নিসর্গ

থাইল্যান্ড… নয়নাভিরাম নিসর্গের কোলে কয়েকটি দিন

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

থাইল্যান্ড নামটা শুনলে প্রথমেই সবার মনের মধ্যে যে ছবিটি আঁকা হয়ে যায় তা হল প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনে পরিপূর্ণ, নিষিদ্ধ আনন্দের একটি দেশ। তাই স্বামী-কন্যা নিয়ে যখন সে দেশে যাবার প্ল্যান করলাম তখন মনের মধ্যে যে খুতখুত করছিল না, তা কিন্ত নয়। কিন্তু ইন্টারনেট ঘেঁটে এর নয়নাভিরাম দ্বীপ ও অসম্ভব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের পরিচয় পেয়ে মনের যাবতীয় সংকোচ অগ্রাহ্য করে ঠিক করলাম যা থাকে কপালে, ঘুরেই আসিনা! আমরা বরাবরই বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে এ্যাভয়েড করে নিজ আয়োজনেই ভ্রমণ করতে পছন্দ করি। এবারেও তার ব্যাতিক্রম ঘটল না। অতঃপর বিশেষ একটি এয়ারলাইন্সের অফারে টিকিট কেটে ফেলে শুরু হল আমাদের টুর প্ল্যান। প্রথমত, যেহেতু দেশটি ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য কতখানি উপযোগী হবে এ ব্যাপারে তেমন কোন ধারণা ছিলা না, তাই আমরা আমাদের টুরটি প্ল্যান করলাম এমনভাবে যাতে করে অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন কম হতে হয়। যাই হোক, প্ল্যানিং সম্পুর্ণ করে এক শুভ দিনে আমি, আমার হাজবেন্ড, সাড়ে পাঁচ বছরের কন্যা এবং আমার কাজিনের ফ্যামিলি চেপে বসলাম প্লেনে। আমাদের টুরটি ছিল সাত রাত, আটদিনের। আমরা প্ল্যান করেছিলাম দুই দিন ক্র্যাবি, এক দিন ফি ফি আইল্যান্ড, দুইদিন ফুকেট এবং দুই দিন ব্যাংকক ঘুরার ইচ্ছা নিয়ে। ব্যাংকক থেকেই সম্ভব হলে একদিন পাতায়া ঘুরে আসা যাবে। এবার আসি আমাদের ভ্রমণের ব্যাপারে।

ক্র্যাবি পর্বঃ
ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

ক্র্যাবি বিচ

সুবর্নভুমি এয়ারপোর্টে নেমেই ট্যাক্সি করে ডন মুয়াং এয়ারপোর্ট, এবং অতঃপর এয়ার এশিয়ার এয়ারক্র্যাফটে করে ক্র্যাবি। কবি সাহিত্যিক নই, কাজেই প্রথম মুগ্ধতার যথাযথ বর্ণনা করতে পারব না। তাই সে চেষ্টাও করছিনা। হোটেল বুকিং আগেই দেয়া ছিল অনলাইনে, তাই সমস্যা হল না। পরদিন ভোরে উঠে ফোর আইল্যান্ড টুরের টিকিট কেটে ফেললাম আর সেই সাথে এই প্রথম দিনের আলোয় থাইল্যান্ড সুন্দরীর প্রকৃত রুপের সাথে পরিচয় ঘটল আমাদের। দিগন্ত বিস্তৃত সুনীল সাগরের সাথে মেঘের মিতালি, আর তার মাঝে  শুরু হল আমাদের সাগর ভ্রমণ। যারা ক্র্যাবিতে যাবেন তারা অবশ্যই এই টুরটি নিতে ভুলবেন না।

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

কোহ পোদা আইল্যান্ড

মোট চারটি দ্বীপে গেলাম আমরা। প্রথমটি ফ্রানাং আইল্যান্ড , দ্বিতীয়টি চিকেন আইল্যান্ড, প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে দ্বীপটি দেখতে অনেকটা চিকেনের মত হওয়ায় এর নাম চিকেন আইল্যান্ড। এখানে আমরা বোট থেকে নামিনি, তবে স্কুবা ডাইভিং-এর ব্যবস্থা ছিল। তৃতীয় দ্বীপটি ছিল টাব আইল্যান্ড এবং চতুর্থটি কোহ পোদা। শেষের দুইটিতেই ঋত্বিক এর বিখ্যাত কাহোনা পেয়ার হ্যায় গানটি শুটিং হয়েছিল। এমন কি হালের বলিউড মুভি বাঘির একটি গানেও এই আইল্যান্ড চারটি দেখতে পাওয়া যায়। দ্বীপ চারটির বর্ণনা দিব? এমন ভাষা জানা থাকলে তো! টাব আইল্যান্ডে এক দ্বীপ থেকে সাগরের মাঝ দিয়ে আরেক দ্বীপে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা সত্যি-ই অসাধারন। বিকেলে ক্রাবি টাউন ভ্রমন। প্রত্যেকটি জিনিস অনেক এক্সপেন্সিভ, কাজেই এখানে শপিং করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা। পরদিন সকালে আরেকটি  আইল্যান্ড রেইলি বিচে গেলাম আমরা। ছোট্ট এই দ্বীপটির রুপ স্বল্প সময়ে পুরোপুরি আস্বাদন করে দুপুরের আগেই ক্রাবিতে ফেরা । অতঃপর লঞ্চে করে ফি ফির উদ্দেশ্যে যাত্রা। এখানেই ক্র্যাবি ভ্রমনের সমাপ্তি।

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

টাব আইল্যান্ড

এখানে ক্রাবি সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। স্থান টি থাইল্যান্ড এর বর্ডার এলাকায়, মালয়েশিয়ার লাংকাওইর খুব কাছে বলেই এলাকাটি মুসলিম অধ্যুষিত। তাই হালাল খাবার পেতে কোন সমস্যা নেই। হোটেল ভাড়াও খুব একটা বেশি না। বাংলাদেশি টাকায় তিন হাজারের মধ্যেই এখানে ভাল হোটেল পাওয়া যাবে। নাইট লাইফ জমজমাট, তবে লাগামছাড়া নয়। রাতের ক্র্যাবির রাস্তায় এলোমেলো ঘুরে বেড়ানো (কন্যা সাথে আছে, তাই নো নাইট ক্লাবে উঁকিঝুকি, রাস্তায় ঘোরা ছাড়া আর উপায় কি), ফ্রেস ফ্রূট জুস, রেস্তোরা থেকে ভেসে আসা হাই বিটের মিউজিক আর ফায়ার এক্রোবেটসের এক্সপেরিয়েন্স আপনাকে যে এক অন্য জগতে নিয়ে যাবে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

ফি ফি আইল্যান্ড ও ফুকেট পর্বঃ

ক্র্যাবিকে বিদায় জানিয়ে এবার গন্তব্য ফি ফি আইল্যান্ড। সুনীল সাগরের বুক চিরে তরতর করে এগিয়ে চলল আমাদের ফেরি। ফেরির ছাদ থেকে এই অপার্থিব দৃশ্য অবলোকন এই ভ্রমনের একটি বোনাস প্রাপ্তি। একে একে আগের দিনের ফোর আইল্যান্ড টুরের সেই চারটি দ্বীপকেই পাশ কাটিয়ে প্রায় দুই ঘন্টা পর তরী এসে ভিড়ল ফি ফি’র ঘাটে। লঞ্চ দ্বীপে ভিড়তেই অসংখ্য দালালের ভিড়। সবাই তাদের হোটেলের আতিথয়তা দিতে উদ্গ্রিব। এদের মাঝ থেকেই আগে থেকে সিলেক্ট করা এক মুসলিম রিসোর্টে ভাগ্যক্রমে রুম পেয়ে গেলাম। পাহাড়ে ঘেরা স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যের ছোট্ট একটি দ্বীপ ফি ফি। কেউ যদি পায়ে হেঁটেই দ্বীপটি প্রদক্ষিণ করতে চায়, তবে তার সর্বোচ্চ বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট লাগতে পারে । এখানে কোন যানবহন নেই, তাই পা-ই একমাত্র ভরসা। লাঞ্চ করে বিকেলে নেমে পড়লাম সাগরে। সত্যি বলছি, এমন কাকচক্ষু স্বচ্ছ পানি আমি এর আগে কোথাও দেখিনি। কোমর পানিতে দাঁড়িয়েও স্পষ্ট সাগরের তলদেশ দেখতে পারছিলাম। রুমে ফিরে ফ্রেশ হয়ে সন্ধ্যায় বের হলাম দ্বীপ প্রদক্ষিনে। কেউ যদি আজ আমাকে জিজ্ঞেস করে থাইল্যান্ড টুরের সবচেয়ে স্মরনীয় মুহুর্ত কোনটি, আমি বলব ফি ফি’তে কাটানো সেই একটি রাত। পুরো দ্বীপটি ছবির মত করে সাজানো। আলো ঝলমলে ছোট্ট ছোট্ট স্যুভেনির শপগুলো; সি ফুড, ইন্ডিয়ান আর থাই খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছে নানা সজ্জায় সজ্জিত রেস্তোরাগুলো। সাগরের তীর ঘেঁষে হাই বিটের মিউজিকের সাথে ফায়ার এ্যাক্রোবেটস আর এসব ঘিরে পর্যটকদের মিলন মেলা। সাগরের মাঝে জাহাজে পার্টি চলছে, মাঝিরা প্রস্তত সর্বদা আপনাকে সেখানে পৌঁছে দিতে। এখানে সাগর উত্তাল নয়, সর্বদাই যেন ধ্যানমগ্ন। সত্যিই রাতের ফি ফি’র এই অদ্ভুত মাদকতা কেমন এক নেশা ধরিয়ে দেয়। তবে এই নেশা যদি কেউ কাটাতে চান, তাহলে একবার শুধু স্যুভেনির শপগুলোতে গিয়ে কোন কিছুর দাম জিজ্ঞেস করলেই হবে। স্থলবিচ্ছিন্ন এই দ্বীপটির প্রতিটি জিনিসই আসে জাহাজে করে, তাই জিনিসগুলোর দাম যে চোখ কপালে ওঠার মত হবে এ আর অস্বাভাবিক কি? কক্সবাজারে ২০ টাকায় কিনেছিলাম এমন একটি একটি ব্রেসলেটের দাম করেছিলাম , চাইলো বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮০০ টাকা। দাম শুনে হাতের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম ব্রেসলেট ছাড়া হাতটা খুব একটা মন্দ লাগছে না!

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

ফি ফি আইল্যান্ড

পরদিন খুব সকালে উঠে আবার দ্বীপভ্রমন, তবে এবার দিনের আলোয়। সেইসাথে ভোরের চমৎকার আলোয় ফটো সেশন। দুপুর নাগাদ ফি ফি’র পাট চুকিয়ে আবার ফেরিতে উঠে বসলাম, এবার গন্তব্য ফুকেট। আবার প্রায় দুই ঘন্টা পর ফেরি ফুকেটের তীরে নিয়ে ফেলল আমাদের। এবার দৃশ্যপটে বেশ পরিবর্তন। নাগরিক ছোঁয়ায় দ্বীপের আবেশ অনেকটাই উধাও। ট্যাক্সি করে পেতং বিচের কাছেই একটি হোটেল নেওয়া হল। এবার থাইল্যান্ডের প্রত্যাশিত রুপের বেশ কাছাকাছি আমরা। রাস্তার ধারে সার বেঁধে মাসাজ পার্লার। স্বল্পবসনা গোলাপী সুন্দরীরা কাস্টমার পেতে যথেষ্ট সক্রিয়। একা পুরুষ দেখলেই টানাটানি চলছে। তবে স্ত্রী-কন্যা সাথে দেখে আমাদের জামাইদের যথেষ্ট হতাশ করেই তাদের কাছেও ঘেঁষল না বেরসিক সুন্দরীরা। যাই হোক, রাতে বের হলাম ফুকেট ভ্রমণে।

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

বাংলা রোড, ফুকেট

এখানে নাইট লাইফ নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাইছি না। শুধু বলি, বাংলা রোডে গিয়ে কান্ডকারখানা দেখে আমরা আমাদের পাতায়া টুরের ইচ্ছা জলাঞ্জলি দিলাম। আগেই বলেছি, আমরা আমাদের প্ল্যানটি করেছিলাম যথেষ্ট ভেবেচিন্তে। এই কয় দিনে সাগর, পাহা্ড়,‌ দ্বীপ যথেষ্ট দেখেছি, তাই এবার আমাদের ফুল কন্সেট্রেশন গ্রুপের ক্ষুদে সদস্যদের দিকে। তাই আগেই আমরা দেখে রেখেছিলাম দু’টি মজার স্পট। একটি ট্রিক আই মিউজিয়াম আর অন্যটি বান তি লাঙ্কা অর্থাৎ উলটো বাড়ি। এই কয়েকদিনের এ্যাডভেঞ্চারের পর এমন মজার দুইটি স্পট সত্যিই এক অদ্ভুত রহস্যের জগতে নিয়ে গিয়েছিল আমাদের। পরদিন দুপুর পর্যন্ত এই দুইটি স্পট কভার করে বিকেলে ফুকেট শপিং। এখানেও জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। তারপরও টুকিটাকি কেনাকাটা করলাম (পরে ব্যাংককে একই জিনিস অর্ধেক দামে কিনেছি)। পরদিন কাকডাকা ভোরে এয়ারপোর্ট পৌঁছে এয়ার এশিয়ায় ব্যাংককে আগমন।

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

বান তি লংকা, ফুকেট

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

ট্রিক আই মিউজিয়াম

ব্যাংকক পর্বঃ

এবার ব্যাংকক কথা। ফুকেট থেকে আকাশপথ পাড়ি দিয়ে আবার ব্যাংকক ডন মুয়াং এয়ারপোর্টে প্রত্যাবর্তন। দুই ফ্যামিলি, তাই মিনি ভ্যানে করে নগরের প্রাতুনাম এলাকায় এসে আগেই অনলাইনে বুকিং দেয়া একটি হোটেলে উঠে পরলাম। ব্যাংককে শপিং যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই এই ব্যাপারটাকে প্রাধ্যান্য দিয়ে আমরা আগে থেকেই আমাদের হোটেলটি প্রাতুনাম এলাকায় সিলেক্ট করেছিলাম। যাবতীয় হোলসেল এবং অন্যান্য মার্কেটগুলো আমাদের হোটেল থেকে হাঁটাপথের দুরত্বে ছিল।

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

রয়্যাল প্যালেস, ব্যাংকক

এবার আসি ব্যাংকক শহর প্রসঙ্গে। শহরের যত ভিতরে প্রবেশ করছিলাম, আমার মুগ্ধতার মাত্রা ততই কমছিল। কোথায় ক্র্যাবি, ফি ফি, ফুকেটের সেই নয়নাভিরাম সাগর সৈকত, আর কোথায় এই ইট কাঠের খাঁচায় ঘেরা ব্যাংককের ঘিঞ্জি নগর জীবন! শহরবাসীর কাঠখোট্টা ব্যাবহার এবং ট্যাক্সি ও টুকটুক চালকদের অসহযোগিতামুলক আচরণ আমার হতাশার মাত্রা আরো বাড়িয়ে তুলল। যেখানেই যেতে চাইনা কেন, আগে তাদের কথামত কোন স্যুভেনির শপে যেতে হবে অথবা কোন টুরিস্ট স্পটের টিকিট তাদের মাধ্যমে কাটতে হবে। আর তাতে যদি আপনি রাজী না থাকেন, তবে তার ক্ষতিপুরণ হিসেবে আপনাকে তিনগুন ভাড়া দিয়ে যেতে হবে। নইলে “আই দোন গো” বলে চোখের নিমিষে হাওয়া হয়ে যাবেন এই মহামানবেরা।

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

ওয়াত আরুন, ব্যাংকক

যাই হোক, এমনই পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের ব্যাংকক পরিভ্রমণ শুরু হল। প্রথম দিন গেলাম গ্র্যান্ড প্যালেস। সময় বেশি ছিল না বলে আমরা আর ভিতরে ঢুকলাম না। এর পর নৌকায় করে সিটি ট্যুর। আপনার যদি পঁচা, নোংরা,দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে একঘন্টা সময় নষ্ট করার তীব্র বাসনা থেকে থাকে, তাহলে এই সিটি ট্যুরটি নিতে পারেন, নইলে দরকার নেই। আমার থাইল্যান্ড ভ্রমণের সবচেয়ে জঘন্য এক্সপেরিয়েন্স ছিল এটা। সন্ধ্যায় টুকিটাকি শপিং। দ্বিতীয় দিন সকালে মাদাম তুসোর মিউজিয়াম দর্শন। জগতবিখ্যাতদের সাথে ফটোসেশনটা সেরে নিলাম। এখানে সিয়াম প্যারাগনে বাচ্চাদের জন্য ওয়াটার ওয়ার্ল্ড এবং আরো কিছু বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে, তবে সময়স্বল্পতার কারণে আমরা আর ওদিকে যাইনি। তাছাড়া মালয়েশিয়ায় একই ধরনের ওয়াটার ওয়ার্ল্ড আমরা আগেই দেখে ফেলেছিলাম বলে আগ্রহও কম ছিল। তবে সাফারি ওয়ার্ল্ডটা মিস করেছি সময় স্বল্পতার জন্য। যার জন্য এখনো আফসোস হয়। দুপুরের পর থেকে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম শপিং-এ। সেদিন রাত এবং পরদিন হাফ ডে পর্যন্ত দুই কিস্তিতে শপিং করে জামাই বেচারার পকেট গড়ের মাঠ করে অতঃপর তাকে দিয়েই সেসব টানাতে টানাতে এয়ারপোর্ট এবং সেখান থেকে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন। আর এখানেই আমাদের আট দিনের থাইল্যান্ড ভ্রমনের সমাপ্তি।

এখন কিছু কমন প্রশ্নের উত্তর দেই-

খরচঃ
পুরো থাইল্যান্ড ট্যুরে আমাদের তিনজনের শপিং ছাড়া দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে বিমান ভাড়া ৪৮,০০০ টাকা এবং ভিসা ১০,২০০ টাকা। রিজেন্টের অফারে টিকিট কেটেছিলাম ১৭,০০০ করে। এছাড়া ব্যাংকক টু ক্র্যাবি, এবং ফুকেট টু ব্যাংকক এয়ার এশিয়ায় টিকিট ফেয়ার পরেছিল তিনজনের প্রায় ১২,০০০ টাকা। ভিসা আমরা সরাসরি করেছিলাম কোন দালাল ছাড়া, তাই জনপ্রতি ৩,৪০০ টাকা করে খরচ হয়েছিল। প্রতিটি হোটেলেই কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট ছিল। খাবার খরচ থাইল্যান্ডে বেশি না। আমরা বেশিরভাগ সময় ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে খেয়েছি, তাই খরচ একটু বেশি পরেছে। থাই ফুড মাঝে মাঝে ট্রাই করেছি, আমার ভাল লাগেনি। পিক সিজনে গিয়েছিলাম বলে কিন্তু সব জায়গাতেই হোটেল ভাড়া বেশি পরেছিল। অন্য সময়ে গেলে আরো কম পরবে। তবে ফি ফি আইল্যান্ড সব সিজনেই এক্সপেন্সিভ। থাই বাথ বাংলাদেশি টাকার প্রায় আড়াই গুন। আমাদের সাথে বাচ্চা থাকার কারণে খরচ একটু বেশি হয়েছে কারণ খাবার বা সেফটির ব্যাপারে কম্প্রোমাইজ তো আর করা যায় না। ব্যাংকক শহরে ফ্রি শাটল আছে, তবে এর খোঁজ করিনি ওই একই কারণে। সব জায়গায় ট্যাক্সিতেই মুভ করেছি। বাচ্চা না থাকলে হয়তো এ্যাডভেঞ্চার করা যেত।

ক্র্যাবি ফি ফি ফুকেট ব্যাংকক নিয়ন আলোয় neon aloy

থাই বীফ স্যুপ

ভিসাঃ
ভিসা করাতে আমাদের কোন জটিলতাই হয়নি। একবারেই হয়ে গিয়েছিল। আমার জামাই সরাসরি করেছে কোন এজেন্সি ছাড়া। আসলে ফ্যামিলি থাকলে ঝামেলা কম হয়। ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেড় থেকে দুই লাখ টাকা দেখালেই চলবে।

শপিংঃ
শপিং-এর জন্য ব্যাংককের বিকল্প হয়না। সব জায়গাতেই নাইট মার্কেট আছে। মলগুলো আটটায় বন্ধ হয়ে যায়, তারপর দোকান থেকে মালামাল রাস্তায় এনে সেটাই হয়ে যায় নাইট মার্কেট যা প্রায় বারটা পর্যন্ত খোলা থাকে। জুতা, ব্যাগ আর গার্মেন্টস প্রোডাক্ট অনেক সাশ্রয় মুল্যে পাওয়া যাবে। ২০০ থেকে ৩০০ বাথে ভাল ব্যাগ পাওয়া যাবে। তবে আরো ভাল নিতে গেলে ৪০০, ৫০০ বাথ খরচ করতে হবে। জুতার ক্ষেত্রেও তাই। দামাদামি করতে পারবেন। তবে সস্তা দেখেই হামলে পরার কোন কারণ নেই, গুণগত মান সবক্ষেত্রে ভাল নয়। ৫০ থেকে ১০০ বাথে টুকিটাকি গিফট আইটেম কিনতে পারবেন। তবে যেখানেই যান না কেন, ফ্রেশ ফ্রুট জুস খেতে ভুলবেন না কিন্তু!

হোটেল:
ক্রাবিতে আমাদের হোটেলের নাম ছিল হারভেস্ট হাউজ, এটি আওনাং বিচে অবস্থিত। ট্যারিফ প্রতি রাতে তিন হাজার। ফি ফি’তে হোটেল মাইয়াদা। ট্যারিফ সাড়ে চার হাজার। ফুকেটে পেতং পার্ল, পেতং বিচে অবস্থিত। এর ট্যারিফ ছিল সাড়ে চার হাজার এবং ব্যাংককে হোটেল গেটওয়ে, রুম ট্যারিফ তিন হাজার টাকা। আপনাদের সুবিধার্থে ট্যারিফগুলো টাকায় কনভার্ট করে লিখলাম।

খোলামেলা পরিবেশঃ
নাইট লাইফ থাইল্যান্ডে বরাবরই উদ্দাম। সি-বিচগুলোতে টিনএজার নিয়ে গেলে কখনো কখনো বিব্রত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বাচ্চা সঙ্গে থাকলে ওয়াকিং স্ট্রিটগুলো থেকে দূরে থাকাই ভাল। রাস্তার পাশেই ওপেন বারগুলোতে সংক্ষিপ্ত পোশাকের ললনাদের স্ট্রিপ শো চলছে, আর সেই সাথে লেডিবয়দের দৌরাত্ব তো আছেই। আমরা এই সব কারনেই সেক্স সিটি খ্যাত পাতায়ায় আর যাই নি। বাচ্চা সঙ্গে থাকার কারনে আমরা যতদুর পেরেছি এই ধরণের পরিবেশ এ্যাভয়েড করেছি। মাসাজ পার্লারে সর্বদা ডাকাডাকি চলে। আমরা মাসাজ নেইনি, তবে যারা নিয়েছে তারা সুফল পেয়েছে শুনেছি। তাই আপনি চাইলে নিতেই পারেন।

সর্বশেষঃ
আট দিনে একটি দেশকে আর কতটুকু জানা যায় বলুন? তবে এক কথায় বলতে গেলে এক অসম্ভব সম্মোহনী সৌন্দর্য্যের অধিকারী একটি দেশ থাইল্যান্ড। এর দ্বীপগুলো যে না দেখেছে, সে সত্যিই এক অপার স্বর্গীয় সৌন্দর্য্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আর একবার সুযোগ পেলে কো সামুই, কো ফাঙ্গা আর চিয়াংমাই যাওয়ার ইচ্ছা আছে খুব। কারণ, একটিবার দেখে যে মন ভরেনা, তাই বারবার যেতে চাই সেই মাতাল করা ধ্যানমগ্ন সাগরের তীরে, আরো একবার হাঁটতে চাই সেই শুভ্র ভেজা বালুকাবেলায় , প্রকৃতিদেবী যেখানে উদার করে খুলে দিয়েছে তার মোহনীয় মাধুর্য্যের ডালা।

আপনার ভ্রমণকাহিনী শেয়ার করতে চান নিয়ন আলোয়-এর সাথে?
যোগাযোগ করুন আমাদের ফেসবুক পেইজের মেসেজে, অথবা ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com এই ঠিকানায়।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top