ক্ষমতা

F-35 যুদ্ধবিমানঃ ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যর্থতা

f-35 নিয়ন আলোয় neon aloy

বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামরিক বাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রজেক্ট এর নাম JSF Project বা ‘জয়েন্ট স্ট্রাইক ফাইটার’ প্রকল্প। সামরিক এই প্রকল্পটির জন্য মার্কিন সরকার এখন পর্যন্ত ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। উল্লেখ্য, প্রত্যেকটি ডলারের উৎস মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করা ট্যাক্স। সামরিক খাত নিয়ে সত্যিকার অর্থেই বাড়াবাড়ি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সর্ববৃহৎ সেনাবাহিনী ও সর্বোচ্চ সংখ্যক ট্যাংক যেন যথেষ্ট নয় তাদের জন্য। JSF প্রকল্পটির সূচনা হয় এই চাহিদা থেকেই। ১৯৯৪ সালে পেন্টাগন, লকহিড মার্টিন নামের একটি মার্কিন অস্ত্র ও বিমান প্রস্ততকারী কোম্পানীকে JSF প্রকল্পের দায়িত্ব প্রদান করে। প্রকল্পটির সঠিক পরিচালনা থেকে সামরিক বাহিনীগুলোর জন্য অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করার কথা লকহিড মার্টিনের।

লকহিড মার্টিন এবং অন্যান্য কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত মডেলগুলোর মধ্যে F-35 মডেলটি বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কার্যকর বিমানগুলোর অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিস্থাপক হিসেবে কংগ্রেসে উত্থাপন করা হয়। যুদ্ধবিমানটির পরিকল্পনা দশায় সমসাময়িক অন্যান্য সকল প্রতিপক্ষের বিমানের কার্যকারিতা বিবেচনাধীন ছিল। অর্থাৎ F-35 প্রজেক্টটির সফল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সত্যিকার অর্থেই ছিল। এ শতাব্দীর প্রথম দশকে টেলিভিশনে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি বা ডিস্কভারি চ্যানেল দেখে থাকলে হয়ত F-35 এর প্রস্তুতি নিয়ে দেখা ডকুমেন্টারির কথাও মনে পড়তে পারে কারো কারো। সূচনার ২৩ বছর পর আসলে কি হল সেই যুগান্তকারী বিমানের তা নিয়ে কৌতুহলের সীমা নেই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর।

মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামরিক প্রকল্পটি প্রস্তাবিত সময়সীমার চেয়ে ৭ বছর বিলম্বে আছে। নির্ধারিত বাজেট এর ৭০% অতিরিক্ত খরচ হয়েছে এখন পর্যন্ত। অনেকটা ঢাকার মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রজেক্টের মত অবস্থা। এমন কি সামরিক খাতে বাজেট কমানো হলেও JSF প্রকল্পের বাজেট অপরিবর্তিত  রাখা হয়েছে। এই থেকেই অনুমান করা যায় যে আসলে প্রকল্পটি পেন্টাগন, কংগ্রেস এবং লকহিড মার্টিনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

F-35 পরিকল্পনার সময় মূল লক্ষ্য ছিল এমন বিমান তৈরী করা যা শব্দের চেয়েও দ্রূতগামী হবে এবং যার রাডার সিস্টেম হবে সর্বাধুনিক। বিমানটির কয়েকটি ভার্সনে উর্ধমুখী টেকঅফের সুবিধাও থাকার কথা। বিমানটির যুদ্ধক্ষেত্রে সফলতা নির্ভর করবে প্রতিপক্ষ কে আগে চিহ্নিত করে দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তাদের প্রতিহত করা। তবে F-35 এর এই কর্মদক্ষতা নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মনে অনাস্থা জন্ম নিয়েছে। যার মূল কারণ হল এখন পর্যন্ত এই দাবী পূরণ করতে পারে এমন একটি বিমানও লকহিড প্রস্তুত করতে পারেনি। তথ্যটি চাঞ্চল্যকরই বটে। ৭ বছর অতিরিক্ত সময় পাওয়ার পরও একটি কার্যকর বিমান বা একটি সফল ফিল্ড টেস্ট দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে লকহিড মার্টিন। কংগ্রেসে একাধিক সিনেটর হতাশাজ্ঞাপন করেছেন। সামরিক অনেক বিশেষজ্ঞের তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছে প্রকল্পটি।

সমালোচনার পক্ষের যুক্তিগুলো লকহিডের ব্যর্থতার থেকেও আশ্চর্যজনক। ২০১৪ সালের একটি পরীক্ষামূলক ডগ ফাইটে F-35 বিমানটি তার থেকে ২০ বছর আগে প্রস্তুতকৃত রাশিয়ান Su-35 বিমানের কাছে পরাজিত হয়। রাশিয়া ও চীনের বিমানবাহিনীর বিমান গুলো ইতোমধ্যে F-35 এর থেকে উন্নত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত হয়েছে। সেই সাথে বিমান গুলো  অত্যাধুনিক যন্ত্রাংশের সুবাদে যে সুবিধা গুলো F-35 বিমানটির ১০ বছর আগে হয়তো ছিল এখন সে সুবিধা গুলো প্রতিপক্ষের বিমান গুলোর থাকবে। অর্থাৎ F-35 বিমানটি এখন সময়ের দাবী পূরণ করতে অপারগ বলে অনেক সামরিক কর্মকর্তা মত প্রকাশ করেছেন। এখন পেন্টাগন আর কংগ্রেসের মধ্যে বিরুপ একটি অবস্থা বিরাজ করছে JSF প্রকল্পটি নিয়ে। যেহেতু বিমানটি এখনও প্রস্তুত হয়নি এবং হলেও তা কার্যকর কোন ভূমিকা পালন করতে পারবে না। ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পূর্ণটাই জলে গেছে সামরিক খাত থেকে- এমনটাই অভিমত অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞের।

F-35 যুদ্ধবিমান নিয়ে তুমুল সমালোচনা আর মতানৈক্য থেকে JSF প্রকল্পের ব্যর্থতার সব চেয়ে প্রকট কারণটি আলোচনায় এসেছে। শিল্পোৎপাদন প্রক্রিয়া কৌশলের ভাষায় যার নাম CONCURRENCE। এর অর্থ এমন এক উৎপাদন কৌশল যার ফলে কোন পণ্যের সকল পরীক্ষামূলক গবেষণা সম্পন্ন হওয়ার আগেই তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাওয়া। কংগ্রেস এবং লকহিড মার্টিন এই CONCURRENCE POLICY দিয়ে F-35 ফ্যাক্টরির কাজ শুরু করে। ফলাফলস্বরুপ গবেষণা ও প্রস্তুতির দুটি আলাদা খাত সমান তালে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। গবেষণা পর্ব সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে না প্রস্তুতককারকদের। নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরিকরণ সহজ হয়ে উঠেছে যা কংগ্রেসের জন্য অত্যন্ত লোভনীয়।

তবে, এই পলিসির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল, প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল একটি ডিজাইন প্রোডাকশন লাইনে একটি জগাখিচুড়ি অবস্থার সৃষ্টি করে। যেহেতু গবেষণা খাত থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ডিজাইন দেওয়ার আগেই কল-কব্জা তৈরি শুরু করে দেয়া হচ্ছে, পরবর্তিতে কোন প্রকার পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সেগুলো আবার নতুন করে প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণাখাতের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পর যে সকল যন্ত্রাংশে সমস্যা পাওয়া গেছে সেগুলো প্রস্তুতকৃত বিমান থেকে খুলে পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এর ফলে গবেষণা, প্রস্তুতি ও পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের সকল ধাপেই আর্থিক ও উৎপাদন সময়ের অপচয় হচ্ছে। এমন তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সামরিক গবেষক এই CONCURRENCE POLICY-কেই F-35 প্রকল্পের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।

উপসংহারে এই কথা বললে ভুল হবে না যে এই F-35 প্রজেক্টটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পিছনে ইতোমধ্যেই এত টাকা, সময় এবং মেধা বিনিয়োগ করা হয়েছে যে সেখান থেকে ফিরে আসার কোন রাস্তা নেই। আর টাকা জলাঞ্জলী দিয়ে এই প্রজেক্ট বাতিল ঘোষণা করারও সুযোগ নেই কেননা ইতোমধ্যেই মিত্র দেশগুলো কয়েকশো F-35 যুদ্ধবিমান কিনার অর্ডার দিয়ে রেখেছে, যেগুলো বাতিল হলে সমগ্র বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বেশ বড় ধরণের ঝাঁকুনি খাবে। তাই প্রয়োজনে আরো কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই প্রজেক্ট বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য। মাঝখান থেকে পকেট ভারী হচ্ছে লকহিড মার্টিনের। তাই যুক্তরাষ্ট সরকারের থিঙ্কট্যাঙ্কের এখন এই প্রকল্প নিয়ে একটাই মনোভাব- It is a project too big to fail!

[চলবে]
পরবর্তী পর্বঃ F-35 যুদ্ধবিমান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাত এবং কিছু কথা।

Most Popular

To Top