নিসর্গ

নারকেল তেল ও কারিপাতার দেশে (তৃতীয় পর্ব): কোচিনে প্রথম দিন

নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বের লিঙ্কঃ নারিকেল তেল ও কারিপাতার দেশেঃ দ্বিতীয় পর্ব]

২৬ ঘন্টা জার্নি করে যারপরনাই ক্লান্ত আমি। তার উপর আমার সে রকম মোশন সিকনেস আছে। মোশন সিকনেস এর চোটে আমি প্লেনের চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি। চোখ খুললেই মনে হচ্ছে পেটের সব কিছু বের হয়ে আসবে (যদিও পেটে তেমন কিছু নাই)। ওদিকে মাযহার ভাবীর ছেলেটা ক্রমাগত চিৎকার করে কেঁদে যাচ্ছে। কোন কিছুতেই তাকে শান্ত করা যাচ্ছেনা।

খানিক আগে সূর্য ডুবে গেছে। এমন সময় প্লেনের পাইলট ঘোষনা করলেন, আর কিছুক্ষনের মাঝে আমরা কোচিন এয়ারপোর্টে অবতরন করবো। এ কথা শুনে আমি অনেক কষ্টে চোখ খুললাম। প্লেন ল্যান্ড করা আর টেক অফ করা দেখতে আমার বরাবরই ভাল লাগে। চোখ খুলে জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। পৃথিবীর বুকে এত অসম্ভব সুন্দর মোহনীয় কোন জায়গা হতে পারে! সুবহানআল্লাহ!!

উপর থেকে গোধূলীর শেষ আলোয় কোচিন দেখা যাচ্ছে। হাজার হাজার গাঢ় সবুজ নারকেল গাছের সারির মাঝে শান্ত স্নিগ্ধ প্রশান্ত এক শহরহঠাৎ করে আমার সকল ক্লান্তি এক নিমিষে গায়েব হয়ে গেল। আমি কখনও ভুলব না এই মুহূর্তের কথা। কোন যায়গা যে এত সবুজ হতে পারে আমার ধারণা ছিলনা।

এ অঞ্চলে বছরের অধিকাংশ সময়ই প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি ধুয়ে দিয়ে গেছে কোচিনকে। কোথাও কোন ধুলা নেই। একদম ঝকঝকে তকতকে। এ দেশের অনেক শহর দেখার পর, এখনও আমি বলব কোচিনই সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন আর ডিসিপ্লিন্ড শহর।

প্লেন ল্যান্ড করার পর আমার আর তর সইছিল না। কখন সাফিরকে দেখব, কত দিন দেখি না! আমার কখনও বিশ্বাস হয় নাই, যে আমি সত্যি সত্যি ইন্ডিয়া এসে পৌঁছাতে পারব। আমার ধারণা ছিল শেষ মুহূর্তে কিছু একটা হবে, আমার যাওয়া বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমি সত্যিই চলে এসেছি!

ইশ…লাগেজ আসতে এতক্ষন লাগে কেন? সবারটা চলে আসছে, শুধু আমার লাল ফিতা লাগানো সুটকেসগুলোই আসছে না!! নানারকম হাস্যকর সব দুশ্চিন্তায় আমি অস্থির হয়ে যেতে থাকলাম।

অবশেষে ট্রলিতে করে তিনটা সুটকেস, একটা ব্যাকপ্যাক এবং একটা হাত ব্যাগ নিয়ে বহু কষ্টে ঠেলতে ঠেলতে বের হলাম। এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে কিছুক্ষন পর দেখি দূরে সাফির আর মাযহার ভাইকে দেখা যাচ্ছে। বাপকে দেখে মাযহার ভাইয়ের পিচ্চি নিমিষেই চুপ হয়ে গেল। ঝাঁপ দিয়ে বাবার কোলে চলে গেল। কে বলবে, এই ছেলে একটু আগে গলা ফাটিয়ে কাঁদছিল। মাযহার ভাইও পিচ্চিকে দেখে এতই খুশি, যে বউ আর  লাগেজের কথাও মনে হয় ভুলেই গেলেন এবং মহানন্দে ছেলে কোলে রওনা দিলেন। আর ভাবী বেচারা লাগেজ টেনে টেনে পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন।

আমাদের আর ভাবীদের থাকার যায়গা দুইটা আলাদা নেভাল বেইসে। তাই আমরা এয়ারপোর্ট থেকে আলাদা হয়ে গেলাম। আমাদের বেস ভাবিদের চেয়েও ৮ কিমি. দূরে। উনারা থাকবেন ওয়েলিংডন আইল্যান্ডে, আর আমাদেরটা ফোর্ট কোচিন আইল্যান্ডে। আমাদের আইল্যান্ড মেইন ল্যান্ড থেকে বেশ কিছুটা দূরে।

ব্রিজে করে মেইনল্যান্ড থেকে প্রথমে একটা দ্বীপে যেতে হয়। সেখান থেকে ব্রিজ পার হলে, তারপর আমাদের ফোর্ট কোচিন দ্বীপ। এয়ারপোর্ট থেকে আরো দেড় ঘণ্টার দূরত্ব।

এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করলাম। প্রতি কি.মি. ১৭ রুপি করে। ঘুম ঘুম চোখে আলো ঝলমলে রাতের কোচিন দেখতে লাগলাম। বাংলাদেশে যেমন শুধু ঢাকা শহর অন্য শহরগুলোর তুলনায় উন্নত, তেমনি আমার ধারণা ছিল ইন্ডিয়াতে দিল্লী, আর বেশি হলে মুম্বাই হয়ত উন্নত হবে। আর কোচিন নিশ্চয় কোন মফস্বল শহর হবে।

বিশাল মসৃণ প্রশস্ত রাস্তা, ট্রাফিক জ্যাম ও গাড়িঘোড়ার ভীড়হীন, ঝলমলে বিলবোর্ড, দামি দামি ব্র্যান্ডের দোকানপাট দেখে বুঝলাম আমার ধারণা কতটা ভুল ছিল। পরে দিল্লী-মুম্বাই দেখার পর বুঝলাম, আমার ধারণা শুধু ভুলই নয়, বরং অনেক বড় ভুল ছিল। কোচিন এসব শহরের চেয়েও উন্নত!!

আমি আগে জানতাম, কোচিন  হল কেরালার প্রাদেশিক রাজধানী। এখানে আসার কয়েক মাস পরে জেনেছি কোচিন হল কেরালার বন্দর নগরী। থিরুভাথানারাম (Trivandrum) হল এখানের রাজধানী

তবে, কেরালার অন্য শহরের চেয়ে কোচিন সুন্দর এবং এখানে জমি কেনা প্রচন্ড এক্সপেন্সিভ। কারন এখানকার প্রায় প্রতিটা পরিবারের কেউ না কেউ মিডল-ইস্টে চাকরি করে এবং প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা পাঠায়। শহরে দামি দামি বাড়িঘর, শপিং মল বানায়। এককথায়, কোচিন হচ্ছে আমাদের চট্রগ্রামের মতো, দুবাইওয়ালাতে ভরা।

ফোর্ট কোচিনে যখন ঢুকলাম তখন রাত ৯টার উপর বাজে। অনেক ঘরেরই বাতি নিভে গেছে। রাস্তায় মানুষ কম। কোচিন যতই উন্নত হোক না কেন, একটা ব্যাপার এখানে মফস্বলের মত। রাত ১০টার ভেতর বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ হয়ে রাস্তা ঘাট খালি হয়ে যায়, মানুষজন খুব দরকার না থাকলে এত রাতে বের হয়না। মাঝে মাঝে শুধু কয়েকটা কুকুর দেখা যায় করুণ সুরে ডাকতে থাকে। ঢাকার রাত ১টা হল এখানে রাত ১০টা।

ফোর্ট কোচিন দেখে মনে হল যেন ভারত নয়, অন্য কোন দেশে চলে এসেছি। রাস্তার বাড়িঘর অনেকটা পর্তুগীজ অথবা ডাচ ধাঁচের। কিছু কিছু বাড়ির ছাদ আবার চাইনিজ ধাঁচের লাল দোচালা মতন। এ দ্বীপে কোন হাইরাইজ বিল্ডিং নেই। বেশিরভাগ দোতালা-তিনতলা বাড়ি। তার উপর অনেক বাড়িকেই মালিকরা Home Stay বানিয়ে ফেলেছে।

Home Stay হল এক ধরনের হোটেল, যেখানে সব কিছু ঘরের মত এগুলো হোটেলের মত বড় বড় হয়না, লম্বালম্বা লবি হয় না বরং বাসার মত ড্রয়িং, ডাইনিং আর ঘরোয়া রান্না ঘর থাকে এক কথায় যারা বিদেশে এসেও ঘরের মত পরিবেশ চায়, তারা এই বাড়ীর মতো হোটেলগুলোতে থাকে আর কোচিন যেহেতু পর্যটন নগরী, তাই এখানে হোটেলের পাশাপাশি এধরনের Home Stay এর প্রচুর চাহিদা ইন্ডিয়াতে সর্ব প্রথম কোচিনে Home Stay কন্টাসেপ্টটা চালু হয়। কিন্তু এখন ইন্ডিয়ার প্রায় সব পর্যটন নগরীতেই Home Stay জনপ্রিয়

রাতের কোচিন দেখতে দেখতে ট্যাক্সি আমাদের বেসের সামনে চলে আসল। আমাদের বেসের নাম ‘দ্রোনাচারিয়া’, হিন্দু পুরানের গুরু দ্রোণাচার্য্যের নামানুসারে। বেসের মেইন গেটে প্রচুর কড়াকড়ি। গার্ডরা জানালার কাঁচ খুলে দেখল ভিতরে কে কে আছে। আমি রাস্তাতেই কয়েক দফা ঘুম দিয়ে ফেলেছি। ঘুমাতে ঘুমাতে বেসের ভিতরে ঢুকলাম। একটা দোতালা দোচালা বাড়ির সামনে আমাদের নামিয়ে দিয়ে ট্যাক্সি চলে গেল। কোচিনে সব বাড়ির ছাদ টিনের চালের মত দু’দিকে ঢালু। বৃষ্টির পানি জমে না থাকার জন্য এই ব্যাবস্থা। ঠিক বরফের দেশে যে কারণে ঢালু ছাদ হয়।  

তালা খুলে আমাদের নতুন বাসায় পা দিলাম। নানা বাড়ির মতো আগের দিনের ডিজাইনের, দুই রুমের বাসা। একটা বেডরুম, সেখানে পরিপাটি করে সাজানো বিছানা। ছোট একটা লাল টকটকে ফ্রিজ, টিভি, আলনা। সাথে নীল টাইলস দেয়া ঝকঝকে বাথরুম। অন্য রুমটায় দুটো সিঙ্গেল সোফা, প্লাস্টিকের গোল ছোট খাবার টেবিল, চারটা প্লাস্টিকের বহু পুরানো চেয়ার, যার রঙ কোন কালে সাদা ছিল।  এই রুমের সাথেই পার্টিশন দেয়াযার অন্য পাশে রান্নাঘর। সেখানে দুটা গ্লাস, দুটা কাঁটাচামচ, চারটা প্লেট, চারটা টেবিল চামচ আর কয়েকটা রান্নার সরঞ্জাম, ডেকচি-পাতিল ইত্যাদি।

এরমাঝে সবচেয়ে সুন্দর হল, একচিলতে বারান্দা। যেহেতু আমাদের ফ্ল্যাটটা নিচতলায়, তাই বারান্দা থেকে দু’পা নিচে নামলেই খোলা জায়গা। একপাশে বিশাল মাঠ,আর অন্য পাশে আরব সাগর!! বাসার এত কাছে সত্যিকারের সাগর। আস্তে আস্তে হাটলেও মাত্র দুমিনিট লাগে সাগর পাড়ে যেতে!! (আমি ঘড়ি ধরে গুনে দেখেছি, আসলেই দু’মিনিট লাগে)!

ছোট থেকে সমুদ্রর পাশে থাকা আমার জন্য স্বপ্নের মত একটা ব্যাপার ছিল। ইনশাআল্লাহ্‌ আগামি ৬ মাস সাগরপারে থাকব- এর চেয়ে উত্তেজনাকর আর কি হতে পারে! আগের দিনের ধাঁচের এই ছোট বাসাটা কয়েকদিনের ভেতরই কিভাবে যেন আমাদের অতি আপন জায়গায় পরিণত হয়ে গেল। বাংলাদেশে ফেরত আসার সময় ছোট্ট বাসাটি ফেলে আসতে যে প্রচণ্ড কষ্ট লেগেছিল, তা আর বলার নয়। এখনও সে যায়গার কথা মনে হলে বুকের ভেতর খালি খালি লাগে।

প্রথম দিন কোনমতে খেয়ে শুয়ে পড়লাম। কোথায় আসলাম, কেমন জায়গা, এত কিছু ভাবার আর কোন শক্তি অবশিষ্ট ছিলনা।  

[পরবর্তী পর্বের লিঙ্কঃ নারিকেল তেল ও কারিপাতার দেশে (চতুর্থ পর্ব): সাগর পাড়ের দিনগুলো]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top