নাগরিক কথা

দেশ স্বাধীন, কিন্তু আমি স্বাধীন তো?

সময় সন্ধ্যা ৬.৩০। অফিস থেকে ফিরবো। বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। বৃষ্টি পড়ছে। একহাতে ভ্যানিটি ব্যাগ- লাঞ্চব্যাগ,অন্যহাতে ছাতা। একেকটা বাস আসে। বাসের দরজা দেখা যায়না। হয় ভর্তি, নয়তো একসাথে এতজন ঠেলাঠলি করে উঠে দরজা পর্যন্ত যেতেই পারিনা। অফিসফেরত নারী-পুরুষ,ছাত্র-ছাত্রী,অনেকেই অপেক্ষা করছে। ৩০/৪০ মিনিটের উপর দাঁড়িয়ে আছি। সিএনজিও পাচ্ছিনা। মোটামুটি ভিড় কম একটা বাস আসতেই উঠার জন্য এগিয়ে গেলাম। ততক্ষণে বৃষ্টি বেশ তেড়ে এসেছে। ছাতা ধরা হাতেই কোনোমতে বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে পড়েছি। সবারই প্রায় একই অবস্থা। এর মধ্যে আবিষ্কার করলাম,কেউ একজন পেছন থেকে দুইহাতে কোমরে ধরেছে। এত্ত মানুষ,কোনোরকম হ্যান্ডেল ধরা,তুমুল বৃষ্টি এর মাঝে একটা মেয়েকে টাচ করার কথা কোনো মানুষের মাথায় কিভাবে আসতে পারে বুঝতে এবং ঘটনার আকস্মিকতায় কয়েক মূহুর্ত থমকে ছিলাম। পেছন ফিরে দেখার মত অবস্থাও ছিলোনা। একটু ভিড় ঠেলে উপরে উঠে চিৎকার করে বললাম- ‘কোন বেজন্মা কোমরে হাত দিয়েছিলি বল, সাহস থাকলে এখন সামনে এসে দাঁড়া!’

যে-ই ছিলো কুলাঙ্গার, ভিড়ের মধ্যে মিশে একদম পেছনে চলে গিয়েছিলো। ওই ঘটনায় যতটা না মানসিকভাবে আহত হয়েছিলাম তারচেয়েও আহত হলাম, যখন দেখলাম বাসের অনেকেই যথেষ্ট বিরক্ত। কয়েকজন বললো, আরে আপা বাদ দেন। আরেক মুরুব্বি বললেন, ভিড়ের মধ্যে উঠছেন কেন বাসে? এবং সবচাইতে অবাক করা বিষয় রাগে অপমানে যখন চোখে প্রায় পানি এসে গেছে এমন সময় মায়ের বয়সী এক মহিলা খিঁচিয়ে উঠলেন – ‘এই ছাতা সরান, দূরে গিয়ে দাঁড়ান। আমার কাপড় ভিজে যাচ্ছে!’

সময় সন্ধ্যা ৭.৩০। বসুন্ধরা সিটি থেকে বাসায় ফিরছি সিএনজি করে। হাতিরঝিল দিয়ে যাবো। হঠাৎ সিএনজি’র ড্রাইভার কাকে যেনো ফোন দিলেন- ‘বসুন্ধরার সামনে, বাড্ডা যামু। হ হ হাতিরঝিল দিয়া আইতাছি’। কার সাথে এই কথোপকথন জানার সাহসে কুলালো না। একবার মনে হলো ছিনতাই করবে। হাতিরঝিলের কোনো অন্ধকার গলির মুখে দাঁড় করিয়ে টাকাপয়সা আর মোবাইল, অর্নামেন্টস নিয়ে নিবে। আবার মনে হলো, যদি তারচেয়েও খারাপ কিছু করে? বলা বাহুল্য- কিছুই হলোনা। যদিও আমি সারা রাস্তা ইয়া নফসি- ইয়া নফসি পড়তে পড়তে জান আর ইজ্জত হাতে নিয়ে বাসায় ফিরলাম। প্রত্যেক মুহুর্তে মনে হচ্ছিলো এই বুঝি সিএনজি থামাবে। বাসার রাস্তার মুখে যখন নামলাম, মনে হলো ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো।

সময় রাত ৯.৪৫। রামপুরা থেকে বাড্ডা আসছি। বোনকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। সিরিয়ালে ছিলাম। তাই দেরি হয়ে গেছে, বাস পেয়ে উঠে পড়েছি। ঢাকা যথেষ্ট ব্যস্ত শহর, রাস্তাঘাট ভর্তি গাড়ি- প্রচুর মানুষ। তবে বন্ধের দিন আবার, কিছুটা রাতও হয়ে পড়েছে, তাই হয়তো লোক কম। কিন্তু হঠাৎই খেয়াল করলাম বাসে মানুষ খুব কম স্বাভাবিকের তুলনায়, সব মিলিয়ে ৯/১০ জন হবে! তারমাঝে বাসের ড্রাইভার-হেল্পার দুজন! বিটিভির সামনে আরো দু’জন নেমে গেলো। মনে হলো ভয়ের একটা ঠান্ডা সাপ নেমে গেলো পিঠ বেয়ে। অনেক চেষ্টা করেও মন থেকে সরাতে পারছিলাম না। মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিলো – “চলন্ত বাসে ধর্ষণ!” কুল কুল করে ঘামছিলাম। যদিও বাসের সবাই ছিলো স্বাভাবিক। আমি নিরাপদেই গন্তব্যে পৌঁছালাম। যদিও মনের ভেতর ততক্ষণে হাজারবার মরেছি।

এরকম আরো অসংখ্য নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা রোজ আমাদের চলমান জীবনে ঘটছে। শেষ দু’টি ঘটনা আমার ভীতু এবং অতি কল্পনাপ্রবণ মনের কল্পনার ফল বলাই যায়। কিন্তু রোজকার এইসব বাস্তবতা, ঘটে যাওয়া অপরাধ-হয়রানি-ধর্ষণ আমাদের সবাইকেই কমবেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগায়। এমন কোনো নারী চলমান প্রেক্ষাপটে খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা বাংলাদেশে, আমি যথেষ্ট সন্দিহান যিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করেন। অবাক লাগে আমি সাতাশ বছরের একজন পূর্ণবয়স্ক কর্মজীবী নারী যার রাস্তা একটু অন্ধকার হলে, রিকশাচালককেও ভয় হয়- যদি কিছু করে! লিফটে একা অবস্থায় অপরিচিত একজন পুরুষ উঠলেও অস্বস্তি হয়। কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাসে উঠার সময় ঠিকমত পা দেয়ার আগে কাপড় ঠিক আছে কিনা খেয়াল করতে হয়। কেউ টাচ করছে কিনা সতর্ক হতে হয়। এমন কি সেটা বাসের হেলপারও। এই দেশে প্রাণ বাঁচানোরও আগে ওড়না সামলানো ফরজ! কারণ দূর্ঘটনা যদি কিছু ঘটে আর যাই হোক কিছু দোষ ওড়নার তো হবেই!

আজকাল সত্যি তাই মনে হয়, আমার দেশ তো স্বাধীন, দেশের মানুষ স্বাধীন। কিন্তু জনসংখ্যার অর্ধেক যে নারী, তারা- আমরা আসলে কতটা স্বাধীন; ঘরে কিংবা বাইরে? আমার এই লেখায় পরিসংখ্যান নেই। থাকলে হয়তো লেখাটি সমৃদ্ধ হতো। কবে কোথায় কতজন, বছরে, মাসে, দিনে ধর্ষিত হলো, নির্যাতিত হলো, খুন হলো। কিন্তু এই মানসিক অসহায়ত্বের পরিসংখ্যান প্রয়োজন ছিলো। স্মোকিং এর সাথে প্যাসিভ স্মোকিং এর মত ধর্ষিত, নির্যাতিত, বা হয়রানি হওয়ার ভয়ে কতশত, হাজার বা লাখো নারী মাসে দিনে বা ঘন্টায় একটা অদ্ভুত অনিরাপদ জীবনযাপন করছেন!

একসময় আমার খুব ইচ্ছে করতো গভীর রাতে একা রাস্তায় হাঁটি, ছাদে উপুড় হয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। আজকাল কল্পনায়ও এসব আসে না। বরং কোনোমতে ঘর থেকে বের হয়ে মান-ইজ্জত সহ ঘরে ফিরতে পারাটাই অনেক বড় একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে এই লেখাটি কোনোভাবেই ভীত হয়ে বেঁচে থাকাকে সাপোর্ট করে নয়, অবশ্যই আমরা সচেতন হবোনিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক হবো। নিজের বা কারো সাথেই কোনো অন্যায় হলে রুখে দাঁড়াবো, প্রতিবাদ করবো। কিন্তু তারপরও একটা স্বাধীন দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত নয় যে একটা ৬/৭ বছরের বাচ্চা, একজন কিশোরী, তরুণী বা বৃদ্ধার অন্তত ঘর থেকে পা ফেলতে সামান্য হলেও ভয় হবে, রাস্তাটা একটু নির্জন বা অন্ধকার হলেই মনের ভয়ে অস্হির হতে হবে। জীবনের আগে কাপড় আগলাতে হবে।

নয়তো নিজেকে স্বাধীন আর কিভাবে বলি?

সাদিয়া রহমান যমুনা
আর্কিটেক্ট,ঢাকা।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top