টাকা-কড়ি

আমি আপনাদের ঘৃণা করি!

বাজেট প্রতিক্রিয়া ১ নিয়ন আলোয় neon aloy

আমার ল্যাপটপের ঘড়িতে এখন রাত্রি ১ টা ৭ মিনিট! কিন্তু আমি ঘুমোতে পারছিনা। না কোন আনন্দে নয়, কোন উত্তেজনায় নয়, নয় কোন অপার্থিব সুখে। ঘৃণায়!

আমি ঘুমোতে পারছিনা আপনাদের প্রতি হৃদয়ের সবচেয়ে গভীরতম যায়গা থেকে অসীম ঘৃণার ক্ষোভটুকু লিখে উগরে দিতে না পারার জন্য! হ্যাঁ, সেই আপনারা যারা আমাদের মত সাধারণ মানুষকে হাজারো-লক্ষ-কোটি ধোঁকা দিয়ে এই দেশের সব, সব সবকিছু প্রতিনিয়ত লুটেপুটে খাচ্ছেন।

সেই আপনাদের প্রতি প্রবল ঘৃণা আর কিছু করতে না পারার হতাশা আমার মত অতি নগন্য, সাধারণ, ছাপোষা আমাকে শুধু নয়, হয়তো আমার মত শত-শত, হাজার-হাজার, লাখ-লাখ, কোটি-কোটি মানুষকে ঘুমোতে দিচ্ছেনা; শুধু আপানদের প্রতি ঘৃণা!

সকালে ঘুম থেকে উঠে পেপারটা দেখার পর থেকে ইচ্ছে হচ্ছিল নিজের মাথার চুল নিজেই টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলি! ইচ্ছে হচ্ছিল নিজের হাতের মাংস নিজেই কামড়ে কামড়ে তুলে ফেলি! ইচ্ছে হচ্ছিল দেয়ালে নিজের মাথা নিজেই ঠুকে ঠুকে রক্তাক্ত করে ফেলি! ইচ্ছে হচ্ছিল ছয় তলার ছাদে উঠে লাফ দিয়ে এই চোর-বাটপার আর লুঠতরাজদের হাত থেকে মুক্তি পাই!

কিন্তু সেটা আর পেরে উঠিনি নিজের পরিবার, আর ছোট্ট ছেলেটির কথা চিন্তা করে। অসহায় মা-বাবার অনন্ত দুঃখ-কষ্টের কথা চিন্তা করে। সবকিছুর পরেও একমাত্র আমার উপরে ভরসা করে থাকা ছেলের মায়ের কথা ভেবে। পারিনি ওদের সামাজিক কোন নিরাপত্তা নেই- সে কথা ভেবে।

কারণ কি? আর আর কি যখন পত্রিকার পাতায় দেখলাম আমার কাছ থেকে “ডাকাতি” করে রাখা প্রতি ১০০ টাকায় আপনাদের মত কিছু মানুষের বেতন হয়, আর আপনাদের ছেলে-মেয়ের ভরন-পোষণের জন্য পেনশন জন্য দেয়া হয়।

যখন দেখলাম, আমার কাছ থেকে “ডাকাতি” করা টাকায় আপনারা উন্নয়নের নামে সবাই মিলে একযোগে লুটপাট করে বিদেশ ভ্রমণ করেন, দামী গাড়িতে চড়েন, বিশাল এপার্টমেন্টে থাকেন।

যখন দেখলাম শিক্ষার নামে ভর্তুকি দিয়ে আপনারা একটা অশিক্ষিত-মূর্খ-বিবেক বিবর্জিত জাতি, বিশেষ করে চোর-বাটপার আর ডাকাত তৈরি করেন। যারা দেশের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য কাজ না করে দলের জন্য আর ক্ষমতার জন্য কাজ করে। আর নিজেরা লুটেপুটে খায় ও ক্ষমতায় থেকে আপনাদেরকে খেতে সাহায্য করে।

আমাদের কাছ থেকে ডাকাতি করা টাকা আপনারা ভর্তুকি ও প্রণোদনার নামে সেই সব চোর-বাটপার আর ডাকাতদের হাতে তুলে দিচ্ছেন, যারা ব্যাংকসহ সকল আর্থিক খাতে ইচ্ছা করে ধস নামিয়ে আপনাদের হাতে সব টাকা তুলে দিয়েছে, নিজেদের পকেট ভরিয়ে।

আমি তো অন্তত বিশ্বাস করিনা যে এই দেশ থেকে কোন টাকা আদৌ পাচার হয়েছে। আপনারা মিডিয়ায় একটা নিউজ ছড়িয়ে দিয়ে সব টাকা নিজেরাই সরিয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস! কোথাও কোন ঋণখেলাপী তৈরি হয়না বরং আপনারাই তৈরি করে থাকেন, নিজের পকেট ভরিয়ে খেলাপী ঋণের সুবিধা দিয়ে আরও অর্থ যোগান দিতে।

আমাদের মত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে এভাবে ছিনতাই, ডাকাতি, লুটপাট করছেন- আপনাদের কি কোন বিবেক বোধ আছে? আপনারা কি আদৌ মানুষের পর্যায়ে পরেছেন বলে মনে করেন? আমরা যারা দিনরাত খেটে, গায়ের ঘাম নিজের জামায় শুকিয়ে, হাজারো-লাখো কটু কথা শুনে নিজেদের জীবনধারণ করার জন্য দুই পয়সা রোজগার করি, সেই আমাদের টাকা নিতে আপনাদের লজ্জা করেনা?

অথচ সেই আমাদের টাকায়ই যখন আপনার চাল-ডাল আর তেল-লবন জুটছে, ফ্ল্যাটে থাকছেন, গাড়িতে ঘুরছেন, সাথে মোটা অংকের বেতন নিচ্ছেন- তখন আপনাদের আর কর দিতে ইচ্ছা করেনা, তাই না? এই হল আপনাদের নীতিবোধ, বিবেকবোধ আর নীতি নির্ধারণ! একটা জঙ্গলের পশুও এর চেয়ে বেশী মানবিক বলে আমি মনে করি!

আপনারা আমাদের মত সাধারণ মানুষের টাকায় জীবনধারণের সকল খরচা পেয়ে থাকেন আর আমাদেরই ছুরি ধরে টাকা ছিনতাই করেন। আমার মত অতি নগন্য আর সাধারণ মানুষের প্রতি মাসের করের টাকায় আপনার বেতন হয়, আর আমাদের সাথেই যত রকম জোচ্চুরি, বাটপারি, বদমাইশি করেন! করেন না বলেন?

এই দেশের কয়টা সাধারণ মানুষ সঠিক বিচার পায়? পুলিশি সহায়তা পায়? ন্যায়বিচার পায়? সঠিক শিক্ষা পায়? সাধারণ চিকিৎসা পায়? এতটুকু সামাজিক নিরাপত্তা পায়? কিছু করার বা বলার স্বাধীনতা পায়? নিজের মত করে চলার কোন সুযোগ পায়? ইচ্ছেমত নিজের মত প্রকাশের অধিকার পায়? কেউ পায়না, কেউই না। সব যায়গাতেই আপনাদের তোয়াজ করে, তেল দিয়ে আর মাথা নত করে, কুর্নিশ করে মানিয়ে চলতে হয়!

অথচ হবার কথা ছিল ঠিক উল্টো! আমাদের সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা আপনারা চুরি-ডাকাতি করে নিয়ে নিজের জীবনধারণ করছেন। আপনাদেরই উচিৎ আমাদের কাছে মাথা নত করে কুর্নিশ করা বা সঠিক সেবা করা, সাহায্য করা, উপকার করা, নিরাপদ রাখা, নিরাপত্তা দেয়া, সাহস দেয়া, সহযোগিতা করা, চাকুরীর সুযোগ তৈরি করা, দরিদ্রদের সাহায্য করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আস্থা অর্জন করা, বিশ্বাস তৈরি করা আর সর্বোপরি নিজেদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা।

কিন্তু এসবের কোন একটাও কি আপনারা করছেন? করতে পারছেন? করতে চাইছেন কি? আপনারাই বলুন না।

আপনারা এসবের কিছুই করছেন না। আপনারা এসব করে দেখুন, শুধু আমি নই, আমার মত হাজারো-লাখো-কোটি মানুষ শুধু তার বেতনের কিছু অংশ নয়, পুরোটাই দিয়ে দিতে রাজি আছে। শুধু আমাদের, আমাদের পরিবারের সার্বিক সামাজিক নিরাপত্তা দিবেন এমন কথা দিন।

কিন্তু এসব তো আপনারা করবেন না। এইসব শিক্ষা, বোধ, বিবেক বা মানবিকতা তো আপানদের মধ্যে নেই। আপনারা জানেন শুধু কিভাবে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই আর লুটপাট করবেন আমাদের সবকিছু। আপনারা মানুষ নন, আপনারা সব পশু বা তার চেয়েও অধম। তাই পশুকে তো মানুষ তেমন কিছু করতে পারেনা, শুধু মনে মনে রাগ হয়ে ঘৃণা করা ছাড়া!

ঠিক তেমনই আপনাদের প্রতি শুধু ঘৃণা, ঘৃণা আর ঘৃণা… হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে, মনের একদম গভীর থেকে, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনাদের মত চোর-বাটপার-ছিনতাইকারী আর সর্বোপরি দেশদ্রোহীদের লুটতরাজের জন্য ঘৃণা, ঘৃণা আর ঘৃণা!

“আমি আপনাদেরকে ঘৃণা করি……”

৩রা জুন ২০১৭
রাত ২ টা।

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top