ফ্লাডলাইট

মিশন অস্ট্রেলিয়াঃ সামর্থ্যে কুলোবে তো?

মিশন অস্ট্রেলিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

ব্যাটসম্যানরা সাধারণত সেট হন সিঙ্গেলস আর ডাবলস নিয়ে, চার-ছক্কা মেরে নয়। তাই সকল ফরম্যাটেই বাউন্ডারি আটকানোর চাইতে সিঙ্গেল আটকানোটা জরুরি। গুরু মাশরাফি নিজেও এমনটা ভাবেন বলে জানিয়েছেনও অনেকবার। তবে ইংলিশদের সাথে প্রথম ম্যাচে আমাদের বোলিং ও ফিল্ডিং স্ট্র‍্যাটেজি দেখে মনে হয়নি তিনি সিঙ্গেল আটকাচ্ছেন বা উইকেট নেবার চেষ্টা করছেন। অবশ্য অপরিচিত কন্ডিশন, তার ওপর ধারণার ১৮০ ডিগ্রী কোণে ঘুরে যাওয়া বাস্তবতা দেখে ম্যাচের পরিকল্পনাও ১৮০ ডিগ্রী কোণে ঘুরে যাওয়ার কথা। ফলাফল, সিঙ্গেলস-ডাবলস নিয়ে, সাথে কিছু বাউন্ডারি বের করে নিয়ে ম্যাচ জিতে যায় ইংল্যান্ড।

এই নতুন ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে অবশ্য ৪০০ রানও নিরাপদ কিনা, সেই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে বিদায়ের পরে ২ বছরে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ক্রিকেটের খোলনলচেটাই পাল্টে ফেলেছে তারা। প্রাচীন ব্রিটিশ টুকটুকে স্টাইল বাদ দিয়ে তারা দল সাজিয়েছে এক ঝাঁক পাওয়ারহিটার ও স্ট্রোকমেকারের মিশেলে। গড়েছে অলরাউন্ডার-ভিত্তিক বোলিং অ্যাটাক, ফলে পাওয়া গেছে লম্বা ব্যাটিং লাইন-আপ। এই টুর্নামেন্টে এই ইংল্যান্ড দলটিকেই সবচেয়ে বেশি ব্যালেন্সড এবং অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছে এখনো পর্যন্ত। সুতরাং কোনমতে ৩০০ পার হওয়া স্কোর করে তাদের বিপক্ষে জয়ের আশা করাটা সমর্থকদের আকাশ-কুসুম কল্পনা হিসেবে ধরে নিয়ে ভুলে যাওয়া যাক।

একই স্টেডিয়ামে টাইগারদের পরের ম্যাচ আর কয়েক ঘন্টা পরে, র‍্যাঙ্কিং-এ দু’নম্বর দল অস্ট্রেলিয়ার সাথে। ওয়ার্নার-ফিঞ্চের ওপেনিং, স্মিথ-ম্যাক্সওয়েলের সাথে তরুণ ট্রাভিস হেড মিলে গড়া মিডল অর্ডার ও অভিজ্ঞ জন হেস্টিংস-মোজেস হেনরিকসের লেট মিডল অর্ডার; এছাড়া স্টার্ক-হ্যাজেলউড-কামিন্সের পেস অ্যাটাক। ব্যাট হাতে এরা দ্রুত রান তোলে, মাঝের ওভারে উইকেট দেয় না, শেষ দিকে পাওয়ার হিট করে। বোলিং-এ গতির সাথে নিয়ন্ত্রণ আর আগ্রাসনের মিশেল আছে, আর সাথে আছে দুর্দান্ত ফিল্ডিং-এ রানের পর রান বাঁচানোর সামর্থ্য। ইংল্যান্ডের মত না হলেও টিম ব্যালেন্সের তফাৎটা ১৯-২০ এর বেশি নয়।  এদের হারাতে হলে, কিংবা হারাবার কথা মাথায় আনতে গেলেও দিতে হবে নিজেদের সেরাটার চাইতে বেশি কিছু।

এবার নিজেদের দিকে তাকানো যাক। ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে পুরো দেশ, নির্বাচকমন্ডলী, ম্যানেজমেন্টের সাথে সম্ভবত দ্বিধাদ্বন্দে আছে যারা ব্যাট করতে নামেন তাঁরা নিজেরাও। দ্বিধাদ্বন্দগুলো একটু পরিষ্কার করার চেষ্টা করা যাক।তিনজন ওপেনার তামিম-সৌম্য-ইমরুল। এদের মধ্যে তামিম-সৌম্য জুটি ভাঙ্গার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অন্য ব্যাটসম্যান যারা আছেন, তাদের মধ্যে নিচে নেমে ফিনিশ করতে পারেন শুধুমাত্র একজন- সাব্বির রহমান। বাকিদের মধ্যে সাকিব-মুশফিক-রিয়াদ-মোসাদ্দেক এমনকি তরুণ মিরাজ, সবার জন্যই আদর্শ পজিশন হচ্ছে ৪ কিংবা ৫ নম্বর। টেকনিকালি সাউন্ড বলে মুশফিককে হয় তিনে তোলা যায়। এরপরে যথাক্রমে রিয়াদ, সাকিব, সাব্বির ও মোসাদ্দেক নামতে পারেন। কিংবা ব্যাটিং অর্ডারে অকাল-ভাঙ্গন নেমে আসলে সাব্বির ও মোসাদ্দেক তাদের পজিশন অদলবদল করতে পারেন। তবে শেষ ১০ ওভারের জন্য অবশ্যই  সাব্বিরকে থাকতে হবে, নাহলে আমাদের চিরাচরিত শেষ ১০ ওভারের দুঃস্বপ্ন পুনরায় দেখতে হবে এবং ‘২০-৩০টা রান কম হয়ে গেল’ ইত্যাদি দীর্ঘশ্বাসে সোশ্যাল মিডিয়ার আকাশ-বাতাস ভারী করা ছাড়া উপায় থাকবেনা।

বোলিং-এ মুস্তাফিজ, রুবেল ও গুরু মাশরাফিকে নিয়ে গড়া পেস অ্যাটাকের সাথে সাকিব আল হাসান তো আছেনই, পঞ্চম বোলার হিসাবে খুব সম্ভবত থাকবেন মেহেদী হাসান মিরাজ- যার দলে থাকাটা ব্যাটিং-এও একটি আলাদা অপশন দেবে টাইগারদের। তবে ইংল্যান্ডের সাথে ম্যাচের মত আট ব্যাটসম্যান নীতিতে যাবার আগে ভাবতে হবে উইকেটের কথা। এ ধরণের উইকেটগুলোতে ২৮০-৩০০ রান হচ্ছে মোটামুটি ‘পার(par)’ স্কোর। মানে কোনমতে এই স্কোর করলে জেতার ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর আশা থাকে। আর ৩৫০-এর আশেপাশের স্কোরকে ধরতে হবে ‘ফিফটি-ফিফটি স্কোর’। অর্থাৎ ম্যাচ সাম্যাবস্থায় আছে, বোলিং-এ নিজেদের সেরাটা দিলেই জয় হাতের মুঠোয় চলে আসবে। একটু পা পিছলালেই ম্যাচটাও পিছলে যাবে।

পার স্কোর আর ফিফটি-ফিফটি স্কোর, যাই থাকুক না কেন, হাতে ১০ ওভার করতে পারার মত বোলার পাঁচজনও যে যথেষ্ট নয়, সেটা ইংল্যান্ড ম্যাচেই পরিষ্কার। তাছাড়া সাকিব আল হাসান বল হাতেও তেমন ছন্দে নেই। সুতরাং মিরাজকে বসিয়ে ইমরুলকে খেলাবার মত বিলাসিতা করাটা এমন একটা বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে একেবারেই অনুচিত।

একাদশ নাহয় দাঁড় করানো গেল। এবার আসা যাক দুর্বলতাগুলো নিয়ে। বোলিং অর্ডারের দুর্বলতা তেমন একটা নেই, ভোগাচ্ছে ব্যাটিং অর্ডারটাই। ব্যাটিং অর্ডারের মূল দুর্বলতা তিনটি।

১। তামিম ইকবালে অতিরিক্ত নির্ভরতাঃ

তামিম আছেন তো দলের ব্যাটিং আছে, তামিম নেই তো ব্যাটিংও নেই! মূলত অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশ জাতীয় দলের ব্যাটিং-এর দশাটা এমনই। অতিরিক্ত তামিম-নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য ব্যাটসম্যানরা মূল দায়িত্বটা না নিলে এ যাত্রায় আর হচ্ছেনা কিছুই।

২। স্ট্রাইক রোটেশনে অনীহাঃ

বাংলাদেশ জাতীয় দলের ব্যাটসম্যানদের সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা এটি। হয় বাউন্ডারি,নাহয় ডট- এছাড়া কিছুই বুঝতে চান না তাঁরা। বর্তমান দলের শুধুমাত্র সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম সিঙ্গেল-ডাবলসে দক্ষতার পরিচয় অনেকদিন ধরেই দিচ্ছেন বটে,তবে সাকিব আল হাসানের বর্তমান অফ ফর্মের কারণে সেই ‘দায়িত্ব’ পুরোটাই এসে পড়ছে মুশফিকের কাঁধে। তরুণ মোসাদ্দেক এ কাজটা বেশি ভালোই করেন,তবে বাকিদেরও এই দিকে নজর দেয়ার সময় হয়েছে বোধ হয়। আসলে সময়টা এখন না হলে আর কখন হবে সেটা জানা নেই কারও।

৩। শেষ দশ ওভারের বিভীষিকাঃ

ফিনিশার না থাকার হাহাকার,আর বাউন্ডারি তুলতে গিয়ে শেষ দশ ওভারে টাইমিং, প্লেসমেন্ট ও স্ট্রাইক রোটেশনের ব্যাপারগুলো বেমালুম ভুলে বসে থাকার মাশুল গুনতে হচ্ছে শেষ ১০ ওভারে। ফলে দেখা যাচ্ছে ৬-৭ উইকেট হাতে থাকার পরেও শেষ ৬০ বলে রান উঠছে ৭০ নাহয় ৮০ করে। যে ধরণের উইকেটে খেলা হচ্ছে, তাতে স্লগ ওভারগুলোতে ৯০ বা ১০০ এর নিচে চিন্তা করা আর ম্যাচ অর্ধেক হেরে বসা একই কথা।

কয়েকদিনের ব্যবধানে এই তিন দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ দল, এমন ভাবাটা অন্যায় হবে। তবে চাইবো, ব্যাটসম্যানেরা তাদের সামর্থ্যের পুরোটা দিক, বোলাররা তাদের সামর্থ্যের পুরোটা দিক, ফিল্ডাররা তাদের সামর্থ্যের পুরোটা দিক। বর্তমান জাতীয় দলের কয়েকজন বাদে প্রায় সবাই-ই দেশ ও বিদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বেশ পরিচিত নাম। সামর্থ্যের পুরোটা দিন, নিজ নিজ নামের প্রতি সুবিচার করুন।

তাহলেই শুধুমাত্র প্রতিপক্ষের সামনে সামর্থ্য দিয়ে কুলোতে না পেরে হেরে যাওয়াটা মেনে নেয়া যাবে। নাহলে পুড়তে হবে হতাশায়। আরো একটি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ‘মিনো’ হয়ে থাকার হতাশাটা নয়, দিনশেষে ঐ কলার-ওল্টানো লোকটার হাতে একটা বৈশ্বিক ট্রফি দেখার অপেক্ষা বেড়ে যাবার হতাশাটাই পোড়াবে বেশি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top