ফ্লাডলাইট

কার্ডিফের সাজানো বাগান ও দুজন “ফুরিয়ে যাওয়া” নায়কের রূপকথা

নিয়ন আলোয়

প্রথমে, দুটি দৃশ্যপট নিয়ে ভাবা যাক।

দৃশ্যপট: ১

১ম ইনিংসে ব্যাট করা দলটি বেশি ভালো করছে। ৪০ ওভার শেষে ৪ উইকেটের বিনিময়ে তাদের স্কোর ২০৩। ফিফটি করেছেন দুজন ব্যাটসম্যান। তাদের একজন বেশ কিছুক্ষণ আগে আউট হলেও আরেকজন আপন গতিতে খেলে যাচ্ছেন। মাঠে নেমেই স্লগ ওভারের পুরো সুবিধা নেবার জন্য ড্রেসিংরুমে প্রস্তুত দুই দুইজন পাওয়ার হিটার।

দলটি শেষ কত রান করতে পারে বলে আপনার ধারণা? খুব নিরাশাব্যঞ্জক ধারণা লাগালেও ৩০০ স্কোরটাকে মামুলি মনে হবার কথা।

দৃশ্যপটঃ ২

২য় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেছে দলটি। টার্গেটটা মোটামুটি নাগালের ভেতরেই।
কিন্তু নতুন বল হাতে জ্বলে উঠলেন বিপক্ষের দুই বোলার, ইংলিশ কন্ডিশনের পুরো সুবিধাটা নিয়ে গতির সাথে হালকা সুইং এর মিশেলে দুজনেই ভয়ানক হয়ে উঠলেন। ওভারের ২য় বলে দলটির ইনফর্ম ওপেনার আউট, যিনি না থাকলে দলের ব্যাটিংটাও থাকেনা। এমন একটা অবস্থা চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। ৫ ওভারের মধ্যেই চলে গেল আরো দুটো উইকেট। ১০ ওভারে রান হল মাত্র ২৪, ১২ তম ওভারে দলের রান যখন ৩৩, আউট হয়ে গেলেন দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানটিও।

৩৩-৪, টার্গেট আড়াইশোর ওপরে। ক্রিজে অভিজ্ঞ ও পোড় খাওয়া দুই জন ব্যাটসম্যান আছেন বটে, তবে যাদের ফর্ম নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই উঠছে অযাচিত সব প্রশ্ন।

বাজি ধরবেন ব্যাট করা দলটির পক্ষে? জেতা কি সম্ভব এ অবস্থায়?
এবার রূপকথা শুনুন। অন্য সব রূপকথার সাথে এর তফাৎটা হল, এ রূপকথা আদতে রূপকথা নয়, বাস্তব ঘটনা।

প্রথম দৃশ্যপটের কথা বলা যাক। নিউজিল্যান্ড যখন ব্যাট করছিল, গুরু মাশরাফি, রুবেল ও ‘বদলে যাওয়া’ তাসকিন আহমেদ বেশি ভালই ভোগাচ্ছিলেন তাদের। তবে উইলিয়ামসন-টেলরের ৮৩ আর টেলর-ব্রুমের ৪৯ রানের দুইটি জুটিতে বেশ ভালই সামলে ফেলেছিল কিউইরা। ফলাফল, ৪০ ওভার শেষে নিউজিল্যান্ডের স্কোর ২০৩-৪। হাতে ৬ উইকেট। ড্রেসিংরুমে প্যাড পড়ে প্রস্তুত জিমি নিশাম ও কোরি এন্ডারসন। ৩০০ স্কোরটাকে বরং কমই মনে হচ্ছিল।

এমন সময় পুরো ম্যাচে একটা বলও না করা এক তরুণ পার্টটাইমারকে আনার ক্ষ্যাপাটে সিদ্ধান্তটা পৃথিবীর ক্রিকেট ইতিহাসে যে গুটিকয় মাত্র অধিনায়কের মাথায় আসতে পারে, তাদের একজন টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি বিন মোর্তুজা। মোসাদ্দেক হোসেন আসলেন, ৩টি ওভার করলেন। রান দিলেন যথাক্রমে ৫, ৩ ও ৫…ভোজবাজির খেলা দেখার মত অবাক দৃষ্টিতে কিউইরা আবিষ্কার করল, তারা এর মধ্যেই ২৪০-৭ হয়ে গেছে, ড্রেসিংরুমে অসহায়ের মত ফিরে গেছেন নিল ব্রুম, জিমি নিশাম ও কোরি এন্ডারসন।

পরের ৪ ওভারে রান উঠেছে মাত্র ২৫। এর মাঝে মুস্তাফিজ মুস্তাফিজিয় কায়দায় বোল্ড করেছেন মিচেল স্যান্টনারকে। আর রুবেল হোসেন দেখিয়েছেন নিজের ইচ্ছামতন ইয়র্কার শুধু লাসিথ মালিঙ্গা নন, তিনিও দিতে পারেন। তিনশ’র ওপরে স্কোরটাকে যেখানে ছেলেখেলা মনে হচ্ছিল, সেখান থেকে একজন ‘বাচ্চা ছেলে’, একজন ‘ফুরিয়ে যাওয়া’ বোলার, একজন ‘অধারাবাহিক’ বোলার ও ‘ক্যাপ্টেন কোটায়’ খেলা একজন ক্যাপ্টেনের হাতে আটকে পড়ে সেই ছেলেখেলা আটকে গেল মাত্র ২৬৫ তেই।

এবার ২য় দৃশ্যপটে আসি। ‘তামিম আছেন তো বাংলাদেশ ব্যাটিং আছে; তামিম নেই,তো কেউই নেই’ এমন একটা অবস্থা অনেকদিন ধরেই চলছে দেশের ক্রিকেটে। ২৬৫ রানের মাঝারি টার্গেট তাড়া করতে নেমে ইনিংসের ২য় বলেই যখন সেই তামিম ইকবালই এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে বিদায় নিলেন, ম্যাচের এপিটাফ পুরোটা না হলেও আধখানা লিখে দিয়েছিলেন অনেকে।
এমন পরিস্থিতিতে সাব্বির রহমান কেন ৩ নম্বরে আসলেন,বিষয়টা আজো অস্পষ্ট রয়ে গেল। এসেই দুটো চার যেভাবে মারলেন, তাতে মনে হচ্ছিল জবাবটা আজ দিয়েই ছাড়বেন। দিতে পারলেন না, টিম সাউদি পরের ওভারেই তাকে তুলে নিলেন। নিজের এরপরের ওভারে তুলে নিলেন সৌম্যকেও। নতুন বল আর বাতাসের হালকা প্রভাব কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত বোলিং করছিলেন তিনি, সাথে যোগ্য সমর্থন ছিল ট্রেন্ট বোল্টেরও।
দেশ তাকিয়ে ছিল দেশের ইতিহাসের সেরা জুটি মুশফিক-সাকিবের দিকে। মুশফিক পারলেন না, এডাম মিলনে নিজের প্রথম ওভারে এসেই মুশফিকের স্টাম্প উড়িয়ে দিলেন।

১২ ওভারের খেলা চলছে, দলের রান ৩৩-৪। অত্যধিক আবেগ থেকে চিন্তা করলেও এই ম্যাচ জেতার চিন্তা করাটা হাস্যকর। তার ওপরে এমন দুজন আছেন ক্রিজে, বোর্ড-ম্যানেজমেন্ট ও সমর্থকদের পক্ষ থেকে যাদের ওপরে মূলক ও অমূলক নানা প্রকার খড়্গ ঝুলছে আগে থেকেই। তবে এ পরিচয়ের বাইরেও তাদের যে আরেকটি করে পরিচয় আছে, সেটা অনেকেই ভুলে গিয়েছিলেন এই ম্যাচের আগে। একজন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ কতবার খাদের কিনারা হতে দলকে একলা হাতে তুলে জয়ের পথ দেখিয়েছেন তার হিসাব করতে বসলে রাত ফুরিয়ে যাব। একজন সাকিব আল হাসান বাংলাদেশ দলকে ব্যাটে-বলে কি কি দিয়েছেন তার হিসাব করতে বসলে ফুরিয়ে যাবে টানা কয়েক মাসের রাত।

গোল্ডফিশের চেয়ে কম স্মৃতিধারনকারী জাতি হিসেবে এই দুজনের সব অবদান ভুলে গিয়েছিলাম আমরা যারা, তাদের সজোরে চপেটাঘাত করতেই যেন মাঠে নেমেছিলেন দুজন।

দলের বাকিদের, সাথে পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দিলেন, ওয়ানডে কিভাবে খেলতে হয়। ডট বল আর বাউন্ডারির মাঝেও একটি বিশাল জীবন আছে, সেই জীবন কিভাবে উপভোগ করা লাগে, হাতে-কলমে দেখালেন দুজন। তাই তো ৩৫ ওভারের বিশাল জুটির প্রথম ২০ ওভারে তুললেন ১১০, যার ভেতরে চার ছিল মাত্র ৯টি। এক রান, দুই রান করে গুটি গুটি পায়ে এগোচ্ছিলেন তারা, নিউজিল্যান্ড দলের শরীর থেকে যেন শুষে নিচ্ছিলেন বিন্দু বিন্দু করে রক্ত। শেষ ১৫ ওভারে রানের গতি একটু বাড়িয়ে দিলেন তারা, বাউণ্ডারি আর রান, দুটোরই কম্পাঙ্ক(ফ্রিকুয়েন্সী) বাড়ল। বল আর রানের তফাৎ কমতে কমতে প্রথমে সমান, এরপরে রানের চেয়ে বলের সংখ্যা বেড়ে গেল। ৯৯ থেকে একটা ছক্কা মেরে সাকিব পেলেন অনেক দিনের আরাধ্য সেঞ্চুরি, মুহুর্তের ভেতরেই ১১৪ তে পৌঁছে গিয়ে সম্ভবত নিতান্তই ক্লান্তিজনিত কারণে ট্রেন্ট বোল্টের একটি সোজা বল মিস করে বোল্ড হয়ে স্টেডিয়ামের সবার হাততালির মাঝে যখন ড্রেসিং রুমে ফিরছিলেন তিনি। জয় থেকে দল ৮ রান দূরে, বল বাকি আরো ২১টি, প্রয়োজনীয় রানের আড়াই গুণের চেয়েও বেশি।

ওদিকে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের সেঞ্চুরি হয়নি তখনো। মোসাদ্দেক ৮ রানের মধ্যে ৩ রান নিলেন ২ বলে। বাকি আর ৫ রান। এর ভেতরে ২ রান পেলেই মাহমুদুল্লাহ পেয়ে যান তাঁর সেঞ্চুরিটাও। তিনি চার মারলেন। একটুর জন্য ছক্কা হল না সেটা, হলে সেঞ্চুরি আর জয় একই সাথে পেয়ে যেতেন। অবশেষে জয়টা এল পরের ওভারে মোসাদ্দেকের একটা আউটসাইড এজ থেকে।

রূপকথা বদলে গেল বাস্তবে। সাকিবের বিকল্প খোঁজার চেষ্টায় রত যারা, তারা লজ্জা পেয়েছেন কিনা জানা যায়নি। কিংবা মাহমুদুল্লাহকে ওয়ানডে দল থেকে বাদ দেবার পক্ষে নানা যুক্তির ভান্ডার দিচ্ছেন যারা, তাদের যুক্তির ভান্ডার ভরা হাটে ভেঙ্গে যাবার পরে তাদের চোখে জল এসেছে কিনা, সেটাও জানা যায়নি।

তবে এটুকু জানা গেছে, সেমিফাইনালে যাওয়া যাক আর নাই যাক, এই জয়ের ফলে প্রাপ্তির খাতা একেবারে শূন্য থাকেনি।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা পার্টনারশিপটা তো পাওয়া গেছেই, এরই সাথে পাওয়া গেছে একজন তাসকিন আহমেদকে, যিনি মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে জানেন; পাওয়া গেছে একজন সাকিব আল হাসানকে, যিনি এখনো ম্যাচ জেতাতে জানেন।

পাওয়া গেছে অতিরিক্ত তামিমনির্ভরতার টোটকা। পাওয়া গেছে পুরো দলের জন্য একটি দৃষ্টান্ত, যে ওয়ানডে ম্যাচ জেতাতে বাউন্ডারি নয়, দৌড়ে রান করতে হয়।

পাওয়া গেছে আরো একটি রূপকথা। যে রূপকথার ওপরে ভিত্তি করে রচনা করা যাবে অনেক মহাকাব্য, তার চেয়েও বেশি উপন্যাস। তার চেয়েও বেশি নাতি-নাতনিকে শোনানোর গল্প। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ভ্রমণ করতে থাকা ইতিহাস।

দুটো-তিনটে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এরকম রূপকথার কাছে নিতান্তই শিশুর হাতের খেলনা!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top