ফ্লাডলাইট

ছয়! করব এবার জয়!

বাংলাদেশ র‍্যাঙ্কিং ছয় নিয়ন আলোয় neon aloy

এই ক্লনটার্ফেই আগেরবারের মোকাবেলায় উইকেট ছুঁড়ে আসার পুরোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩০-৪০টা রান কম জমা হয়েছিল স্কোরবোর্ডে, যার মাশুল গুনতে হয়েছিল ৬ উইকেটে হেরে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আগের ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় কার্যতঃ সেদিনই শেষ হয়ে গিয়েছিল ত্রিদেশীয় সিরিজ জয়ের আশা। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের সাথে ২য় মোকাবেলাতে জিতে যাওয়ায় নিভু নিভু হয়ে জ্বলছিল একটা প্রদীপ। যে প্রদীপের আলোয় র‍্যাংকিং-এ ছয়ে ওঠার সরু রাস্তাটার অবয়ব একটু একটু করে বোঝা যাচ্ছিল।

সেই রাস্তায় হাঁটতে জরুরি ছিল গতকালের বিজয়টি। টসে জিতে মাশরাফি বিন মর্তুজা কিউইদের ব্যাটিং-এ পাঠালেন এবং প্রথম ওভার করতে আসলেন। একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের জয়ের ম্যাচে গুরু মাশরাফির প্রথম ওভারে উইকেট পাওয়াটা ছিল একপ্রকার সরকারি সিলমোহর। দিনে দিনে সে সিলমোহরের ওপরে নির্ভরতা কমে আসলেও মাঝেমধ্যে আজো সেই সিলমোহরের ছাপ দিয়েই চলেছেন এই ভদ্রলোক। আজও দিচ্ছিলেন, ১ম ওভারের ৩য় বলে টম ল্যাথাম টাইমিং-এ গড়বড় করলেন, বল উড়ে গিয়ে স্কয়ার লেগের দিকে যাচ্ছিল, যেখানে দু’হাত বাড়িয়ে অপেক্ষায় ছিলেন প্রায় ৮ মাস পরে দলে সুযোগ পাওয়া নাসির হোসেন, টম ল্যাথামও হাঁটা শুরু করে দিয়েছিলেন ড্রেসিংরুমের পথে… কিন্তু বিধিমশায় বাঁহাতি ব্রায়ান লারা হয়ে উঠলেন, নাসির হোসেন দু’হাত বাড়িয়েও হাঁচড়ে-পাঁচড়ে ধরতে পারলেন না ক্যাচটা।

মুস্তাফিজ যদিও নিজের ২য় ওভারেই লুক রঙ্কিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তবে ক্যাচ মিসের মাশুলটা দিতে হল মোটা অঙ্কে। ল্যাথাম জুটি করলেন নিল ব্রুমের সাথে। ১৩৩ রানের জুটি গলায় শুধু কাঁটা নয়, মৃত প্রবালের ধারালো দাঁতের মত বিঁধছিল। ত্রাণকর্তা রূপে যার আবির্ভাব, তাকে এই দেড়-দু’ঘন্টা আগেও ধুয়ে ফেলা হচ্ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। হ্যাঁ, তিনি নাসির হোসেন। ল্যাথাম আর নিল ব্রুম, দু’জনকে পরপর দুই ওভারের প্রথম বলেই তুলে নিলেন তিনি। নতুন দুই ব্যাটসম্যান রস টেলর ও কোরি এন্ডারসনকে শুরু করতে হয়েছিল নতুন করে। শুরু করেছিলেনও, তবে হঠাৎ কোরি এন্ডারসন কি বুঝে যেন সাকিব আল হাসানকে উড়িয়ে মারতে যান, আর স্কয়ার লেগ বাউন্ডারিতে সন্ন্যাসীর মত ঠান্ডা মাথায় বলটি তালুবন্দী করেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। ব্যস! সেই থেকে শুরু। ব্রুম-ল্যাথামের জুটি যেখানে কিউইদের ৩২০ বা এর অধিক স্কোরকে সামান্য একটা উঁইয়ের ঢিবি ডিঙ্গানোর মত কাজ হিসাবে দেখাচ্ছিল, এন্ডারসনের উইকেটের পরে সেই উঁই ঢিবি হয়ে গেল হিমালয়ের এভারেস্ট শৃঙ্গ।

এরপরের ঘটনা প্রবাহ খুব সংক্ষিপ্ত। কিংবা বলা যায়, টাইগার পেস-ত্রয়ীর মুহুর্মুহু তোপাঘাতে তা সংক্ষিপ্ত বানানো হল। কিউই ইনিংসের শেষ অঙ্কে মাশরাফি-মুস্তাফিজের স্থিতধী মস্তিষ্ক, আর ওদিকে রুবেল হোসেনের লাগামবিহীন, অথচ নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনই ছিল মূল কুশীলব। মাঝখানে অবশ্য সাকিব আল হাসানের হঠাৎ সোজা হয়ে আসা দ্রুতগতির ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে মিশেল স্যান্টনারের বিস্ফোরিত চোখের ক্যামিও পারফর্ম্যান্সটাও ছিল প্রশংসা করবার মত। সব মিলে শেষটা হবার কথা ছিল স্বপ্নের মত, তবে একপাশ ধরে রস টেলর তার প্রিয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুরোনো অভ্যাসমত করে ফেললেন ফিফটি, আর দলকে নিয়ে গেলেন মোটামুটি সম্মানজনক এক অবস্থানে।

তামিম ইকবাল কাল কি ভেবে, বা কি খেয়ে নেমেছিলেন জানা নেই,তবে প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে এক লাফে যেভাবে মার্ক গ্রেটব্যাচ, ফিলো ওয়ালেস ও বীরেন্দ্র শেবাগের পাশে বসে গেলেন, সাথে বলটাকেও হারিয়ে ফেললেন, তাতে বোঝা গেল যাই খেয়ে থাকুন, সেটা বেশ পুষ্টিকর ছিল বটে! আগের দুই ম্যাচের ফিফটিগুলোকে ৩য় ম্যাচ পর্যন্ত টানতে পারলেন না সৌম্য। কোন রান না করেই আউট হলেন, বিশ্রিভাবেই হলেন। কারণ আগের ম্যাচের রিভিউতেই বলেছিলাম, হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশনের ব্যাটসম্যানরা সাধারণত বিশ্রিভাবেই আউট হন।

২৭১ এর টার্গেট খুব বড় না হলেও খুব ছোটও নয়। পার্টনারশিপ না হলে এই নিরীহ টিলা দুরূহ কেওক্রাডং হতে খুব বেশি সময় নেবার কথা নয়। তাই নিল ব্রুম ও টম ল্যাথাম যা করেছিলেন প্রথম ইনিংসে, তামিম ইকবাল ও সাব্বির রহমান ঠিক তাই করলেন। তামিম-সাব্বির জুটি থামল ব্রুম-ল্যাথাম জুটির তিন রান বেশি করবার পরে,তামিমের আউটের মধ্য দিয়ে।

মঞ্চ নাটক, টিভি নাটক বা সিনেমা, কিংবা উপন্যাস- একটা ভালো গল্পে ক্লাইম্যাক্স থাকবেই। এ ম্যাচটি নাটক-সিনেমা-উপন্যাসের তুলনায় কম নয়, বরং নাটকীয়তার দিক থেকে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসার দাবী রাখে। তাই এ ম্যাচেও ক্লাইম্যাক্স আসল, সাব্বির রানআউট হলেন এমনই এক কায়দায়, সামাজিক মাধ্যমে যে  কায়দাটির নাম ‘পাকিস্তানী রানআউট’, অর্থাৎ একই প্রান্তের দিকে দু’জন ব্যাটসম্যানের প্রান্তরেখা ছোঁবার প্রাণান্ত চেষ্টা এবং একজন ব্যাটসম্যানের মাঠেরই প্রান্তের বাইরে চলে যাওয়া; তথা আউট হওয়া।

স্কোর ১৬০ না হতেই মোসাদ্দেকও নেই। জাতি তখন তাকিয়ে সেই দুজনের দিকে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জুঁটি গড়ে বার বার আমাদের পিঠ ও অন্যান্য অঙ্গ বাঁচিয়েছেন যে দু’জন, সেই সাকিব-মুশফিক জুটির দিকে। ৩৯ রান পর্যন্ত গেলেন দুজন, এরপরেই হামিশ বেনেটের পাতা ফাঁদে সাকিব আল হাসানের অসহায় পতন। নামলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। তখনও কেউ ভাবেনি ক্লাইম্যাক্স আদৌ শেষ হয়েছে কিনা। কিংবা এই ক্লাইম্যাক্সটি ঠিক কোন ধরণের ফলাফলের দিকে নিচ্ছে ম্যাচটিকে, তাও বোঝা যায়নি। বাকি তখনো ৭২ রান।

মুশফিকুর রহিম স্বভাবজাত বরফ শীতল মাথায় খেলছিলেন, সঙ্গ দিচ্ছিলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। শেষ দিকে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ রানের গতি হঠাৎ বাড়িয়ে দিলেন। টাইগাররা দ্রুত এগোচ্ছে জয়ের দিকে, তখন ভক্তকুলে নতুন চিন্তা, নতুন আশঙ্কা… এবারও কি তীরে এসে তরী ডুববে, ভারতের সাথে সেই ম্যাচটির মত?

শেষমেষ তা হয়নি, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ নিজের হাতে জয় নিশ্চিত করলেন। কেন তিনি দলে এত গুরুত্বপূর্ণ,কেন তাকে বাদ দেবার বিপক্ষে গোঁ ধরেছিলেন খোদ মাশরাফি বিন মোর্তুজা- এ সব প্রশ্নের জবাব দিলেন মিড উইকেট দিয়ে হাঁকানো ঐ শটে।

আর এখানেই নাটক-সিনেমার সাথে ক্রিকেট ম্যাচের তফাৎ। যেখানে ভিলেন হামিশ বেনেটের অমন বেয়াদবির জবাব সংলাপে নয়, ব্যাট হাতে তাও আবার নিরীহ একটা চামড়া দিয়ে মুড়ে সেলাই করা বলকে পিটিয়েও দিব্যি দেয়া যায়।

অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জয়, সেই নিভু নিভু আলোতেই ছয় নম্বরে ওঠার রাস্তা পাড়ি দেয়া হয়ে গেল। এবার এই আলোতেই ঘুটঘুটে আঁধারের পথ পাড়ি দেবার পালা। কাজটা কঠিন, তবে কলার ওল্টানো ভদ্রলোক আর তেঁতে থাকা তার সতীর্থরা অনেকটাই প্রস্তুত।

হে ওভাল, আমরা আসছি।
হে লন্ডন, তুমি কি প্রস্তুত বাঘের গর্জন শুনতে?

[আপনি কি খেলাধুলার পোকা? স্কুল-কলেজ-অফিসে আপনার ফোনে অন থাকে ক্রিকইনফো অ্যাপ আর সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত খেলা দেখেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ, লা লিগা আর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের?
এই স্পোর্টস পান্ডিত্য নিয়ে চায়ের দোকানে বন্ধুদের সাথে আর কত ঝগড়া করবেন? তারচেয়ে বরং আপনার ম্যাচ প্রিভিউ/ রিভিউ কিংবা প্রিয় খেলোয়াড়কে নিয়ে আবেগঘন স্মৃতি আমাদের পাঠিয়ে দিন neonaloymag@gmail.com এই ইমেইল অ্যাড্রেসে!]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top