টাকা-কড়ি

লাখ টাকার মালিক হয়েও যেদেশে আপনি পথের ফকির!

লাখ টাকার ফকির নিয়ন আলোয় neon aloy

আশিক সাহেবের ছোটখাটো ব্যাবসা। বছরে টার্নওভার গড়ে ৫০ লক্ষ টাকা।

কয়েকদিন আগে এক ক্লায়েন্টকে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকার ইনভয়েস পাঠায়। ক্লায়েন্ট সরকারী ভ্যাট, ট্যাক্সসহ সব কেটেকুটে ৯২ হাজার টাকার চেক দেন। ১,২০,০০০/- টাকায় ২৮,০০০/- টাকা সরকারী খাতায়।

এভাবে কমবেশি সব ক্লায়েন্টই সরকারী খাতের টাকা কেটে চেক দেয়। গড়ে ৫০ লক্ষ টাকায় বছরে সরকারকে দিচ্ছে প্রায় ১০ লক্ষ টাকার মত।

না, হিসেবটা ঠিক না। এই কর্তনকৃত টাকা যখন কম্পানি একাউন্টে রাখছে, সেখান থেকেও আবগারি শুল্ক বাবদ টাকা কাটছে।

তারপর, আশিক সাহেব যখন এখান থেকে টাকা তুলে মাসে নিজের একাউন্টে নিচ্ছেন, সেখানে ব্যালান্স যখন ১ লাখের বেশী হচ্ছে সেখান থেকেও টাকা কাটছে। এভাবে টাকা কাটছে অন্যান্য এমপ্লয়ীদের একাউন্ট থেকেও।

টাকা কাটা কিন্তু এখনো শেষ হয় নাই। আশিক সাহেব যখন কম্পানি রিটার্ন জমা দিচ্ছেন, সেখানেও কিছু টাকা যাচ্ছে। আবার, তিনি প্রতি মাসে যে টাকাটা নিচ্ছেন সেটা যখন তার পারসোনাল ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিচ্ছে, সেখানেও ভালো একটা ইনকাম ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। এভাবে অন্যান্য এমপ্লয়ীরাও দিয়ে যাচ্ছে।

অস্থিরতার শেষ কিন্তু এখানেই না। আশিক সাহেবের ছেলেমেয়েদের শখ মেটানোর জন্য মাঝে মাঝে রেস্টুরেন্টে গেলে ১৫% করে ভ্যাট গুনতে হচ্ছে। ২০০০/- টাকা বিলের ৩০০/- টাকাই ভ্যাট। প্রয়োজনীয় যে জামা, কাপড়, জুতো কিনে দিচ্ছেন, সেখানেও ভ্যাট।

নিত্যদিনে যখন যে জিনিসটাই খাচ্ছেন-পড়ছেন আশিক সাহেব ও তার পরিবার, সবকিছু মিলিয়ে যে কত টাকা ভ্যাট দিতে হচ্ছে যেটা স্বচক্ষে দেখা যাচ্ছে না। এই বাবদ প্রতি বছর পরিবারটির কত হাজার-হাজার টাকা যায়, তা হিসেব করে আর আশিক সাহেব মাথাটা নষ্ট করতে চাচ্ছেন না।

সরকারী খাতে যত টাকাই যাক না কেন, আশিক সাহেবের কোন আপত্তি নেই। তিনি এ টাকা খুশী মনে দেন। দেওয়ার পর মনে আত্মতৃপ্তিও অনুভব করেন দেশকে কিছু দেওয়ার কারণে।

এতোক্ষণ তো গেল সামনের দরজার হিসাব। এবার আসুন পিছনের দরজায় দাঁড়াই।

আশিক সাহেব যখন পারসোনাল ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেন, তখন তো তার আয়ের উপর নির্ধারিত ট্যাক্স দেনই, তার উপর যখন TIN সার্টিফিকেট তুলতে যান, তখন ঐ A4 সাইজের সাদাকালো প্রিন্টে পাতলা কাগজটার জন্যও টাকা দিতে হয়। যেটা কি না সম্পূর্ণ ফ্রী পাওয়ার কথা।

আর কম্পানির TIN সার্টিফিকেটের ফ্রী পাওনা পাতলা কাগজটা হাতে পেতেও অনেক দাম দিতে হয়। আপনি ব্যাবসা করবেন, আর ট্যাক্সের উপর ট্যাক্স(!) দিবেন না তা কি করে হয়?

আমি আপনাকে টাকা দিব, আপনি আমাকে প্রমাণস্বরুপ রিসিট (সার্টিফিকেট) দিবেন। এই রিসিট দেওয়ার জন্যও আপনাকে ঘুষ দিতে হয়! আপনি বড়ই বিচিত্র, বড়ই মহান!

আশিক সাহেবের একবার পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়ায় পার্শ্ববর্তী থানায় যান জিডি করতে। গিয়ে দেখেন জিডি’র ফর্ম নেই। একখানা আছে, সেটা ফটোকপি করে নিয়ে আসতে হবে। কি আর করা। আশেপাশে ফটোকপির মেশিনও নেই। অগত্যা প্রায় এককিলো হেঁটে ফটোকপি করিয়ে এনে ফর্ম ফিলাপ করে জমা দেয়ার পর তো আরেক কাহিনি।

কাহিনি কি? কিছু খরচা লাগবে। আশিক সাহেব শুধালেন, এখানে আপনাদের তো কিছু করার দরকার নেই। পাসপোর্ট তো খুঁজে দিতে বলিনি। শুধু এই ফর্মটা গ্রহণ করবেন মাত্র।

না, এটা ফাইলিং করতে হবে। কিছু খরচ তো লাগবেই। বাহ্ বেশতো! কত লাগবে আপনাদের? একপ্রকার জিম্মি হয়েই তাদের চাহিদা মিটিয়ে চলে এলেন আশিক সাহেব। মেটাতে বাধ্য হলেন কারনে এর ক’দিন পরেই তাকে দেশের বাইরে যেতে হয়েছিল।

আশিক সাহেব একবার ভূমি অফিসের এক গ্যাঁড়াকলে পরেছিলেন। না, ভুলটা আশিক সাহেবের ছিল না। ছিল মাননীয় সরকারের সুযোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারা সৃষ্ট। সেখানে তাকে টানা দু’বছর নাকানি-চুবানি খাইয়ে প্রায় লক্ষাধিক টাকা উপঢৌকন দিয়েই তবে মুক্তি পেতে হয়েছিল।

আশিক সাহেব মনে মনে নিজেকে সান্তনা দেন- এটা তো বাংলাদেশ। এখানে এমনই তো হয়। এটাই এখানকার নিয়ম। যেখানকার যেমন নিয়ম, বাঁচতে হলে সেভাবেই চলতে হয়।

আশিক সাহেব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন। সরকারকে টাকা দিচ্ছেন, ঠিক আছে। কিন্তু কি পাচ্ছেন? কি সেবা পাচ্ছেন?

– এই যে সরকারী অফিসগুলো আছে কাদের জন্য?
: জনগনের সেবার জন্য। এগুলো প্রত্যেকটি জনসেবা প্রতিস্ঠান।

– এইসব অফিসের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খাচ্ছে-পড়ছে কার টাকায়?
: সরাসরি জনগনের টাকায়। সর্বস্তরের জনগনের টাকায়।

তাহলে এই সব সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারহোল্ডার (ডিরেক্টর) হচ্ছে লিগ্যালি ও লজিক্যালি দেশের প্রত্যেকটি জনগন। এবং তাদের কর্মচারি হচ্ছে সকল সরকারি কর্মকর্তাসহ সকলেই।

সূত্রানুযায়ী, যে কোন স্তরের মানুষই যখন এইসব অফিসে সেবা নেওয়ার জন্য যাবেন, কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবার উচিত এইসব সেবাগ্রহীতাকে “স্যার” বলে সম্বোধন করা যেহেতু তাদের টাকাতেই এদের পেট-সংসার চলে। অথচ উল্টো এইসব শেয়ারহোল্ডারদের তাদেরই বেতনভুক্ত কর্মচারীদের (সরকারী কর্মকর্তাদের) স্যার-স্যার বলে ডাকতে হয়। না ডাকলে তারা আবার মাইন্ড করেন!

শুধু কি মাইন্ড! যখন কোন প্রয়োজনে প্রাপ্য ন্যায্য সেবা নিতে কোন সরকারী অফিসে যাবেন, তখন তাদের স্যার-স্যার বলে ঘুষ না দিলে তারা মুখের দিকে ভালো করে ফিরেও তাকায় না।

অদ্ভুত তুমি, আর অদ্ভুত তোমার কর্মকান্ড হে প্রিয় স্বদেশ আমার!

Most Popular

To Top