টুকিটাকি

বোবায় ধরেছে কখনো আপনাকে?

বোবায় ধরা নিয়ন আলোয় neon aloy

কল্পনা করুন মধ্যরাত। নিজের ঘরে ঘুমচ্ছেন। হঠাৎ ঘুম ভাঙলো, কিন্তু চোখ মেলতে পারছেন না। নড়ছে না শরীর, হাত পায়ের আঙুল পর্যন্ত। বুকের উপর ভর দিয়ে আছে কিছু। শ্বাস-প্রশ্বাস কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে। মনে হছে কেউ বুকের উপর উঠে বসে গলা আর শরীর চেপে ধরে আছে। প্রচণ্ড ভয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে চাচ্ছেন, কিন্তু টুঁ শব্দটি বের হচ্ছে না গলা দিয়ে। এমন চলতে থাকবে কয়েক মিনিট। ঘুম শান্তির পরিবর্তে হয়ে উঠেছে আতঙ্ক। পড়েই কোন হরর নভেলের প্লট ইন্ট্রো মনে হলেও এটি চিকিৎসকের কাছে দেয়া অনেক রোগীর সিম্পটমের বর্ণনা। জেনে হয়তো অবাক হবেন, আজ রাতে ঘুমানোর পর অনেকেই উপরে বর্ণনা করা ঘটনাটি বাস্তবে অনুভব করবেন। এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয় স্লিপ প্যারালাইসিস নামের একটি নিদ্রাব্যাধির কারণে। আমাদের দেশীয় ভাষায় যাকে “বোবায় ধরা” বলা হয়।

২০১১ সালে একদল গবেষক ৩৬,০০০ মানুষের কাছ থেকে নেয়া সমীক্ষার আলোকে বলেন, সাধারণ জনসংখ্যার ৭.৬% “বোবায় ধরা” দ্বারা আক্রান্ত। অনিদ্রা, ঘুমের সময়ের অনিয়ম, হতাশা কিংবা যে কোন মানসিক ব্যাধি থেকে এর উৎপত্তি হতে পারে। নিউরোসায়েন্স গবেষণার ভাষায় ঘটনাটি ব্যাখা দিতে হলে বলতে হবে, “যখন কেউ এর দ্বারা আক্রান্ত হবেন তখন তার মস্তিষ্ক ঘুম থেকে উঠে গেলেও তার শরীর তখনও ঘুমিয়ে থাকবে। যার কারণেই মূলত একে স্লিপ প্যারালাইসিস বা ঘুমের মধ্যে পক্ষাঘাতগ্রস্ততা বলা হয়।”

বোবায় ধরার পুরো ঘটনাটি আসলে এক প্রকার REM (rapid eye movement) দশা। এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, REM দশা কি? আমরা যখন ঘুমাই, তখন আমাদের ঘুমের গাড়ত্বকে আসলে চারটি ধাপ বা দশায় ভাগ করা যায়ঃ ১, ২, ৩, ৪ এবং REM দশা।
দশা ১ হচ্ছে ঘুমের একদম প্রথম দিককার দশা। এ সময়, আপনার ঘুম হয় খুবই হালকা। এ দশায় ঘুমন্ত কাউকে হালকাভাবে ডাকলেই তার ঘুম ভেঙে যাবে। এ সময় আপনার চোখের নড়নচড়ন এবং পেশীর সক্রিয়তা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে।
দশা ২-এ আপনার চোখের নড়াচড়া একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। মস্তিষ্কের তরঙ্গগুলো, যা আপনার শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোও কমতে থাকে।
দশা ৩ এবং ৪-কে গবেষকরা নাম দিয়েছেন ডেল্টা দশা। এই দুইটি দশায় আপনি গভীর ঘুমে অচেতন থাকেন এবং এই ঘুম থেকে আপনাকে জাগিয়ে তুলতে বেশ কষ্ট করতে হবে। এই দশায় আপনার চোখের নড়াচড়া এবং পেশীর সক্রিয়তা একদম শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
REM দশাতে আপনি ঘনঘন নিঃশ্বাস নেন, আপনার শরীরের পেশীগুলো সাময়িকভাবে অবশ হয়ে যায়। হৃৎপিণ্ড দ্রুত ধড়ফড় করতে থাকে, ব্লাড প্রেশার বেড়ে যায়। এ সময়টাতে  আপনার চোখ বেশ দ্রুত নড়াচড়া করতে থাকে (এ কারণেই এই দশার নাম দেওয়া হয়েছে Rapid Eye Movement, বা REM)। ঘুমের সবগুলো দশাতেই আপনি স্বপ্ন দেখতে পারেন, তবে বেশিরভাগ স্বপ্নই আপনি দেখে থাকেন মূলত এই REM দশায়।

বোবায় ধরা নিয়ন আলোয় neon aloy

বোবায় ধরা ব্যক্তির মনে হবে তার শরীরের উপর পাশবিক শক্তি নিয়ে কোন অশরীরী চেপে বসেছে, যার ভারে সে এক আঙ্গুলও নাড়াতে পারছে না

REM দশায় দেখা স্বপ্ন অন্যদের থেকে বেশি বাস্তব মনে হয়। ঘুমের এই দশায় মানব মস্তিষ্ক অতিরিক্ত কর্মক্ষম হয়ে ওঠে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এ সময় ঘুমন্ত দশায় থাকলেও এই দশায় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ অনেকটা থাকে জেগে থাকা অবস্থায় মস্তিষ্কের কাজকর্মের মতই! শরীরের এই ভারসাম্যহীন অবস্থায় দেখা স্বপ্নের কার্যকলাপ শরীরের উপর যেন প্রভাব না ফেলতে পারে মস্তিষ্ক সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে। সাধারণত যে কেউ এই দশায় ঘুম থেকে থেকে উঠার সাথে সাথে তার পেশীগুলো অবশ অবস্থা থেকে সচল হয়ে পড়ে। যে কারণে তিনি তৎক্ষণাৎ  শরীরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান, স্বাভাবিকভাবেই হাত-পা নাড়তে পারেন, কথা বলতে পারেন। তবে যাদের এই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে দেরি হয় তারাই “বোবায় ধরা” অবস্থায় আক্রান্ত হন। যেহেতু আমাদের শরীরের পেশীগুলো আমাদের হাত-পা নাড়ানো, দাঁড়ানো, কথা বলার মত প্রক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, সেহেতু পেশী সচল না হওয়া পর্যন্ত আপনি হাজার চেষ্টা করেও নড়তে বা কথা বলতে পারবেন না। সোজা বাংলায়, আপনার মস্তিষ্ক এ সময় সজাগ থাকলেও হাত-পা-মুখ ‘ঘুমন্ত’ অবস্থায় থাকার কারণে এ পরিস্থিতির সূচনা হয়। এই পরিস্থিতির ব্যাপ্তি কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে এই সময়টা এর চেয়ে ঢের বেশি মনে হয়।

বোবায় ধরা ঘটনাগুলোর বিবরণ থেকে গবেষকরা ধারণা করছেন মস্তিষ্ক শরীরের নিয়ন্ত্রন নিতে না পারায় তার ব্যাখ্যাস্বরুপ কোন ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করে। মস্তিষ্ক সিগন্যাল পাঠানোর পরেও যখন দেখে হাত-পা সহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গগুলো তার ‘কথা শুনছে না, তখন মস্তিষ্কের আক্ষরিক অর্থেই ‘মাথা খারাপ হয়ে যায়’! সে ভাবতে থাকে, “এরকম তো হবার কথা নয়, নিশ্চয়ই আমার শরীরের উপর কেউ একজন বসে থেকে আমার হাত-পা চাপা দিয়ে রেখেছে” এবং সে এটাই বিশ্বাস করতে শুরু করে। যে কারণে আপনার মনে হয় কোন এক অব্যাখ্যনীয় অশরীরী আপনার শরীরের উপর বসে আপনার গলা চেপে ধরেছে। অন্যদের মতে, মস্তিষ্কের আ্যমিগডালা নামের অংশের অতিরিক্ত কর্মক্ষমতা এই ধরনের অনুভূতির জন্ম দিতে পারে। মস্তিষ্কের এই অংশটি ভয় আর সন্ত্রস্ত অনুভূতির উৎপত্তিস্থল। বর্ণিত লক্ষণগুলো অনুভব করার সময় মানব মস্তিষ্ক ভীত হয়ে ওঠে এবং আ্যমিগডালা অতি কার্যকর হয়ে ওঠে।

আক্রান্ত ব্যক্তি কি ধরনের স্বপ্ন দেখে ভীত হচ্ছেন তার ভিত্তিতে “বোবায় ধরা” তিন ভাগে বিভক্তঃ
প্রথমত, Incubus; এতে মনে হবে কেউ বুকের উপর চেপে বসে আছে এবং হাত-পা বন্ধ করে রেখেছে। নিঃশ্বাসের সমস্যাটি ভয়ের কারণে হয়ে থাকে।
দ্বিতীয়ত রয়েছে Intruder; এই দশায় মস্তিষ্ক শরীরের অপারগতার ব্যাখ্যাস্বরুপ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্বের ভ্রম সৃষ্টি করে তার প্রতি ভয়ের প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এ স্বপ্নগুলো কিছু ক্ষেত্রে এতটাই বাস্তব হয় যে আক্রান্ত ব্যক্তি তা সত্যি মনে করতে থাকেন।
তৃতীয় এবং শেষটি হল Out-of-body; এ ধরনের বোবায় ধরায় আক্রান্তরা তাদের সত্তাকে শরীরের বাইরে ভেসে থাকতে অনুভব করেন। সারা রুম জুড়ে তারা উড়ে বেড়াতে পারেন কিন্তু শরীরে ফিরে চোখ মেলার ক্ষমতা তাদের থাকে না।

বোবায় ধরা নিয়ন আলোয় neon aloy

স্লিপ প্যারালাইসিসের “আউট অফ বডি” এক্সপেরিয়েন্স

মস্তিষ্কের আর সব ব্যাপারের মত স্লিপ প্যারালাইসিস বা “বোবায় ধরা” এর সম্পর্কেও জ্ঞান সীমিত। যার কারণে এর কোন প্রতিকার বা প্রতিরোধ এখনও আমাদের জানা নেই। গবেষক ও চিকিৎসকগণ চিত হয়ে শুয়ে ঘুমানো পরিহার করে এক পাশ হয়ে ঘুমানোর পরামর্শ দেন। যারা নিয়মিত এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান তাদের পরামর্শ দেয়া হয় শরীরের যে কোন একটি অঙ্গ নাড়াচাড়ার চেষ্টা করার, কারণ যে কোন একটি পেশি সচল হলে ঘটনাটির সমাপ্তি হয়।

তথ্যসূত্র ১ঃ জার্সী ডেমিক,
তথ্যসূত্র ২ঃ টাক ডটকম

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top