নাগরিক কথা

“ভুল চিকিৎসা”, আমাদের শিক্ষিত সমাজ, এবং বেলাশেষের গ্লানি…

ভুল চিকিৎসা চিকিৎসক প্রহার নিয়ন আলোয় neon aloy
নিকট অতীতের একটি ঘটনাঃ

৬ ই মে, ২০১৫, স্থান-সেন্ট্রাল হাসপাতাল। এক ভদ্রমহিলাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হল। প্রয়োজনীয় একটি মেজর অপারেশন সম্পন্ন হল। পরদিন সকালে উনাকে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড থেকে কেবিনে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘন্টাখানেক পর তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, সমস্ত ব্যবস্থা নেয়ার পরও মিনিট দশেকের মাঝেই উনি মারা যান। মাইন্ড ইট, ৬ তারিখে হেঁটে হেঁটে যে ভদ্রমহিলা হাসপাতালে এলেন, ৭ তারিখে উনি মারা গেলেন।

এই যে রোগীটি মারা গেলেন, সেজন্য কিন্তু সেন্ট্রাল হাসপাতালে কোনো ভাংচুর হয়নি, কোনো চিকিৎসককে পেটানো হয়নি, ভুল চিকিৎসার অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি! কারণ, ঐ ভদ্রমহিলার ছেলে ছিলেন চিকিৎসক, আমার সহকর্মী। উনি জানতেন অপারেশনটির পর কারো কারো ক্ষেত্রে এরকম শ্বাসকষ্ট (Massive Pulmonary Embolism) হতে পারে, অনেকে মারাও যেতে পারেন।

ঘটনাটি দু’বছর আগের। আমার সেই সহকর্মী এখন কিছুদিন পর পর ফেসবুকে তার মায়ের সাথে তোলা ছবি শেয়ার করে, হয়ত তার কল্পনার রাজ্যে তার মা এখনও বেঁচে আছে….

এবং প্রাচ্যের অক্সফোর্ডঃ

এবার বলুন তো, উপরের ঘটনাটির মত কোন ঘটনা যদি ঢাকা ইউনিভার্সিটির কোনো ছাত্রের মায়ের ক্ষেত্রে ঘটত, তবে তার কনসিকোয়েন্স কি হতো?

উত্তরটা অজানা নয়, কয়দিন আগেই আমরা তার নমুনা দেখেছি। হাসপাতাল ভাংচুর হয়েছে, ৭০-৮০ জন ছাত্র নামের কিছু কলঙ্কিত সন্ত্রাসী একত্রিত হয়ে চিকিৎসককে পিটিয়েছে, অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়া হয়েছে, “ডেঙ্গুর রোগীকে ক্যন্সারের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে”-এই মিথ্যা ধোঁয়া তুলে বরেণ্য চিকিৎসককে অযথা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে…

Posted by আতিকুজ্জামান ফিলিপ on Friday, 26 May 2017

ঢাকা ইউনিভার্সিটিকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়। এই কি তার নমুনা! যারা এই কাজগুলো করলো, তারা কি একবারও চিন্তা করেছিলো যে তারা প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের প্রতিনিধিত্ব করছে? তাত্ত্বিকভাবে যদি ধরেও নেই চিকিৎসায় ভুল হয়েছে, তবুও কি কোনো যুক্তিতে চিকিৎসক পেটানো বা ভাংচুর করা সমর্থনযোগ্য?

যারা এই কাজটি করল তাদের জন্য ডেল কার্নেগীর একটা কথা মনে পড়ছে- “ভদ্র আচরণ করতে শিক্ষা লাগে, অভদ্র আচরণ করতে অজ্ঞতাই যথেষ্ট…”

এবং অন্যান্যরাঃ

গ্রাম এলাকায় একটা কথা প্রচলিতঃ “হাজার টাকার বাগান খায় পাঁচ সিকার ছাগলে”…

দিনের পর পর কিছু ছাগল এসে সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল ভাঙচুর করে, তাদের দেখে আমার সর্বদা এ বাক্যটিই মাথায় আসে। এ পর্যন্ত ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি এভাবে হয়েছে (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, মঙ্গলবার, ২৩ মে,২০১৭)।

Posted by আতিকুজ্জামান ফিলিপ on Friday, 26 May 2017

চিকিৎসায় অসন্তুষ্টি থাকতে পারে। তার জন্য আইনগত ব্যবস্থা থাকার পরও যারা এসব ভাংচুর করে, ভিডিও ফুটেজ দেখে এদের ধরে আইনে সোপর্দ করা উচিত। কাউন্টার অ্যাটাকে যেতে হবে; বাঙালি শক্তের ভক্ত, নরমের যম। মনে রাখতে হবে- “ভ্রষ্ট বাঙালিকে ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ উপায় তার গালে শক্ত করে একটি চড় কষিয়ে দেয়া…..”

মহাজ্ঞানী সাংবাদিকঃ

রোগী মারা গেল, কিছু মূর্খ হাসপাতাল ভাংচুর করল, আরেক মূর্খের দল পত্রিকায় লিখলো, ‘ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু…’

যে প্রশ্নটা করতে চাচ্ছি, তা হল- রোগীর সেই ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে ঐ মহাজ্ঞানী সাংবাদিকরা কোথায় ছিলেন? আমরা চিকিৎসকরা না হয় ভুল করি। যারা ভুল চিকিৎসার খবর ছাপালেন, তারা যদি আমাদের একটু শুধরে দিতেন তবে কৃতার্থ হতাম, একটি প্রাণও হয়তো বেঁচে যেতো।

আমি জানি অনেক সাংবাদিক যথেষ্ট রেসপন্সিবল। কিন্তু গুটিকয় যে সাংবাদিক দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে “ভুল চিকিৎসা”র নিয়মিত গীত গান, তারা কি একবারও চিন্তা করেন যে তারা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কি ক্ষতিটা করছেন?

মার্ক টোয়েন বলেছিলেন— “If you don’t read the newspaper, you’re uninformed. If you read the newspaper, you’re misinformed…”

মার্ক টোয়েন খামখেয়ালী টাইপ লোক ছিলেন। যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে কি আমি এখন ধরেই নিব যে মার্ক টোয়েন যথার্থ কথাই বলেছিলেন?

মূর্খশিরোমণি!

টকশো আমি সাধারণত দেখি না। কেন দেখি না, সে প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদের উক্তিটি দেইঃ “বাঙলাদেশের প্রধান মূর্খদের চেনার সহজ উপায় টেলিভিশনে কোনো আলোচনা অনুষ্ঠান দেখা। ওই মুখমন্ডলিতে উপস্থাপকটি হচ্ছেন মূর্খশিরোমণি….”

আমি এখন বুঝি হুমায়ুন আজাদ কেনো একথা বলেছিলেন। উপস্থাপিকা বারবার লাইভে সংযুক্ত অধ্যাপক ডাঃ আবদুল্লাহ স্যারকে “ডাঃ আবদুল্লাহ” নামেই ডেকে গেলো। কিভাবে একজন মানী লোককে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়, তা কি উপস্থাপিকার অজানা? মানী লোককে সম্মান দিতে আমাদের এত অনীহা কেনো? মানুষকে অভদ্রতার শিক্ষা দেয়াই কি এখন চ্যানেলগুলোর মূল কাজ?

নাম ধরে ডাকাই এই চ্যানেলগুলোর প্রোটোকল- এ ধরনের ভ্রান্ত যুক্তি দয়া করে দেবেন না। যদি তাই দেন, তবে চ্যানেলগুলোর প্রোটোকল ঠিক করুন। গুণী লোকের কদর দিতেই হবে, সে যেই হোন না কেনো…

কঠোর আইনঃ

টাইমস অফ ইন্ডিয়া পত্রিকায় একবার একটি খবর চোখে পড়ল–“In Gujarat, 3 yr jail for slapping a doc”

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে চিকিৎসকদের উপর হাত তোলার সাজা ছিল ৭ বছরের জেল। যদি আমার ভুল না হয়, তবে ২০১৪ সালে সাজা দ্বিগুণ করা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথাটি আমার এখনও মনে আছে, “If you think to assault a nurse, doctor or ambulance officer, we’ll give you upto 14 years to think again.”

বছরের পর বছর আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত চিকিৎসক প্রহৃত হয়। শুধুমাত্র গত ছয় মাসেই অর্ধশতাধিক চিকিৎসক ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ২৩ মে, ২০১৭)। গুজরাটের মত এরকম একটি শাস্তিও কি আমাদের দেশে দেয়া হয়েছে? কুইন্সল্যান্ডের কাছাকাছি কোনো আইনও কি আমাদের নীতিনির্ধারকরা তৈরি করতে পেরেছেন? কেন পারেন নি? সমস্যাটা কোথায়?

নীতিনির্ধারকদের অনুরোধ করি, এবার একটি কঠোর আইন তৈরির উদ্যোগ নিন। এমনভাবে আইন করুন যাতে চিকিৎসকদের উপর যেসব বর্বররা আক্রমণ করে তারা যাতে জামিনটাও না পায়।

ইমার্জেন্সী রেসপন্স টিমঃ

চিকিৎসা সেবায় কেউ নিজেকে প্রতারিত মনে করলে BMDC তার সমাধান দেয়। ভালো কথা। তবে একটা ব্যাপার জানার ছিলো- BMDC এর রেজিস্টার্ড ডাক্তাররা যখন প্রহৃত হন বা বিপদে পড়েন, তখন তাদের সাহায্যার্থে এই প্রতিষ্ঠান কোনো চিকিৎসককে কখনও কি আইনী সহায়তা দিয়েছে? নাকি BMDC এর কাজ খালি সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া?

আমি যেটা বুঝি সেটা হলো- চিকিৎসকদের প্রয়োজনে একটি “ইমার্জেন্সী আইনী রেসপন্স টিম” এখন সময়ের দাবী। সারাজীবন বই খাতায় মুখ গুঁজে সময় পার করা এই লোকগুলো আইনী জটিলতা বোঝেন কম। হাইপোথেটিক্যাল এই ব্যাপারটাকে তাই এখন বাস্তবে রূপ দিতে হবে।

একটি নির্মোহ পর্যবেক্ষণঃ

একটা অবজারভেশন না বলে পারছি না। জুনিয়র চিকিৎসকরা অহরহ মার খান। সিনিয়র চিকিৎসকদের কখনও খুব একটা উচ্চবাচ্য করতে দেখিনি। কিন্তু আমাদের সিনিয়ররা, শিক্ষকরা যখনই বিপদে পড়েছেন, এই জুনিয়ররাই সবসময় সরব হয়েছেন। জুনিয়র চিকিৎসকদের এই ভালোবাসার মূল্যায়ন কিন্তু সবাইকে করতে হবে।

মোম ও সুতোঃ

সাধারণ জনগণদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।

মোমবাতির ভিতর সুতোটা একদিন মোমকে প্রশ্ন করলো, “আমি পুড়ে যাচ্ছি, কিন্তু তাতে তুমি গলে যাচ্ছো কেন?”
মোম হেসে উত্তর দিল, “যাকে অন্তরের মাঝে রাখলাম, তাকে একা কিভাবে পুড়ে যেতে দেই বলো?”

আপনারা যখন অসুস্থ হন, মোমের সলতের ন্যায় পুড়তে থাকেন, আমরাও কিন্তু তখন ব্যথিত হই, আমাদের অন্তরটিও তখন মোমের ন্যায় গলতে থাকে। এটি আপনাদের বুঝতে হবে। আমাদের বাহ্যিক কাঠিন্য দেখেন, অনুরোধ করব অন্তরটাও দেখুন।

যে কঠিন কঠিন কথাগুলো বলেছি সেগুলো আপনাদের (সাধারণ জনগণদের) জন্য নয়। যারা ভাংচুর করে, চিকিৎসক পিটিয়ে সাধারণ জনগণের চিকিৎসায় বাধার সৃষ্টি করে, এই কাঠিন্য তাদের জন্য।

পরিশেষঃ

বেলাশেষের গ্লানির কথা বলে লেখার ইতি টানবো।

ছবিতে দেখলাম অধ্যাপক ডাঃ এবিএম আবদুল্লাহ স্যারের মত লোক আদালতে রুমের বাইরে বেঞ্চিতে চিন্তিত মনে বসে রয়েছেন। বেলাশেষে এদেশের মানুষকে কি দিলেন আর তার বিনিময়ে কি পেলেন- ব্যথিত চিত্তে হয়তো সেই হিসেব কষছেন। একুশে পদকপ্রাপ্ত এই লোকটিকে পুলিশের খাতায় পলাতক হিসেবেও দেখানো হলো। কি বিচিত্র এই দেশের মানুষ!

আরো কিছু কথা বলতে চেয়েছিলাম, বাদ দেই। কিছু সন্ত্রাসীকে ঠান্ডা করতে যে দেশে আবদুল্লাহ স্যারের মত লোককে অপরাধী বানানো হয়, সেই দেশে বেশি কথা নিরর্থক। দস্তয়োভস্কির একটা কোটেশন জানি, সেটা বলে বিদায় নেইঃ

“Pain and sufferings are always inevitable for a large intelligence and a deep heart. The really great men must, I think, have great sadness on earth.”

ভিডিও কৃতজ্ঞতাঃ আতিকুজ্জামান ফিলিপ।

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, বরং একটি ভয়াবহ অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রবল গণসচেতনতা গড়ে তোলাই একমাত্র উদ্দেশ্য। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top