকেই বলবেন “কাম অন, অত সিরিয়াস হওয়ার কি আছে? এটা তো জাস্ট ফান।”
আপনাকে অবশ্যই ভাষার ব্যাপারে সিরিয়াস হতে হবে। আপনার ভাষাকে আপনি প্রতিদিন নির্মাণ করছেন। ভাষা হলো মানুষের অস্তিত্বের অন্যতম মৌলিক একক। আপনার ভাষা নেই মানে আপনার চিন্তা চেতনার বিকাশের সুযোগ নেই অর্থাৎ খোদ আপনিই নেই!
ভাষার মাধ্যমেই পৃথিবী সবকিছু স্বকীয়তা লাভ করেছে, ক্ষমতা কাঠামো বিকশিত হয়ে সুদৃঢ় হয়েছে ভাষার মাধ্যমে। এককথায় ভাষাই সমগ্র মানবসত্তার প্রকাশক। ভাষার বিকাশের ইতিহাসই মানুষের ইতিহাস। ফান করতে করতে একদিন “ভরে দেওয়া” টার্মটা শক্তিশালী ডিসকোর্সে পরিণত হবে চর্চার মাধ্যমে।

তার আগেই কি আমাদের সচেতনভাবে সতর্ক ও সংযত হওয়া উচিৎ নয়?

লেখকঃ লুবানা বিনতে কিবরিয়া

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top