নাগরিক কথা

শুধু ধর্ষণই কি অপরাধ? প্রকাশ্যে ধর্ষণের হুমকি কি অপরাধ নয়??

ধর্ষণ হুমকি নিয়ন আলোয় neon aloy

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখিকা তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখিকার মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, বরং একটি ভয়াবহ অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রবল গণসচেতনতা গড়ে তোলাই একমাত্র উদ্দেশ্য। সঙ্গত কারণেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নাম গোপনীয় রাখা হলো।]

এইচএসসি পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। প্র‍্যাকটিকাল চলছে। আমি ভিকারুননিসা থেকে পরীক্ষা দিচ্ছি, আমার সিট পড়েছে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে। গত পরশু আমাদের কয়েকটি গ্রুপের প্র‍্যাকটিকাল ছিলো। আমাদের সাথে একই প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিচ্ছে ‘উইলস লিটল ফ্লাওয়ার’ কলেজের স্টুডেন্টরা। তো গতপরশু পরীক্ষায় অজানা কারণে আমাদের একটি গ্রুপকে উইলসের ছেলেদের সাথে একই রুমে পরীক্ষা দিতে হয় (যদিও এমনটি হবার কথা নয়)। আমাদের এক সহপাঠী পরীক্ষা কক্ষে কিছু খারাপ অভিজ্ঞতার স্বীকার হওয়ায় সেগুলো লিখে একটি স্ট্যাটাস দেয় ফেসবুকে। সবার জন্য সেই স্ট্যাটাসের স্ক্রিনশট আমি দিয়ে দিচ্ছি। পড়লেই দেখতে পাবেন, তার স্ট্যাটাসের শুরুতেই সে খুব পরিষ্কারভাবে লিখে দিয়েছে, স্ট্যাটাসটি ইন্সটিটিউটটির সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, শুধুমাত্র স্পেসিফিক ‘গ্রুপ-৫‘ এর জন্য। খুব ক্লিয়ারলি লেখা।

কোনো অজ্ঞাত কারণে সাধারণ কথাটি বুঝতে আমাদের ‘লিটল ফ্লাওয়ার’ বন্ধুদের ভুল হয়েছে। তো যেমনটি হয়, দল বেঁধে এসে তারা স্ট্যাটাসে আমাদের সহপাঠীকে আক্রমণ করা শুরু করে। যাক, তাও ঠিক আছে, আক্রমণ করতেই পারে। তো সেই আক্রমণাত্মক কমেন্টস পড়তে পড়তে একটা জায়গায় আপনাদের সকলের চোখ আটকে যাওয়া উচিৎ উইলসের একজন ভাইয়ার দু’টি কমেন্টে। প্রথমটিতে তিনি লিখেছেন, “Ajke dekhsi To… Pola deikha tomra kon kon jaiga ucha koira hathso….” এবং আরেকটিতে লিখেছেন, “Amra kharap polapan na deikha baicha geso…. Naile Chemistry Lab e Biology practical hoiya jaito…”

সেই পোস্ট এবং তার নিচের কমেন্টগুলোর স্ক্রিনশটঃ

ধর্ষণ হুমকি নিয়ন আলোয় neon aloy

 

ধর্ষণ হুমকি নিয়ন আলোয় neon aloy

ধর্ষণ হুমকি নিয়ন আলোয় neon aloy

ধর্ষণ হুমকি নিয়ন আলোয় neon aloy

ধর্ষণ হুমকি নিয়ন আলোয় neon aloy

বুঝতে পারছেন কী লিখেছে? Joke মনে হচ্ছে? একই বছরে পরীক্ষা দেয়া ব্যাচমেট দু’জন ছেলেমেয়ে। ছেলেটি মেয়েটিকে বলছে, তারা খারাপ হলে কেমিস্ট্রি ল্যাব বায়োলজি ল্যাব হয়ে যেত। ইঙ্গিতটা খুবই পরিষ্কার।
“তোমাদের ধর্ষণ করতাম!!!”

আমি জানি না, এই কথাগুলার ভয়াবহতা কতটুকু বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু প্রত্যেকটা শব্দ মারাত্মক ভয়ংকর। কত কঠিন পরিস্থিতি হলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ওপেনলি একই ব্যাচের ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একজন ‘পুরুষ’ আরেক প্রতিষ্ঠানের একজন ‘নারী’কে ধর্ষণের হুমকি দিতে পারে! নোংরা ইঙ্গিত দিয়ে বলতে পারে যে কেমিস্ট্রি ল্যাবকে বায়োলজি ল্যাব বানিয়ে ছাড়বে!

ধর্ষণের খবর দেখলে আমাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। আমরা পাতার পর পাতা লিখি, হা-হুতাশ করি। “আমাদের সন্তানেরা কোথায় নিরাপদ?”, বাবা মায়েরা হায়-হায় করেন। কিন্তু যেখান থেকে এসব শুরু হয়, সেটা নিয়ে কিন্তু আমরা মাথা ঘামাই না। প্রতিষ্ঠানের কথা একপাশে রাখি। এখানে কথা হচ্ছে দু’জন ছেলেমেয়ে, দুজন স্বতন্ত্র মানুষকে নিয়ে। একটা ছেলের সাহস কিভাবে হয় তার সমবয়সী একটা মেয়েকে ধর্ষণের ভয় দেখাতে এভাবে পাবলিকলি? এই সাহস সে কোথায় পাচ্ছে?

খেয়াল করলেই দেখা যায় শুধু ছেলেরাই বলে “ল্যাংটা কইরা ছাইড়া দিমু”, “রাস্তার মাঝখানে কাপড় খুইলা নাচামু”, “রাস্তায় ফালায়া ***”, “তোর মায়রে **”। আপনি জীবনে ঠিক কয়জন মেয়েকে এভাবে একজন পুরুষের সম্ভ্রমহানির হুমকি দিতে দেখেছেন? কবে থেকে একটা যৌনাঙ্গ এত শক্তিশালী আর একটা যৌনাঙ্গ এত দুর্বল হয়ে গেলো? কবে থেকে সামান্য এক পুরুষাঙ্গ ঈশ্বরের চেয়েও ক্ষমতাধর হয়ে গেলো? কবে থেকে পুরুষেরা ভাবতে শুরু করলো যৌনাঙ্গ ব্যবহারের হুমকি দিয়ে দিয়ে তারা পুরো পৃথিবী জয় করে ফেলবে?

সেই সাথে কমেন্ট করা মেয়েগুলোকেও দেখবেন। প্রত্যেকে সমর্থন যোগাচ্ছে সহপাঠীদের। কারও মনে হচ্ছে না কথাগুলো নোংরা, এসব কথা কোনো মেয়েকে বলা উচিৎ নয়। কারও মনে হচ্ছে না, আমিও তো মেয়ে। তাহলে কিভাবে সমর্থন যোগাই? মানুষের সামনে প্রাতিষ্ঠানিক গৌরব নিতান্তই গৌণ। কিন্তু এদের প্রত্যেকের কি শুধু “উইলসের ছাত্রী” পরিচয়টা বড়, মানুষ পরিচয়টা নয়?

ছোটবেলায় ধর্ম বইয়ে ‘আইয়্যামে জাহেলিয়া’-এর রগরগে বর্ণনা ছিলো। কিভাবে সে সময় নারীদের নিরাপত্তা ছিলো না, তাদের সম্মান করা হতো না… … আমি আসলে জানতে চাই, এখনের সময়টা আইয়্যামে জাহেলিয়ার চেয়ে ঠিক কতটুকু উন্নত? দুইটা প্রতিষ্ঠানের সমবয়সী ছেলেমেয়েরা একসাথে পরীক্ষা দিচ্ছি। সম্পর্ক হবে গঠনমূলক। সমালোচনায় থাকবে সহনশীলতা, যুক্তি। সেখানে অযাচিত অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছেলেরা মেয়েদের ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে, আর মেয়েরা মেয়েদের বলছে ‘অ্যাটেনশন সিকার’!

এটুকুই কি যথেষ্ঠ নয় বুঝাতে যে আমরা কত ভয়াবহ একটা সময় পার করছি? এমন একটা সমাজে বাস করছি, যেখানে একটি ছেলে নিজের পুরুষাঙ্গকে এতটাই শক্তিশালী আর একজন নারীর যোনিকে এতটাই দুর্বল মনে করে যে, অনায়াসে বিন্দুমাত্র জড়তা ছাড়াই সবার সামনে ধর্ষণের হুমকি দেয়!

ছেলে, ঐ দুবলা পাতলা যোনি মানুষ জন্ম দেয়!
তুমিও সেভাবেই জন্ম নিয়েছো। তার শক্তি সম্পর্কে ধারণা থাকলে তুমি চুপসে যেতে। আফসোস, তোমার মা তোমাকে সেই ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
দীর্ঘশ্বাস!

লিখেছেনঃ কাশফিয়া হাসান মৌরি, এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।

[আপনার আশেপাশে ঘটে চলা যেকোন সামাজিক অন্যায়, অপরাধ, অসঙ্গতির কথা অকপটে আমাদের লিখে জানান neonaloymag@gmail.com এই ইমেইল এড্রেসে।]

Most Popular

To Top