বিশেষ

কাজের স্বীকৃতি পাচ্ছেন না, নিজেকে শেষ করে দেওয়াটাই কি শেষ সমাধান?

Neon Aloy Magazine
মাতা হারি নিয়ন আলোয় neon aloy

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জার্মান গোয়েন্দা মাতা হারি।

আমোদকন্যা বা এক্সোটিক ড্যান্সার মাতা হারি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনীর স্পাই ছিলেন, দুঃসাহসী নারী স্পাই।
ধরা পড়েন ফ্রেঞ্চ বাহিনীর হাতে। বিচারে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যার আদেশ দেয়া হয়। মৃত্যুর আগে চার্চের একজন নান বা সিস্টার তাঁকে অভয় দিতে আসেন। মাতা হারি তাঁকে বললেন, “মৃত্যু কিছু না। জীবনও কিছু না। মরে যাওয়া, ঘুমিয়ে পড়া, শূন্য হয়ে যাওয়া… এসবে কি আসে যায়? সবই মায়া, মরীচিকা!”
তাঁকে ফায়ার করে মেরে ফেলার আগে ফায়ারিং স্কোয়াডের সৈন্যদের দিকে হাসিমুখে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দেন মাতা হারি।

ভয়ংকর আমেরিকান ক্রিমিনাল জেমস রজার্সকেও মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিলো ফায়ারিং স্কোয়াডে। গুলি করার আগে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনার কোন শেষ ইচ্ছা আছে, জেমস?” জেমস তখন নখ কামড়াতে কামড়াতে নিশ্চিন্ত চেহারায় বললেন, “তা তো আছেই! আমাকে একটা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেওয়া যায় কি?”

জর্জ অ্যাপেল নামের এক ব্যাক্তিকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেওয়া হয়। অ্যাপেলের অপরাধ, সে নিউইয়র্ক সিটির এক পুলিশ অফিসারকে হত্যা করেছে। ইলেকট্রিক চেয়ারে বসেই সবার দিকে তাকিয়ে সে চিৎকার করে হেসে বললো, “বন্ধুরা, তোমরা একটু পরেই একটা ভাজা আপেল দেখবে…!”

ক্ষুদিরাম বসু নিয়ন আলোয় neon aloy

বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু

সবশেষ বলি আমাদের বিপ্লবী ক্ষুদিরামের কথা। ক্ষুদিরাম হাঁটতে হাঁটতে ফাঁসির মঞ্চের দিকে যাচ্ছেন, এই দৃশ্য নিয়ে মুকুন্দ দাসের রচনা করা একটা গান আছে যাতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন লতা মুঙ্গেশকর – “একবার যেতে দে মা, ঘুরে আসি।” এই গানটি শুনেছি অনেকেই।
ক্ষুদিরামের যখন বিচার হচ্ছিলো, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর। ফাঁসির রায় শুনে বিচারকদের দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন ক্ষুদিরাম। তখন বৃটিশ বিচারক কর্নডফ অবাক হয়ে ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞেস করলেন, “ছেলে, তোমার যে ফাঁসিতে ঝুলে মরতে হবে, এটা বুঝতে পারছো?”
ক্ষুদিরাম তখন মুচকি হেসে বললেন, “আরেকটু সময় যদি আমি পেতাম, তাহলে আমার ভারতবাসীকে শিখিয়ে দিতাম বোমা কিভাবে বানাতে হয়!”

কারো কারো জন্যে মৃত্যু ব্যাপারটা অন্যরকম আনন্দের। মৃত্যুর আগেই তাঁরা অদ্ভূত মিথ্যে কথায় ভর্তি জগত ফেলে অনেক দূরে চলে যান, যে জগতে সামান্যতম ভয়ও নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁরা উপভোগ করেন নিজের মৃত্যুকেও। এই মৃত্যুতে কষ্ট নেই, ঘৃণা নেই, অসহায়ত্ব নেই।

আবার কিছু কিছু মৃত্যু আছে খুব কষ্টের, খুব গ্লানির। ইদানিং ভুরি ভুরি ছাত্র-ছাত্রী আত্মহত্যা করে পরীক্ষায় এ প্লাস পায়নি বলে। এইতো সেদিন একটা ছাত্র আত্মহত্যা করলো এ প্লাস না পেয়ে। পরে বোর্ডে রেজাল্ট দেখা গেলো এ প্লাস পেয়েছে সে! ভুলে ভরা শিক্ষাপদ্ধতির ভুরি ভুরি এ প্লাসের মাঝে একজন এ প্লাস না পাওয়া ছাত্রের কি অবস্থা হবে ভবিষ্যতে, সেটা সে বুঝে ফেলেছিলো। কি অসহায়ত্ব নিয়ে মরে গেছে ছেলেটা!

সত্যিকারের সঠিক রেজাল্টে সে এ প্লাস পাবার পর শিক্ষাবোর্ড, কোন শিক্ষক কিংবা শিক্ষামন্ত্রী তাঁকে ‘স্যরি’ বললেন না… কেউ না!

আমরা মুখে যতোই বলি রেজাল্ট মূখ্য নয়, দিনশেষে সবাই রেজাল্টটাই দেখি। প্রশ্ন পেয়ে হোক আর না পেয়ে হোক, যে গোল্ডেন পেয়েছ তার জয়জয়কার সবদিকে। এ প্লাস না পেয়ে যে কাঁদছে, তাকে স্বান্তনা দিয়ে একটু পরেই আমরা তার কথা ভুলে যাবো।

একজনের সারাজীবন ধরে কষ্ট করে পড়ালেখা করে এসে দেওয়া পাবলিক পরীক্ষার খাতাগুলো মূল্যায়নের সময় একজন শিক্ষক কিংবা শিক্ষিকা কি সত্যিই বুঝেন, তাঁদের কোন ছোট্ট ভুল শেষ করে দিতে পারে কোন সম্ভাবনাময় জীবন? তাঁরা কি প্রত্যেকটা খাতা খোলার আগে দেখতে পান প্রশ্ন পাবার আগে টেনশনে ঘামতে থাকা, অজস্রবার আল্লাহ্‌ কিংবা ঈশ্বরের নাম নিতে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের মুখগুলো?

না দেখতে পান না। দেখতে পেলে একজন ইন্টার পরীক্ষার্থীর খাতা কখনো সমবয়সী কিংবা জুনিয়র কেউ কেটে সেই ছবি ফেসবুকে আপলোড করতো না… কোন ম্যাডাম বাসে বসে ইচ্ছামতো লাল কালি দিয়ে দাগ টেনে টেনে মিনিটে একটা করে খাতা কাটতেন না। অথবা দেশের বেশিরভাগ স্টুডেন্টকে মনে মনে জীবনে কোন না কোন একটা পর্যায়ে থ্রী ইডিয়টস মুভির দেয়ালে ‘I Quit’ লিখে ফাঁসিতে ঝুলে পড়া ছাত্রটির জায়গায় নিজেদের কল্পনা করতে হতো না।

ঘুণে ধরা, জঞ্জালে ভরা এই সিস্টেম আসলে কোন ছাত্র-ছাত্রীর জীবনের মূল্য দিতে জানে না। চুলোয় যাক এই সিস্টেম। এই সিস্টেম না জন্ম দিতে পারবে কোন জিনিয়াসকে না বানাতে পারবে কোন স্মুথ ক্রিমিনাল।

আমরা বিশাল একটা ল্যাবরেটরীর গিনিপিগ। এই ল্যাবরেটরিতে আমাদের খাঁচা থেকে বের করে যেভাবে ইচ্ছা কাটা হয়, কাটাকুটি শেষ হলে ফেলে দেয়া হয়। আর আমরা খাঁচায় বসে প্রার্থনা করি মৃত্যুটা যেন যন্ত্রণাদায়ক না হয়।

তবে স্বপ্ন দেখি একদিন সব বদলে যাবে। টিভি সিরিজ গেম অফ থ্রোনসের শিষ্য আরিয়া স্টার্ককে গুরু সিরিও ফোরেলের দেওয়া বিখ্যাত ডায়লগটার মতো আমাদের সবার মনে এই মন্ত্র গেঁথে যাবেঃ

– What Do We Say to The Death?
– Not Today…!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top