গল্প-সল্প

বোধ!

“তুমি হয় তোমার মা’কে রাখবা, নাহয় আমাকে.. ওকে?? আমি ওই মহিলার দায়িত্ব নিতে পারবো না আর। যখন তখন খালি বাথরুমে নিয়ে যাও, আবার আনো। হঠাৎ করে প্রস্রাব করে দেয়া, গায়ের গন্ধ! টেনে টুনে তুলতে হয়, গোসল করানো লাগে, আই এম রিয়েলি স্যরি, বাট এইসব আমি পারবো না। এইসব আজাইরা কাজ করার জন্য আমি লেখাপড়া করে এই ঘরে বউ হয়ে আসি নাই। তুমি ওনাকে যত তাড়াতাড়ি পারো বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসো প্লিজ.. প্লিজ প্লিজ!!”

“দেখো তানিয়া, এখন সেটা সম্ভব না। জায়গা-জমির দলিলে এখনো সাইন নিই নি। আর এখন এই বাড়ি টা মা’র নামে। এখন দিয়ে আসলে হয়তো বাড়িটা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তারচে’ বুড়ি ওইভাবে পড়ে থাকুক, ওইভাবে মরুক। তুমি তোমার হালে থাকো, চিল করো।”

নাজমা বেগম, বয়স ঊনষাট কি ষাট হোলো। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকটা শতবয়সী বৃদ্ধার মত অচল হয়ে পড়েছেন। কোনো কিছু ঠিকমত হাতে ধরতে পারেন না। হাত কাঁপে। শ্বাস-কষ্ট, গ্যাটেবাত তো নিত্যসঙ্গী! ঠিকমত চিকিৎসাও হয় না তার। এক কোণে অবহেলিত হয়ে পড়ে থাকেন একমাত্র ছেলের সংসারে।

এই বাড়িটি তার স্বামীর ঘামঝরানো পরিশ্রমের বাড়ি। যখন বিয়ে করে এসে এই বাড়িতে উঠেন, তখন ছিলো টিনের ছাউনি। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ছিলো না। তারা দুজনে মিলে দিনরাত পরিশ্রম করেছিলেন। হেন কাজ ছিলো না যা তারা করেননি। কাপড় সেলাই, গার্মেন্টসে চাকরী, দিন-মজুরী, রান্না করে অফিসে টিফিন সাপ্লাই দেয়া, গ্যারেজের মিস্ত্রি সব করেছেন। অসম্ভব কষ্টের বিনিময়ে তারা এ টিনের ছাউনির জায়গায় বাড়িটি বানিয়েছেন। দু’তলা বাড়িটি সাজিয়েছিলেন তারা নিজেদের মত করেই। সেখানে দক্ষিণমুখী বড়সড় একটা ব্যালকনি আছে, যেখান থেকে ভোরের সূর্য ওঠা আর রাতের জোৎস্না- দু’টোই দেখা যায়। নাজমা বেগম আর হাসান সাহেব খুব ভোরে ব্যালকনির গ্রিল ধরে সকালের সূর্য আর পাখিদের নীড়ছাড়া হতে দেখতেন। এক-একদিন জোৎস্না রাতে আর্মচেয়ারে আধশোয়া হয়ে চাঁদের আলোতে গা ভাসিয়ে দিতেন। দখিনা বাতাসে নাজমা বেগমের উড়তে থাকা চুল তার বড্ড ভালো লাগতো। বিকেলে চায়ের সাথে এক-আধটা মিষ্টি গান বাজতো শখের বশে কেনা দামী গ্রামোফোনটিতে। কিংবা কোন কোনদিন বৃষ্টি নামলে ব্যালকনির গ্রিল দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁতেন তারা। তাতে সাধ না মিটলে ধুপধাপ করে ছাদে গিয়ে কাকভেজা হয়ে আসতেন। ভালোবাসার কমতি ছিলো না।

ফাহিম তাদের জীবনে এলো বহু বছর পর। এই বাড়িতেই কেটেছে নাজমা বেগমের একমাত্র সন্তান ফাহিমের বাল্যকাল, শৈশব, কৈশোর… কত স্মৃতি ঘেরা এ বাড়ি! ফাহিমের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তারা তাকে সব চেয়ে সেরা স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়েছিলো। কোনো কমতি রাখেননি ফাহিমের কোন আবদার মেটানোতে, যা চেয়েছে সব পেয়েছে। এমনকি ফাহিম নিজে যে মেয়েকে পছন্দ করেছে, সেই মেয়েকেই বউ করে এনেছেন ছেলের সুখের জন্য! ফাহিমের ভার্সিটিতে উঠার পর তার বাবা মারা যায় ক্যান্সারে। নাজমা বেগমের দেহে রোগের আগমন শুরু সেই থেকে!

ছেলে বড্ড লক্ষী ছিলো। কিন্ত বউটা আসার পর সে পুরোপুরি পালটে যায়। সেদিন হাত থেকে একটা সেটের কাচের গ্লাস ফেলে দেয়ায় বউ তাকে থাপ্পড় মেরেছিলো! হাঁটতে দেরি করলে হাত ছেড়ে দেয়, মাঝেমধ্যে তাল সামলাতে না পেরে নাজমা বেগম পড়ে গিয়ে ব্যাথা পান অনেক। মাঝেমধ্যে তাকে খেতে দেয়া হয় না। টেবিলে মাছ-মাংসের অভাব নেই, কিন্তু নাজমা বেগমের ভাগ্যে জোটে বাসি খাবার, ডাল-ভাত। চুপচাপ খেয়ে বসে থাকেন আর চোখের পানি মোছেন সাদা ছেঁড়া শাড়ির আচল দিয়ে!

বউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ইদানিং ছেলেও কম না। সে সমান তালেই মায়ের সাথে বেয়াদবি করে যায়। মায়ের যে পরার মত শাড়ি নেই, সেটা তার চোখে পড়ে না। কিন্তু তার এটা খেয়াল থাকে যে তার বউ একই শাড়ি দুইবার পড়ছে কিনা, মেক-আপ এর জিনিসপত্র লাগবে কিনা। মাকে যে একবার ভালোবেসে জড়িয়ে ধরবে তা না, উলটো ধমকি দিয়ে বলে “আর কত অন্ন খতম করবি বুড়ি?” অথচ বউয়ের সাথে রোজ কামলীলা সারতে তার বাধে না, বউ কে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাবার খেতে যাবার সময় মায়ের কথা একটিবারও মনে পড়ে না।

বউয়ের প্ররোচনায় ফাহিম এই পৈতৃক ভিটে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। যে বাড়ির প্রতিটি কোণে রয়েছে ভালোবাসার অকৃত্রিম অমূল্য ছোঁয়া!

উকিল সব কাগজপত্র ঠিক করে নিয়ে আসে। সে মায়ের হাতের ছাপ দিয়ে সব কিছু নিজের নামে করে নেয়। ব্যস! কাজ শেষ…..

অদূরে এক বৃদ্ধাশ্রমের সাথে যোগাযোগ করা হলো। আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি, নাজমা বেগমকে নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে আসলো ফাহিম। দু’জোড়া কাপড় আর কিছু টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে চলে আসলো। আর কেয়ারটেকারের হাতে ৫০০টা টাকা গুঁজে দিয়ে বললো “তার মা যদি মারা যায় তাহলে তাকে যেন ট্রাবল দেয়া না হয়, নিজেরাই যেন ম্যানেজ করে নেয়”।

আসার পথে ফাহিম দেখলো, তার মা বৃদ্ধশ্রমের এক বহু পুরোনো কর্মচারীর সাথে কথা বলছে। কথা বলার ধরণটা এমন, যেন তারা বহু বছরের পরিচিত! তার মাকে ভেতরে নিয়ে যেতেই সে ওই কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করলো, “আপনি কি ওই মহিলাকে চেনেন? আপনাকে তো আগে কখনো দেখিনি, কিভাবে চেনেন?”

বৃদ্ধ-কর্মচারীর জবাব আসলো, “না চেনার কি আছে বাবা? বড্ড ভাল মানুষ এই মহিলা। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে রাস্তায় ফেলে দেয়া এক সদ্যজাত শিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন এক এতিমখানা থেকে, আমি আগে ওখানেই চাকরী করতাম”।

লেখিকাঃ তাহসিন বিনতে রফীক (আরশী)

Most Popular

To Top