গল্প-সল্প

ছোটগল্পঃ নয়ে আট…

নয়ে আট নিয়ন আলোয় neon aloy

| ১ |

এই কাজটা মা করে গেলেন পুরোটা বছর। যতক্ষণ তাঁর দুই ছেলে স্কুলে ক্লাস করছে, বয়েজ সেকশনের অভিভাবকদের বসার ঘরে তিনি বসে রইলেন। প্রতিদিন সকাল এগারোটা থেকে বিকাল ৫ টা। আর কোন ছেলের মা নাই। ক্লাস এইট, নাইন, টেনের ছেলেরা আর যা-ই হোক, বাচ্চা না। কিন্তু হামিদা খাতুন একাই বসে থাকলেন। স্যাররা প্রথমদিকে বোঝালেন যে ভয়ের কিছু নাই, তাঁর ছেলেরা স্কুলে যতক্ষণ সময় আছে ততক্ষণ নিরাপদ। কিন্তু হামিদা খাতুন ভরসা পান না। তিনি ঠাঁয় বসে থাকলেন। দিনের পর দিন। তপন আর হিমেল রাগ করে, ক্লাসে নাকি তাদের মান থাকেনা। আর কোন ছেলের মা তো আসেনা। তাহলে তাদের মা কেন আসে অযথা? মায়ের সবকিছুতেই বেশি বেশি। ছেলেরা রাগ করে করুক, স্কুলের স্যাররা গোপনে বিরক্ত হয় হোক, মা স্কুল আঙ্গিনা থেকে এক পা নড়বেন না ঠিক করেছেন। অবস্থাটা এমন দাঁড়ায় যে, অভিভাবকদের জন্য নির্ধারিত বাথরুম দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার ফলে একরকম অকেজোই ছিল, সেটিও মেরামত করতে বাধ্য হয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। কারণ একজন অভিভাবক রোজ রোজ স্কুলে আসেন, স্কুল চলাকালীন পুরোটা সময় ছেলেদের ক্লাসরুমের দিকে তাকিয়ে একশো মিটার দূরত্বে অবস্থিত অভিভাবকরুমে বসে থাকেন।

টিফিনের সময় হলে দুই ছেলে মা’র কাছে এসে ভাত খেয়ে যায়। টিফিন টাইমে কোথায় একটু সিঙ্গারা, সমুচা খাবে তা না; খেতে হবে ভাত! উফফ! মা যে কি জ্বালাতে পারে! আগে দুই ভাইয়ের টিফিনে বরাদ্দ ছিল বিশটাকা, দশটাকায় দুটো সিঙ্গারা দু’জন খেয়ে দশ টাকা করে প্রতিদিন স্কুল ডায়েরির ভাঁজে গোপনে জমিয়ে রাখা যেত। মাস তিনেক জমিয়ে শেক্সপিয়র রচনাসমগ্র কেনা গিয়েছিল। একদিন টাকা জমানোর ব্যাপারটা ধরা পড়ে যায়। পড়বে না? ওরকম গোয়েন্দা স্বভাবের একটা বোন যদি ঘরে থাকে, ধরা পড়বেই তো! তারপর থেকে মা রান্না করে দিত, সেও ভালো ছিল একরকম। এখন মা নিজেই এসে স্কুলে বসে থাকে। স্যাররা তো বলেছেন স্কুল ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় পুলিশ তো পুলিশ, পুলিশের বাপও তাদের কিচ্ছুটি করতে পারবেনা। কিন্তু হামিদা খাতুন এতে আশ্বস্ত নন। বাংলাদেশে কোনকিছুই ঠিকঠাক হয়না, দেখা গেল পুলিশ একদিন স্কুলে এসে তাঁর দুই ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে চাইলো, তখন? তপন ভেবে পায় না, পুলিশ যদি ধরে নিয়ে যেতেই চায়, মা কী করে তাদের আটকাবে? এসব প্রশ্ন করলেই মা ধমক দেন। আর বাবাটাও যে কী! তাকেও বোঝানো গেল না যে মায়ের স্কুলে যাওয়ার কোন মানেই হয়না। যা হবার তা তো হবেই।

যা হবার তা তো হবেই রে বাপ। তোরা কী বুঝবি মায়ের যন্ত্রণা! মাঝেসাঝে আক্ষেপের সুরে আপনমনে বিড়বিড় করেন হামিদা খাতুন। দু’টো বাচ্চা বাচ্চা ছেলে তাঁর। অমন যক্ষের ধন দু’টোকে পাহাড়া দিতে তাঁর কি ভালো লাগে? কিন্তু ওইটুকু না করলেই বা মনকে বুঝ দেন কী করে? তপন ভূমিষ্ঠ হওয়ার বছর না ঘুরতেই তিনশ পয়তাল্লিশ দিনের মাথায় হিমেলের জন্ম। রোগা, চিমসে মারা একেবারে। সারাদিন কাঁদে, সারাদিন কাঁদে। তপনের বাপ তো শেষমেষ রাগ করে বলেই ফেললো একদিন – ফালাইয়া দেও এরে ওয়ালের বাইরে। অথচ এই হিমেলই পরে বাপের সবচেয়ে আদরের, সবচেয়ে কাছের মানুষে পরিণত হয়। পোলাপান যতই রাগ করুক, হামিদা খাতুন স্কুলে না গিয়ে পারেন না। হামিদা খাতুনের ভাবভঙ্গি, প্রস্তুতি দেখলে মা মুরগির কথা মনে পড়ে। আকাশে অশনিসংকেত দেখলেই যে ছানাগুলোকে নিজ ডানার ভেতর লুকিয়ে ফেলে আর রাগে গজরাতে থাকে।

এই তো মাসখানেক আগে বলা নেই কওয়া নেই রিপন আর সাগরকে ওদের বাসার সামনের মসজিদ থেকে ধরে নিয়ে গেল ডিবি পুলিশ। পরে জানা গিয়েছিল যে লোকটা ওদের দুজনকে হাতকড়া পড়িয়েছিল, সে নাকি রিপন, সাগরের সাথে নামাজ পড়েছে টানা একসপ্তাহ। মাঝে মাঝে নাম কী, বাবার নাম কী, কোন স্কুলে পড় এসব প্রশ্নও করেছে। রিপন, সাগরকে ধরার পরে বাকি পাঁচ পরিবারে আবার একটা ধাক্কা লাগে। তপন, হিমেল তো এক পরিবারেরই; এছাড়াও রাসেল, ইমন, পাঠান, জিসানও যে যার মত গা ঢাকা দেয়। এরা কেউই বুঝতে পারেনা দুইবছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা- যার তদন্ত রিপোর্টে এসেছে এটা স্রেফ একটা দুর্ঘটনা, সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এতদিন পরে পুনরায় কেন ধরপাকড় শুরু হলো। ফুপ্পির বাসায় আশ্রয় নিয়ে এই প্রশ্ন তপন, হিমেলের মনে উঁকি দেয়। পরে তারা জানতে পারে সানির বাবা নাকি না-রাজি দিয়েছেন। অর্থাৎ, আগের সরকারের আমলে তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাটির যে রিপোর্ট দিয়েছিল, সেটা নাকি নিরপেক্ষ হয়নি, আসল ঘটনা ধামাচাপা পড়েছে। সরকার পরিবর্তন হবার ফলে সানির বাবা না-রাজি দিয়ে পুনরায় মামলাটি তদন্ত করার আপিল করেছেন। আসল ঘটনা? আসল ঘটনা আবার কী? তারা কি কেউ জানতো সানিকে এভাবে ডুবে মরতে হবে? না তারা চেয়েছে? এভাবে বন্ধুর মৃত্যু কেউ কামনা করতে পারে? এই সহজ জিনিসটা বড়রা বুঝছেন না কেন? রিপন আর সাগরকে কি পুলিশ মারধর করে? তাদেরকেও কি ধরে নিয়ে যাবে? এ বছর তাদের এসএসসি পরীক্ষা, এভাবে কতদিন তাদের লুকিয়ে থাকতে হবে? এমন হাজারো প্রশ্নের বুদবুদ তপন, হিমেলের মাথায় তৈরি হয়। পরে অবশ্য স্কুলের স্যারদের পরামর্শ ও অভয়বাণীতে তপন, হিমেল, রাসেল, পাঠান, জিসান, ইমন ক্লাসে যোগ দেয়। রিপন, সাগরও পনেরো দিনের হাজতবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসে।

জেলফেরত রিপন, সাগরকে নিয়ে ওদের এলাকা আর স্কুলে বিরাট হৈচৈ পড়ে যায়। ক্লাস টেনের দুইটা ছেলে জেলের ভাত খেয়ে এসেছে- এলাকার আবালবৃদ্ধবনিতা কারোরই যেন এটা বিশ্বাস হতে চায়না। সকাল, সন্ধ্যা তাদের বাসায় মানুষের আনাগোনা লেগেই আছে, লেগেই আছে। আর এত এত প্রশ্ন! মেরেছে নাকিরে বাপ? কী খেতে দিত? ঠিকমতো ঘুমোতে পারতি? এমন অজস্র প্রশ্ন। গোপনে গোপনে কত যে কানাঘুষা!

-নিশ্চই কিছু করসে, নাইলে এমনি এমনি পুলিশ ধইরা নিয়া যায় নাকি?
-কি সুন্দর নূরের লাহান ফুটফুইট্টা পোলাডারে আট বন্ধুয়ে মিল্ল্যা মাইরা নদীত ফালাইয়া দিল। মাইরা ভাবসে পার পাইবো, অথচ দ্যাহো আল্লার কি বিচার নদীত লাশ ভাইস্যা উঠলো।
-আরে না না নদীডার দোষ আছে। বছর বছর নদীডা মানুষ নেয়। ওই পোলার বাপ-মায়ের কপাল পুড়লো আর কি!

স্কুলে বন্ধু, স্যারদের প্রশ্ন তো আছেই। প্রথমদিকে ওরা উত্তর দিয়েছে ঠিকঠাক। যত দিন গেছে ওদের মেজাজ বিগড়ে গেছে। কথা তুললেই উল্টাপাল্টা যা খুশি বলে, এমনকি গালাগালও দেয়। রিপনের মতো আলাভোলা বাচ্চা ছেলে এখন কথায় কথায় চোখ পাকিয়ে কথা বলে, দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। জেলে নাকি কোন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর সাথে পরিচয় হয়েছে তার। সে নাকি রিপন, সাগরকে ছোট ভাইবেরাদার বানিয়েছে। বলেছে ওদের কোন সমস্যা হলে তাকে বলতে। পেটের ভিতর সোজা ড্যাগার চালিয়ে দিয়ে নাড়িভুঁড়ি বার করে আনবে। সাগরকে তেমন একটা না হলেও রিপনকে সবাই ভয় পেতে শুরু করে। সে আর আগের সেই রিপন নাই। টিফিন পিরিয়ডে বাথরুমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খায় আর বন্ধু-জুনিয়ররা কিঞ্চিৎ কৌতুহল এবং কিঞ্চিৎ ভয়মিশ্রিত চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। অফ পিরিয়ডে রিপন হাইবেঞ্চের উপর পা তুলে বসে থাকলেও ক্লাস ক্যাপ্টেন তার নাম ব্ল্যাকবোর্ডে তোলেনা।

তবে মাঝে মাঝে বোধহয় রিপন, সাগরদেরও জেলের অভিজ্ঞতা সবাইকে জানাতে ইচ্ছে করে। এই যেমন সেদিন রিপন হঠাৎ করেই দীপ্তকে ডেকে বলে, জেলের গল্প শুনবি? ভয় পাইস না আবার। তোরা তো সব নাদান পোলাপাইন।
এটা বলেই সে বিদঘুটে হাসি হাসতে থাকে। কখনো কখনো ক্লাস না থাকলে হাইবেঞ্চকে তবলা বানিয়ে সে গান ধরে,
“মার্ডার তো আমরাই করিনি, মার্ডার তো আমরাই করিনি..
সঙ্গে ছিল আটজনা, সঙ্গে ছিল আটজনা
দুইজনার জেল হইলো, আর ছয়জনার হইলোনা….”

জেলের বড়ভাইরা নাকি তাদের দুইজনকে দিয়ে এই গান গাওয়াতো। জেলে নাকি শক্ত শক্ত রুটি, আর গুড় খেতে দিত। রিপন, সাগরের নামে জেলের দোকানে খাতা করা ছিল। সেখানে টাকা জমা দেয়া থাকতো, ওরা দোকান থেকে কিছু নিলে টাকা কেটে রাখতো। দশটাকার জিনিস কিনলে বিশটাকা কেটে নিত। জেলের বড়ভাইদের নিয়মিত সিগারেট, বিস্কিট, কেক খাইয়ে হাতে রাখতে হতো। যে রিপন অনেকটাই বড় হয়ে গিয়েছিল জেল খেটে, সে-ও পর্যন্ত একদিন ফিসফিস করে জানায় তার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা। গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে হঠাৎ সে টের পায় তার নাদুসনুদুস শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাথাড়ি হাত চলছে। বিষয়টা বুঝতে তার কিছুটা সময় লাগে। বোঝার সাথে সাথে তার ভিতরে ধক করে ওঠে। সরে যে যাবে সেই সুযোগ নেই, যেটুকু জায়গা তার জন্য বরাদ্দ সেখানেই সে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল। নড়লেই পরের কয়েদীর ঘুম ভেঙ্গে যাবে। সে কি বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা! শোনা যাচ্ছিল তাদের নাকি কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ভাগ্য ভালো পনেরো দিনেই জামিন হয়েছিল, নইলে জ্বলন্ত উনুন থেকে সাক্ষাত আগুনে পড়তে হতো।

তপন, রিপনরা তো নির্বিঘ্নে ক্লাস করে যাচ্ছে। খুব শীঘ্রই ওদের এসএসসি পরীক্ষা। স্কুল কর্তৃপক্ষ ক্লাস টেনের শীর্ষ বিশজন ছেলে আর শীর্ষ বিশজন মেয়েকে নিয়ে স্পেশাল ক্লাসের ব্যবস্থা করেছে। সেখানে তপন, রিপনদের সেই আটজনই আছে। এইটের বৃত্তি পরীক্ষায় হিমেল সমগ্র জেলায় ট্যালেন্টপুলে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আর তপন সাধারণ গ্রেডে হয় প্রথম। ফলে এবার ওদের প্রতি মনোযোগ আর প্রত্যাশাও বেশি।
কিন্তু পড়াশোনার এত ব্যস্ততার মাঝেও কি সানিকে ওদের মনে পড়েনা? পুরো ঘটনাটাই তো এখনো দুঃস্বপ্ন মনে হয়। কি দুষ্টুটাই না ছিল সানি! সবাইকে মাতিয়ে রাখতো রীতিমত। তপনদের সাথে এইটের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য স্পেশাল ক্লাসে এলো, উদ্দেশ্য বৃত্তি পাওয়া নয়। ভালো ছাত্রদের সাথে থেকে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া। কিন্তু নাহ, স্পেশাল ক্লাসের চাপ নিতে না পেরে আবার চলে গেল সাধারণ ক্লাসে। সেখানে গিয়েও কেলেঙ্কারি বাঁধালো, ধর্ম বইতে কিসব আজেবাজে কথা লিখে হুজুরের হাতে ধরা পড়ে। আর হুজুরের সে কি বেদম পিটুনি! সেই পিটুনি খেয়ে, এবার থেকে ভালো হয়ে চলবো এই মর্মে মুচলেকা দিয়ে আবার চলে আসে স্পেশাল ক্লাসে। কিন্তু যেই কি সেই! তবে মনটা খুব বড় ছিল। একবার নিসা নামে ক্লাসের একটা মেয়েকে সানির ভালো লাগতে শুরু করে। প্রপোজ করলে ভেবে দেখবো- নিসার এই কথা শুনেই সানি খুশিতে পুরো ক্লাসের সবাইকে মিষ্টি খাওয়ায়। সানির মত ভালো ছেলেকে কষ্ট দেয়া উচিৎ হবেনা, মিষ্টি খেয়ে হৃষ্টচিত্তে ক্লাসের সবাই এই মতামত দেয়। ক্লাসের সবার ভয়েই কি নিসা সানির সাথে কিছুদিন হেসে হেসে কথা বলেছিল?

বইয়ের সাথে সানির যেন অহি-নকুল সম্পর্ক। পড়তে সে মোটেই চাইতোনা। সেই সানিই কিনা তপনকে একবার বলে তার সাথে বুকস্টলে গিয়ে বই বাছাই করে দিতে। সে নাকি বই পড়বে! শুনে তো তপন আকাশ থেকে পড়ে। পাঠ্যপুস্তক যে ছুঁয়েও দেখেনা, সে পড়বে আউট বই? আর তপন নিজেই কি বই চেনে? যাকগে, যেহেতু সানি তাকে বই বাছাই করে দিতে বলেছে, অবশ্যই সে নিজেকে বই বিশেষজ্ঞ ভাবতে পারে। স্কুল ছুটির পর তপন, সানি আর হিমেল স্কুল মার্কেটের বইয়ের দোকানে যায়। দুই-একটা দোকানে যেসব বই দেখে, সেগুলো ঠিক মনে ধরেনা। বইয়ের নামধাম অত কঠিন হলে কি চলে? খুঁজতে খুঁজতেই চোখ পড়ে হুমায়ুন আহমেদ নামটার উপর। হুম, টিভিতে উনার নাটক দেখায়। উনি বিখ্যাত লেখক। উনার বই-ই কিনতে হবে। অতঃপর তারা তিনজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে হুমায়ুন আহমেদের “সে আসে ধীরে” উপন্যাসের বইটা কিনে ফেলে। ওমা! সানি নাকি বই বাসায় নিবেনা। বই বাসায় নিলে নাকি ওর বাবা ওর পিঠের ছাল তুলে ফেলবে। তাহলে উপায়? উপায় সানিই বের করে। বইটা তপনের কাছেই থাকবে এবং তপন রোজ ব্যাগে করে বইটা নিয়ে আসবে। সানি ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে একপাতা দুইপাতা করে পড়ে ফেলবে।

একদিকে তপনরা এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে ওদের বাবা মায়েরা হন্যে হয়ে এখানে-ওখানে ছুটে বেড়াচ্ছেন। উদ্দেশ্য- তাদের ছেলেদের সামনে পরীক্ষা, তাদের যেন পুলিশ কিংবা গোয়েন্দারা ধরে নিয়ে না যায়। শহরের সব প্রভাবশালী রাজনীতিবীদদের কাছে ধর্না দেয়া শেষ, কেউই নিশ্চিন্ত করতে পারেনা, আবার অক্ষমতাও প্রকাশ করেনা। সানির বাবা নাকি মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে বারবার অসন্তোষ প্রকাশ করে চলেছেন। লোকটার হাত অনেক লম্বা। ইনভেস্টিগেশন অফিসারকে পছন্দ না হলেই বদলি করিয়ে ফেলছেন। আটজন ছেলের এই সাতটা পরিবার যেন কোর্টকাছারি, থানা-পুলিশ,তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। অকাতরে টাকা ঢালতে হচ্ছে। তদন্ত কাজ অসম্পূর্ণ রেখে একেকজন তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হন, আরেকজন আসেন। এসেই সবকিছু প্রথম থেকে শুরু করতে চায়। প্রথম থেকে শুরু করার মানেই হলো আটজনকে আটক করা, রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা। ফলে তাদের পড়াশোনার ক্ষতি, এমনকি এসএসসি পরীক্ষাও অনিশ্চিত। ফলে সন্তানদের পড়াশোনা নির্বিঘ্ন রাখার ব্যবস্থা করতে হয় বাবা-মায়েদের।

তদন্তকর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ খুশ তো সব খুশ। ছেলেরা আরামসে পড়াশোনা চালাতে পারবে। তদন্ত কর্মকর্তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে যেতে হয়। অবশ্য তদন্ত কর্মকর্তারাও ছেলেগুলোর পড়াশোনা নির্বিঘ্নে যেন চলতে পারে সেই ব্যাপারে যথেষ্ট সিনসিয়ার। তাই মালকড়ির জন্য নিয়মিত তাগাদা দিতে ভুল হয়না। যেমন একদিন তদন্ত কর্মকর্তা রিপনের বাবাকে ফোন করে হাসতে হাসতে বলেই ফেললো, বুঝেনই তো ভাইসাব। আমি আসলে চাইনা আপনাদের বাচ্চাগুলা কোন ভোগান্তির শিকার হোক। কিন্তু বুঝেনই তো সামনে ঈদ-পুজা আছে। তাছাড়া আমাদেরও পরিবার বাচ্চাকাচ্চা আছে নাকি? হেহেহে..

অতএব টাকা ঢালো। মাথাপিছু হিসাব। হামিদা খাতুনের তো দুই ছেলে। তাকে ডাবল দিতে হয় সবসময়। হয়তো কিছু কমে মানানো যায়। কোত্থেকে কোত্থেকে যে টাকা জোগাড় করে হামিদা খাতুন আর তপন-হিমেলের বাবা! কোর্ট কাছারিতে ছোটাছুটি তো আছেই। কোর্টের দুর্বা ঘাসও নাকি টাকা খায়। মুহুর্মুহু চাপ বাপ-মায়েরা সামাল দিতে থাকে। আর সন্তানেরা দুধ-ডিম-কলা খেয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকে।

এর মধ্যে এসএসসি শেষ করে আটজন ভর্তি হয় বিভিন্ন কলেজে এবং আরো একবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার মাসখানেক তদন্ত করে আটজনকে বাবা-মাসহ ডেকে পাঠান। তিনি বাবা-মায়েদের আশ্বস্ত করেন তাদের সন্তানদের কোনরকম হয়রানি করা হবেনা। তিনি মাসখানেক ধরে বিভিন্নজনের সাথে আলাপ করেছেন। ফায়ারসার্ভিস কর্মী, নদীপাড়ের বাসিন্দা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি… এখন এই আটজনের সাথে কথা বলা দরকার। সমস্ত তদন্ত করে তার মনে হয়েছে এটা খুনখারাবি কিছু নয়, স্রেফ দুর্ঘটনা। তিনি দ্রুত চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে চান। সানি নদীতে ডুবেই মারা গেছে, বন্ধুরা তাকে মেরে নদীতে ফেলে দেয়নি। সানির পিঠে ও মাথায় আঘাতের যে দাগ পাওয়া গেছে, সে সম্পর্কেও পরিস্কার হওয়া গেছে। আটজনের একজন ইমন ঘটনা ঘটার ঘন্টাদুয়েক পরে স্থানীয় লোকদের নিয়ে সানিকে নদীতে খুঁজতে নামে; বর্শা, টোডা নানাকিছু দিয়ে খোঁজার সময় সানি পিঠে আঘাত পায়। উদ্ধারের পরে অজ্ঞান সানিকে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে সজ্ঞান মানুষের মত বসিয়ে রাখা হয়। গাড়ি স্টার্ট নিতেই সানি গাড়ি থেকে উল্টে পড়ে যায়। সেই থেকে মাথায় আঘাত। তদন্ত কর্মকর্তা ইমনের বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করেন। আটজনের মধ্যে সেই সবচেয়ে পরিণত ছিল।

| ২ |

তখন ওরা ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার স্পেশাল ক্লাস করে। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। ১১ আগস্ট, ২০০৫ সাল। দুটো ক্লাসের শিক্ষক স্কুলে আসেননি। সহকারি প্রধান শিক্ষক ওদের ছুটি দিয়ে দিলেন। অযথা সময় নষ্ট না করে বাসায় বসে পড়গে যা। স্কুল থেকে বের হয়েই দুই-একজনের মাথায় হয়তো আসে এত আগে বাসায় গিয়ে কাজ কী? এরচেয়ে আশেপাশে কোথাও ঘুরে আসলেই হয়। পয়তাল্লিশ-পয়তাল্লিশ নব্বই মিনিট সময় হাতে আছে। ইমনই সম্ভবত বলে নদী খুব কাছে, নদী দেখতে যাওয়া যায়। তপন সবার আগে রাজি হয়। হ্যাঁ, নদী দেখতেই চলো। তারা নয়জন। রাসেলকে নিতে চায়নি তপন। ক্লাসের ফার্স্টবয় হওয়ার সুবাদে সবার উপরে তপনের কিছুটা হলেও কর্তৃত্ব আছে। মানসিকভাবে সবচেয়ে বড় ইমন থেকে শুরু, সবচেয়ে বেয়াড়া জিসান পর্যন্ত তার কথা শোনে। রাসেলকে নেয়া যাবেনা, ও একটু আঁতেলমার্কা। কিন্তু রাসেল গোঁ ধরেছে সে যাবেই। ওরা নদীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সানি তো খুবই উত্তেজিত। সে সাঁতার জানে, সে নদীতে গোসল করবে। অনেক পরে তারা জানতে পারে সানি তাদের মতোই সাঁতার জানতো না, নদীতে নামার জন্য সে মিথ্যা বলেছে। নদী তো নদী, যাত্রাপথে এক মাছের ঘের পড়ে। সানি সেখানেই নেমে যেতে চায়। অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাকে মানানো যায়। নদীতে গিয়ে একেবারে নামবে সে। একমাত্র ইমনই সাঁতার জানতো। অনেক অনেক পরে, ইমনকে সানির বলা একটা কথা ওদের কানে বাজবে।
-দোস্ত, আমি কিন্তু তোর ভরসাতেই পানিতে নামমু।

ইমন হয়তো খুব একটা পাত্তা দেয়নি কিংবা কথাটা বুঝতেই পারেনি। যে নিজে সাঁতার জানে, তার অন্যের ভরসার দরকার কী?
কিন্তু সানি যে সাঁতার না জেনেই, স্রেফ এডভেঞ্চারের মোহে নদীতে নামতে চেয়েছিল, ভেবেছিল সাঁতার জানা কেউ পাশে থাকলেই আর কোন ভয় নাই- সে কথা কে জানতো?

নদীর পাড়ে তারা পৌঁছায় ঠিক দুপুরবেলায়। ইমন তাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে এসেছে। এটা ইমনদের এলাকার মধ্যেই পড়ে। বেশ গ্রাম-গ্রাম ভাব আছে। কাঁঠালদিয়া নাম গ্রামের। নদী দেখে ওরা বেশ উচ্ছ্বসিত। স্কুল থেকে মাইলদুয়েকের পথ, অথচ কখনো আসাই হয়নি। বর্ষার মৌসুম। নদীতে পানি থৈথৈ। নদীর পাড়ে প্রচুর মানুষ যে যার মতো স্নান করছে, কাপড় ধুচ্ছে, কেউ হয়তো বা জাল ফেলেছে নদীতে। এত মানুষের ভিড়ে ওদের কি কেউ আলাদাভাবে খেয়াল করেছে? হয়তো করেছে কারণ ওদের গায়ে স্কুলের সাদা ইউনিফর্ম। সানি ইউনিফর্ম খুলে ঝটপট স্কুল ব্যাগে রাখে। তপন, হিমেল, রাসেল, রিপন, সাগর, পাঠান একটা গাছের চারপাশে গোল করে বাঁধানো সিমেন্টের বস্তার বাঁধের উপর দাঁড়ায়। ওরা যেহেতু সাঁতার জানেনা, ওরা এখান থেকেই ইমন, সানির স্নান দেখবে। জিসান তো সাঁতার জানেনা। সে কেন প্যান্ট ভাঁজ করছে? সে কি পানিতে নামবে? জিসানটা যা বেয়াড়া! সে নাকি কেবল পা ভেজাবে, নদীর গভীরে যাবেনা। সানি আর ইমন নেমে পড়েছে। পানিতে নেমেই স্বভাবসুলভ দুষ্টুমিতে মেতে ওঠে সানি আর একটু একটু করে গভীরে যায়। ইমন ওকে বেশি দূরে যেতে না করে। ইমন এখানকার ছেলে, সে জানে নদীর ভালোমন্দ।

সানি ডুব দেয়, আবার ওঠে। ডুব দেয়, ওঠে। ডুব দেয়, ওঠে। ডুব……. বাঁধ থেকে ওরা অপেক্ষা করে সানির ওঠার। যারা সাঁতার জানে, তারা ভাসা ডোবার নানা কায়দা কানুন জানে। একজায়গায় ডুব দিয়ে, আরেকজায়গায় ভেসে ওঠা। সানি হয়তো সেটাই করছে। ওদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। পাঁচ মিনিট যায়। সানি ভেসে ওঠেনা। হয়তো আরো দূরে গিয়ে ভেসে উঠবে। ও যা দুষ্টুমি জানে! দশ মিনিট যায়। সানি ভেসে ওঠেনা। আরে উঠবে উঠবে। ভেসে না উঠে কোথায় যাবে? ইমন ডুব দিয়ে সানিকে খোঁজে। পায়না। আবার ডুব দেয়। পায়না। আবার ডুব দেয়। পায়না। ইমন হতভম্ব হয়ে ডুব দেয়, ভেসে ওঠে কিন্তু সানিকে পায়না। সানি সানি সানি…. সানি ওঠেনা । সত্যি বলতে কি আধঘণ্টা অব্দি বিশ্বাস ছিল সানি উঠবেই উঠবে। কিন্তু সানি ওঠেনা। কলিজার ভেতর ধক করে ওঠে সবার। ইমন ডাঙ্গায় উঠে আসে। সে তার সাধ্যমত খোঁজাখুঁজি করেও সানিকে পায়নি। কারোরই মাথায় আসেনা নদীর পাড়ভর্তি মানুষদের জানালে হয়তো তক্ষুনি খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে যেত। হয়তো সানিকে পেয়েও যেত। কিন্তু ওরা লোকজন ডাকেনা। ওদের ভয় হয় লোকজনকে বললে বুঝি লোকজন ভাববে ওরা সানিকে মেরে নদীতে ফেলে দিয়েছে, তাই ওদেরকেও লোকজন মেরে নদীতে ফেলে দিবে। পাড়ের লোকজন দেখেছে স্কুল ইউনিফর্ম পড়া কয়েকটা ছেলে এসেছে। কজন এসেছে কজন যাচ্ছে সেই খোঁজ তো তারা রাখেনি। আর তেমন কোন হৈচৈও তো তারা দেখেনি যে বুঝবে কিছু একটা হয়েছে।
নয়জন এসেছিল। এখন ওরা আটজন। আটজনই ঘোরের মধ্যে আছে। কী হলো এটা? সানি তাদের সাথে এই মুহুর্তে নাই এটা তারা বুঝতে পারছে, কিন্তু সানি আর কোনদিনই ফিরে আসবেনা এটা তাদের মাথায় ঘুণাক্ষরেও আসেনা। সানি ওদের সাথে গিয়েছিল, তারপর থেকে নেই কেন- একথা কাউকে বোঝানো যাবেনা। তাদেরকে কেউ আস্তো রাখবে না। সুতরাং, সানির সাথে স্কুল ছুটির পর তাদের দেখা হয়নি। সানি কোথায় তারা জানে না। এখন তারা যে যার বাসায় ফিরে যাবে, শনিবার থেকে নিয়মিত স্কুল করবে। এর বেশিকিছু তারা ভাবতে পারছেনা। বাসায় আসার পথে এক ঝোপ দেখে সানির ব্যাগ তপন ফেলে দেয়। তপনের ধারণাও হয়তো হয়নি সে কত বড় ভুল কাজ করতে যাচ্ছিল। ইমনই কি মনে করে বুদ্ধি করে ব্যাগটা সাথে করে নিয়ে নেয়।

বাসায় এসে তো আর কোন কথা বের হয়না মুখ দিয়ে। স্নান করতে গিয়ে বালতির জল দেখেও তপন আর হিমেল আঁৎকে ওঠে। ভাত খেতে পারেনা। কারোর দিকে তাকাতে পারেনা। বৃহস্পতিবারের সিনেমায় মনোযোগ দিতে পারেনা।

ইমন বাসায় গিয়ে তার এক মামাতো ভাইকে নিয়ে লোকজন যোগাড় করে নদীতে ছুটে যায়। সে-ই প্রথম সানির ডায়েরি থেকে সানির বাবার নাম্বার খুঁজে বের করে ফোন করে জানায় সবকিছু। সানি তাদের সাথে নদীতে এসেছিল। এখন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। তিনঘন্টার খোঁজাখুঁজির পরে সানিকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তখন সে জীবিত না মৃত তা নিয়ে নানা কথা চালু আছে। কেউ কেউ তো বলে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে তাকে বসিয়ে না রেখে শুইয়ে দিলে সে গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় জখম হতোনা, হয়তো বেঁচে যেত।

দুঃসংবাদ বাতাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। বিকেলের মধ্যে জানাজানি হয়ে যাওয়ার পরে তপন হিমেলের বাবা-মামা ছুটে এলেন বাসায়। সবকিছু জানলেন। তপন-হিমেলের বাবা ডিসেন্ট মানুষ। তিনি বললেন ভয়ের কিছু নেই।

রাতে বাসায় পুলিশ আসে। পুলিশ সবার আগে ধরেছে জিসানকে। জিসান পুলিশকে নিয়ে এসেছে তপন হিমেলদের বাসায়। ওরা ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওদের বাবা ওদের ঘুম থেকে জাগায় আর বলে পুলিশ এসেছে পাশের ঘরে, তারা যেন ভয় না পায়। ঢুলুঢুল চোখে পাশের ঘরে এসে তপন দেখে তার মা হামিদা খাতুন পুলিশের সামনেই জিসানকে বকাঝকা করছে। জিসান বেয়াড়া হলেও তপনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তপন তার মাকে পুলিশের সামনেই বলে জিসান ভালো ছেলে, ওকে বোকোনা।

প্রথমে তাদের তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকের বাসায়। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য হলেও পার্টি ক্ষমতায় থাকার সুবাদে বেশ প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় রাখতে পেরেছেন। তিনি তপনদের স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের প্রধানও। তাঁর বাসায় গিয়ে ওরা দেখে ইমন তার বাবা-মা সহ হাজির। স্কুল প্রশাসনের প্রায় সকল শিক্ষক উপস্থিত সেখানে। কারোর দিকে তাকাতে পারেনা তপন কিংবা হিমেল। কিছু কথা কানে ভেসে আসে। দুই ভাই খুব মেধাবী, নিশ্চিত বৃত্তি পাবে। ছেলেটা ডুবেই মরেছে কোন সন্দেহ নাই। থানায় নিয়ে যাওয়া হবে তাদের। জিজ্ঞাসাবাদ করেই নাকি ছেড়ে দিবে নেতার কাছে- এই কথা দিয়ে যায় পুলিশের ওসি। স্কুলের এক শিক্ষক, যিনি আবার সংরক্ষিত আসনের ওয়ার্ড কমিশনারও, তাঁকে পাঠানো হয় স্কুলের তরফ থেকে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি ছেলেদের ফেরত নিয়ে আসবেন।

আটজনের মধ্যে চারজনকে থানায় হাজির করা গেছে। ওসি’র রুমে এক এক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। প্রায় দেড় ঘন্টা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জিসানকে ডাকা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ঘন্টাখানেক। এরপর তপন দশ মিনিট, হিমেল পাঁচ মিনিট। তারা কেন নদীপাড়ের মানুষজনকে ডাকলোনা- এই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে আসে। তপন, হিমেল সব অকপটে বলেছে। তারা কী ভাবছিল, কেন কাউকে ডাকেনি সব। তালগোল পাকিয়েছে জিসান। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল পানিতে ধস্তাধস্তি বা মারামারি হয়েছিল কিনা ইমন আর সানির মধ্যে। এই একই প্রশ্নের উত্তরে তপন-হিমেল বলেছে এমন কিছু হবার প্রশ্নই আসেনা। পানিতে মারামারি হয়েছে এটা বললে হয়তো তাকে ছেড়ে দিবে এই ভেবে জিসান বলেছে, হ্যাঁ, পানিতে ইমন আর সানি মারামারি করেছে। ফলে যেটা হলো, তপন আর হিমেল ছাড়া পেয়ে গেল রাতেই। ওদের বাবা খালি কাগজে বন্ড সই করে ছেলেদের নিয়ে আসলেন বাসায়। জিসান আর ইমনকে আটকে রাখা হলো। পরে আরো কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদে জিসান বললো, না, এমন কিছু হয়নি। ওসি’র শক্ত হাতের দুখানা চড়সমেত পরের দিন ছাড়া পায় জিসান। ইমন বেচারা জিসানের কারণে ভোগান্তির শিকার হলো। তবে সেও ছাড়া পায়।

শনিবারের স্কুল কেমন যেন থমথমে, সর্বত্র গুঞ্জন। ওরা আটজন মিলে রড দিয়ে পিটিয়ে সানিকে মেরে পানিতে ফেলে দিয়েছে- এমন কথাও শোনা গেল কোথাও কোথাও।

সেকেন্ড পিরিয়ডে হেডমাস্টার ক্লাসে আসলেন। তিনি বেশ রাশভারি মানুষ। এসেই বৃহস্পতিবারের ঘটনায় যারা যারা ছিল তাদের দাঁড়াতে বললেন। প্রত্যেককে দুটো করে কষে চড় লাগালেন। জিসান আর ইমনকে বললেন ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে। তারা আর এই স্কুলে পড়তে পারবে না। কারণ তারা পানিতে নেমেছিল। স্কুলের ছেলেমেয়েরা কী করতে পারবে আর কী করতে পারবে না সেসব নতুন করে জানিয়ে দেয়া হেডমাস্টারের প্রায় চিৎকারসম দশ মিনিটের লেকচার থেকেই তারা প্রথম জানতে পারলো সানির বাবা-মা মার্ডার কেস ফাইল করেছে। খুনের মামলা। নিজেদের কানকেও যেন বিশ্বাস হতে চায় না। খুন? সানিকে খুন? সানিকে তারা কেন খুন করতে যাবে? ক্লাস এইটের ছেলেরা বাচ্চা না হলেও খুন করার মত বড় কী হতে পেরেছে? পৃথিবীর যতখানি জিঘাংসা, হিংস্রতার সাথে পরিচয় ঘটলে কেউ কাউকে খুন করতে পারে, তার ছিটেফোঁটাও কি তাদের মধ্যে প্রবেশ করেছে? কিন্তু ওদের সহজ-সরল মন জানেনা; যে রাষ্ট্রে তাদের বসবাস, সেই রাষ্ট্রে দুইমাসের বাচ্চাও হত্যা মামলার আসামী হওয়ার নজির আছে।

মূলকথা হলো সানি নেই। সবার মধ্যমণি হয়ে যে জ্বলজ্বল করতো সবসময় সেই ছেলেটা নেই। এই শূন্যতা কিভাবে পূরণ করবে তার আট বন্ধু?

|৩|

আগস্টের রাত। ঝুম বৃষ্টি। ইলেক্ট্রিসিটি নেই। বারান্দা থেকে বৃষ্টি দেখে তপন। আজ সানির এগারোতম মৃত্যুদিবস। আকস্মিক বিদ্যুৎ চমকানোতে যেন সানির মুখ ভেসে ওঠে। আচ্ছা, বেঁচে থাকলে কি তার মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো সানি? নাকি সে বিমান চালাতো? অথবা জাহাজে জাহাজে ঘুরে বেড়াতো পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে? নাকি সানি ক্রিকেটার হতো? সানির মত অস্থিরচিত্তের ছেলের সাথে কোনটা মানায়?

টানা পাঁচ বছর অবর্ণনীয় ভোগান্তির পর সেই যে সেই তদন্তকর্মকর্তা, তাঁর ঐকান্তিকতায় তদন্তের ফাইনাল রিপোর্ট আসে। তিনি একটা পয়সাও নেননি। বলেছিলেন, একটা ছেলে অকালে ঝরেছে, আরো আটটা ছেলের জীবন কী করে নষ্ট করি? খোদার কাছে কী জবাব দিবো?

আটজনের কে কোথায় আছে? রাসেল আমেরিকায়। রিপন আর সাগর ডাক্তারি পড়া শেষ করেছে। পাঠান, জিসান, ইমনের খোঁজ জানা নাই। তপনের ভাই হিমেল পড়া শেষ করে ঢাকায়। ওদের কি মনে পড়ে সানিকে? নাকি জীবনের স্বাভাবিক ঘাত-প্রতিঘাতে ওরা সানিকে ভুলে গেছে? বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু নাকি সর্বোচ্চ একবছর। এটাতো একবিংশ শতাব্দী।

ইংরেজি ইউনিটের যে লিখিত ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে তপন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল সেখানেও সানির স্মৃতি মিশে আছে। পরীক্ষায় রচনা লিখতে বলা হয়েছিল। চারটা রচনা থেকে তপন বাছাই করেছিল ‘The worst memorable incident I have ever experienced’. সেই ১১ আগস্টের কথাই তো সে লিখেছিল। তপন কী করে ভুলবে সানিকে?

বুকসেল্ফ থেকে সানির সেই বইটা বের করে তপন। বইটার শুরুর পাতায় লেখা আছে-
This book belongs to a friend who had miles to go but he couldn’t…

Most Popular

To Top